হোম / আহতদের তালিকা / আলম বাদশা
আলম বাদশা

আলম বাদশা

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, চতুর্থ শ্রেণি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

একটি শিশু, এক বিপ্লব, এক নির্মম শাসনের রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি
সেদিন শেরপুর শহরের এক কোণে, শিশু আলম বাদশা খেলার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়, যোগ দেয় মিছিলে। যে মিছিল ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, এক উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্নে প্রজ্বলিত। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয় শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট বাহিনী। পুলিশ গাড়ির চাকা তুলে দেয় মিছিলে থাকা মানুষের শরীরে, হত্যা করে তিনজনকে প্রকাশ্য রাস্তায়। আর যে মুহূর্তে মানুষের বুক ফেটে বেরিয়ে আসে শোক ও ক্ষোভ, সেই মুহূর্তে শুরু হয় বুলেট ও লাঠির বর্ষণ। সে সময়ই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয় আলম বাদশার ছোট্ট শরীর। কোনো সামরিক সন্ত্রাসী নয়, কোনো অপরাধী নয়— শুধু একটি শিশু, যার অপরাধ ছিল দেশের পক্ষে দাঁড়ানো। তার দেহে আজও রয়েছে ৪২টি গুলির ক্ষতচিহ্ন-যা বের করা যাচ্ছে না অল্প বয়স হওয়ার কারণে। এই ক্ষতগুলো কেবল শারীরিক নয়। ক্ষতগুলো খুনী মুজিবের বেটি খুনি হাসিনা সরকারের ব্যর্থতা, দমননীতি ও অমানবিক, শাসনের নগ্ন উদাহরণ!


আওয়ামী শাসন যে কীভাবে ভিন্নমতের প্রতি শূন্য সহনশীলতা দেখায়, কীভাবে শিশু পর্যন্ত তাদের দমনযজ্ঞ থেকে রেহাই পায় না— আলম বাদশা তার জ্যান্ত প্রমাণ। এই একটি দৃষ্টান্তই বলে দেয়, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কেবল রাজনৈতিক মতবিরোধ দমন করে না, সে ভবিষ্যতকেও গুলিতে ঝাঁজরা করে দেয়। আলম আজও বেঁচে আছে, বেঁচে আছে যন্ত্রণার সঙ্গে, বেঁচে আছে প্রতিজ্ঞায়— এই রক্তে ভেজা পথ কখনো ভুলবে না। সে শুধু শিশু নয়, সে এক জীবন্ত সাক্ষ্য, এক বিপ্লবের শিখা, যে প্রজন্মকে শিখিয়ে দেবে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে কীভাবে বুক উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।
ছোট্ট বয়স, বিশাল সাহস, আলম বাদশা ইতিহাসের বুকে এক জ্বলন্ত নাম।
জন্ম ও শৈশব
আলম বাদশা-জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী সন্তান, জন্মগ্রহণ করেন ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর, শেরপুর জেলার শেরপুর উপজেলার সরকারপাড়া গ্রামে। ছোট্ট এই গ্রামেই তাঁর শৈশবের সূচনা, যেখানে প্রকৃতির সরলতা আর জনজীবনের কষ্ট তাঁর মানস গঠনে রেখেছে গভীর প্রভাব। সমাজের নিপীড়িত মানুষের কাতারে বেড়ে ওঠা এই শিশু অল্প বয়সেই উপলব্ধি করে নেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দায়।
পারিবারিক প্রেক্ষাপট
আলম বাদশার পিতা ফকির আলি একজন পরিশ্রমী চাল কলের শ্রমিক, যিনি জীবনের নানা প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানদের মানুষ করতে সংগ্রাম করে গেছেন নিরবধি। কর্মহীন জীবনে থেকেও তিনি যে ত্যাগ ও আদর্শের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর মা খোর্শেদা বেগম একজন গৃহিণী, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অসীম ধৈর্য ও মমতার ছায়া বিস্তার করে সন্তানদের বুকভরা সাহস আর মূল্যবোধে গড়ে তুলেছেন। এই পরিবারেই গড়ে উঠেছে আলম বাদশার সংগ্রামী চেতনা। তাঁর বড় ভাই আমির হোসেন দুর্জয় জীবিকার তাগিদে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, অপর ভাই আমির হোসেনও জীবনের প্রয়োজন মেটাতে যুক্ত আছেন বিভিন্ন কর্মে, আর ছোট ভাই মো. আনিস প্রথম শ্রেণির এক প্রাণবন্ত ছাত্র!
ছাত্র জীবন ও সাহসী অংশগ্রহণ
মাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হয়েও আলম বাদশা অসামান্য সাহসিকতা দেখিয়েছেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনে। তাঁর মনোজগতে দারুণ প্রভাব ফেলেছে বড় ভাইদের আত্মত্যাগ, সেই স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে তিনি নাম লিখিয়েছেন জুলাইয়ের উত্তাল আন্দোলনের বীরসেনানীদের কাতারে। তাঁর অংশগ্রহণ ছিল নিছক উপস্থিতি নয়, বরং ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার এক সাহসী ঘোষণা।
সংগ্রামী জীবন ও প্রেরণা
আলম বাদশার জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয়, সাহস বয়স দেখে আসে না, আসে চেতনা আর দায়বদ্ধতা থেকে। একটি শিশু কীভাবে সময়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, কীভাবে দায়িত্ববোধের পরিপক্কতায় বিপ্লবী হয়ে ওঠে তা আলম বাদশার জীবনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তিনি শুধু একজন ছাত্র নন, একজন প্রতীক, যিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হতে পারেন প্রেরণার অগ্নিশিখা, সাহসিকতার আলোকবর্তিকা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
আমি আলম বাদশা। বয়সে ছোট হলেও স্বপ্ন ছিল বিশাল— একটা অন্যায়হীন সমাজ, যেখানে সত্য ও ন্যায়ের জয় হবে। ৪ আগস্ট, ২০২৪। দিনটি ছিল সাধারণ কোনো দিন নয়; ছিল সংগ্রামের দিন। দুপুর ১২টা নাগাদ আমি খেলার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হই, উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেওয়া। তখনও বুঝিনি, সামনে অপেক্ষা করছে ইতিহাসের এক ভয়াবহতম অধ্যায়। বিকেল ৩টার দিকে, যখন মিছিল উত্তাল হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী টিয়ার গ্যাস আর রাবার বুলেট ছুঁড়ে দেয় আমাদের দিকে। তারপর পুলিশ বাহিনী পাষাণের মতো গাড়ি উঠিয়ে দেয় মিছিলে, মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তিনজন নিরীহ প্রাণ। রক্তে রঞ্জিত সেই পথ ঘাট যেন মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। লাশগুলো যখন সন্ধ্যায় সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল, তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ আর কান্নার এক বেদনা কাতর সুর। সেই ক্রোধ থেকেই নতুন করে গর্জে ওঠে মিছিল— আর সে সময়ই শুরু হয় নির্মম দমন।
চোখের পলকে পুলিশ গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। আমি কিছু বুঝার আগেই আমার ছোট্ট শরীর যেন বিদীর্ণ হয়ে যায় রাবার বুলেটের বৃষ্টিতে। হাত, পা, বুক, পিঠ-আমার দেহের প্রায় প্রতিটি অংশে লাগে ৪২টি গুলির বুলেট। একটি শিশুর উপর কতটা বর্বর হতে পারে ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী, তা যেন, নিজের রক্তেই আমি লিখে দিয়েছিলাম। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, অচেতন হয়ে যাই। পরে জানতে পারি, আমার আন্দোলনের ভাইয়েরা আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে শেরপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাঁদের সাহস আর ভালোবাসাতেই আমি বেঁচে আছি।
আমার প্রশ্ন একটাই— কার ভয়ে ছোট্ট একটা দেহকে এমনভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিতে হয়? আমার অপরাধ কী ছিল? শুধুই কি মিছিলের একজন হওয়া? যদি তাই হয়,তাহলে আমি আজীবন এ মিছিলেই থাকব— ভয়হীন, মাথা উঁচু করে, আলোর পথ ধরেই।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
একটি ছোট শরীরে লুকিয়ে আছে ফ্যাসিবাদের ৪২টি ক্ষতচিহ্ন— আলম বাদশা শুধু নাম নয়, সে এক জ্যান্ত প্রতিবাদ
৪ আগস্ট ২০২৪-আন্দোলনের সেই ভয়াল দিনে ফ্যাসিস্ট দমন-পীড়নের শিকার হয়ে যখন আমি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, তখন আন্দোলনের ভাইয়েরা আমাকে উদ্ধার করে শেরপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই আমি ভর্তি থাকি ৫ আগস্ট পর্যন্ত। অবস্থা গুরুতর থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত আমাকে স্থানান্তর করা হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমার বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। এই ছোট্ট শরীর জুড়ে ছিল অসংখ্য গুলির ক্ষত, যার অনেকগুলো এখনো শরীরের ভেতর রয়ে গেছে- নিরব দগদগে যন্ত্রণা হয়ে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, ১৭ বছর না হলে এই গুলিগুলো অপারেশন করে বের করা সম্ভব নয়। ফলে এখনও শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনের সাথী হয়ে আছে সেই বুলেট। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকা দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়, সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা অনুভব করি। নিয়মিত চলছে ব্যথানাশক ওষুধের কোর্স। এই শরীরী ক্ষত কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি সাক্ষী হয়ে আছে একটি বর্বর শাসনের নগ্নতা ও এক শিশু বিপ্লবীর আত্মত্যাগের চিহ্ন হয়ে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পুনর্বাসন সংক্রান্ত তথ্য
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: চতুর্থ শ্রেণির একজন ছাত্র
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তাকে পড়াশোনার জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেয়া যাতে সে ভালো করে তার ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারে।


এক নজরে আলম বাদশা
নাম : আলম বাদশা
জন্ম তারিখ : ২৪-১১-২০১২
জন্মস্থান : শেরপুর
পেশা : ছাত্র, চতুর্থ শ্রেণি
নিজ জেলা : শেরপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দিঘারপাড়া, ইউনিয়ন/পৌরসভা: শেরপুর, থানা: শেরপুর, জেলা: শেরপুর
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : ফকির আলি
পিতার পেশা ও বয়স : চাল কলের শ্রমিক, ৩৮
মায়ের নাম : খোশেঁদা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৬
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ি : টিনের বাড়ি
সম্পদ : ৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
আহত হওয়ার স্থান ও সময়: শেরপুর থানার মোড়ে, ৪ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ২.০০টা
আক্রমণকারী ও আঘাতকারী: আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍