হোম / আহতদের তালিকা / আপন মিয়া
আপন মিয়া

আপন মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আইডি: ময়মনসিংহ বিভাগ ০১৩জন্ম ও শৈশব
আপন মিয়া জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী শ্রমিক যোদ্ধা। ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ শেরপুর জেলার শেরপুর উপজেলার পশ্চিম শেরীপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব কেটেছে অনাহার-অভাব আর সংগ্রামের ছায়ায়, কিন্তু সেই কঠিন জীবনই তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। গ্রামের সরল আর শ্রমজীবী মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল তাঁর শৈশব, যেখানে স্বপ্ন গড়া হয় রক্ত আর ঘামে।
এক নজরে আপন মিয়াপারিবারিক জীবন
আপন মিয়ার পিতা মো. বিশু মিয়া ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী, যিনি কঠোর পরিশ্রম করে ছেলেকে গড়ে তুলেছেন দৃঢ় মনোবল ও নৈতিকতার পাঠ দিয়ে। যদিও বর্তমানে কর্মহীন, তবুও তাঁর ত্যাগ আর পরিশ্রম পরিবারের কাছে অমূল্য সম্পদ। মা রাশেদা খাতুন একজন নিবেদিতপ্রাণ গৃহিণী, যিনি ভালোবাসা, মমতা ও নিরলস যত্নে সন্তানদের মানুষ করেছেন। আপন মিয়ার একমাত্র ছোট বোন বৃষ্টি এখনো শিশুকালেই— নূরানী মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক কোমলমতি শিক্ষার্থী।
কর্মজীবন
শৈশব থেকেই জীবিকার প্রয়োজনে আপন মিয়া শ্রমজীবী পেশায় যুক্ত হন। পেশায় তিনি একজন কাঠমিস্ত্রী— যিনি কেবল কাঠে কাজ করেন না, বরং সেই কাঠের শিল্পের নিপুণ ছাপ রেখে যান। কঠোর শ্রমে গড়ে ওঠা এই জীবন তাঁকে শিখিয়েছে সৃষ্টিশীলতা ও পরিশ্রমের মর্যাদা। কাঠের টুকরো থেকে যেমন নির্মাণ হয় সৌন্দর্য, তেমনি নিজ জীবনকে নির্মাণ করেছেন অটল সাহসে।
সংগ্রামী জীবন ও বিপ্লবী চেতনা
কাঠমিস্ত্রির পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বীর বিপ্লবীর আত্মা। আপন মিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাহসের সঙ্গে যুক্ত হন জুলাই আন্দোলনে। তাঁর বিশ্বাস ছিল— বড় ভাইদের আত্মত্যাগ যেন কখনো ভুলে না যায় এই জাতি, যেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় প্রত্যেকে। তিনি প্রমাণ করে দেন, সংগ্রামী হওয়ার জন্য উচ্চপদ বা নামী পরিচয় প্রয়োজন নেই— প্রয়োজন সাহস, চেতনা ও দায়বদ্ধতা। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একটি শ্রমিকের হাত থেকেও উঠে আসতে পারে ইতিহাস বদলে দেওয়া মুষ্টিবদ্ধ এক বিপ্লব।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ

আমি আপন মিয়া। একজন সাধারণ শ্রমিক। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কখনো পিছু হটিনি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকাল ৪টা ৩০মিনিট। এই সময়টিই আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত হয়ে থাকবে। সেদিন খরমপুর মোড়ে ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে শুরু হয় তীব্র সংঘর্ষ। আমি প্রতিদিনের মতোই কর্মস্থলে ছিলাম, কিন্তু যখন শুনি আন্দোলনে আবারও রক্ত ঝরেছে, যখন জানতে পারি কলেজ রোডে পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় দু’জন শহীদ হয়েছেন, তখন দেরি করিনি— দৌড়ে চলে যাই খরমপুরের দিকে। সেখানে ছাত্র-জনতার মিছিলের সামনের সারিতে ছিলাম আমি। কিন্তু রাষ্ট্র আমার মতো একজন শ্রমিকের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণকেও ক্ষমা করেনি। হঠাৎ খরমপুর এলাকায় পুলিশ ছুঁড়তে থাকে উপর্যুপরি টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলি। চারপাশে কান্না, চিৎকার, রক্ত আর ধোঁয়ার বিষাক্ত ধ্বংসযজ্ঞ। সেই গুলির একটি এসে বিদ্ধ হয় আমার চোখে। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যায়। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে রক্তের ধারা। আমি ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তখন আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে, আমাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনের প্রহরী ছাত্রলীগ এসে সেই মানবিক প্রচেষ্টাকে থামিয়ে দেয়। আহত একজন শ্রমিক, যার চোখ গুলিতে ঝাঁঝরা, তাকেও হাসপাতালে নিতে দেয় না তারা। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়াবহতা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার জীবন্ত প্রমাণ আমি আপন মিয়া। এই চোখ শুধু আলো হারায়নি— এই চোখ হারিয়েছে দেশের উপর রাখা ভরসার এক বড় অংশ। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের লেলিয়ে দেয়া পেশীশক্তি কীভাবে একজন শ্রমিকের জীবনকেও থামিয়ে দিতে চায়, তার নির্মম দলিল হয়ে আছে এই ৪ আগস্ট।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট— খরমপুর মোড়ে যখন পুলিশের গুলিতে আমার চোখ বিদ্ধ হয়, তখন আমি শুধু দৃষ্টিশক্তিই হারাইনি, হারিয়েছি স্বাভাবিক জীবনের পথচলার শক্তি। গুলির পর আমি ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। রক্তে ভিজে যায় মুখ, চোখ আর হৃদয়ের সমস্ত আশা। চারদিকে আতঙ্ক আর বিভীষিকা। এই ভয়াল মুহূর্তে আমার বাবা আমাকে কোলে তুলে নিয়ে যান নানাবাড়িতে, প্রাণে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টায়।
প্রথমে নেওয়া হয় স্থানীয় এক চক্ষু ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বারে। তিনি কিছু ওষুধ দেন, কিন্তু এক মাস চিকিৎসা চলার পরও চোখের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। শেষমেশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। সেখানেই আমার চোখে হয় প্রথম অপারেশন। চার দিন হাসপাতালে থেকে যন্ত্রণা আর প্রতীক্ষার মধ্যে কাটে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, প্রতি সপ্তাহে আবার যেতে হয় চিকিৎসকের কাছে। অবশেষে দুই মাস পর দ্বিতীয়বারের মতো অপারেশন হয়, এবং কিছু গুলি চোখ থেকে বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখনো একটি গুলি চোখের ভেতর রয়ে গেছে— যা প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করছে যন্ত্রণা, ঝাপসা দৃষ্টির ভয়। ডাক্তার বলেছেন, এক মাস পর আরেকবার অপারেশন করতে হবে।
কিন্তু আর যাওয়া হয়নি— অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অব্যবস্থাপনার জালে আটকে গেছে সেই চিকিৎসার পথ। আজও সেই চোখে সমস্যা রয়ে গেছে। ঝাপসা আলো, অস্বস্তি আর ব্যথার নতুন নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসে প্রতিদিন।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং প্রয়োজন।
পূনর্বাসন সংক্রান্ত তথ্য
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
একজন কাঠমিস্ত্রী, যিনি কাঠের উপর নকশা ডিজাইন করেন।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।

নাম : মো. আপন মিয়া
জন্ম তারিখ : ০৭-০৩-১৯৯৯
জন্মস্থান : শেরপুর
পেশা : শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রী
নিজ জেলা : শেরপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম শেরীপাড়া, পৌরসভা: শেরপুর, থানা: সদর, জেলা: শেরপুর
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : মো. বিশু মিয়া
পিতার পেশা ও বয়স : কাঠমিস্ত্রী, ৪০
মায়ের নাম : মোছা. রাশেদা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণি, ৩৫
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৮০০০ টাকা
বাড়ী : টিনের বাড়ি
সম্পদ : ৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ঘটনার স্থান : শেরপুরের খড়মপুর খাদ্য গুদাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪, বিকাল ৪.৩০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍