আরিফুল হক আসিফ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ছাত্র, নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ, অনার্স ৩য় বর্ষ
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
আরিফুল হক আসিফ জন্মগ্রহণ করেন ২০০৪ সালের ৫ মে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শান্তশিষ্ট জেলা জামালপুরে, নরুন্দি ইউনিয়নের শ্রী-বাড়ি গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি, কৌতূহলী ও মেধাবী। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষকের পরিশ্রম, এবং পরিবারের আন্তরিক ভালোবাসার মধ্যে বড় হতে হতে আসিফের মধ্যে গড়ে ওঠে সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতার গুণাবলি।
তার পিতা মায়নুল হক মঞ্জু, বয়স ৪০ বছর, পেশায় কৃষক; মা আফসানা মিমি, বয়স ৩৫ বছর, গৃহিণী। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন। সীমিত সম্পদের মধ্যেও পিতা-মাতা সন্তানের শিক্ষার প্রতি বিশেষ যত্নবান। তাদের একমাত্র স্বপ্ন ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
আসিফের পরিবার একটি সাধারণ কৃষক পরিবার। তাদের বসতভিটা মাত্র ১০ শতাংশ জমি, যেখানে একটি কাঁচা টিনসেড ঘর এবং ছোট একটি উঠান আছে। জীবিকার প্রধান উৎস কৃষিকাজ, যা ঋতুভেদে অনিশ্চিত। ফসলের ভালো ফলন হলে সংসারে কিছুটা স্বস্তি আসে, আর খারাপ মৌসুমে পরিবারকে ধার-দেনায় চলতে হয়। পিতার মাসিক গড় আয় ১৫০০ হাজার টাকা, যা দিয়ে সাতজনের সংসার, শিক্ষার খরচ, চিকিৎসা, ও ঘরের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। মায়ের গৃহকর্মই সংসারের আরেকটি স্তম্ভ। তিনি সংসার সামলান, সন্তানদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন, আর মাটি, ঘর ও ফসলের সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে রাখেন।
পরিশ্রমই এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী, তবুও তারা সততার সঙ্গে বাঁচে। কখনও বিলাসিতা নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এই বাস্তবতার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা আসিফ জীবনের মূল্য, কষ্ট, ও মানুষের মমতা বুঝতে শেখেন।
শিক্ষাজীবনের যাত্রা
আসিফের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার গ্রামের এক ক্ষুদ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সানফ্লাওয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুলে। এখান থেকেই তিনি অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী ও মনোযোগী। বই পড়তে ভালোবাসতেন, আর স্কুলের শিক্ষকরা তাকে “ভদ্র, মেধাবী ও নিয়মিত” ছাত্র হিসেবে চিনতেন। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন নান্দিনা এম এইচ কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানেই তিনি একের পর এক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেন। পিএসসি ২০১৫, জেএসসি ২০১৮, এবং এসএসসি ২০২০ সালে ভালো ফলাফল করে উত্তীর্ণ হন। এরপর নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি ২০২২ সালে সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি একই কলেজে অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র।
আসিফ পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ সচেতন ও উদ্যমী তরুণ হিসেবে পরিচিত। কলেজে তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সমাজসেবা কার্যক্রমে অংশ নেন। সহপাঠীদের কাছে তিনি সাহসী, আন্তরিক ও সহায়ক মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধাভাজন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সময়
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। সেই রাতেই, রাত ৯টার দিকে, আসিফ ছিলেন নান্দিনা আদনান ডায়াগনো কমপ্লেক্স এন্ড হসপিটালের সামনে। হঠাৎ করে একদল ছাত্রলীগ নেতাকর্মী সেখানে হামলা চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় তরুণদের ভয় দেখানো ও দমন করা। আসিফকে লক্ষ্য করে তারা একদম নির্মমভাবে আক্রমণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাকে চোখ ও হাত-পা বেধে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে জামালপুর সদরের উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল-এর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
নির্মম নির্যাতনের ভয়াবহতা
সেদিনের রাতটি আসিফের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল-এর বাড়িতে পৌঁছে তাকে একটি ঘরে আটকে ফেলা হয়। সেখানে ১২-১৫ জন ব্যক্তি একত্রে তার উপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। লোহার রড, কাঠ ও লাঠি দিয়ে একের পর এক আঘাত করা হয় তার শরীরে। মাথা, মুখ, বুক, পিঠ কোনো জায়গা বাদ যায় না। প্রহার করতে করতে তারা তার এক হাত ও এক পা ভেঙে দেয়। মুখে এমনভাবে আঘাত করে যে তিনি রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
এই নির্যাতন চলে টানা ৩ ঘন্টা। তার চিৎকার থেমে গেলে, অচেতন অবস্থায় ঘাতক আওয়ামী বেলাল-এর সহকর্মীরা তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয়রা এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থা
আসিফকে দ্রুত ডা: আদনান ডায়গনো কমপ্লেক্স এন্ড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার হাত ও পায়ে প্লাস্টার দেওয়া হয়, মাথা ও মুখের ক্ষত সেলাই করা হয়। প্রায় ১০ দিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। হাড় ভাঙার কারণে তার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহ পর ফিজিওথেরাপি শুরু হয়। ব্যথা কমাতে নিয়মিত ওষুধ ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হয়। এখনো তার শরীরের বিভিন্ন পেশি ও স্নায়ুর জায়গায় স্থায়ী ব্যথা রয়ে গেছে। হাঁটলে বা ঠান্ডা লাগলে ব্যথা বেড়ে যায়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকাও জোটে না, তবুও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমান জীবন ও চিকিৎসা
বর্তমানে আসিফ কিছুটা সুস্থ হলেও শারীরিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক নন। এক পা ও এক হাত এখনো দুর্বল। ভারী কিছু তুলতে পারেন না, দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে গেলেও ব্যথা শুরু হয়। তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং মাঝে মাঝে স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে থেরাপি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও তিনি পড়াশোনা থামাননি। ধীরে ধীরে ক্লাসে ফিরছেন, এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগোচ্ছেন।
পরিবারের সংগ্রাম
আসিফের পিতা এখনো প্রতিদিন মাঠে কাজ করেন। কৃষিকাজই সংসারের একমাত্র অবলম্বন। তবুও চিকিৎসা ও ঋণের বোঝা বাড়ছে দিন দিন। তাদের ঘরে কষ্ট, দারিদ্র্য ও উদ্বেগের ছায়া লেগেই আছে। তবুও পরিবারটি আশা হারায়নি। তারা বিশ্বাস করেন, আল্লাহ একদিন তাদের জন্য ভালো কিছু রাখবেন। আরিফুলের মা প্রায়ই বলেন, “আমার ছেলেটা ভালো মানুষ, আল্লাহ ওকে সুস্থ করে দিক। ওর কষ্ট যেন বৃথা না যায়।”
স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য
আসিফ এখনো স্বপ্ন দেখেন, তিনি আবার পূর্ণ সুস্থ হয়ে পড়াশোনা শেষ করবেন, শিক্ষক হবেন বা সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করবেন। তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতন করা। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি ছাড়িনি। আমার শরীর ভাঙতে পারে, কিন্তু আমার মনোবল কেউ ভাঙতে পারবে না।”
এক নজরে আরিফুল হক আসিফ
নাম : আরিফুল হক আসিফ
জন্ম : ০৫ মে ২০০৪, জামালপুর
শিক্ষা : অনার্স ৩য় বর্ষ, নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ
পেশা : ছাত্র, নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ, অনার্স ৩য় বর্ষ
জীবনের প্রথম স্কুল : সানফ্লাওয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুল
হাইস্কুল : নান্দিনা এম এইচ কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
কলেজ : নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ
বিশ্ববিদ্যালয় : নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ
পাশের সন
এসএসসি : ২০২০
এইচএসসি : ২০২২
জেএসসি : ২০১৮
পিএসসি : ২০১৫
স্থায়ী ঠিকানা : তারাগন্জ,শ্রী-বাড়ি, গ্রাম: শ্রী- বাড়ি, ইউনিয়ন: নরুন্দি, থানা: জামালপুর সদর, জেলা: জামালপুর।
বর্তমান ঠিকানা : নান্দিনা খড়খড়িয়া, গ্রাম: খড়খড়িয়া, ইউনিয়ন: রানাগাছা, থানা: জামালপুর সদর, জেলা: জামালপুর
পিতার নাম : মায়নুল হক মন্জু, পিতার পেশা : কৃষি, বয়স: ৪০
মায়ের নাম : আফসানা মিমি, মাতার পেশা : গৃহিণী, বয়স: ৩৫
বাড়ির বিবরণ : কাঁচা ( টিনসেড)
সম্পদ : ১০ শতাংশ (বাড়ি)
পরিবারের মাসিক আয়: ১৫০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
আহতের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৪, রাত ৯.০০টা
ঘটনার স্থান : নান্দিনা ডাঃ আদনান ডায়াগনো কমপ্লেক্স এন্ড হসপিটাল
আক্রমণকারী : জামালপুর সদর উপজেলার সাবেক আওয়ামী ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল, ও স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা
আঘাত : এক হাত ও পা ভাঙ্গা, মুখ ও মাথায় জখম
আক্রমণের ধরণ : হাত,পা, চোখ বেঁধে আওয়ামী সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল-এর বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন
অর্থনৈতিক অবস্থা : কৃষিনির্ভর পরিবার
পরিবার : পিতা-মাতা ও ৫ ভাইবোন
স্বপ্ন : ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ
চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
১. দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন
২. মনোসামাজিক কাউন্সেলিং
৩. চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যভিত্তিক নথি সংরক্ষণ
৪. শিক্ষা অব্যাহত রাখার সহায়তা
৫. ফ্রি টিউশন বা কোচিং সাপোর্ট
৬. শিক্ষা উপকরণ প্রদান
৭. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি মওকুফের ব্যবস্থা করা
তার পিতা মায়নুল হক মঞ্জু, বয়স ৪০ বছর, পেশায় কৃষক; মা আফসানা মিমি, বয়স ৩৫ বছর, গৃহিণী। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন। সীমিত সম্পদের মধ্যেও পিতা-মাতা সন্তানের শিক্ষার প্রতি বিশেষ যত্নবান। তাদের একমাত্র স্বপ্ন ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
আসিফের পরিবার একটি সাধারণ কৃষক পরিবার। তাদের বসতভিটা মাত্র ১০ শতাংশ জমি, যেখানে একটি কাঁচা টিনসেড ঘর এবং ছোট একটি উঠান আছে। জীবিকার প্রধান উৎস কৃষিকাজ, যা ঋতুভেদে অনিশ্চিত। ফসলের ভালো ফলন হলে সংসারে কিছুটা স্বস্তি আসে, আর খারাপ মৌসুমে পরিবারকে ধার-দেনায় চলতে হয়। পিতার মাসিক গড় আয় ১৫০০ হাজার টাকা, যা দিয়ে সাতজনের সংসার, শিক্ষার খরচ, চিকিৎসা, ও ঘরের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। মায়ের গৃহকর্মই সংসারের আরেকটি স্তম্ভ। তিনি সংসার সামলান, সন্তানদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন, আর মাটি, ঘর ও ফসলের সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে রাখেন।
পরিশ্রমই এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী, তবুও তারা সততার সঙ্গে বাঁচে। কখনও বিলাসিতা নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এই বাস্তবতার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা আসিফ জীবনের মূল্য, কষ্ট, ও মানুষের মমতা বুঝতে শেখেন।
শিক্ষাজীবনের যাত্রা
আসিফের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার গ্রামের এক ক্ষুদ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সানফ্লাওয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুলে। এখান থেকেই তিনি অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী ও মনোযোগী। বই পড়তে ভালোবাসতেন, আর স্কুলের শিক্ষকরা তাকে “ভদ্র, মেধাবী ও নিয়মিত” ছাত্র হিসেবে চিনতেন। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন নান্দিনা এম এইচ কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানেই তিনি একের পর এক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেন। পিএসসি ২০১৫, জেএসসি ২০১৮, এবং এসএসসি ২০২০ সালে ভালো ফলাফল করে উত্তীর্ণ হন। এরপর নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি ২০২২ সালে সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি একই কলেজে অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র।
আসিফ পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ সচেতন ও উদ্যমী তরুণ হিসেবে পরিচিত। কলেজে তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সমাজসেবা কার্যক্রমে অংশ নেন। সহপাঠীদের কাছে তিনি সাহসী, আন্তরিক ও সহায়ক মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধাভাজন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সময়
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। সেই রাতেই, রাত ৯টার দিকে, আসিফ ছিলেন নান্দিনা আদনান ডায়াগনো কমপ্লেক্স এন্ড হসপিটালের সামনে। হঠাৎ করে একদল ছাত্রলীগ নেতাকর্মী সেখানে হামলা চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় তরুণদের ভয় দেখানো ও দমন করা। আসিফকে লক্ষ্য করে তারা একদম নির্মমভাবে আক্রমণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাকে চোখ ও হাত-পা বেধে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে জামালপুর সদরের উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল-এর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
নির্মম নির্যাতনের ভয়াবহতা
সেদিনের রাতটি আসিফের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল-এর বাড়িতে পৌঁছে তাকে একটি ঘরে আটকে ফেলা হয়। সেখানে ১২-১৫ জন ব্যক্তি একত্রে তার উপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। লোহার রড, কাঠ ও লাঠি দিয়ে একের পর এক আঘাত করা হয় তার শরীরে। মাথা, মুখ, বুক, পিঠ কোনো জায়গা বাদ যায় না। প্রহার করতে করতে তারা তার এক হাত ও এক পা ভেঙে দেয়। মুখে এমনভাবে আঘাত করে যে তিনি রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
এই নির্যাতন চলে টানা ৩ ঘন্টা। তার চিৎকার থেমে গেলে, অচেতন অবস্থায় ঘাতক আওয়ামী বেলাল-এর সহকর্মীরা তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয়রা এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থা
আসিফকে দ্রুত ডা: আদনান ডায়গনো কমপ্লেক্স এন্ড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার হাত ও পায়ে প্লাস্টার দেওয়া হয়, মাথা ও মুখের ক্ষত সেলাই করা হয়। প্রায় ১০ দিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। হাড় ভাঙার কারণে তার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহ পর ফিজিওথেরাপি শুরু হয়। ব্যথা কমাতে নিয়মিত ওষুধ ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হয়। এখনো তার শরীরের বিভিন্ন পেশি ও স্নায়ুর জায়গায় স্থায়ী ব্যথা রয়ে গেছে। হাঁটলে বা ঠান্ডা লাগলে ব্যথা বেড়ে যায়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকাও জোটে না, তবুও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমান জীবন ও চিকিৎসা
বর্তমানে আসিফ কিছুটা সুস্থ হলেও শারীরিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক নন। এক পা ও এক হাত এখনো দুর্বল। ভারী কিছু তুলতে পারেন না, দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে গেলেও ব্যথা শুরু হয়। তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং মাঝে মাঝে স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে থেরাপি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও তিনি পড়াশোনা থামাননি। ধীরে ধীরে ক্লাসে ফিরছেন, এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগোচ্ছেন।
পরিবারের সংগ্রাম
আসিফের পিতা এখনো প্রতিদিন মাঠে কাজ করেন। কৃষিকাজই সংসারের একমাত্র অবলম্বন। তবুও চিকিৎসা ও ঋণের বোঝা বাড়ছে দিন দিন। তাদের ঘরে কষ্ট, দারিদ্র্য ও উদ্বেগের ছায়া লেগেই আছে। তবুও পরিবারটি আশা হারায়নি। তারা বিশ্বাস করেন, আল্লাহ একদিন তাদের জন্য ভালো কিছু রাখবেন। আরিফুলের মা প্রায়ই বলেন, “আমার ছেলেটা ভালো মানুষ, আল্লাহ ওকে সুস্থ করে দিক। ওর কষ্ট যেন বৃথা না যায়।”
স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য
আসিফ এখনো স্বপ্ন দেখেন, তিনি আবার পূর্ণ সুস্থ হয়ে পড়াশোনা শেষ করবেন, শিক্ষক হবেন বা সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করবেন। তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতন করা। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি ছাড়িনি। আমার শরীর ভাঙতে পারে, কিন্তু আমার মনোবল কেউ ভাঙতে পারবে না।”
এক নজরে আরিফুল হক আসিফ
নাম : আরিফুল হক আসিফ
জন্ম : ০৫ মে ২০০৪, জামালপুর
শিক্ষা : অনার্স ৩য় বর্ষ, নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ
পেশা : ছাত্র, নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ, অনার্স ৩য় বর্ষ
জীবনের প্রথম স্কুল : সানফ্লাওয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুল
হাইস্কুল : নান্দিনা এম এইচ কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
কলেজ : নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ
বিশ্ববিদ্যালয় : নান্দিনা শেখ আনোয়ার হোসাইন কলেজ
পাশের সন
এসএসসি : ২০২০
এইচএসসি : ২০২২
জেএসসি : ২০১৮
পিএসসি : ২০১৫
স্থায়ী ঠিকানা : তারাগন্জ,শ্রী-বাড়ি, গ্রাম: শ্রী- বাড়ি, ইউনিয়ন: নরুন্দি, থানা: জামালপুর সদর, জেলা: জামালপুর।
বর্তমান ঠিকানা : নান্দিনা খড়খড়িয়া, গ্রাম: খড়খড়িয়া, ইউনিয়ন: রানাগাছা, থানা: জামালপুর সদর, জেলা: জামালপুর
পিতার নাম : মায়নুল হক মন্জু, পিতার পেশা : কৃষি, বয়স: ৪০
মায়ের নাম : আফসানা মিমি, মাতার পেশা : গৃহিণী, বয়স: ৩৫
বাড়ির বিবরণ : কাঁচা ( টিনসেড)
সম্পদ : ১০ শতাংশ (বাড়ি)
পরিবারের মাসিক আয়: ১৫০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
আহতের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৪, রাত ৯.০০টা
ঘটনার স্থান : নান্দিনা ডাঃ আদনান ডায়াগনো কমপ্লেক্স এন্ড হসপিটাল
আক্রমণকারী : জামালপুর সদর উপজেলার সাবেক আওয়ামী ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল, ও স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা
আঘাত : এক হাত ও পা ভাঙ্গা, মুখ ও মাথায় জখম
আক্রমণের ধরণ : হাত,পা, চোখ বেঁধে আওয়ামী সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল-এর বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন
অর্থনৈতিক অবস্থা : কৃষিনির্ভর পরিবার
পরিবার : পিতা-মাতা ও ৫ ভাইবোন
স্বপ্ন : ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ
চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
১. দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন
২. মনোসামাজিক কাউন্সেলিং
৩. চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যভিত্তিক নথি সংরক্ষণ
৪. শিক্ষা অব্যাহত রাখার সহায়তা
৫. ফ্রি টিউশন বা কোচিং সাপোর্ট
৬. শিক্ষা উপকরণ প্রদান
৭. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি মওকুফের ব্যবস্থা করা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍