হোম / আহতদের তালিকা / মো. আশিকুর রহমান
মো. আশিকুর রহমান

মো. আশিকুর রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আশিকুরের পিতা জনাব রহিমুদ্দিন, বয়স এখন ৫২। তিনি পেশায় একজন কাঁচামাল বিক্রেতা। প্রতিদিন গ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরে স্বল্পমূল্যের সবজি সংগ্রহ করেন। তারপর তা নিয়ে শহরের পথে ছুটেন, হাঁটেন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত। দিনশেষে যা আয় হয়। তা দিয়ে চলে সংসারের দৈনিক আহার। বেশি কিছু নয়, কিন্তু অভাবের সঙ্গে লড়ার মতো যথেষ্ট। আশিকের মা আলেয়া খাতুন, বয়স ৪১, সংসারের হাল ধরেছেন অন্যভাবে। একটি ছোট মুদি দোকান চালান তিনি, সেখানে বিক্রি হয় চিনি, চা-পাতা, বিস্কুট আর ছোটখাটো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যা বিক্রি হয়, তার প্রতিটি পয়সা দু’হাতে ঢেলে দেন সংসারের চুলায়, সন্তানের খাতায়, স্বামীর কষ্টের কাঁধে।
এই দম্পতির চার সন্তান। একমাত্র ছেলে আশিকুর রহমান এবং তার তিন বোন: এশা, নুপুর ও সাদিয়া। এশা কিছুদিন আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, নতুন জীবনের দিকে পা বাড়িয়েছে। নুপুর অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, স্বপ্ন দেখে শিক্ষক হবার, আর সবচেয়ে ছোট সাদিয়া দশম শ্রেণির ছাত্রী, তার খাতা এখনো স্বপ্ন দিয়ে ভরা। কিন্তু পরিবারের সব আশা-ভরসা, স্বপ্ন আর দায়িত্ব এসে পড়ে আশিকুরের কাঁধে। পিতার কাঁধ ধীরে ধীরে নুয়ে পড়ছিল, মায়ের দোকান জীবনযুদ্ধে পর্যাপ্ত ছিল না। তাই পরিবারের একমাত্র ছেলেটি সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেই কিছু করতে হবে।
আশিকুর পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল, কাঁথার নিচে লুকিয়ে রাখা বই কিংবা মোমবাতির আলোয় রাত্রি পার করা তার জীবনের সাধারণ দৃশ্যপট। কিন্তু এসএসসি পাশ করেই তাকে থেমে যেতে হয়। কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন এক মুহূর্তে গিলে খায় বাস্তবতা। পরিবারের অর্থনৈতিক দৈন্য তাকে ধাক্কা দেয় বাস্তবতার দরজায়। এরপর সে বিদেশে, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু সময় তাকে ভিন্ন পরিণতির দিকে টেনে নেয়। আর এই টানেই সে জড়িয়ে পড়ে জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনের ঢেউয়ে।
জুলাই আন্দোলন ও রক্তাক্ত বিকেল
তারিখটা ছিল ৪ আগস্ট ২০২৪। সেদিন সারা দেশের তরুণ সমাজ পথে নেমেছিল দমন-পীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে, এককথায় এক নতুন সকালের আশায়। তরুণ-তরুণীদের মুখে মুখে সেদিন শ্লোগান উঠেছিল “তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার”, “আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের সুযোগ নাই”, “দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেবো রক্ত, রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”। সেই আন্দোলনের ঢেউ সারা বাংলায় ছড়িয়েছিল, ছুঁয়েছিল শেরপুরকেও। বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে শেরপুর থানার মোড়ে জনতার ঢল, তাদের কণ্ঠে প্রতিবাদের আগুন, চোখে আশার আলো। সকলের প্রত্যাশা আর দাবি একটাই— স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ছাত্র হত্যায় খুনের বিচার। সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন আশিকুর রহমান। তিনি শুধু দর্শক ছিলেন না, ছিলেন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, ছিলেন নিজের ভবিষ্যতকে বাজি রাখা এক সৈনিক।
বিকাল সাড়ে তিনটায় হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়। আন্দোলনে অন্যায়ভাবে ছাত্র-জনতার দিকে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি ছুঁড়লে জনতা ক্ষেপে যায়। তখন পাল্টা আক্রমণ করলে পালিয়ে যায় পুলিশ ও আওয়ামী দোসরেরা। পালানোর সময় পুলিশ বাহিনীর বেপরোয়া গাড়ি জনতার উপর উঠিয়ে দেয়ার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয়। পাশেই ছিল আশিকুর রহমান। দিগি¦দিক ছুটোছুটি, আতঙ্ক, কান্না আর ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে পুলিশের গাড়ি তুলে দেয় আশিকসহ আন্দোলনকারীদের উপর। অনেকেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, যাদের মধ্যে ছিলেন আশিকুর নিজেও। তার পায়ের উপর দিয়ে উঠে যায় গাড়ির চাকা। পায়ের হাড় ভেঙ্গে যায়, থেতলে যায় পায়ের মাংস, শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে। কিন্তু তখনো হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যায়নি। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হাসপাতালেও হামলা চালাচ্ছিল, আহতদের তালিকায় নাম থাকাটাও ছিল জীবনের ঝুঁকি। তাই উপায়ন্তর না দেখে গ্রামের ফার্মেসিতে চিকিৎসা নেন গোপনে।
৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে পরিস্থিতি খানিকটা বদলায়। সেদিন আশিকুরকে শেরপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সবার আগ্রহের বাইরে এক নিঃশব্দ সংগ্রাম শুরু হয়। তার পায়ের ব্যথা, শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক ক্লান্তি আর ভবিষ্যতের ভয়।
প্রতিদিনের যন্ত্রণা ও থেমে যাওয়া স্বপ্ন
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর চিকিৎসার দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের হাতে। প্রাথমিক চিকিৎসা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। তিনদিন পর পা ফুলে যায়, রক্ত জমাট বাঁধে। ফের হাসপাতালে ভর্তি হন আশিকুর, সেখানে টানা ১১ দিন রাখা হয়। ব্যান্ডেজ করে পা মোড়ানো হয় যেন তার যন্ত্রণা ঢেকে রাখা যায়। কিন্তু তার ডান পায়ের দু’টি আঙুল অবশ হয়ে যায়, চলাফেরা করতে পারেন না ঠিকভাবে, দাঁড়ালেই ব্যথায় ভেঙে পড়ে শরীর।
রগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল অপারেশন কিংবা উন্নত চিকিৎসার, কিন্তু পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাদের দৈনিক আয় দিয়ে চলে খাবার, চাল কিন্তু চিকিৎসা নয়। নিজের কষ্ট সহ্য করেও পরিবারের বোঝা হয়ে থাকতে চায় না আশিকুর। তবু প্রতিদিন তার পা কেঁদে ওঠে, তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কারণ সে জানে এই দেশের জন্য দাঁড়াতে গিয়ে, সে আর ঠিকমতো হাঁটতেও পারবে না।
একটা পরিবার, একটা গ্রাম, আর এক তরুণের পতাকাবাহী যন্ত্রণা
আজ আশিকুর রহমান একটি ঘরের কোণে বসে কষ্ট গোনে। ছোট বোন সাদিয়া তাকে সাহায্য করে, মা ব্যান্ডেজ বদলান। বাবা এখনো ভোরে সবজি কিনতে বের হন, কিন্তু আশিকুরের চোখে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি যেন আর আগের মতো শক্ত পায়ে হাঁটতে পারেন না, কারণ ভেতরে ছেলের যন্ত্রণা তাকে নুয়ে দিয়েছে। এই তরুণ শুধু শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি, তার সাথে ভেঙে পড়েছে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। দেশ যখন উন্নয়নের ঢোল পেটায়, তখন একটি গ্রামের দরিদ্র ঘরে বসে আশিকুর তার রক্তাক্ত পা-টা দেখে ভাবে— এই উন্নয়ন কার জন্য?
একটি আবেদন, একটি প্রতিজ্ঞা
আশিকুরের জীবনে যদি একটা স্থায়ী বাসস্থান থাকত, যদি কিছু অর্থ থাকত, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাহলে হয়তো সে আবার হাঁটতে পারত, হয়তো কোনো কাজ শুরু করতে পারত। আজ তার স্বপ্ন একটিই, পায়ের চিকিৎসা যেন হয়, যেন সে পরিবারের হাল ধরতে পারে।
এই লেখাটি কেবল একটি জীবন সংগ্রামের দলিল নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নও। যারা রাস্তায় নেমে স্বপ্ন দেখে দেশ বদলানোর, তাদের জন্য রাষ্ট্র কী রেখে যায়? একটি আঙুল হারালে, একটি পা বিকল হলে, একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেলে রাষ্ট্র কি কেবল বিবৃতি দেয়?
আশিকুর রহমান একজন বীর। তার হাতে অস্ত্র ছিল না, কিন্তু সাহস ছিল। সে কোনো রাজনৈতিক নেতার সন্তান নয়, কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নয়, সে আমাদের মতো একজন সাধারণ তরুণ, যার জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলো খুবই সাধারণ। তবু আজ তার জীবন অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে, শুধু এই কারণেই যে, সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল।
এই লেখাটি তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার নিদর্শন হোক এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিন্তায় তার জন্য কিছু জায়গা তৈরি করুক, যেন একটি পায়ের হাড়ে জমে থাকা রক্তের মতো কোনো স্বপ্ন আর নষ্ট না হয়।

তাদের গ্রামটির নাম লসমনপুর উত্তরপাড়া। শেরপুর সদর উপজেলার কুসুমহাটি ইউনিয়নের অজস্র শাখা-প্রশাখার ভেতর দিয়ে নদীহীন, পাথরহীন, কিন্তু সংগ্রামে ভরা একটি গ্রাম। এখানেই ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ জন্ম নেয় এক সাহসী প্রাণ, নাম আশিকুর রহমান। তার জীবনের গল্পটি হয়তো শিরোনাম হতো না পত্রিকার পাতায়, হয়তো কেউ তার ছবিও আঁকতো না দেয়ালে; কিন্তু এই দেশের মাটিতে তার রক্ত মিশে গেছে, তার ব্যথা হয়ে উঠেছে অনেক তরুণের ব্যথার প্রতিচ্ছবি।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. আশিকুর রহমান
জন্ম : ০৫/০৩/১৯৯৮
জন্মস্থান : লসমনপুর উত্তরপাড়া, ইউনিয়ন: কুসুমহাটি, থানা: শেরপুর সদর
নিজ জেলা : শেরপুর
পেশা : ছাত্র
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : লসমনপুর উত্তরপাড়া, ইউনিয়ন: কুসুমহাটি, থানা: শেরপুর সদর, শেরপুর
পিতা : মো. রহিমদ্দিন, বয়স: ৫২ বছর
পিতার পেশা : কাঁচামাল বিক্রেতা
মাতা : আলেয়া খাতুন, ৪১
মাতার পেশা : মুদি দোকানদার
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
পরিবারের সদস্য : ০৬ জন
ভাই—বোনের তথ্যাদি
১. এশা, বয়স: ২৭, সম্পর্ক: বড় বোন, পেশা: গৃহিণী
২. নুপুর, বয়স: ১৯, সম্পর্ক: ছোট বোন, পেশা: শিক্ষার্থী, অনার্স ১ম বর্ষ
৩. সাদিয়া, বয়স: ১৫, সম্পর্ক: ছোট বোন, পেশা: শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি
আক্রমণকারী
পুলিশ গাড়ি চাপা দেয়। পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহয়তা কার্ড চালুকুসুমহাটিতে বেড়ে উঠে আশিক

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍