হোম / আহতদের তালিকা / আরিফুল ইসলাম
🕯️

আরিফুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শরীরে ২৯০টি গুলির ক্ষত; আমি বেঁচে আছি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের নির্মমতার জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে
জন্ম ও শৈশব
আরিফুল ইসলাম ২০০৫ সালের ১০ মার্চ শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার গোসাইপুর ইউনিয়নের গিলাগাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোট্ট এই গ্রামের সাধারণ পরিবেশেই গড়ে ওঠে তাঁর শৈশব। পিতা-মাতার স্নেহ-ভালোবাসা আর সংগ্রামের মাঝেই গড়ে উঠেছে তাঁর মনোবল,নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ।
পারিবারিক জীবন
তাঁর পিতা মোঃ রজব আলী (৫৯) পেশায় একজন কৃষক। কর্মহীনতা সত্ত্বেও তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা সন্তানদের আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। মা মোছাঃ আম্বিয়া বেগম (৫১) একজন গৃহিণী,যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মমতায় সন্তানদের বড় করে তুলেছেন। বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন (৩৬) একজন শিক্ষক,অপর ভাই আবু সাঈদ (২৮) প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং ছোট বোন আমিয়া (২৪) একজন বিবাহিত গৃহিণী।
শিক্ষাজীবন
আরিফুল ইসলাম একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের চেতনায় দীক্ষিত ছিলেন, যা তাঁকে আন্দোলনের অগ্রভাগে নিয়ে আসে।
সংগ্রামী জীবন ও জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা
জুলাই ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আরিফুল ইসলাম ছিলেন এক সাহসী অংশগ্রহণকারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি রাস্তায় নামে,শুধু নিজের নয়,সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের জন্য। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহী অংশগ্রহণ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর মতো একজন তরুণ কিশোর কণ্ঠে যেন প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি জেগে উঠেছিল। তিনি চেয়েছিলেন,আন্দোলনের বড় ভাইদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়,যেন শোষণের শৃঙ্খল ছিন্ন হয়।আরিফুল ইসলামের জীবনচিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাহস ও আত্মত্যাগ কেবল বড়দের মধ্যেই নয়,ছোটদের মাঝেও বিপ্লবী চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। তাঁর সংগ্রামী পথচলা আগামী প্রজন্মের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে’যেখানে আছে ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠা,দায়িত্ববোধ এবং অপরাজেয় সাহসের এক মহিমান্বিত বার্তা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত যে দেহ: আমি জুলাই আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই রাজপথে ছিলাম। ১৮ জুলাই ২০২৪,সেই বিভীষিকাময় বিকেলে আমি যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থান করছিলাম-আন্দোলনের সামনের সারিতে। পরিস্থিতি তখন দারুণ উত্তপ্ত ও রক্তঝরা। চারদিক থেকে ঘিরে ধরে আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী। উপর থেকে সাততলা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে গুলি চালানো হচ্ছিল,নিচে রাস্তায় পুলিশের সাঁজোয়া যান,চারদিক থেকে ঘেরাও করে ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এক পশুর মতো।আমরা যারা সামনে ছিলাম,হঠাৎ দেখলাম পুলিশ সরাসরি তাক করে গুলি চালাতে শুরু করে। মাত্র ১০ ফুট দূর থেকে রাবার বুলেট আমার দিকে তাক করে ছোড়া হয়। মুহূর্তেই আমার ডান হাত,বুক ও পিঠে ছিন্ন-বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্ধ হয় ২৯০টির মতো রাবার বুলেট। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। আমার শরীরের প্রতিটি অংশ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। আমার বুক যেন ফেটে যাচ্ছিল,পিঠ ছিল ছিন্নভিন্ন,ডান হাত প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে।পুলিশ তখনও থামেনি।আহত অবস্থায় পড়ে থাকা অবস্থাতেই আমাদের উপর লাঠিচার্জ চালায়,গালিগালাজ করে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও করতে গেলে তাদের ফোন ভেঙে ফেলা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ পিছু হটে গেলে ছাত্র ও জনতা আমাকে টেনে তুলে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেই দিন শুধু আমার নয়-আমার মতো অসংখ্য ছাত্রের দেহে গুলি, লাঠি, ঘৃণা আর দমননীতির আঁচড় লেগেছিল। আমি এখনও সেই বুলেটের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছি-যেন জীবন্ত সাক্ষী হয়ে,এই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার,ফ্যাসিবাদের।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আওয়ামী পাশবিকতার জীবন্ত সাক্ষী: ১৮ জুলাই ২০২৪। যাত্রাবাড়ীর রক্তাক্ত বিকেলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও বর্বরতার যেভাবে শিকার হয়েছিলাম,তার দাগ আজও আমার শরীরে স্পষ্ট। পুলিশের সরাসরি গুলিবর্ষণে আমার শরীরে প্রায় ২৯০টি রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়-প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। রক্তাক্ত অবস্থায় আন্দোলনের ভাইয়েরা জীবন হাতে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে যাত্রাবাড়ী পালস হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ১৩ থেকে ১৪টি গুলি অপারেশনের মাধ্যমে বের করা হয়।আমার বুকে তখন রক্ত জমে ছিল,ফুসফুসে ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল। দ্রুত সেখানে বুকের সার্জারি করা হয় এবং আমার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আমাকে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে ১৮ দিন ধরে টানা চিকিৎসা চলে; প্রতিটি দিন ছিল মৃত্যু আর যন্ত্রণার মাঝে বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
চিকিৎসারত অবস্থায়ই জানা গেল, আমার শরীরে এখনও প্রায় ২৭৬টি রাবার বুলেট রয়ে গেছে, যেগুলো অপারেশন না করলে সারাজীবন থেকে যাবে। পরে আমাকে সিএমএইচ-এ পাঠানো হয়,চিকিৎসা সেখানেও চলতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা,বুকের ব্যথা,পিঠে অসহ্য জ্বালাপোড়া সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে।এরপর আমাকে ময়মনসিংহে প্রায় দুই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়, যেখানে নিয়মিত থেরাপি দেওয়া হতো। ডান হাত অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় স্কাই অপারেশন করাতে হয়। এখনো নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে হচ্ছে। প্রতি মাসে একবার সিএমএইচ-এ চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়,পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়,কারণ শরীরের মধ্যে থাকা বুলেটগুলো যেকোনো সময় নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আমার শরীর এখন এক জীবন্ত নিদর্শন-আওয়ামী ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা, ছাত্র-জনতার রক্ত দিয়ে রাঙানো এক কলঙ্কিত ইতিহাস। চিকিৎসা আর লড়াই যেন এখন আমার সমান্তরাল পথচলা-একদিকে শারীরিক ক্ষতের সঙ্গে যুদ্ধ, আরেকদিকে ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে বেঁচে থাকা।
হাসিনার ফ্যাসিবাদি দোসর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পৈশাচিক চিত্র
জুলাই ২০২৪-এর গণজাগরণে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রুখে দিতে ফ্যাসিস্ট রাক্ষসী হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ রাস্তায় নামে অস্ত্র হাতে। তারা গণমানুষের কণ্ঠরোধ করতে গুলি,লাঠি ও রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর। সাততলা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে গুলি চালায়,ফ্লাইওভারে অবস্থানরত ছাত্রদের লক্ষ্য করে চলে রাবার বুলেটের বর্বর বৃষ্টি। যাত্রাবাড়ীতে আরিফের শরীরে ২৯০টি গুলি ঢুকিয়ে তারা প্রমাণ করে-এই দোসর বাহিনী কেবল রাজনৈতিক সন্ত্রাসই নয়,বরং মানবতা ধ্বংসের এক ভয়াল যন্ত্র। ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবং পুলিশ বাহিনী তখন খুনি হাসিনার রক্তচক্ষুর সবচেয়ে হিংস্র হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।


চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
১. পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা
২. অবশিষ্ট গুলি অপসারণের ব্যবস্থা
৩. দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা
৪. চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা
৫. নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
১. অফিসিয়াল স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা
২. চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ
৩. পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা



একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আরিফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১০-০৩-২০০৫
জন্মস্থান : শেরপুর
পেশা : ছাত্র, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা
নিজ জেলা : শেরপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: গিলাগাছা, পৌরসভা: গোসাইপুর, থানা: শ্রীবরদি, জেলা: শেরপুর
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পিতার নাম : মোঃ রজব আলী
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৯ বছর
মায়ের নাম : মোছা: আম্বিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫১ বছর
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ২৫০০০
আয়ের উৎস : কৃষি ও বড় ভাইয়ের চাকরি
বাড়ি : টিনের বাড়ি
সম্পদ : ২ একর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন