মো. অনিক
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : রাজমিস্ত্রি
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
২০০৬ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করে সে। জন্ম থেকেই ভাগ্য যেন তার কাঁধে কষ্টের ইট তুলে দিয়েছিল। পিতার নাম মো. নূরুল হক। তিনিও একজন পরিশ্রমী রাজমিস্ত্রী, বয়স এখন ৪৫, যিনি নিজের জীবনকে ইট-সিমেন্টের গন্ধে গলিয়ে দিয়েছেন সন্তানের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে। টানাপোড়েনের সংসারে ছেলেদেরকেও শিখিয়েছেন রাজমিস্ত্রির কাজ। মা মোছা. অঞ্জনা বেগম, বয়স ৪০, গৃহস্থালির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা ক্লান্তি আর মায়ার সংজ্ঞা, যিনি সংসার নামক পুরনো নৌকাটি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দুঃখের ঢেউ পেরিয়ে।
আক্রমণকারী
পুলিশের গুলিতে পায়ের গোড়ালি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৃদ্ধাঙ্গুলি এখনো নড়াচড়া করা যায় না।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালুএকনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদিঅনিক বেশ ভালোভাবেই বাবার পেশা রপ্ত করে নিয়েছে। রাজমিস্ত্রির কাজ করে মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা আয় করে, সেই টাকায় চলে ছয় সদস্যের সংসার। তার চোখে এখনো ঝলসে ওঠে স্বপ্নের রেখা, যদিও বাস্তবতা ছুঁয়ে দেয় পায়ের নিচের কাদামাটি। ভাই রবিন, বয়স ২১, তাকেও রাজমিস্ত্রির কাজে লাগায় অনিক; সে যেন সংসারের দ্বিতীয় কাঁধ, ক্লান্ত কিন্তু অটুট। বোন নুরি আক্তার, বয়স মাত্র ১৬, এখনো ৯ম শ্রেণির ছাত্রী, অক্ষরের আলোয় সে খুঁজে ফেরে নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি। আর আছে ছোট ভাই কাকন মিয়া, বয়স ১৩, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, যার বইয়ের পৃষ্ঠা এখনো স্বপ্নে রাঙা, যদিও পেছনে বাজে ক্ষুধার টান। অনিকের ঠিকানা শ্রীবর্দীর যোগিসীমোরা, ঘরিয়া কাজিরচর এলাকায়। যেখানে সে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, আর এখন প্রতিদিনের রোদে-ঘামে গড়ে তুলছে ভবিষ্যতের ইট-কাঠ-পাথরের আশ্রয়। তার জীবন একটা নির্মাণাধীন ভবনের মতো অপূর্ণ, কিন্তু সম্ভাবনায় ভরা। সেখান থেকেই জুলাই তুমুল আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল সে।
জুলাই এসেছিল গ্রামে গ্রামে
জুলাইয়ের দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত, বেদনাময় অধ্যায় হয়ে থাকবে যেখানে স্বৈরাচারের ছায়া গাঢ় হয়েছে, মানুষের স্বাধীন কণ্ঠকে থামিয়ে দেয়ার জন্য গর্জে উঠেছে রাষ্ট্রীয় বর্বরতা। ২০২৪ সালের জুলাই মাস, যা প্রজন্মের চোখে এক রক্তমাখা সঙ্কেত হয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগ নামক একটি রাজনৈতিক শক্তির ফ্যাসিবাদী রূপ উন্মোচনের নির্মম কালপর্ব। এ মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গণআন্দোলন— বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন আর ভোটবিহীন শাসনের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিকরাও রাস্তায় নেমে আসে। তাদের কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদের, দাবি ছিল গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি। ক্ষমতার নেশায় মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি আওয়ামী লীগ। রাজপথে নামা নিরীহ ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। লাঠিপেটা করা হয়েছে এমনভাবে, যেন তারা কোনো শত্রু সেনাবাহিনী। রাস্তার মোড়ে মোড়ে তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসের দুর্গ। শেরপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরিশাল কিংবা ফেনী বাংলাদেশের কোনো জায়গায় নিরাপত্তা ছিল না। শিক্ষার্থী ও খেটে খাওয়া মানুষদের শরীর ভেদ করেছে রাবার বুলেট, গুলির স্পর্শে রক্তাক্ত হয়েছে শহর। সরকারি দল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লাঠিয়াল বাহিনী, পুলিশের ছত্রছায়ায়, হাতে হাত মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আন্দোলনরত জনতার ওপর।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
জুলাইয়ে রাজপথে রক্ত ঝরেছে, পতাকার মতো উড়েছে প্রতিবাদের শ্লোগান। সেই আন্দোলনের উত্তাল ভোরে একজন নীরব সৈনিক ছিল মো. অনিক। বয়সে তরুণ, পেশায় রাজমিস্ত্রি, কিন্তু হৃদয়ে ছিল এক অনড় প্রতিবাদীর স্পন্দন। শেরপুরের ঘরিয়া কাজির চর গ্রামের এই সাহসী তরুণ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই ছিল রাজপথের অগ্রভাগে। তার হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, কাঁধে ছিল না কোনো রাজনৈতিক ব্যাজ, ছিল কেবল অন্যায়, দুর্নীতি আর শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এক অসীম সাহস।
৪ আগস্ট সেই বিভীষিকাময় দিনে রাজপথে নামে অনিক। সকাল থেকেই উত্তাল ছিল জনতার ঢল, রাজপথে ধ্বনিত হচ্ছিল জীবনের অধিকার ও স্বাধীনতার গান। কিন্তু দুপুর ২টার দিকে আকাশের আলো নিভে এল যেন। হঠাৎ করেই বিনা উসকানিতে নিরীহ শিক্ষার্থী ও জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশবাহিনী। গুলির আওয়াজ ছিন্ন করে দেয় প্রতিবাদের পাঁজর, মুহুর্মুহু গুলি চালায় তারা নিরস্ত্র জনতার উপর। যে রাজপথে মানুষ হেঁটেছিল বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে, সেই পথেই চলতে থাকে পুলিশের বেপরোয়া গাড়ি। শরীরের উপর দিয়ে চলে যাওয়া চাকার নিচে থেঁতলে যায় ভবিষ্যৎ, উড়ে যায় মাথার খুলি, ছিটকে পড়ে শরীর। সেই নরকসম যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল অনিক, দৃঢ়চেতা মন নিয়ে। তার পাশ দিয়েই পুলিশের গাড়ি জনগণকে পিষে হাওয়া গতিতে ছুটে পালাচ্ছিলো।
এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ এক ভারী গুলি এসে বিধে অনিকের পায়ের ঠিক গোড়ালিতে। মুহূর্তেই মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে গুলিটি। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ, রাজপথ হয়ে ওঠে এক তাজা তরুণের বেদনার নীল নদী। অনিক পড়ে থাকেন রক্তাক্ত অবস্থায়, ব্যথায় নিথর, তবু তার চোখে ছিল না পরাজয়ের ছায়া। সহযোদ্ধারা তখন জীবন বাজি রেখে তাকে টেনে নিয়ে যায় এক স্থানীয় ফার্মেসিতে। চিকিৎসা বলতে ছিল সামান্য ব্যান্ডেজ আর কিছু মলম, কারণ হাসপাতালে তখনও তাণ্ডব চালাচ্ছিলো সরকারি দলের পেটোয়া বাহিনী। হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তখনও ছিল না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য
আহতের দেহ শুধু রক্তাক্ত হয় না, সময়ের ভারে সে হয়ে ওঠে এক নীরব ইতিহাস। সেই ইতিহাসেরই এক বেদনাময় অংশ মো. অনিকের জীবন। আন্দোলনের দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকার পর সহযোদ্ধাদের সহায়তায় রক্তাক্ত দেহ নিয়ে সে ফিরে আসে নিজের বাসায়। কিন্তু ঘরে এসেও শান্তি মেলে না। চারপাশে ভয়াবহ পরিস্থিতি, হাসপাতালগুলোতেও ছিল না নিরাপত্তা, ছিল বর্বর হামলার ভয়। বাধ্য হয়ে পরদিন, ৫ আগস্ট, পরিবার তাকে নিয়ে যায় শেরপুর সদর হাসপাতালে।
সেখানে দীর্ঘ এক মাস ভর্তি থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর চিকিৎসা পায়নি সে। না ছিল পর্যাপ্ত ওষুধ, না ছিল সেবার মনোভাব। অগত্যা পরিবার নিরুপায় হয়ে ধার-দেনা করে নেয়া ঋণের টাকায় তাকে ভর্তি করে ডক্টরস ক্লিনিকে। প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে চলে সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, তাই পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে।
পঙ্গুতে ছিল প্রায় এক মাস। সেখানে করা হয় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে আরও আর্থিক সংকটে পড়ে পরিবার। পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত ওষুধপত্র চলেছে। কিন্তু এত চিকিৎসার পরও অনিক পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি। বর্তমানে সে কোনো ধরনের ভারী কাজ করতে অক্ষম। হাঁটাচলায় প্রতিনিয়ত ব্যথা অনুভব করে। পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল সবসময় সোজা হয়ে থাকে, নাড়াতে পারে না, বাঁকাতে পারে না, এমনকি সামান্য নড়াচড়াতেও প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ফুলে আছে রগ, যার কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে তার চলাফেরা।
এই তরুণ আজ এক আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার বোঝা নিয়ে বেঁচে আছে। অথচ সে কোনো অপরাধ করেনি । শুধু নিজের অধিকার আর ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। তার এই যন্ত্রণা আজ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেকের দরজায়, কে নেবে এই বেদনার দায়?
তার ক্ষত এখনো শুকোয়নি। কিন্তু তার এই রক্ত আর যন্ত্রণার গল্প থেমে থাকবে না। এ ক্ষতই একদিন বুকে লেখা হবে স্বাধীনতার কবিতা হয়ে। অনিকের পায়ের রক্ত সেই দিনগুলোর সাক্ষ্য বহন করে, যখন সাহস ছিল বন্দুকের মুখোমুখি দাঁড়াবার, আর বুকে ছিল একটাই চাওয়া একটি শোষণহীন, মানবিক রাষ্ট্র।
নাম : মো. অনিক
জন্ম : ১৫ অক্টোবর, ২০০৬
জন্মস্থান : ঘরিয়া কাজির চর, শ্রীবরদী, শেরপুর
নিজ জেলা : শেরপুর
পেশা : রাজমিস্ত্রি
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : যোগিসীমোরা, ঘরিয়া কাজির চর, শ্রীবরদী, শেরপুর
পিতা : মো. নুরুল হক, বয়স: ৪৫, পেশা: রাজমিস্ত্রি
মাতা : মোছা. অঞ্জনা বেগম, বয়স: ৪০, পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
পরিবারের সদস্য : ০৬
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. রবিন, বয়স: ২১, পেশা- রাজমিস্ত্রির, সম্পর্ক- ভাই
২. নুরি আক্তার, বয়স: ১৬, পেশা: ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: বোন
৩. কাকন মিয়া, বয়স: ১৩, পেশা: ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: ভাই
আক্রমণকারী
পুলিশের গুলিতে পায়ের গোড়ালি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৃদ্ধাঙ্গুলি এখনো নড়াচড়া করা যায় না।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালুএকনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদিঅনিক বেশ ভালোভাবেই বাবার পেশা রপ্ত করে নিয়েছে। রাজমিস্ত্রির কাজ করে মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা আয় করে, সেই টাকায় চলে ছয় সদস্যের সংসার। তার চোখে এখনো ঝলসে ওঠে স্বপ্নের রেখা, যদিও বাস্তবতা ছুঁয়ে দেয় পায়ের নিচের কাদামাটি। ভাই রবিন, বয়স ২১, তাকেও রাজমিস্ত্রির কাজে লাগায় অনিক; সে যেন সংসারের দ্বিতীয় কাঁধ, ক্লান্ত কিন্তু অটুট। বোন নুরি আক্তার, বয়স মাত্র ১৬, এখনো ৯ম শ্রেণির ছাত্রী, অক্ষরের আলোয় সে খুঁজে ফেরে নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি। আর আছে ছোট ভাই কাকন মিয়া, বয়স ১৩, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, যার বইয়ের পৃষ্ঠা এখনো স্বপ্নে রাঙা, যদিও পেছনে বাজে ক্ষুধার টান। অনিকের ঠিকানা শ্রীবর্দীর যোগিসীমোরা, ঘরিয়া কাজিরচর এলাকায়। যেখানে সে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, আর এখন প্রতিদিনের রোদে-ঘামে গড়ে তুলছে ভবিষ্যতের ইট-কাঠ-পাথরের আশ্রয়। তার জীবন একটা নির্মাণাধীন ভবনের মতো অপূর্ণ, কিন্তু সম্ভাবনায় ভরা। সেখান থেকেই জুলাই তুমুল আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল সে।
জুলাই এসেছিল গ্রামে গ্রামে
জুলাইয়ের দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত, বেদনাময় অধ্যায় হয়ে থাকবে যেখানে স্বৈরাচারের ছায়া গাঢ় হয়েছে, মানুষের স্বাধীন কণ্ঠকে থামিয়ে দেয়ার জন্য গর্জে উঠেছে রাষ্ট্রীয় বর্বরতা। ২০২৪ সালের জুলাই মাস, যা প্রজন্মের চোখে এক রক্তমাখা সঙ্কেত হয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগ নামক একটি রাজনৈতিক শক্তির ফ্যাসিবাদী রূপ উন্মোচনের নির্মম কালপর্ব। এ মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গণআন্দোলন— বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন আর ভোটবিহীন শাসনের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিকরাও রাস্তায় নেমে আসে। তাদের কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদের, দাবি ছিল গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি। ক্ষমতার নেশায় মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি আওয়ামী লীগ। রাজপথে নামা নিরীহ ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। লাঠিপেটা করা হয়েছে এমনভাবে, যেন তারা কোনো শত্রু সেনাবাহিনী। রাস্তার মোড়ে মোড়ে তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসের দুর্গ। শেরপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরিশাল কিংবা ফেনী বাংলাদেশের কোনো জায়গায় নিরাপত্তা ছিল না। শিক্ষার্থী ও খেটে খাওয়া মানুষদের শরীর ভেদ করেছে রাবার বুলেট, গুলির স্পর্শে রক্তাক্ত হয়েছে শহর। সরকারি দল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লাঠিয়াল বাহিনী, পুলিশের ছত্রছায়ায়, হাতে হাত মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আন্দোলনরত জনতার ওপর।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
জুলাইয়ে রাজপথে রক্ত ঝরেছে, পতাকার মতো উড়েছে প্রতিবাদের শ্লোগান। সেই আন্দোলনের উত্তাল ভোরে একজন নীরব সৈনিক ছিল মো. অনিক। বয়সে তরুণ, পেশায় রাজমিস্ত্রি, কিন্তু হৃদয়ে ছিল এক অনড় প্রতিবাদীর স্পন্দন। শেরপুরের ঘরিয়া কাজির চর গ্রামের এই সাহসী তরুণ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই ছিল রাজপথের অগ্রভাগে। তার হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, কাঁধে ছিল না কোনো রাজনৈতিক ব্যাজ, ছিল কেবল অন্যায়, দুর্নীতি আর শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এক অসীম সাহস।
৪ আগস্ট সেই বিভীষিকাময় দিনে রাজপথে নামে অনিক। সকাল থেকেই উত্তাল ছিল জনতার ঢল, রাজপথে ধ্বনিত হচ্ছিল জীবনের অধিকার ও স্বাধীনতার গান। কিন্তু দুপুর ২টার দিকে আকাশের আলো নিভে এল যেন। হঠাৎ করেই বিনা উসকানিতে নিরীহ শিক্ষার্থী ও জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশবাহিনী। গুলির আওয়াজ ছিন্ন করে দেয় প্রতিবাদের পাঁজর, মুহুর্মুহু গুলি চালায় তারা নিরস্ত্র জনতার উপর। যে রাজপথে মানুষ হেঁটেছিল বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে, সেই পথেই চলতে থাকে পুলিশের বেপরোয়া গাড়ি। শরীরের উপর দিয়ে চলে যাওয়া চাকার নিচে থেঁতলে যায় ভবিষ্যৎ, উড়ে যায় মাথার খুলি, ছিটকে পড়ে শরীর। সেই নরকসম যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল অনিক, দৃঢ়চেতা মন নিয়ে। তার পাশ দিয়েই পুলিশের গাড়ি জনগণকে পিষে হাওয়া গতিতে ছুটে পালাচ্ছিলো।
এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ এক ভারী গুলি এসে বিধে অনিকের পায়ের ঠিক গোড়ালিতে। মুহূর্তেই মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে গুলিটি। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ, রাজপথ হয়ে ওঠে এক তাজা তরুণের বেদনার নীল নদী। অনিক পড়ে থাকেন রক্তাক্ত অবস্থায়, ব্যথায় নিথর, তবু তার চোখে ছিল না পরাজয়ের ছায়া। সহযোদ্ধারা তখন জীবন বাজি রেখে তাকে টেনে নিয়ে যায় এক স্থানীয় ফার্মেসিতে। চিকিৎসা বলতে ছিল সামান্য ব্যান্ডেজ আর কিছু মলম, কারণ হাসপাতালে তখনও তাণ্ডব চালাচ্ছিলো সরকারি দলের পেটোয়া বাহিনী। হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তখনও ছিল না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য
আহতের দেহ শুধু রক্তাক্ত হয় না, সময়ের ভারে সে হয়ে ওঠে এক নীরব ইতিহাস। সেই ইতিহাসেরই এক বেদনাময় অংশ মো. অনিকের জীবন। আন্দোলনের দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকার পর সহযোদ্ধাদের সহায়তায় রক্তাক্ত দেহ নিয়ে সে ফিরে আসে নিজের বাসায়। কিন্তু ঘরে এসেও শান্তি মেলে না। চারপাশে ভয়াবহ পরিস্থিতি, হাসপাতালগুলোতেও ছিল না নিরাপত্তা, ছিল বর্বর হামলার ভয়। বাধ্য হয়ে পরদিন, ৫ আগস্ট, পরিবার তাকে নিয়ে যায় শেরপুর সদর হাসপাতালে।
সেখানে দীর্ঘ এক মাস ভর্তি থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর চিকিৎসা পায়নি সে। না ছিল পর্যাপ্ত ওষুধ, না ছিল সেবার মনোভাব। অগত্যা পরিবার নিরুপায় হয়ে ধার-দেনা করে নেয়া ঋণের টাকায় তাকে ভর্তি করে ডক্টরস ক্লিনিকে। প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে চলে সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, তাই পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে।
পঙ্গুতে ছিল প্রায় এক মাস। সেখানে করা হয় অস্ত্রোপচার। চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে আরও আর্থিক সংকটে পড়ে পরিবার। পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত ওষুধপত্র চলেছে। কিন্তু এত চিকিৎসার পরও অনিক পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি। বর্তমানে সে কোনো ধরনের ভারী কাজ করতে অক্ষম। হাঁটাচলায় প্রতিনিয়ত ব্যথা অনুভব করে। পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল সবসময় সোজা হয়ে থাকে, নাড়াতে পারে না, বাঁকাতে পারে না, এমনকি সামান্য নড়াচড়াতেও প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ফুলে আছে রগ, যার কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে তার চলাফেরা।
এই তরুণ আজ এক আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার বোঝা নিয়ে বেঁচে আছে। অথচ সে কোনো অপরাধ করেনি । শুধু নিজের অধিকার আর ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। তার এই যন্ত্রণা আজ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেকের দরজায়, কে নেবে এই বেদনার দায়?
তার ক্ষত এখনো শুকোয়নি। কিন্তু তার এই রক্ত আর যন্ত্রণার গল্প থেমে থাকবে না। এ ক্ষতই একদিন বুকে লেখা হবে স্বাধীনতার কবিতা হয়ে। অনিকের পায়ের রক্ত সেই দিনগুলোর সাক্ষ্য বহন করে, যখন সাহস ছিল বন্দুকের মুখোমুখি দাঁড়াবার, আর বুকে ছিল একটাই চাওয়া একটি শোষণহীন, মানবিক রাষ্ট্র।
নাম : মো. অনিক
জন্ম : ১৫ অক্টোবর, ২০০৬
জন্মস্থান : ঘরিয়া কাজির চর, শ্রীবরদী, শেরপুর
নিজ জেলা : শেরপুর
পেশা : রাজমিস্ত্রি
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : যোগিসীমোরা, ঘরিয়া কাজির চর, শ্রীবরদী, শেরপুর
পিতা : মো. নুরুল হক, বয়স: ৪৫, পেশা: রাজমিস্ত্রি
মাতা : মোছা. অঞ্জনা বেগম, বয়স: ৪০, পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
পরিবারের সদস্য : ০৬
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. রবিন, বয়স: ২১, পেশা- রাজমিস্ত্রির, সম্পর্ক- ভাই
২. নুরি আক্তার, বয়স: ১৬, পেশা: ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: বোন
৩. কাকন মিয়া, বয়স: ১৩, পেশা: ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: ভাই
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍