হোম / আহতদের তালিকা / মো. জসিম উদ্দিন
মো. জসিম উদ্দিন

মো. জসিম উদ্দিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ঢালাই শ্রমিক (রাজমিস্ত্রী)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো. জসিম উদ্দিন একজন তরুণ ঢালাই শ্রমিক (রাজমিস্ত্রি), যিনি শেরপুর জেলার শেরপুর সদর উপজেলার সদর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে চরপক্ষিমারি গ্রামে বসবাস করেন। তার জন্ম ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি। তার পিতা জিয়াউল হক, বয়স ৫০ বছর, পেশায় তিনিও একজন ঢালাই শ্রমিক। মাতা মোছা. ফরিদা বেগম গৃহিণী, যার বয়স ৩৭ বছর। পরিবারে মোট ৫ জন সদস্য রয়েছে। জসিমের বড় বোন জিবনা আক্তার, বয়স ২২, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী এবং ছোট ভাই মো. ওয়াসিমের বয়স ১৩, সে ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে।

পরিবারটি জসিমের পিতার অল্প আয়ের উপর নির্ভরশীল। মাসিক আয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা, যা মূলত ঢালাইয়ের কাজ থেকে আসে। অল্প বয়স থেকেই জসিম পরিবারের আয়-রোজগারে হাত লাগিয়েছে, বাবার সঙ্গে মিলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতে সহায়তা করছে। জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয় জসিম। তারপর থেকে শ্রমজীবী এই পরিবারটির প্রতিটি সদস্য কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে।
ভোট জালিয়াতির রাজনীতি ও আ’লীগের অবৈধ ক্ষমতা দখল
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রের চরম অবমূল্যায়নের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। তিনটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন আ’লীগ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করে ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নেওয়ায় ১৫৪টি আসনে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায়। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, বরং চারদিকে ছিল ভয়, ত্রাস ও সহিংসতা।
এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল গণতন্ত্রের আরেকটি পরিহাস। নির্বাচন-পূর্ব রাতে ব্যালটবাক্স পূর্ণ করে ফেলাসহ ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রে ভোটারদের বাধা দেওয়া হয়, আগেই ব্যালট ভর্তি করা হয়, বিরোধীদের প্রচারণা চলাকালীন হামলা ও গ্রেফতার সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচন কমিশন ছিল পুরোপুরি নীরব ও পক্ষপাতদুষ্ট। বিরোধী দলের প্রার্থীদের হয়রানি, গ্রেফতার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ। বাকস্বাধীনতা হরণ করে জুলুম ও নিপীড়ন চালায় জামায়াতে ইসলামী, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর উপর। বিচারবহির্ভূতভাবে গুম, খুন করে ফেলার বৈধতা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটের নামে পুরো প্রক্রিয়াটিকে কৌতুকের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। আমি-ডামির নির্বাচনে পরিণত হয় ২০২৪ সালের নির্বাচন। এই তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস না রেখে ক্ষমতায় থাকার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে জিম্মি করে রেখেছিল। এর ফলে দেশে একটি অকার্যকর, কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে মানুষের ভোটাধিকার শুধু একটি প্রতীকী ব্যাপার হয়ে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ মৃত্যুপথযাত্রী, আর এর অন্যতম প্রধান দায় বর্তায় আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতি ও স্বৈরশাসনের উপর। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষক, ছাত্র-জনতার সাথে আন্দোলনে যোগ দেয় সমাজের সর্বস্তরের লোকজন। গার্মেন্টস শ্রমিক, রাজমিস্ত্রিও বাদ যায়নি। সকলেই নেমে আসে রাস্তায়।
আন্দোলনের রক্তাক্ত সৈনিক মো. জসিম উদ্দিনের চোখে গুলি
মো. জসিম শুরু থেকেই ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সক্রিয় ছিলেন। সাধারণ মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে থেকে তিনি অবস্থান নেন। ৪ আগস্ট, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ডাকে শেরপুরে বিক্ষোভ শুরু হলে জসিম তার বন্ধুদের সঙ্গে শেরপুরে থানার মোড়ে অবস্থান নেন। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে শেরপুর থানার মোড়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য সানোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা একযোগে ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ চালায়। এমপি সানোয়ার নিজেই অস্ত্র হাতে উপস্থিত হয়ে গুলি চালাতে থাকে। নিরপরাধ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। এই বর্বর হামলায় জসিম সরাসরি গুলিবিদ্ধ হন। একটি গুলি তার চোখে এসে লাগে এবং চোখ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে। অস্ত্রোপচারের সময় সেই গুলি বের করতে গিয়ে চিকিৎসকরা জানান, তার চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
এছাড়া তার শরীরের অন্যত্রও গুলির আঘাত লেগেছে, যার ফলে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেদিন আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা শুধু গুলি চালায়নি, অস্ত্র হাতে নিয়ে দুঃসাহসিকভাবে হামলা চালায় সাধারণ জনতার ওপর। জসিমের এই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার এক ভয়াবহ দলিল। তিনি এখন আর শুধু একজন শ্রমিক নন। তিনি শাসকগোষ্ঠীর গুলিতে দৃষ্টিশক্তি হারানো এক তরুণ, যিনি নিজের জীবন দিয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে দাঁড়িয়েছিলেন। তার যন্ত্রণার ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামের প্রেরণা জোগাবে।
চিকিৎসার নির্মম পথ
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মো. জসিম উদ্দিনের শরীর ও জীবন এক কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে। ৪ আগস্ট শেরপুরে আন্দোলনের সময় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে তার চোখ ও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। একটি গুলি চোখ ভেদ করে মাথার ভেতরে প্রবেশ করে, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তার চোখের আলো নিভে যায়। সেদিন রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর পড়ে গেলে ছাত্র ও সাধারণ মানুষ তাকে দ্রুত ধরে সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাসপাতালে থাকা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলার আশঙ্কায় তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বাসায় অবস্থানকালে তার চোখ ফুলে ওঠে এবং ইনফেকশন শুরু হয়। কিন্তু তখনও কোনো উন্নত চিকিৎসার সুযোগ ছিল না। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে আওয়ামী লীগের পতনের পর তার চিকিৎসার পথ খুলে যায়। ৬ আগস্ট চোখে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে চিকিৎসক পরামর্শ দেন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার। ঐ রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা চক্ষু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিন দিন পর তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় এবং ওষুধ চলতে থাকে। তবে এক মাস পর আবারও অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানান, তার আহত চোখ দিয়ে আর কখনও দেখা সম্ভব নয়। জসিমের এই চিকিৎসা-যাত্রা শুধু একটি শরীরের ক্ষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের জ্বলন্ত প্রমাণ, যেখানে এক তরুণ শ্রমিকের চোখ, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ গুলির আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।


নাম : মো. জসিম উদ্দিন
জন্ম : ০১/০১/২০০৬
জন্মস্থান : চরপক্ষিমারি, শেরপুর সদর পৌরসভা, শেরপুর
নিজ জেলা : শেরপুর
পেশা : ঢালাই শ্রমিক (রাজমিস্ত্রী)
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চরপক্ষিমারি, ইউনিয়ন: ৪নং ওয়ার্ড, পৌরসভা, উপজেলা: নলিতাবাড়ী, জেলা: শেরপুর
পিতা : জিয়াউল হক, বয়স: ৫০
বাবার পেশা : ঢালাইয়ের কাজ (রাজমিস্ত্রী)
মাতা : মোছা. ফরিদা বেগম, বয়স: ৩৭
মায়ের পেশা : গৃহিণী
মাসিক আয় : ১৮ হাজার টাকা
পরিবারের সদস্য : ০৫ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. জিবনা আক্তার, বয়স: ২২, পেশা: অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী, সম্পর্ক: বোন
২. মো. ওয়াসিম, বয়স: ১৩, পেশা: ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: বোন
আক্রমণকারী
আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য সানোয়ার হোসেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
২. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণজুলাইয়ে চোখ হারানো

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍