মোছা. রাজমনি আকতার
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মোছা. রাজমনি আকতার শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার কাকীলাকুড়া ইউনিয়নের পূর্ব পিরিচপুর গ্রামে ১৯৯১ সালের ১০ মে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করছেন। পূর্বে কাজের সুবিধার্থে ঢাকার গাজীপুরে থাকলেও এখন চোখ হারিয়ে নিজ এলাকাতেই অবস্থান করছেন। রাজমনির পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৯ জন। পিতা মো. আব্দুল আজিজ একজন দিনমজুর (বয়স ৫০) এবং মাতা মোছা. জহুরা বেগম (বয়স ৪০) গৃহিণী। পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস দিনমজুরির কাজ।
রাজমনি নিজে ও তার দুই বোন মল্লিকা (বয়স ২৫) এবং বীথী (বয়স ১৮) গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের কাঁধেই সংসারের একটি বড় দায়িত্ব বর্তায়। এছাড়াও ছোট বোন স্মৃতি (১৫), নীতি (১১) ও ঊর্মি (১১) এখনো শিক্ষার্থী। ভাই স্বপন (বয়স ২২) একজন সিএনজি চালক হিসেবে কাজ করেন। এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবন জড়িয়ে আছে সংগ্রামের সাথে। অল্প আয়ে এত বড় পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করাই এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রাজমনির চোখ হারিয়ে পরিবারটির উপর নেমে এসেছে হতাশার হাতছানি।
পুলিশের গুলি এসে রাজমনির চোখ বিদ্ধ করে
ছাত্র-জনতার আন্দোলন যেন শুধুমাত্র তরুণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনই ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সর্বস্তরের জনতার প্রতিবাদের স্রোত। যেখানে বৃদ্ধা নারী আর গার্মেন্টস কর্মীরাও আপন জীবনের মায়া ত্যাগ করে সগর্বে দাঁড়িয়েছিলেন বুলেটের সামনে। গাজীপুরের গাজীপুরা ২৭ নম্বর এলাকায় একটি গার্মেন্টস কর্মী হিসাবে কাজ করতেন রাজমনি। ২০ জুলাই দুপুরে তিনি অন্যান্য গার্মেন্টস কর্মীদের সাথে ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। তার চোখে তখন কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক অদম্য প্রত্যয়। আওয়ামী লীগের বিচার আর ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে তিনি রাস্তায় নেমেছিলেন। কারণ তিনি জেনেছিলেন, এই শহরের রাজপথে তার ভাই-বোনেরা রক্তে স্নান করছে। যদিও ঢাকায় থাকা তার দুই বোন তাকে বারবার নিষেধ করেছিল, “রাস্তায় যাবি না, বিপদ হবে”। তবুও তার পা আর থেমে থাকেনি। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত তিনি ছাত্র-জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন।
২০ জুলাই বিকেল গড়িয়ে যখন তিনটা বাজে, তখন আন্দোলন হঠাৎ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের হাতে তখন দেশি-বিদেশি অস্ত্র। মুহূর্তে তুমুল গুলিবর্ষণ শুরু হয়। মানুষের আর্তচিৎকার, ধোঁয়া আর রক্তে আকাশ ভারী হয়ে যায়। ঠিক সেই ভয়ার্ত সময়ে একটি গুলি এসে রাজমনির চোখে বিঁধে যায়।
চোখে তীব্র জ্বালা আর অন্ধকার নেমে আসে। তিনি আর কোনো আলোকরেখা দেখতে পাননি। পাশে থাকা ছাত্র-জনতা চিৎকার দিয়ে তার কাছে ছুটে আসে। তাড়াহুড়ো করে জয়দেবপুর তাজউদ্দীন হাসপাতালে নিতে চাইলেও ছাত্রলীগের অবস্থানের কারণে সেদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
চিকিৎসার সুযোগ হয়নি হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে
একটি হাসপাতাল থেকে আরেকটি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেও তাকে কোথাও ভর্তি করা যায় নি। সর্বত্র আওয়ামী লীগের ভয় আর আতংক। জয়দেবপুরের তাজউদ্দীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ভর্তির সুযোগ দেয়নি। এক অনিশ্চিত অন্ধকারে তিন দিন কেটে যায়। অবশেষে ২৫ জুলাই ঢাকার ইসলামিয়া হাসপাতাল তাকে ভর্তি নেয়। ততক্ষণে একটি চোখ চিরতরে নিভে গেছে। এই নারীর যন্ত্রণার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় জুলাইয়ের করুণ দিনগুলির কথা। সেদিন রাষ্ট্র আর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস মানুষকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। ইসলামিয়া হাসপাতালে তিনি দু’দিন ছিলেন। চিকিৎসকরা তার চোখে দু’টি অপারেশন করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য এখানেই শেষ হয়নি। পরে তিনি “জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে” কাগজপত্র দাখিলের জন্য ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে গেলে তার চিকিৎসার মূল কাগজপত্র তিনি পাননি। কোনো অর্থনৈতিক সহায়তা বা চিকিৎসা খরচও তাকে দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে তার ডান চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, আর বাম চোখটিও ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে। টাকার অভাবে কোথাও ভালো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। ঋণ করে কিছু চিকিৎসা চালালেও সেটুকু যথেষ্ট নয়। এই সাহসী বৃদ্ধা আজ রাষ্ট্রের অবহেলা ও উপেক্ষার এক জীবন্ত নিদর্শন।
সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব রাজমনি
আন্দোলনের পূর্বে গার্মেন্টস শ্রমিক হিসাবে কাজ করলেও এখন তিনি সম্পূর্ণ বেকার। মেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা আর পরিবারের ভরণ-পোষণের বিষয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের এক অভূতপূর্ব ঐক্য
২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলন ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়, বরং সার্বজনীন এক গণজাগরণ, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। রাস্তায় নেমেছিল কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, বৃদ্ধ, গার্মেন্টস কর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, এমনকি গৃহবধূরাও। সকলেই নিজের মতো করে এই প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছিল, কারণ এটা ছিল তাদেরও সংগ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বঞ্চনা, বৈষম্য, দুর্নীতি, শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং চাকরিতে নিয়োগ বাণিজ্য সব মিলিয়ে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে জুলাইয়ের রাস্তায়। কেউ প্রতিবাদ করেছে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছে মৌনভাবে, কেউবা গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটাই: ন্যায়বিচার ও একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যার জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে রাজমনিদের।
আন্দোলনের রক্তাক্ত দৃশ্যেও দেখা গেছে, গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ চোখ হারিয়েছে, কেউ পা, কেউ চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। এমনকি বৃদ্ধ মানুষ, গার্মেন্টস কর্মী নারীরাও এই আন্দোলনের নির্মম শিকার হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে এ আন্দোলন ছিল জনগণের। জুলাইয়ের আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে, মানুষ যখন নির্যাতিত হয়, তখন পেশা, বয়স বা শ্রেণি কোনো বাধা হতে পারে না। সবাই তখন একসঙ্গে হয়ে যায়। একটি পরিবর্তনের স্বপ্নে, একটি ন্যায্য সমাজের আশায়। এই আন্দোলন ছিল বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, যেখানে জনগণ নিজের কথা নিজেই বলেছে, সাহসে, রক্তে এবং প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোছা. রাজমনি আকতার
জন্ম : ১০/০৫/১৯৯১
জন্মস্থান : পূর্বপিরিজপুর, কাকিলাকুড়া, শ্রীবরদী, শেরপুর
নিজজেলা : শেরপুর
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পূর্বপিরিজপুর, ইউনিয়ন: কাকিলাকুড়া, উপজেলা: সদর, জেলা: শেরপুর
পিতা : মো. আব্দুল আজিজ, বয়স: ৫০
পিতার পেশা : দিনমজুর
মাতা : মোছা. জহুরা বেগম, বয়স: ৪০
মায়ের পেশা : গৃহিণী
মাসিকআয় : ০৬ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : দিনমজুরি
পরিবারের সদস্য : ০৯ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মল্লিকা, বয়স: ২৫, সম্পর্ক: বোন, পেশা: গার্মেন্টস কর্মী
২. বীথী, বয়স: ১৮, সম্পর্ক: বোন, পেশা: গার্মেন্টস কর্মী
৩. স্মৃতি, বয়স: ১৫, সম্পর্ক: বোন, পেশা: শিক্ষার্থী
৪. নীতি, বয়স: ১১, সম্পর্ক: বোন, পেশা: শিক্ষার্থী
৫. স্বপন, বয়স: ২২, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: সিএনজি চালক
সন্তানের তথ্যাদি
১. ঊর্মি, বয়স: ১১, সম্পর্ক: মেয়ে, পেশা: শিক্ষার্থী, পঞ্চম শ্রেণি
আক্রমণকারী
পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ
আহত হওয়ার স্থান ও তারিখ: গাজীপুরা-২৭, ২০ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৩টা
পুনর্বাসন ভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. রেশনকার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ, ২. মেয়ের পড়াশোনার জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা
রাজমনি নিজে ও তার দুই বোন মল্লিকা (বয়স ২৫) এবং বীথী (বয়স ১৮) গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের কাঁধেই সংসারের একটি বড় দায়িত্ব বর্তায়। এছাড়াও ছোট বোন স্মৃতি (১৫), নীতি (১১) ও ঊর্মি (১১) এখনো শিক্ষার্থী। ভাই স্বপন (বয়স ২২) একজন সিএনজি চালক হিসেবে কাজ করেন। এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবন জড়িয়ে আছে সংগ্রামের সাথে। অল্প আয়ে এত বড় পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করাই এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রাজমনির চোখ হারিয়ে পরিবারটির উপর নেমে এসেছে হতাশার হাতছানি।
পুলিশের গুলি এসে রাজমনির চোখ বিদ্ধ করে
ছাত্র-জনতার আন্দোলন যেন শুধুমাত্র তরুণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনই ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সর্বস্তরের জনতার প্রতিবাদের স্রোত। যেখানে বৃদ্ধা নারী আর গার্মেন্টস কর্মীরাও আপন জীবনের মায়া ত্যাগ করে সগর্বে দাঁড়িয়েছিলেন বুলেটের সামনে। গাজীপুরের গাজীপুরা ২৭ নম্বর এলাকায় একটি গার্মেন্টস কর্মী হিসাবে কাজ করতেন রাজমনি। ২০ জুলাই দুপুরে তিনি অন্যান্য গার্মেন্টস কর্মীদের সাথে ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। তার চোখে তখন কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক অদম্য প্রত্যয়। আওয়ামী লীগের বিচার আর ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে তিনি রাস্তায় নেমেছিলেন। কারণ তিনি জেনেছিলেন, এই শহরের রাজপথে তার ভাই-বোনেরা রক্তে স্নান করছে। যদিও ঢাকায় থাকা তার দুই বোন তাকে বারবার নিষেধ করেছিল, “রাস্তায় যাবি না, বিপদ হবে”। তবুও তার পা আর থেমে থাকেনি। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত তিনি ছাত্র-জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন।
২০ জুলাই বিকেল গড়িয়ে যখন তিনটা বাজে, তখন আন্দোলন হঠাৎ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের হাতে তখন দেশি-বিদেশি অস্ত্র। মুহূর্তে তুমুল গুলিবর্ষণ শুরু হয়। মানুষের আর্তচিৎকার, ধোঁয়া আর রক্তে আকাশ ভারী হয়ে যায়। ঠিক সেই ভয়ার্ত সময়ে একটি গুলি এসে রাজমনির চোখে বিঁধে যায়।
চোখে তীব্র জ্বালা আর অন্ধকার নেমে আসে। তিনি আর কোনো আলোকরেখা দেখতে পাননি। পাশে থাকা ছাত্র-জনতা চিৎকার দিয়ে তার কাছে ছুটে আসে। তাড়াহুড়ো করে জয়দেবপুর তাজউদ্দীন হাসপাতালে নিতে চাইলেও ছাত্রলীগের অবস্থানের কারণে সেদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
চিকিৎসার সুযোগ হয়নি হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে
একটি হাসপাতাল থেকে আরেকটি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেও তাকে কোথাও ভর্তি করা যায় নি। সর্বত্র আওয়ামী লীগের ভয় আর আতংক। জয়দেবপুরের তাজউদ্দীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ভর্তির সুযোগ দেয়নি। এক অনিশ্চিত অন্ধকারে তিন দিন কেটে যায়। অবশেষে ২৫ জুলাই ঢাকার ইসলামিয়া হাসপাতাল তাকে ভর্তি নেয়। ততক্ষণে একটি চোখ চিরতরে নিভে গেছে। এই নারীর যন্ত্রণার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় জুলাইয়ের করুণ দিনগুলির কথা। সেদিন রাষ্ট্র আর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস মানুষকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। ইসলামিয়া হাসপাতালে তিনি দু’দিন ছিলেন। চিকিৎসকরা তার চোখে দু’টি অপারেশন করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য এখানেই শেষ হয়নি। পরে তিনি “জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে” কাগজপত্র দাখিলের জন্য ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে গেলে তার চিকিৎসার মূল কাগজপত্র তিনি পাননি। কোনো অর্থনৈতিক সহায়তা বা চিকিৎসা খরচও তাকে দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে তার ডান চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, আর বাম চোখটিও ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে। টাকার অভাবে কোথাও ভালো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। ঋণ করে কিছু চিকিৎসা চালালেও সেটুকু যথেষ্ট নয়। এই সাহসী বৃদ্ধা আজ রাষ্ট্রের অবহেলা ও উপেক্ষার এক জীবন্ত নিদর্শন।
সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব রাজমনি
আন্দোলনের পূর্বে গার্মেন্টস শ্রমিক হিসাবে কাজ করলেও এখন তিনি সম্পূর্ণ বেকার। মেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা আর পরিবারের ভরণ-পোষণের বিষয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের এক অভূতপূর্ব ঐক্য
২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলন ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়, বরং সার্বজনীন এক গণজাগরণ, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। রাস্তায় নেমেছিল কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, বৃদ্ধ, গার্মেন্টস কর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, এমনকি গৃহবধূরাও। সকলেই নিজের মতো করে এই প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছিল, কারণ এটা ছিল তাদেরও সংগ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বঞ্চনা, বৈষম্য, দুর্নীতি, শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং চাকরিতে নিয়োগ বাণিজ্য সব মিলিয়ে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে জুলাইয়ের রাস্তায়। কেউ প্রতিবাদ করেছে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছে মৌনভাবে, কেউবা গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটাই: ন্যায়বিচার ও একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যার জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে রাজমনিদের।
আন্দোলনের রক্তাক্ত দৃশ্যেও দেখা গেছে, গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ চোখ হারিয়েছে, কেউ পা, কেউ চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। এমনকি বৃদ্ধ মানুষ, গার্মেন্টস কর্মী নারীরাও এই আন্দোলনের নির্মম শিকার হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে এ আন্দোলন ছিল জনগণের। জুলাইয়ের আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে, মানুষ যখন নির্যাতিত হয়, তখন পেশা, বয়স বা শ্রেণি কোনো বাধা হতে পারে না। সবাই তখন একসঙ্গে হয়ে যায়। একটি পরিবর্তনের স্বপ্নে, একটি ন্যায্য সমাজের আশায়। এই আন্দোলন ছিল বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, যেখানে জনগণ নিজের কথা নিজেই বলেছে, সাহসে, রক্তে এবং প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোছা. রাজমনি আকতার
জন্ম : ১০/০৫/১৯৯১
জন্মস্থান : পূর্বপিরিজপুর, কাকিলাকুড়া, শ্রীবরদী, শেরপুর
নিজজেলা : শেরপুর
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পূর্বপিরিজপুর, ইউনিয়ন: কাকিলাকুড়া, উপজেলা: সদর, জেলা: শেরপুর
পিতা : মো. আব্দুল আজিজ, বয়স: ৫০
পিতার পেশা : দিনমজুর
মাতা : মোছা. জহুরা বেগম, বয়স: ৪০
মায়ের পেশা : গৃহিণী
মাসিকআয় : ০৬ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : দিনমজুরি
পরিবারের সদস্য : ০৯ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. মল্লিকা, বয়স: ২৫, সম্পর্ক: বোন, পেশা: গার্মেন্টস কর্মী
২. বীথী, বয়স: ১৮, সম্পর্ক: বোন, পেশা: গার্মেন্টস কর্মী
৩. স্মৃতি, বয়স: ১৫, সম্পর্ক: বোন, পেশা: শিক্ষার্থী
৪. নীতি, বয়স: ১১, সম্পর্ক: বোন, পেশা: শিক্ষার্থী
৫. স্বপন, বয়স: ২২, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: সিএনজি চালক
সন্তানের তথ্যাদি
১. ঊর্মি, বয়স: ১১, সম্পর্ক: মেয়ে, পেশা: শিক্ষার্থী, পঞ্চম শ্রেণি
আক্রমণকারী
পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ
আহত হওয়ার স্থান ও তারিখ: গাজীপুরা-২৭, ২০ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৩টা
পুনর্বাসন ভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. রেশনকার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ, ২. মেয়ের পড়াশোনার জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা