হোম / আহতদের তালিকা / মো. নাঈম
মো. নাঈম

মো. নাঈম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক (বর্তমানে বেকার)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো. নাঈম ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবার দ্বিতীয় বিয়ে তাকে মানসিকভাবে অনেক আঘাত করে। তার বাবা তাদের খোঁজ না নেওয়ায়, নাঈম ও তার ছোট ভাই দাদা-দাদীর কাছে বড় হতে বাধ্য হয়। সংসারের দায় মেটাতে নাঈম কিশোর বয়সেই ঢাকায় পাড়ি জমায় এবং এক বেকারিতে কাজ শুরু করে।
৫ আগস্ট সে দিনটি তার জীবনের জন্য অভিশাপ হয়ে আসে। নবীনগর, বাইপাইল ও আশুলিয়ায় সকাল থেকেই ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। নাঈম সে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। বিকেলের দিকে খবর আসে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। সেই খবরে উত্তাল জনতা রাস্তায় নেমে আসে, কিন্তু পুলিশ ও ছাত্রলীগ তখনও থেমে নেই। তারা কিছু শহীদের লাশ পুড়িয়ে দেয়, গুলি ছুঁড়তে থাকে নির্বিচারে। নাঈম পুলিশের মধ্যকার কিছু কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারে তারা হিন্দিতে কথা বলছে। তাতে সে মনে করে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং ইন্ডিয়ান পুলিশের সরাসরি হাত রয়েছে এই দমন-পীড়নে।
বাসার ছাদ কিংবা গোপন জায়গা থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি চালানো হয় আন্দোলনরত জনতার উপর। সেই হামলায় অসংখ্য তরুণ শহীদ হন, কেউ কেউ মারাত্মকভাবে আহত হন। এই নারকীয় হামলার একপর্যায়ে নাঈমের বাহুতে একটি গুলি এসে লাগে। গুলিটি তার হাড় ভেঙে দেয় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। মুহূর্তেই তার জীবনে নেমে আসে এক অনিশ্চয়তার অন্ধকার। ভবিষ্যৎ, কর্মক্ষমতা এবং স্বপ্ন সব কিছু যেন সেই গুলির সাথে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে।
জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তটাই যেন মো. নাঈমের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। গুলি লাগার পরপরই সে দেখতে পায়, তার হাত ফুটো হয়ে গেছে ও একটি মারাত্মক গর্ত তৈরি হয়েছে যা দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। পাশে থাকা এক ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে একটি গামছা দিয়ে তার হাত বেঁধে দেয় রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য। কিন্তু ওই মুহূর্তে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথ সহজ ছিল না। পরিস্থিতি ছিল ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের আতঙ্ক ও হুমকিতে ভরা। মাছের আরতের পাশ দিয়ে চুপিসারে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করা হলেও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অন্তত তিন-চারবার তাদের বাধা দেয় এবং কোনোমতে তারা অন্যত্র সরে যায়।
শেষমেশ এক লোহার পণ্যবাহী ট্রাকে করে নাঈমকে হ্যাপি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার হাত ব্যান্ডেজ করা হয় প্রাথমিকভাবে। এরপর তাকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। গণস্বাস্থ্যেই প্রথম অপারেশন করা হয় এবং রক্তক্ষরণের অবস্থা কিছুটা সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছিল। অপারেশনের পর নাঈমকে আবুল হোসেন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পাঁচ দিন ভর্তি রেখে আরও একটি অপারেশন করে তার হাতে রিং পরানো হয়, কারণ হাড় ভেঙে গিয়েছিল। এত রক্তক্ষরণ হয়েছিল যে, তার শরীরে চার ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।
বর্তমানে তার আর চিকিৎসা চলমান নেই। অর্থনৈতিক অনটনের কারণে ওষুধ নেয়াও বন্ধ। প্রায় ছয় মাস ধরে তার হাতে রিং পরানো রয়েছে, যা তাকে এখনো সীমাহীন কষ্টের মধ্যে রেখেছে। স্বাভাবিক কাজ তো দূরের কথা, হাতের নড়াচড়াও কঠিন হয়ে গেছে। চিকিৎসার অভাবে দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। একটি গুলি বদলে দিয়েছে তার জীবন, ছিনিয়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন ও কর্মক্ষমতা।হাতে গুলিবিদ্ধ
পরিচয়
মো. নাইম, শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ির রাজনগর ইউনিয়নের সাগরদি কৃষ্ণপট্টি গ্রামের এক শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান। তার জন্ম ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর। বর্তমানে সে বেকার হলেও পূর্বে একজন শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তার বাবা মো. উকিল আলী একজন কারখানা শ্রমিক, বয়স ৪৫ বছর। তিনি পরিবার চালানোর জন্য মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা আয় করেন। নাইমের মা, মোছা. নাজমা বেগম, ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। যার শোক ও শূন্যতা এখনো তাদের সংসারে বয়ে বেড়ায় নীরবে। তিন সদস্যের ছোট এই পরিবারে নাইমের একমাত্র ভাই নাজমুল, যিনি বর্তমানে ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত, বয়স ১৬ বছর। একদিকে পরিবারের সীমিত আয়, অন্যদিকে মায়ের না থাকা এই দুইয়ের ভার কাঁধে নিয়ে বড় হচ্ছে দুই ভাই। বর্তমানে সাগরদী কৃষ্ণপট্টির স্থায়ী ঠিকানায় বসবাস করছেন তারা। কঠিন বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা এই তরুণদের জীবনে স্বপ্ন আছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দরকার সহায়তা ও স্থিতিশীলতার।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. নাঈম
জন্ম : ২৭/১২/২০০৭
জন্মস্থান : সাগরদি কৃষ্ণপট্টি, রাজনগর, নালিতাবাড়ি, শেরপুর
নিজ জেলা : শেরপুর
পেশা : শ্রমিক (বর্তমানে বেকার)
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : সাগরদি কৃষ্ণপট্টি, রাজনগর, নালিতাবাড়ি, শেরপুর
পিতা : মো. উকিল আলী, বয়স: ৪৫
পেশা : শ্রমিক
মাতা : মৃত মোছা. নাজমা বেগম
মাসিক আয় : ১২ হাজার টাকা
পরিবারের সদস্য : ৩ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. নাজমুল, বয়স: ১৬, পেশা: ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: ভাই
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান ও তারিখ: বাইপাইল, আশুলিয়া, ৫ আগস্ট ২০২৪

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍