মো. সবুজ মিয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী (বর্তমানে বেকার)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাস হয়ে থাকবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, শিক্ষাগত বৈষম্য, বেকার এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্র ও তরুণ সমাজ হঠাৎ করেই যেন ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থেকে দেশে তৈরি করে এক ভয়াবহ নিপীড়নমূলক পরিবেশ। গুম, খুন, বিচারহীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাস সব কিছুই যেন ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা।
জুলাই ২০২৪-এ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে ছাত্র-জনতা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রাজপথে ধ্বনিত হয় এক স্লোগান: “স্বৈরাচারের পতন চাই!” শিক্ষাগত বৈষম্য, চাকরির অনিশ্চয়তা ও পুলিশের বর্বরতায় ক্ষুব্ধ তরুণরা হাতে প্ল্যাকার্ড আর চোখে আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় ন্যায়ের পক্ষে।
কিন্তু রাষ্ট্র তাদের জবাব দেয় গুলি ও লাঠিপেটা দিয়ে। পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা মিলে রাজপথকে পরিণত করে রণক্ষেত্রে। নির্বিচারে চালানো হয় গুলি, ছোঁড়া হয় কাঁদানে গ্যাস, ব্যবহার করা হয় জলকামান। পাখির মতো গুলি খেয়ে অনেক তরুণ রক্তাক্ত হয়, কেউ চিরতরে হারায় দৃষ্টিশক্তি বা শরীরের অঙ্গ, কেউ হারিয়ে ফেলে স্বাভাবিক জীবন।
জুলাইয়ের শেষদিকে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও, আগস্টের শুরুতে গণগ্রেফতার ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে আবার উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। হাজারো মানুষ রাস্তায় নামে, সরকারের পতনের দাবিতে সরব হয় সারাদেশ। এই আন্দোলন ছিল শুধু একটি ন্যায্য দাবি নয়, এটি ছিল একটি স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণ।
এই আন্দোলন প্রমাণ করে, যে প্রজন্মকে নতজানু করতে চেয়েছিল সরকার তারাই মাথা তুলে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র যখন অন্যায়কে আইন বানায়, তখন জনগণের প্রতিবাদই হয়ে ওঠে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়। জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন তাই শুধু একটি ঘটনার নাম নয়, এটি ইতিহাসে লেখা এক সাহসিকতার নাম।
পরিচিতি
তাঁর নাম মো. সবুজ মিয়া, বয়স মাত্র ২৪। পিতা ৬২ বছরের বৃদ্ধ মো. আমজাদ আলী, একজন রিকশাচালক, মাতা ছফুর বেগম। পরিবারের সদস্য ৫ জন। স্বপ্ন ছোট, লড়াই বড়। বেড়ে উঠেছেন শেরপুরের এক নিভৃত গ্রাম: বাঘবের, নালিতাবাড়ি।
সবুজ মিয়া ছিলেন রিকশাচালক বাবার একমাত্র ভরসা, পরিশ্রমী এক সন্তান। প্রতিদিন সকালে কাজে বের হতেন ফিরতেন রাতে। গাজীপুরের গার্মেন্টসে সেলাই মেশিনে হাত চালিয়ে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। প্রতিটি বেতনের টাকায় চলত ঘরে চাল-ডাল, আর পিতার ঔষধ। সবুজ শুধু একজন শ্রমিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিবারের অবলম্বন, একজন নীরব স্বপ্নদ্রষ্টা। কিন্তু তার সে হাত আজ আর নেই। একটি সন্তান আছে তাঁর, আর বৃদ্ধ বাবা-মা। সবুজ আজ শুধু একজন আহত মানুষ নন, তিনি এই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জীবন্ত দলিল।
তাঁর দোষ?
সে প্রতিবাদ করেছিল। দাঁড়িয়েছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্র তাকে উপহার দিয়েছে গুলি। আজ সে আর গার্মেন্টসে যেতে পারে না। ছয় মাস ধরে কাজহীন। তিন আঙুল নড়ে না। কিন্তু তবুও সে মাথা নত করেননি।
উত্তপ্ত গাজীপুরের রাজপথ
১৯ জুলাই বোর্ড বাজার, বড়বাড়ি, গাজীপুর। সবুজ মিয়া তখন প্রতিদিনের মতো গার্মেন্টস কাজে যাচ্ছিলেন বড়বাড়িতে। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সকাল থেকেই চলছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলন। বিভিন্ন রাস্তায় অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল পুলিশ-বিজিবি। রাস্তায় উত্তেজনা ও আন্দোলনের কারণে সেদিন তাঁর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি ঘরে ফিরে না গিয়ে সরাসরি যোগ দেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। হাজারো গার্মেন্টস কর্মীর মতো তিনিও দাঁড়িয়ে যান রাজপথে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, কিন্তু তিনি দমে যান না। দুপুরের খাবারের পর আবারও যোগ দেন আন্দোলনের মাঠে।
রাষ্ট্রীয় দমননীতির নির্মম চিত্র
দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আন্দোলনের ভিড় লক্ষ্য করে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারদিক থেকে ছুটে আসে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস, আর গুলি। সেই সময় সবুজ মিয়ার ঠিক সামনেই, তাঁর সহকারী পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান রাস্তায়। চোখের সামনে একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য আজও রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় সবুজকে।
এই বিভীষিকার মাঝে এক মুহূর্তেই সবুজ নিজেই হয়ে পড়েন গুলির শিকার। একটি তাজা গুলি সোজা এসে ঢুকে যায় তাঁর ডান হাতের কনুইতে, আর অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই হাত ঝুলে পড়ে, ছিঁড়ে যায় রগ, বেরিয়ে আসে ভিতরের মাংস ও রক্ত। তিনি বলেন: “বদনার নল দিয়ে যেভাবে পানি পড়ে তেমনি রক্ত পড়ছিল হাত থেকে।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভাইয়ের গামছা দিয়েই দ্রুত নিজের হাত শক্ত করে বেঁধে ফেলেন সবুজ। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। বেহুঁশ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান।
বাঁচা-মরার লড়াই
সবুজ যখন অজ্ঞান, তখন আশপাশের কিছু তরুণ সাহস করে একটি রিকশায় তোলেন তাঁকে। কিন্তু সে সময় ছাত্রলীগের কিছু অস্ত্রধারী রিকশাটি থামিয়ে দেয়। রিকশাচালককে মারধর করা হয়, ছাত্রদের উপর চালানো হয় লাঠি। তাদের অপরাধ-তারা একজন আহত মানুষকে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিল।
আঘাতপ্রাপ্ত সবুজকে বহু অনুরোধ ও কান্নাকাটির পরে কিছু মুরব্বি, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি কোটবাজারের এক ছোট ক্লিনিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরের গন্তব্য হয় জয়দেবপুর, সেখানেও চিকিৎসা পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়, যেখানে শুরু হয় বেঁচে থাকার প্রথম লড়াই।
৮ দিন সেখানে থাকার পর চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠান, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তা না থাকায় সেখানে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও উপযুক্ত চিকিৎসা মেলে না।
সবশেষে, আর কোনো রাস্তা না দেখে সবুজের বোন, বোনজামাই ও এলাকার মানুষ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে তাকে নিয়ে যান ইবনে সিনা হাসপাতাল, কল্যাণপুরে। সেখানে শুরু হয় শেষ চেষ্টা— একটি হাত বাঁচানোর যুদ্ধ। অপারেশন হয়, ব্যান্ডেজ হয়, অনেক কাটা-ছেঁড়া হয়। কিন্তু হাতের কনুই থেকে নিচের অংশ প্রায় অচল হয়ে যায়, তিনটি আঙুল আর নড়ে না।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। অতি শীঘ্রই তার তার হাতের আঙুলগুলোকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে উপযুক্ত অপারেশন করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে তিনি একজন বেকার। তার হাতের এই অবস্থায় তার পক্ষে ভাড়ি কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের জন্য এককালীন আর্থিক অনুদান দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও তার সন্তানের জন্য শিক্ষাবৃত্তি প্রয়োজন।
মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করলে সন্তানের শিক্ষা ও নিজের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে। এছাড়াও স্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য রিক্সা কিনে অথবা মুদি দোকান করার প্রয়োজনীয় টাকা দেয়া যেতে পারে।
এক নজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. সবুজ মিয়া
জন্ম তারিখ : ২৬/১২/১৯৯৯
জন্মস্থান : শেরপুর
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী (বর্তমানে বেকার)
নিজ জেলা : শেরপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বাঘবের, ইউনিয়ন: বাঘবের, থানা: নালিতাবাড়ি, জেলা: শেরপুর
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো. আমজাদ আলী
পিতার পেশা ও বয়স : রিকশাচালক, বয়স: ৬২
মায়ের নাম : ছফুর বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, বয়স: ৫০
পারিবারিক অবস্থা
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. আনজুয়ারা, বয়স: ৩০, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
২. মনোয়ারা, বয়স: ২৬, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
সন্তানের তথ্যাদি
১. আবু সাইদ, বয়স: ১, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : বোর্ডবাজার, বড়বাড়ি, গাজীপুর
আক্রমণকারী : বিজিবি
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২ টা
জুলাই ২০২৪-এ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে ছাত্র-জনতা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রাজপথে ধ্বনিত হয় এক স্লোগান: “স্বৈরাচারের পতন চাই!” শিক্ষাগত বৈষম্য, চাকরির অনিশ্চয়তা ও পুলিশের বর্বরতায় ক্ষুব্ধ তরুণরা হাতে প্ল্যাকার্ড আর চোখে আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় ন্যায়ের পক্ষে।
কিন্তু রাষ্ট্র তাদের জবাব দেয় গুলি ও লাঠিপেটা দিয়ে। পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা মিলে রাজপথকে পরিণত করে রণক্ষেত্রে। নির্বিচারে চালানো হয় গুলি, ছোঁড়া হয় কাঁদানে গ্যাস, ব্যবহার করা হয় জলকামান। পাখির মতো গুলি খেয়ে অনেক তরুণ রক্তাক্ত হয়, কেউ চিরতরে হারায় দৃষ্টিশক্তি বা শরীরের অঙ্গ, কেউ হারিয়ে ফেলে স্বাভাবিক জীবন।
জুলাইয়ের শেষদিকে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও, আগস্টের শুরুতে গণগ্রেফতার ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে আবার উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। হাজারো মানুষ রাস্তায় নামে, সরকারের পতনের দাবিতে সরব হয় সারাদেশ। এই আন্দোলন ছিল শুধু একটি ন্যায্য দাবি নয়, এটি ছিল একটি স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণ।
এই আন্দোলন প্রমাণ করে, যে প্রজন্মকে নতজানু করতে চেয়েছিল সরকার তারাই মাথা তুলে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র যখন অন্যায়কে আইন বানায়, তখন জনগণের প্রতিবাদই হয়ে ওঠে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়। জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন তাই শুধু একটি ঘটনার নাম নয়, এটি ইতিহাসে লেখা এক সাহসিকতার নাম।
পরিচিতি
তাঁর নাম মো. সবুজ মিয়া, বয়স মাত্র ২৪। পিতা ৬২ বছরের বৃদ্ধ মো. আমজাদ আলী, একজন রিকশাচালক, মাতা ছফুর বেগম। পরিবারের সদস্য ৫ জন। স্বপ্ন ছোট, লড়াই বড়। বেড়ে উঠেছেন শেরপুরের এক নিভৃত গ্রাম: বাঘবের, নালিতাবাড়ি।
সবুজ মিয়া ছিলেন রিকশাচালক বাবার একমাত্র ভরসা, পরিশ্রমী এক সন্তান। প্রতিদিন সকালে কাজে বের হতেন ফিরতেন রাতে। গাজীপুরের গার্মেন্টসে সেলাই মেশিনে হাত চালিয়ে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। প্রতিটি বেতনের টাকায় চলত ঘরে চাল-ডাল, আর পিতার ঔষধ। সবুজ শুধু একজন শ্রমিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিবারের অবলম্বন, একজন নীরব স্বপ্নদ্রষ্টা। কিন্তু তার সে হাত আজ আর নেই। একটি সন্তান আছে তাঁর, আর বৃদ্ধ বাবা-মা। সবুজ আজ শুধু একজন আহত মানুষ নন, তিনি এই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জীবন্ত দলিল।
তাঁর দোষ?
সে প্রতিবাদ করেছিল। দাঁড়িয়েছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্র তাকে উপহার দিয়েছে গুলি। আজ সে আর গার্মেন্টসে যেতে পারে না। ছয় মাস ধরে কাজহীন। তিন আঙুল নড়ে না। কিন্তু তবুও সে মাথা নত করেননি।
উত্তপ্ত গাজীপুরের রাজপথ
১৯ জুলাই বোর্ড বাজার, বড়বাড়ি, গাজীপুর। সবুজ মিয়া তখন প্রতিদিনের মতো গার্মেন্টস কাজে যাচ্ছিলেন বড়বাড়িতে। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সকাল থেকেই চলছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলন। বিভিন্ন রাস্তায় অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল পুলিশ-বিজিবি। রাস্তায় উত্তেজনা ও আন্দোলনের কারণে সেদিন তাঁর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি ঘরে ফিরে না গিয়ে সরাসরি যোগ দেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। হাজারো গার্মেন্টস কর্মীর মতো তিনিও দাঁড়িয়ে যান রাজপথে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, কিন্তু তিনি দমে যান না। দুপুরের খাবারের পর আবারও যোগ দেন আন্দোলনের মাঠে।
রাষ্ট্রীয় দমননীতির নির্মম চিত্র
দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আন্দোলনের ভিড় লক্ষ্য করে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারদিক থেকে ছুটে আসে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস, আর গুলি। সেই সময় সবুজ মিয়ার ঠিক সামনেই, তাঁর সহকারী পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান রাস্তায়। চোখের সামনে একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য আজও রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় সবুজকে।
এই বিভীষিকার মাঝে এক মুহূর্তেই সবুজ নিজেই হয়ে পড়েন গুলির শিকার। একটি তাজা গুলি সোজা এসে ঢুকে যায় তাঁর ডান হাতের কনুইতে, আর অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই হাত ঝুলে পড়ে, ছিঁড়ে যায় রগ, বেরিয়ে আসে ভিতরের মাংস ও রক্ত। তিনি বলেন: “বদনার নল দিয়ে যেভাবে পানি পড়ে তেমনি রক্ত পড়ছিল হাত থেকে।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভাইয়ের গামছা দিয়েই দ্রুত নিজের হাত শক্ত করে বেঁধে ফেলেন সবুজ। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। বেহুঁশ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান।
বাঁচা-মরার লড়াই
সবুজ যখন অজ্ঞান, তখন আশপাশের কিছু তরুণ সাহস করে একটি রিকশায় তোলেন তাঁকে। কিন্তু সে সময় ছাত্রলীগের কিছু অস্ত্রধারী রিকশাটি থামিয়ে দেয়। রিকশাচালককে মারধর করা হয়, ছাত্রদের উপর চালানো হয় লাঠি। তাদের অপরাধ-তারা একজন আহত মানুষকে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিল।
আঘাতপ্রাপ্ত সবুজকে বহু অনুরোধ ও কান্নাকাটির পরে কিছু মুরব্বি, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি কোটবাজারের এক ছোট ক্লিনিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরের গন্তব্য হয় জয়দেবপুর, সেখানেও চিকিৎসা পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়, যেখানে শুরু হয় বেঁচে থাকার প্রথম লড়াই।
৮ দিন সেখানে থাকার পর চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠান, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তা না থাকায় সেখানে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও উপযুক্ত চিকিৎসা মেলে না।
সবশেষে, আর কোনো রাস্তা না দেখে সবুজের বোন, বোনজামাই ও এলাকার মানুষ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে তাকে নিয়ে যান ইবনে সিনা হাসপাতাল, কল্যাণপুরে। সেখানে শুরু হয় শেষ চেষ্টা— একটি হাত বাঁচানোর যুদ্ধ। অপারেশন হয়, ব্যান্ডেজ হয়, অনেক কাটা-ছেঁড়া হয়। কিন্তু হাতের কনুই থেকে নিচের অংশ প্রায় অচল হয়ে যায়, তিনটি আঙুল আর নড়ে না।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। অতি শীঘ্রই তার তার হাতের আঙুলগুলোকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে উপযুক্ত অপারেশন করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
বর্তমানে তিনি একজন বেকার। তার হাতের এই অবস্থায় তার পক্ষে ভাড়ি কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের জন্য এককালীন আর্থিক অনুদান দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও তার সন্তানের জন্য শিক্ষাবৃত্তি প্রয়োজন।
মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করলে সন্তানের শিক্ষা ও নিজের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে। এছাড়াও স্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য রিক্সা কিনে অথবা মুদি দোকান করার প্রয়োজনীয় টাকা দেয়া যেতে পারে।
এক নজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. সবুজ মিয়া
জন্ম তারিখ : ২৬/১২/১৯৯৯
জন্মস্থান : শেরপুর
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী (বর্তমানে বেকার)
নিজ জেলা : শেরপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বাঘবের, ইউনিয়ন: বাঘবের, থানা: নালিতাবাড়ি, জেলা: শেরপুর
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো. আমজাদ আলী
পিতার পেশা ও বয়স : রিকশাচালক, বয়স: ৬২
মায়ের নাম : ছফুর বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, বয়স: ৫০
পারিবারিক অবস্থা
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. আনজুয়ারা, বয়স: ৩০, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
২. মনোয়ারা, বয়স: ২৬, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
সন্তানের তথ্যাদি
১. আবু সাইদ, বয়স: ১, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : বোর্ডবাজার, বড়বাড়ি, গাজীপুর
আক্রমণকারী : বিজিবি
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২ টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍