হোম / আহতদের তালিকা / শওকত ফকির
শওকত ফকির

শওকত ফকির

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আন্দোলনে হাত ভাঙা বীর
পেশা: ছাত্র, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জুলাই আন্দোলন: আওয়ামী সন্ত্রাসের নৃশংস অধ্যায়
২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে সারা দেশে ছাত্র-জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক গণ আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারভিত্তিক।
কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার এই প্রতিবাদকে রুখতে নামিয়ে দেয় তার দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী; ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে এবং ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্র; পুলিশ ও র‍্যাবকে। এই সময়ে দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার উপর চালানো হয় ভয়াবহ নিপীড়ন। দিনের পর দিন আন্দোলনকারীদের উপর করা হয় লাঠিচার্জ, নিক্ষেপ করা হয় রাবার বুলেট, ক্যাদানে গ্যাস সর্বপরি গুলি। ছাত্রদের রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তুলে নিয়ে গুম করা হয়। কাছ থেকে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া হয়, করা হয়

সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ অভিযানে অনেকের মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, চিকিৎসা পেতে বাধা দেয়া হবে, হাসপাতালে নিয়েও ফিরিয়ে দেয়া হবে। এমনকি আত্মীয়-স্বজনদের বাসা থেকেও তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। নারীদের ক্ষেত্রেও বাছ-বিচার করেনি তাদের বর্বরতা; তাদের উপরও চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এই নিপীড়ন ছিল শুধুই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এক পশুর মতো আচরণ- যেখানে মানবতা, ন্যায়বিচার এবং ন্যূনতম রাজনৈতিক শালীনতার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
জুলাই আন্দোলনের এক লড়াকু যোদ্ধা
জন্ম ও শৈশব
শওকত ফকির জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৮ সালের ৭ জানুয়ারি, নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার কাকেরগড়া ইউনিয়নের নগুয়া গ্রামে। মেঠো পথ, সবুজ শস্যের ক্ষেত আর নদীর কুল ঘেঁষা সেই শান্ত গ্রামেই তার শৈশব কেটেছে। প্রান্তিক জনপদের সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ পরে হয়ে ওঠেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া এক বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর।

পারিবারিক জীবন
শওকতের পিতা সুলতান ফকির একজন সৎ ও পরিশ্রমী কৃষক, যিনি সীমিত সামর্থ্য নিয়ে পরিবারকে আগলে রেখেছেন দৃঢ় হাতে। তাঁর মা পারভিন একজন পরম মমতাময়ী নারী, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় সন্তানদের গড়ে তুলেছেন নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে। চার ভাই ও এক বোনের ঘরে শওকত বড় হয়েছেন একটি ঘনিষ্ঠ, ভালোবাসায় পূর্ণ পরিবারে। বড় ভাই সাজ্জাদুর রহমান একজন ছাত্র ও মসজিদের ইমাম; সিয়াম, আবু সাইম ও ছোট বোন তাসনিম প্রত্যেকেই শিক্ষার পথে অগ্রসরমান।

ছাত্রজীবন ও মননগঠন
ছাত্রজীবনে শওকত ছিলেন একাগ্র ও দায়িত্বশীল। আনন্দ মোহন কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এই তরুণ ছাত্র নিজেকে কেবল পাঠ্যবইয়ের জগতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবতেন, প্রশ্ন তুলতেন এবং খুঁজতেন একটি ন্যায্য, মুক্ত ও মানবিক সমাজের পথ। তার চিন্তা ও চরিত্রে ফুটে উঠত সাহস, আত্মত্মবিশ্বাস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার এক অবিচল মানসিকতা।

সংগ্রামী জীবন
ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে শওকত ফকির হয়ে ওঠেন জুলাই আন্দোলনের এক নির্ভীক সৈনিক

তিনি শুধু নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করেননি; বরং ভাইদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেজন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন আন্দোলনে। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি রাজপথে থেকেছেন জনতার পাশে। শওকতের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একজন সাধারণ ছাত্র হয়ে উঠতে পারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নিরলস আলোকবর্তিকা।

সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন-এই বীরের আত্মকাহিনী
আমি শওকত ফকির। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী; কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই আমার অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই ছাত্র-জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। রাজপথে দাঁড়িয়েছি নিজের দায়িত্ববোধ থেকে, কোনো লোভ বা প্ররোচনায় নয়। জুলাই মাসে কুমিল্লায় চাচাতো ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ৩ আগস্ট চকবাজার এলাকায় যখন আন্দোলনের ডাক এলো; আরেকবারও ভাবিনি। নেমে গেলাম রাজপথে, ব্যানার হাতে, মাথা উঁচু করে। আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল হঠাৎ করেই ঘিরে ধরে পুলিশ আর খুনী হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় লাঠিচার্জ। আর তাদের লক্ষ্য ছিলাম আমি; বিশ্বাসই হয় না, এমন বর্বরভাবে আমাকে আঘাত করলো। লাঠির পর লাঠি; একটা সময় মনে হলো শরীর আর সাড়া দিচ্ছে না। আমার এক হাতের হাড় ভেঙে গেল, মোবাইল ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল ওরা। এরপর যখন পেছনে ফিরলাম,
তখনই ওরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায়: একটা গুলি এসে লাগে আমার পায়ে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। চারপাশে শুধু চিৎকার, রক্ত, কান্না আর ভয়ে গুমরে ওঠা কিছু ছেলেমেয়ে। আমি তখন আর নিজেকে মানুষ মনে করিনি; মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো দাস, কোনো বিদ্রোহী, যাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে একটাই অপরাধে; আমি প্রতিবাদ করেছি, মাথা নত করিনি।

আজও সেই ব্যথা আমি বইছি; হাতের ব্যথা, পায়ের গুলির ক্ষত, আর ফোন হারানোর নয়; সবচেয়ে বড় ক্ষত, এই স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলার বেদনা। কিন্তু আমি দমে যাইনি। ওরা ভেবেছিল আমাকে থামিয়ে দেবে, কিন্তু আমার শরীর যতই রক্তাক্ত হোক, আমার মন এখনও রাজপথে দাঁড়িয়ে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না। একদিন এ অন্ধকার শেষ হবেই।

চিকিৎসার কথা বললে এখনও হাতটা কেঁপে ওঠে...
সেদিন ৩ আগস্ট ছিল; আমার জীবনের এক ভয়ংকর দিন। যখন ওরা আমার শরীরে বারবার লাঠি চালাচ্ছিল, আমি জানতাম, ওরা শুধু আমার হাড় ভাঙছে না, ওরা আমাদের আশা ভাঙতে চাইছে। গুলিটা যখন পায়ে লাগে, তখন চারপাশ কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসে। আমি পড়ে যাই, আর এরপর কীভাবে সেখান থেকে উঠেছি, আজও মনে নেই ঠিকমতো। আন্দোলনের ভাইয়েরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় কুমিল্লার এক স্থানীয় ফার্মেসিতে। ওখানেই জরুরি ভিত্তিতে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, রক্তপাতে তখনও বন্ধ হয়নি, মাথা ঘুরছিল, ব্যথায় চোখে জল। ওই ফার্মেসিটাও যেন ভয়ে কাঁপছিল; কারণ জানত, আমায় চিকিৎসা দিলে তারাও 'অপরাধী' হয়ে যাবে শেখ হাসিনার শাসনে। পরে যখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলো খুনি হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাল, তখন আমি গ্রামে ফিরে আসি। দুর্গাপুর মেডিকেল হাসপাতালে গিয়ে এক্সরে করাই। ডাক্তার দেখেই বললেন, হাতের হাড় ভেঙে গেছে। অপারেশন লাগবে ভাই, দেরি করলে অবস্থা খারাপ হবে। মাথার ভেতরটা হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গেল; আমার হাতটা, যেটা দিয়ে আমি বই ধরতাম, পোস্টার লিখতাম, প্ল্যাকার্ড ধরতাম, আজ সেই হাত আর আগের মতো নেই।
আওয়ামী সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের ধ্বংস করতে চায়। কীভাবে এটা শুধু চিকিৎসা নয়; এটা এক জীবন্ত সাক্ষ্য, কীভাবে তারা ছাত্র-জনতার শরীরে আঘাত করে আসলে
করতে চায়। আমি চিকিৎসা নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু যে ঘা ওরা দিয়েছে; তা শুধু শরীরের নয়, তা আত্মার গভীরে। এই হাতটা ভাঙা, কিন্তু মনটা না; এই মন আবার লড়বে, আবার লিখবে, আবার বলবে: 'তোমরা যতই গুলি চালাও, আমরা থামবো না

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা

এক নজরে শওকত ফকির
নাম : শওকত ফকির
জন্ম তারিখ : ০৭-০১-১৯৯৮
জন্মস্থান : শেরপুর
পেশা : ছাত্র, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ
নিজ জেলা : দুর্গাপুর, নেত্রকোনা

স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: নগুয়া, ইউনিয়ন/পৌরসভা: কাকেরগড়া, থানা: দুর্গাপুর, জেলা: নেত্রকোনা
পিতার নাম : সুলতান ফকির , কৃষক, ৫৭
মায়ের নাম: পারভিন
পরিবারের তথ্য:

মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৮
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ী : সেমি পাকা, ৮ জন
সম্পদ: ২০ কাঠা পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:
১. সাজ্জাদুর রহমান, বয়স: ২৩, পেশা: ছাত্র এবং মসজিদের ইমাম, শ্রেণি: দাওরায়ে হাদীস সম্পর্ক: ভাই
ভাই-বোনদের বিবরণ
২. সিয়াম, বয়স: ১৯, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: এডমিশন প্রার্থী, সম্পর্ক: ভাই
৩. আবু সাইম, বয়স: ১৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১০ম, সম্পর্ক: ভাই
৪. তাসনিম, বয়স: ১০, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান ও সময়: কমিল্লা বাজার, ৩ আগস্ট, ২০২৪ বিকাল ২.০০টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍