হোম / আহতদের তালিকা / মানিক মিয়া
 মানিক মিয়া

মানিক মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : গার্মেন্টস কর্মী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

এক চোখের আলো
হাজার চোখের স্বপ্নমানিক মিয়া
ক্রমিক: ১৫৭
আইডি: ময়মনসিংহ বিভাগ ০৩৪

জন্মপরিচয়
মানিক মিয়া ২০ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার বাঁশতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল হাকিম উদ্দিন একজন মুদি দোকানদার এবং তার মাতা মালেকা খাতুন গৃহিণী। দুই ভাই-বোনের মধ্যে মানিক মিয়া সবার বড়। বৃদ্ধ পিতা সংসারের খরচ চালাতে না পাড়ায় ছোটবেলায়ই তার পড়ালেখার ইতি ঘটে। সংসারের হাল ধরতে তিনি পাড়ি জমান গাজীপুরে। সেখানে তাঁর স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। তাঁর ছেলে ইয়াসমিন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং তাঁর মেয়ে মরিয়ম তিন বছরের শিশু। তাঁর সংসার খুব ভালোই চলছিল। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের অধিকার আদায় করতে যেয়ে তিনি তাঁর বাম চোখ হারান এবং ডান চোখেও আঘাতপ্রাপ্ত হন।

এক চোখের আলো হাজার চোখের স্বপ্ন
স্বৈরাচারী সরকার কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দিতেন যার কারণে অনেক মেধাবী ছাত্ররা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হতো। কোটার ভিত্তিতে নয় মেধার ভিত্তিতে চাকরি নিয়োগের শ্লোগান নিয়ে ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। তখন সাময়িকভাবে সফলতা লাভ করলেও রিটের আবেদনের ভিত্তিতে ২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা ব্যবস্থা আবার পুনর্বহাল রাখা হয়। এই অসম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে। সরকারকে প্রস্তাবনা দেয়া হয় মেধার ভিত্তিতে যেন নিয়োগ দেওয়া হয়, কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার তা না করে বরং ন্যায্য আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে আসে। ১ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই আন্দোলন চলছিল। ১৯ জুলাইয়ের স্বৈরাচারী সরকার ন্যায্য দাবি পূরণ তো দূরের কথা বরং তার সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী পুলিশ লীগ দিয়ে ছাত্রদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালায় যা পুরো ছাত্র সমাজকে ব্যথিত করে তোলে। ছাত্ররা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার তার পুলিশ বাহিনীকে সরাসরি গুলি করার নির্দেশ প্রদান করে। তারই প্রেক্ষিতে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
ছাত্ররা এই হত্যার প্রতিবাদে আরও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। স্বৈরাচারী সরকার তার সন্ত্রাসী বাহিনী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং তার পুলিশ বাহিনীকে সর্বশক্তি দিয়ে ছাত্রদের উপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেয়। এই ন্যাক্কারজনক দমন-পীড়ন ছাত্রসমাজ সহ্য করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ তার সন্তানকে গুলির মুখে দিয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেননি। আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, সাধারণ জনতা ছাত্রদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে রাস্তায় নেমে আসে। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ শিক্ষক শ্রেণি, শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিক্সাচালক এবং গার্মেন্টস কর্মী সকলেই আন্দোলনে যোগদান করে। মানিক মিয়াও সে সাহসীদের মধ্যে একজন। তিনি একজন গার্মেন্টস কর্মী হয়েও ছাত্রদের অধিকার আদায়ে নিয়মিত আন্দোলনে শরীক হতেন। তিনি তার গার্মেন্টসের প্রায় ৩৫ জনকে নিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ৫ আগস্ট সকালেই তিনি গাজীপুর চৌরাস্তায় বের হয়ে আসেন। সেখানে ছাত্র-জনতা ধীরে ধীরে জড়ো হতে থাকে। স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী, আওয়ামী যুব বাহিনী আগে থেকেই ছিল তৎপর। তারা দেশি-বিদেশি অস্ত্র, রাবার বুলেট বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ছাত্র জনতা হত্যায় ওঁৎপেতে ছিলো। গাজীপুর চৌরাস্তার ফ্লাইওভারে বিজিবি এবং পুলিশ গুলি তাক করে অবস্থান নেয়। ছাত্ররা সামনের দিকে অগ্রসর হলে চতুর্দিক থেকে পুলিশ, বিজিবি এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা দেশি-বিদেশী অস্ত্র দিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে উপার্যুপারি গুলি চালাতে থাকে। সামনের সারির ছাত্র-জনতা একে একে গুলির আঘাতে রাস্তায় পড়ে যায়। রক্তাক্ত হয়ে যায় সেই রাস্তা। শাহাদাত বরণের পাশাপাশি অনেকেই আহত হয়। মানিক মিয়া আন্দোলন করতে করতে সামনের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লে অনেক গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। একটা গুলি তার চোখে বিঁধে যায় এবং তিনি সাথে সাথে রাস্তায় পড়ে যান। তাঁর সারা শরীর এবং মুখ রক্তাক্ত হয়ে যায়। তিনি অন্য হাত দিয়ে বাম চোখটা ধরে পিছনের দিকে যেতে থাকেন। পথিমধ্যেই তিনি পড়ে যান। সেখানে অবস্থানরত ছাত্র-জনতা তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত বর্ণনা
তিনি যখন তাঁর চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে যান তখন তিনি অন্য চোখ দিয়ে দেখতে পান যে, তাঁর উপরে মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তাঁর ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তখন তাঁর চোখ থেকে রক্ত ঝরছিল তবুও স্বৈরাচারী সরকারের পা চাটা গোলামরা তাকে সহযোগিতা করেনি। সেখান থেকে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নেয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর তাকে আগারগাঁও চক্ষু হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। তিনি একটি এম্বুলেন্স ভাড়া করতে গেলে ৩৩ হাজার টাকা চাওয়া হয়। তিনি হতভম্ব হয়ে শুনে। তখন ছাত্রদের সহযোগিতায় মিরপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করানো হয়। আগস্টের ১২ তারিখে আগারগাঁও চক্ষু হসপিটালে ভর্তি হন। হাজার হাজার রোগীর মধ্যে তিনি প্রথম তিন দিন চিকিৎসা পাননি। সঠিক চিকিৎসার অভাবে তিনি তাঁর বাম চোখ হারান। দীর্ঘদিন বাম চোখের চিকিৎসা না পাওয়ায় তার ডান চোখেও সমস্যা দেখা দিচ্ছিলো। বর্তমানে তিনি স্ত্রীসহ সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে থাকেন। প্রায় তিন মাস তিনি বিছানায় পড়ে ছিলেন। তিনি যে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন সেখানে গেলে তাকে আর নেয়া হয় না। পরিবারের কোনো উপার্জন অক্ষম ব্যক্তি না থাকায় ঋণ করে তাঁর সংসার চালাতে হচ্ছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
১। তাঁর দুই চোখে এখনও তিনটি গুলি রয়েছে। মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উপস্থাপনা
১। স্ত্রীর জন্য কর্মের ব্যবস্থা করা
২। তাঁর নিজের জন্য দু’টি দুধেল গাভীর ব্যবস্থা করা।
এক নজরে মানিক মিয়া
নাম : মানিক মিয়া
জন্ম তারিখ : ২০ ডিসেম্বর ১৯৮৮
জন্মস্থান : ময়মনসিংহ
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : ময়মনসিংহ, গ্রাম: বাঁশতলা, ইউনিয়ন: কাকনী, থানা: তারাকান্দা, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: হাকিম উদ্দিন
মায়ের নাম : মালেকা খাতুন
পিতার পেশা ও বয়স : মুদী দোকানদার, ৭৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : মুদী দোকান
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. ইয়াসিন, বয়স: ১৪ বছর, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ছেলে
২. মরিয়ম, বয়স: ৩, সম্পর্ক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : গাজীপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বেলা ১১টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍