হোম / আহতদের তালিকা / মো: পিংকু
মো: পিংকু

মো: পিংকু

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

যাত্রাবাড়ী দনিয়া কলেজের সামনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দিন, মানবিকতা ছাড়া আর কোনো পরিচয় ছিল না পিংকুর। নিরীহ এই ভাঙাড়ি হকার আহত ছাত্রদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে গিয়েই পড়লেন পুলিশ ও ছাত্রলীগের বৃষ্টির মতো গুলির সামনে। পেট ভেদ করা গুলি আর মুখ থুবড়ে পড়ে ভাঙা দাঁতের ব্যথা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একদিন যে মানুষটি পরিবার ও প্রতিবেশীদের ভরসা ছিলেন, তিনি এখন নিজেই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায়। পিংকুর গল্প শুধু ব্যক্তিগত নয় এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব সাক্ষ্য, মানবিক রাষ্ট্রের প্রতি এক অস্ফুট আর্তি।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ ও ছাত্রলীগের বর্বর আচরণ
একজন নিরীহ হকারকে হত্যা করে কী বা লাভ স্বৈরাচারদের
মো: পিংকু
পেশা: হকার
ক্রমিক: ০১৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০১৬
পরিচিতি
মো: পিংকুর জন্ম ১৯৮৫ সালের ১২ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জ জেলায়। জন্মসূত্রে হলেও শৈশব থেকেই তার জীবন কেটেছে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায়। দারিদ্র্য আর সংগ্রামে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির চোখে কখনো বিশাল স্বপ্ন ছিল না, কিন্তু হৃদয়ে ছিল একটা অদম্য মানবিকতা। বাবার নাম মোসলেম, যিনি মহান রবের দরবারে পাড়ি জমিয়েছেন। মায়ের নাম হনুফা বেগম, যিনি বর্তমানে ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধা। পরিবারে ছয় ভাই-বোনের মধ্যে পিংকু অন্যতম বড়। ভাই-বোনদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো কাজ করে জীবিকা চালায়, কেউ বিধবার জীবন যাপন করছেন।
পিংকু পেশায় একজন হকার। তবে সাধারণ হকারদের মতো বড় দোকান বা ফুটপাতে বসে নয়, তিনি ভাঙাড়ি মালামাল সংগ্রহ করে তা বিক্রয় করে জীবন চালাতেন। পুরাতন কাগজ, বোতল, প্লাস্টিক, লোহা এসব তিনি এলাকায় ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করতেন এবং তা বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়েই পরিবার চালাতেন। এই কাজটি যদিও সমাজে সম্মানজনক নয় বলে অনেকের চোখে ধরা হয়, তবু পিংকু সেটাই পরম নিষ্ঠায় করে গেছেন। তার উপার্জনেই চলত মা ও বোনের ওষুধ-পথ্য, ছোট ভাইদের খরচ।
পারিবারিক বর্ণনা
পিংকুর পরিবার একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার। মা হনুফা বেগম একসময় গৃহকর্মে যুক্ত থাকলেও বয়সের ভারে এখন কিছুই করতে পারেন না। বাবা মোসলেমের বহু বছর আগে মৃত্যু হয়েছে। পরিবারে ভাই-বোন মিলিয়ে পাঁচজন সদস্য। বড় বোন ডলি আক্তার, বয়স ২৪, এখন বিধবা জীবন যাপন করছেন। ছোট ভাই রিংকু একজন লিফট মেকানিক, সেন্টু ও মিন্টু নামের দুই ভাই চাকরিরত। পরিবারের সকল সদস্য কোনো না কোনোভাবে সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। পিংকু ছিলেন এই পরিবারের নির্ভরতার অন্যতম স্তম্ভ।
২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে ফুঁসে উঠেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। দুর্নীতি, ক্ষমতার দমননীতি আর অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে সাধারণ মানুষও সংহতি জানায়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল, সমাবেশে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, বিজিবি, আনসার, সেনাবাহিনী ও পুলিশের গুলি ও দমন-নির্যাতন চলতে থাকে। পিংকু যেহেতু রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় বসবাস করতেন, সেখানকার দনিয়া কলেজ এলাকায় আন্দোলনরত। ছাত্রদের দেখে তিনি মর্মাহত হন। মানবিকতার টানে নিজেই এগিয়ে যান তাদের পাশে দাঁড়াতে।
আন্দোলনে যোগদান
পিংকু আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংগঠনের সদস্য ছিলেন না, কিন্তু ছাত্রদের প্রতি মায়া, শ্রদ্ধা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের নৈতিক সাহস তাকে আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য করে। তিনি নিজে আহত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন না, কিন্তু প্রতিদিন সকালে যারা আহত হতেন, তাদের হাসপাতালে পৌছে দেয়ার কাজে স্বেচ্ছায় জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার রাস্তায় রক্তাক্ত তরুণদের দেখে তিনি চুপ থাকতে পারেননি। কিন্তু একদিন, সেই মানবিক সহায়তার কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেই যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ ও ছাত্রলীগের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই, দুপুর ১টার দিকে দনিয়া কলেজ এলাকায় ছাত্রদের একটি মিছিলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পিংকু। হঠাৎ ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায়। চারদিক থেকে গুলি চালানো হয়। একসময় একটি গুলি এসে তার পেট বিদ্ধ করে, এবং পড়ে যাওয়ার সময় রাস্তার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে তার পাঁচটি দাঁত ভেঙে যায়। তখন আশেপাশের সাধারণ মানুষ ও কয়েকজন আন্দোলনকারী তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, তখন থেকেই তার জীবন পুরোপুরি পাল্টে যায়।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
পিংকুর গুলি লেগেছে পেটের নিচের অংশে। সেই সাথে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ায় তার পাঁচটি দাঁত ভেঙে যায়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তার পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে দুঃখজনকভাবে সেই অস্ত্রোপচারের পরও তিনি এখনো স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারেন না। তার খাদ্যনালী সংকুচিত হয়ে গেছে এবং গলায় ব্যথা অনুভব করেন। দাঁতের ক্ষতির কারণে কথা বলতেও সমস্যা হয়। বর্তমানে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ হতে গেলে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন। এই জীবনীটি মোঃ পিংকুর সংগ্রাম, মানবতা ও শারীরিক পঙ্গুত্বের বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি তার জন্য সমাজের কাছ থেকে সম্মান, সহানুভূতি ও সহায়তার দাবি জানায়।
প্রস্তাবনা
১. পিংকুর খাদ্যনালী ও দাঁতের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন।
২. তাকে চিকিৎসা সহায়তা বাবদ একটি বিশেষ মেডিকেল ফান্ড বরাদ্দ দেয়া উচিত।
৩. তার যেহেতু চলাফেরা ও কাজে বাধা সৃষ্টি হয়েছে, তাই তার জন্য একটি বিকল্প আয়ের উৎস নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে একটি মাসিক পুনর্বাসন ভাতা চালু করা যেতে পারে।

এক নজরে মো: পিংকু
নাম: পিংকু
জন্ম তারিখ: ১২-০৪-১৯৮৫
জন্মন্মস্থান: মুন্সিগঞ্জ
পেশা: হকার (ভাঙ্গারি মালামাল সংগ্রহ করে বিক্রয় করতেন)
নিজ জেলা: মুন্সিগঞ্জ
স্থায়ী ঠিকানা: মহল্লা: দয়াগঞ্জ, থানা: গেন্ডারিয়া, ঢাকা সদর, ঢাকা
বর্তমান ঠিকানা: মহল্লা: শনির আখড়া, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মো: মোসলেম (মৃত)
মায়ের নাম: হনুফা বেগম, বৃদ্ধা, বয়স: ৭২
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
ভাই-বোনের বিবরণ
১. ডলি আক্তার, বয়স: ২৪, বিধবা, সম্পর্ক: বোন
২. রিংকু, বয়স: ২১, লিফট মেকানিক, সম্পর্ক: ভাই
৩. সেন্টু, চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
৪. মিন্টু, চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান: শনির আখড়া (দনিয়া কলেজের সামনে)
আহত হওয়ার সময়: ২০ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১.০০টা
আক্রমণকারী: সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍