হোম / আহতদের তালিকা / আসাদুজ্জামান আকাশ
আসাদুজ্জামান আকাশ

আসাদুজ্জামান আকাশ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ময়মনসিংহ
পেশা : শিক্ষক (নূরানী মাদ্রাসা)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আসাদুজ্জামান আকাশ
পেশা: শিক্ষক (নূরানী মাদ্রাসা)
ক্রমিক: ১৬৪
আইডি: ময়মনসিংহ বিভাগ ০৪১

হাত ভাঙা ও মাথায় রাবার বুলেটের আঘাত

জন্ম পরিচয়
ডিসেম্বর মাস প্রায় শেষ দিকে। সেদিন ছিলো ২৭ তারিখ। তীব্র শীত আর কুয়াশায় ঘেরা উজানপাড়া গ্রাম। তবুও দরদর করে ঘামছেন শামসুন্নাহার। বড় বড় নি:শ্বাস নিচ্ছেন আর আল্লাহকে ডাকছেন। কিছুক্ষণ পরেই নবজাতকের কান্নার শব্দ শোনা গেলো। পাঁচ কন্যার পর পুত্র সন্তানের বাবা হলেন নূর মোহাম্মদ। শখ করে পুত্রের নাম রেখেছেন “আসাদুজ্জামান আকাশ”। সেই আসাদুজ্জামান আকাশ আজ জুলাই যোদ্ধা। বাংলাদেশের ২য় স্বাধীনতার জন্য যারা জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছেন তাদেরই একজন তিনি। আসাদুজ্জামান ১৯৯৮ সালে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার উজানপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব শান্তশিষ্ট ও মেধাবী ছিলেন। বাবা-মা ও বড় বোনদের নিবিড় পরিচর্যায় তিনি বড় হয়েছেন।

শিক্ষা ও কর্মজীবন
আসাদুজ্জামান নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন এবং পরবর্তীতে ফুলবাড়িয়া পাইলট স্কুল থেকে এসএসসি ও ময়মনসিংহ গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি মুক্তাগাছা কলেজ থেকে একাউন্টিং বিষয়ে অনার্স ও আনন্দমোহন কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশুনা সম্পন্ন করে তিনি স্থানীয় একটি নূরানী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। তাঁর পিতা একজন কৃষক এবং মাতা গৃহিণী। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব এখন তাঁর। তিনি সস্ত্রীক তাঁর পিতা-মাতার সাথে নিজ গ্রামে বসবাস করছেন।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
জন্ম থেকেই শান্ত ছেলে আসাদুজ্জামান নিজ গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাননি। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক মিছিল, মিটিংয়েও তাকে দেখা যায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘসময়ের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় তিনি নিজেও ছিলেন অতিষ্ঠ। একজন ছাত্র হিসেবে শিক্ষা জীবনে হতে হয়েছে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার। তাই যখনই আন্দোলনের ডাক আসে আর দেরি করেননি।
সেদিন সারা দেশের পরিস্থিতি
জুলাই মাসে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যার পর থেকেই আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। সারা দেশের প্রায় সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্দোলন কার্যক্রম আরও বেগবান হয়। পুরো জুলাই মাস জুড়ে অসংখ্য ছাত্র-জনতা আহত হয় ও শতাধিক শহীদ হয়। হাজার হাজার মানুষকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে ৯ দফা দাবি নিয়ে ছাত্ররা আন্দোলন চালিয়ে যায়। এরই মধ্যে সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু ছাত্রদেরকে কিছুতেই দমিয়ে রাখা যায়নি। ৩ আগস্ট ৯ দফা দাবি বাদ দিয়ে ১ দফা দাবি করা হয় এবং তা ছিলো হাসিনার পদত্যাগ। ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। সেদিন সারা দেশে ব্যাপক হামলা চলে এবং আওয়ামী ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাহিনী শতাধিক মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে উত্তেজিত জনতা বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও কয়েকটি জেলায় পুলিশ স্টেশনে আগুন দেয়। প্রায় সব জেলায় অসহযোগ আন্দোলন পুরোপুরি পালিত হয়। সেদিন খুনি হাসিনা তিন বাহিনীর প্রধানের সাথে বৈঠকে বসে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয় এবং শক্ত হাতে দমন করার আহ্বান জানায়। স্বৈরাচারী হাসিনার নির্দেশে পুলিশ ছাত্রদের উপর রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং অনেক জায়গায় সরাসরি গুলি চালায়। পুলিশ সরাসরি গুলি না চালানোর রিট খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। স্বৈরাচারী সরকার আন্দোলনকারীদের দমাতে না পেরে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে এবং সব ধরনের অফিস-আদালতে তিন দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তারপর দিন ৫ আগস্ট গণভবন অভিমুখে লংমার্চ ঘোষণা করা হয়।
যেভাবে আহত হলেন
প্রতিদিনের মতো ৪ আগস্ট বিকেলের দিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলার ইব্রাহিম সুপার মার্কেটের সামনে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিলো। একদিকে ছাত্র-জনতার মিছিল ও বিপরীত দিকে ছিলো পুলিশ বাহিনীর অবস্থান। এদিকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাহিনীর ছাত্র আন্দোলন দমন করার প্রস্তুতি চলছিলো বলে জানা যায়। হঠাৎ করেই পুলিশ বাহিনী আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। আতংকিত ছাত্র-ছাত্রীরা এদিক সেদিক দৌড়াতে শুরু করে। হঠাৎ একটি রাবার বুলেট তাঁর মাথায় আঘাত করে। তিনি আহত হয়ে সেখানেই রাস্তায় পড়ে যান। পড়ে যাওয়ার সময় তাঁর বাম হাত ভেঙে যায় এবং পায়ে মারাত্মক ছেঁড়া ফাটার সৃষ্টি হয়। আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত নিকটবর্তী ফুলবাড়িয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয় এবং সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে পপুলার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ সময় ছাত্রলীগের কিছু কর্মী উপস্থিত থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে যার ফলে চিকিৎসার পরিবেশ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে তার ভাঙা হাত নিয়ে তাকে কিশোরগঞ্জ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। রাত ৯টার মধ্যে সেখানের পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকলেও ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসীরা বাধা দেয়ায় যাত্রা ব্যাহত হয়। অতঃপর বাধ্য হয়ে তাকে বাইকে করে অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেয়া হয় এবং সেখানেই এক্সরে করানো হয়। এক্সরে রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে তাঁর হাতে প্লাস্টার করে দেয়া হয়।
আহত হওয়ার পর তিনিসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়েও আওয়ামী লীগের দোসররা তাদের পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হন। বর্তমানে তিনি বাম হাতে কোনো কাজ করতে পারছেন না।

একনজরে আসাদুজ্জামান আকাশ
নাম : আসাদুজ্জামান আকাশ
জন্ম : ২৭ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান : ফুলবাড়িয়া
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
পেশা : শিক্ষক (নূরানী মাদ্রাসা)
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: উজানপাড়া, ডাকঘর: ফুলবাড়িয়া, থানা: ফুলবাড়িয়া, জেলা: ময়মনসিংহ
পিতা : নূর মোহাম্মদ, পেশা: কৃষক, বয়স: ৬৫ বছর
মাতা : শামসুন্নাহার, পেশা: গৃহিণী, বয়স: ৬০ বছর
মাসিক আয় : ৪,৫০০
বাড়ি : টিনশেড বিল্ডিং
ভাই-বোনদের পরিচয় : পাঁচ বোন বিবাহিত
ঘটনার স্থান : ফুলবাড়িয়া ইব্রাহিম সুপার মার্কেটের সামনে
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ৪ আগস্ট, ২০২৪ বিকাল ৪.০০টা
প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসা
২. আর্থিক সহযোগিতা
৩. কর্মসংস্থানের মূলধন প্রয়োজন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍