মো: আশরাফুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
মো: আশরাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জের এক শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া পরিশ্রমী টাইলস মিস্ত্রী। যার স্বপ্ন ছিল শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। অদম্য শ্রম আর দায়িত্ববোধ তাকে খুব অল্প বয়সেই পরিবারটির প্রধান ভরসায় পরিণত করে। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন। তবু তার চোখে এখনও বেঁচে থাকার দৃঢ় ইচ্ছা আর সমাজবদলের নরম স্বপ্ন জ্বলজ্বল করে।
আশরাফুল আজ শুধু একজন আহত শ্রমিক নন তিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের এক নীরব প্রতীক।
আশরাফুল আজ শুধু একজন আহত শ্রমিক নন তিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের এক নীরব প্রতীক।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
তিনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন কোমর থেকে সম্পূর্ণ অবশ
মো: আশরাফুল ইসলাম
পেশা: শ্রমিক (টাইলস মিন্ত্রী)
ক্রমিক: ০১৭
আইডি: ঢাকা সিটি ০১৭
পরিচিতি
মো: আশরাফুল ইসলামের জন্ম ২০০০ সালের ১০ জানুয়ারি, কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম হাতিমারায়। গ্রামের মাটির গন্ধ, কাঁচা রাস্তা, খোলা মাঠ আর ছেলেবেলার সাদামাটা স্বপ্ন নিয়েই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তার পরিবার ছিল সচ্ছলতার নিচে থাকা এক সংগ্রামী পরিবার। বাবা জহিরুল ইসলাম একজন দিনমজুর আর মা তাসলিমা বেগম গৃহিণী। সংসারে ছিল সাতজন সদস্য, যার মধ্যে আশরাফুল ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করে আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হয়নি, কারণ সংসারের অভাব-অনটনের ভার বইতে তাকে অল্প বয়সেই কর্মজীবনে ঢুকতে হয়। সেই বয়সে অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন আশরাফুল মাটি ও ঘামে গড়া জীবনের খোঁজে ছোটেন। পারিপার্শ্বিক দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও জীবনের প্রতিদিনকার যুদ্ধ তাকে গড়ে তোলে আত্মপ্রত্যয়ী এক তরুণ হিসেবে, যার চোখে স্বপ্ন নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।
কর্ম
অল্পবয়সেই ঢাকায় এসে টাইলস মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন আশরাফুল। কাজ শুরু করেন নির্মাণাধীন ভবনে। প্রথম দিকে রাজমিস্ত্রিদের সহকারী হিসেবে কাজ করলেও পরে নিজেই দক্ষ টাইলস মিস্ত্রী হয়ে ওঠেন। দিনে ৮-১০ ঘণ্টা খাটতেন, ছুটি বলতে কিছু ছিল না। প্রতি মাসে আয় হতো মাত্র ১০ হাজার টাকা, যার পুরোটা প্রায় পরিবারের পিছনেই খরচ হয়ে যেত। ভাই-বোনদের লেখাপড়া, বাবা-মায়ের ওষুধ, খাবার খরচ সবই ছিল তার কাঁধে। কখনো লিফটের পাশে, কখনো ছাদের ধারে বসে পানি খেতে খেতে স্বপ্ন দেখতেন একদিন নিজের একটা ঘর হবে, মা-বাবা সেখানে থাকবেন, আর ভাই-বোনদের সবাই শিক্ষিত হয়ে চাকরি করবে। এই স্বপ্নই তাকে ঠেলে নিয়ে যেত কঠোর পরিশ্রমে। অন্যদিকে রাজনৈতিক চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস তার মধ্যে গড়ে ওঠে এখানে, কাজ করতে করতেই।
পারিবারিক বর্ণনা
আশরাফুলের পরিবার একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত ও পরস্পর নির্ভরশীল পরিবার। বাবা জহিরুল ইসলাম পেশায় শ্রমিক, যিনি এখন বয়সের ভারে খুব একটা কাজ করতে পারেন না। মা তাসলিমা আখতার গৃহিণী, যিনি সন্তানদের মানুষ করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। পরিবারে তিন বোন ও এক ভাই রয়েছে। বড় বোন মারিয়া বিবাহিত, থাকেন গ্রামে। ছোট বোন সাদিয়া দশম শ্রেণির ছাত্রী, তরিকুল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র এবং নুসরাত নামে সর্বকনিষ্ঠ বোন পড়ছে প্লে শ্রেণিতে একটি মাদ্রাসায়। সাত সদস্যের এই পরিবারটি একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে, আশরাফুল ছিলেন এই পরিবারের চালিকাশক্তি। পরিবারের সকল সিদ্ধান্তে তার পরামর্শ নেয়া হতো। তার উপার্জনের ওপর নির্ভর করে চলত সংসার। তিনি না থাকলে যেন এই সংসারটাই দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তি হারিয়ে ফেলতো।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে সারা দেশে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক গণআন্দোলনে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, চাকরিতে পক্ষপাত, শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ সব মিলিয়ে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ বিস্ফোরণের রূপ নেয়। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ আরও অনেক অঞ্চল। 'ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ'-এর মতো দলগুলোও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়। আশরাফুল, একজন দিনমজুর হয়েও বুঝতে পারেন এই আন্দোলন তার মতো সাধারণ মানুষের মুক্তির পথ হতে পারে। সামাজিক অবিচার আর রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়ান সাহসের সাথে। কাজ থেকে অবসর পেলেই আন্দোলনে যোগ দিতেন। লিফলেট বিলি, মানববন্ধন, মিছিল সব কিছুতেই তিনি নিজেকে যুক্ত করেন নিঃস্বার্থভাবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তার এই আত্মত্যাগ ছিল এক প্রতীকী প্রতিবাদ।
আন্দোলনে যোগদান
আন্দোলনের শুরু থেকেই আশরাফুল সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট সকালে তিনি কাজে না গিয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে যান কাজলা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায়। সকাল ১০:৩০ মিনিটে পুলিশ ও আওয়ামী সরকারের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায় আন্দোলনকারীদের দিকে। একটি গুলি আশরাফুলের গলার ডান পাশে বিদ্ধ হয় এবং বাম কাঁধের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। এই গুলির আঘাত আশরাফুলের শরীরে চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব ডেকে আনে। তার শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায়। সেদিন থেকে তার জীবন আর আগের মতো থাকেনি। একজন কর্মঠ, উদ্যমী যুবক এক মুহূর্তেই শারীরিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
আহত পরবর্তী জীবন
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আশরাফুলের জীবন পাল্টে যায় পুরোপুরি। তিনি প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর ভর্তি হন আল-করিম হাসপাতালে। সেখানে ২১ দিন থাকার পর তাকে স্থানান্তর করা হয় সিএমএইচে, যেখানে এক মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী ধাপে তাকে পাঠানো হয় সিআরপিতে, যেখানে চার মাস শারীরিক থেরাপি চলে। এরপর আবারও তাকে সিএমএইচে পাঠানো হয় এবং আরও দুই মাস চিকিৎসা চলে। ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ তিনি বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু ফিরেও তিনি আর আগের মতো হতে পারেননি। গলা থেকে নিচ পর্যন্ত পুরো অংশ অবশ হয়ে গেছে। তিনি এখন চলাফেরা করতে পারেন না, নিজের শরীরের কোন কাজ নিজে করতে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া, গোসল, চলাফেরা সব কিছুই এখন তার মা করে দেন। পরিবারটির আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়। একজন কর্মক্ষম যুবক আজ নিঃস্ব, পরনির্ভরশীল, অথচ তার চোখে এখনও লেগে আছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ছায়া।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
আশরাফুলের চিকিৎসা প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। শুরু হয় রক্তপাত বন্ধ করা থেকে, তারপর চলে একের পর এক অপারেশন, থেরাপি, ওষুধ এবং ডাক্তারের পরামর্শ। চিকিৎসার জন্য পরিবারের অর্ধলক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছে, যার সিংহভাগই ঋণ করে সংগ্রহ করতে হয়েছে। সিআরপি-তে তার চার মাসের থেরাপির খরচ বহন করাও ছিল দুঃসাধ্য। প্রতি মাসে ওষুধ, থেরাপি ও ফলোআপে খরচ হয় প্রায় ৮-১০ হাজার টাকা। তিনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। গলা থেকে নিচে সম্পূর্ণ অবশ, ফলে তাকে বিশেষ হুইল চেয়ার ও বিছানায় থাকার জন্য প্রয়োজন বিশেষ প্যাডেড বেড ও পরিসেবা। চিকিৎসকদের মতে, তাকে পরবর্তীতে আবারও অস্ত্রোপচার করতে হতে পারে। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে লাগবে দীর্ঘমেয়াদী ফিজিওথেরাপি ও মানসিক সহায়তা।
প্রস্তাবনা
আশরাফুল ইসলাম এখন পঙ্গু। তিনি আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তার জীবন ও পরিবারের জীবন দুই-ই আজ অনিশ্চয়তার মধ্যে। সরকারের উচিত তার চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি করা, মাসিক ভাতা প্রদান করা এবং উন্নত মানের ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা করা। এছাড়া তাকে একটা হুইলচেয়ার, সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সুবিধা, নিয়মিত ওষুধ ও খাবারের জন্য রেশন সুবিধা দেয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদে যদি তার জন্য বাসায় বসে করার মতো কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যায়, যেমন: হোমভিত্তিক অনলাইন কাজ বা ছোট দোকান চালানোর ব্যবস্থা, তাহলে তার বেঁচে থাকা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হবে। কারণ, আশরাফুলের মতো তরুণদের কণ্ঠেই দেশজোড়া অন্যায়ের। বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি নিহিত। তার পাশে দাঁড়ানো মানে হলো এ জাতির বিবেককে বাঁচিয়ে রাখা।
এক নজরে মো: আশরাফুল ইসলাম
নাম: মো: আশরাফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ: ১০-০১-২০০০
জন্মস্থান: কিশোরগঞ্জ
পেশা: শ্রমিক (টাইলস মিস্ত্রী)
নিজ জেলা: কিশোরগঞ্জ
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: হাতিমারা, ইউনিয়ন: নামাপাড়া,
থানা: করিমগঞ্জ,
জেলা: কিশোরগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা: বাড়ি: ১৩/১২১, ৩য় তলা,
এলাকা: কাজলা,
থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: জহিরুল ইসলাম
মায়ের নাম: তাসলিমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স
শ্রমিক, ৫৫
মায়ের নাম ও পেশা: গৃহিণী, ৫০
মাসিক আয়: ১০,০০০
আয়ের উৎস: শ্রম (দিনমজুর)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:৭ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মারিয়া আক্তার, গৃহিণী, বয়স ২২, সম্পর্ক: বোন
২. সাদিয়া আক্তার, বয়স: ১৫, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: দশম, সম্পর্ক: বোন
৩. তরিকুল ইসলাম, বয়স: ১৩, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ভাই
৪. নুসরাত জাহান, বয়স: ৬, পেশা: ছাত্রী, মারকাজুল নুর মডেল মাদ্রাসা শ্রেণি: প্লে, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান: কাজলা ব্রীজ (স্বপ্ন মার্কেটের কাছে)
আহত হওয়ার সময়: ৫-৮-২০২৪, সকাল ১০:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
মো: আশরাফুল ইসলাম
পেশা: শ্রমিক (টাইলস মিন্ত্রী)
ক্রমিক: ০১৭
আইডি: ঢাকা সিটি ০১৭
পরিচিতি
মো: আশরাফুল ইসলামের জন্ম ২০০০ সালের ১০ জানুয়ারি, কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম হাতিমারায়। গ্রামের মাটির গন্ধ, কাঁচা রাস্তা, খোলা মাঠ আর ছেলেবেলার সাদামাটা স্বপ্ন নিয়েই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তার পরিবার ছিল সচ্ছলতার নিচে থাকা এক সংগ্রামী পরিবার। বাবা জহিরুল ইসলাম একজন দিনমজুর আর মা তাসলিমা বেগম গৃহিণী। সংসারে ছিল সাতজন সদস্য, যার মধ্যে আশরাফুল ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করে আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হয়নি, কারণ সংসারের অভাব-অনটনের ভার বইতে তাকে অল্প বয়সেই কর্মজীবনে ঢুকতে হয়। সেই বয়সে অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন আশরাফুল মাটি ও ঘামে গড়া জীবনের খোঁজে ছোটেন। পারিপার্শ্বিক দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও জীবনের প্রতিদিনকার যুদ্ধ তাকে গড়ে তোলে আত্মপ্রত্যয়ী এক তরুণ হিসেবে, যার চোখে স্বপ্ন নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।
কর্ম
অল্পবয়সেই ঢাকায় এসে টাইলস মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন আশরাফুল। কাজ শুরু করেন নির্মাণাধীন ভবনে। প্রথম দিকে রাজমিস্ত্রিদের সহকারী হিসেবে কাজ করলেও পরে নিজেই দক্ষ টাইলস মিস্ত্রী হয়ে ওঠেন। দিনে ৮-১০ ঘণ্টা খাটতেন, ছুটি বলতে কিছু ছিল না। প্রতি মাসে আয় হতো মাত্র ১০ হাজার টাকা, যার পুরোটা প্রায় পরিবারের পিছনেই খরচ হয়ে যেত। ভাই-বোনদের লেখাপড়া, বাবা-মায়ের ওষুধ, খাবার খরচ সবই ছিল তার কাঁধে। কখনো লিফটের পাশে, কখনো ছাদের ধারে বসে পানি খেতে খেতে স্বপ্ন দেখতেন একদিন নিজের একটা ঘর হবে, মা-বাবা সেখানে থাকবেন, আর ভাই-বোনদের সবাই শিক্ষিত হয়ে চাকরি করবে। এই স্বপ্নই তাকে ঠেলে নিয়ে যেত কঠোর পরিশ্রমে। অন্যদিকে রাজনৈতিক চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস তার মধ্যে গড়ে ওঠে এখানে, কাজ করতে করতেই।
পারিবারিক বর্ণনা
আশরাফুলের পরিবার একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত ও পরস্পর নির্ভরশীল পরিবার। বাবা জহিরুল ইসলাম পেশায় শ্রমিক, যিনি এখন বয়সের ভারে খুব একটা কাজ করতে পারেন না। মা তাসলিমা আখতার গৃহিণী, যিনি সন্তানদের মানুষ করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। পরিবারে তিন বোন ও এক ভাই রয়েছে। বড় বোন মারিয়া বিবাহিত, থাকেন গ্রামে। ছোট বোন সাদিয়া দশম শ্রেণির ছাত্রী, তরিকুল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র এবং নুসরাত নামে সর্বকনিষ্ঠ বোন পড়ছে প্লে শ্রেণিতে একটি মাদ্রাসায়। সাত সদস্যের এই পরিবারটি একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে, আশরাফুল ছিলেন এই পরিবারের চালিকাশক্তি। পরিবারের সকল সিদ্ধান্তে তার পরামর্শ নেয়া হতো। তার উপার্জনের ওপর নির্ভর করে চলত সংসার। তিনি না থাকলে যেন এই সংসারটাই দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তি হারিয়ে ফেলতো।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে সারা দেশে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক গণআন্দোলনে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, চাকরিতে পক্ষপাত, শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ সব মিলিয়ে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ বিস্ফোরণের রূপ নেয়। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ আরও অনেক অঞ্চল। 'ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ'-এর মতো দলগুলোও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়। আশরাফুল, একজন দিনমজুর হয়েও বুঝতে পারেন এই আন্দোলন তার মতো সাধারণ মানুষের মুক্তির পথ হতে পারে। সামাজিক অবিচার আর রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়ান সাহসের সাথে। কাজ থেকে অবসর পেলেই আন্দোলনে যোগ দিতেন। লিফলেট বিলি, মানববন্ধন, মিছিল সব কিছুতেই তিনি নিজেকে যুক্ত করেন নিঃস্বার্থভাবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তার এই আত্মত্যাগ ছিল এক প্রতীকী প্রতিবাদ।
আন্দোলনে যোগদান
আন্দোলনের শুরু থেকেই আশরাফুল সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট সকালে তিনি কাজে না গিয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে যান কাজলা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায়। সকাল ১০:৩০ মিনিটে পুলিশ ও আওয়ামী সরকারের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায় আন্দোলনকারীদের দিকে। একটি গুলি আশরাফুলের গলার ডান পাশে বিদ্ধ হয় এবং বাম কাঁধের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। এই গুলির আঘাত আশরাফুলের শরীরে চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব ডেকে আনে। তার শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায়। সেদিন থেকে তার জীবন আর আগের মতো থাকেনি। একজন কর্মঠ, উদ্যমী যুবক এক মুহূর্তেই শারীরিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
আহত পরবর্তী জীবন
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আশরাফুলের জীবন পাল্টে যায় পুরোপুরি। তিনি প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর ভর্তি হন আল-করিম হাসপাতালে। সেখানে ২১ দিন থাকার পর তাকে স্থানান্তর করা হয় সিএমএইচে, যেখানে এক মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী ধাপে তাকে পাঠানো হয় সিআরপিতে, যেখানে চার মাস শারীরিক থেরাপি চলে। এরপর আবারও তাকে সিএমএইচে পাঠানো হয় এবং আরও দুই মাস চিকিৎসা চলে। ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ তিনি বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু ফিরেও তিনি আর আগের মতো হতে পারেননি। গলা থেকে নিচ পর্যন্ত পুরো অংশ অবশ হয়ে গেছে। তিনি এখন চলাফেরা করতে পারেন না, নিজের শরীরের কোন কাজ নিজে করতে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া, গোসল, চলাফেরা সব কিছুই এখন তার মা করে দেন। পরিবারটির আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়। একজন কর্মক্ষম যুবক আজ নিঃস্ব, পরনির্ভরশীল, অথচ তার চোখে এখনও লেগে আছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ছায়া।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
আশরাফুলের চিকিৎসা প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। শুরু হয় রক্তপাত বন্ধ করা থেকে, তারপর চলে একের পর এক অপারেশন, থেরাপি, ওষুধ এবং ডাক্তারের পরামর্শ। চিকিৎসার জন্য পরিবারের অর্ধলক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছে, যার সিংহভাগই ঋণ করে সংগ্রহ করতে হয়েছে। সিআরপি-তে তার চার মাসের থেরাপির খরচ বহন করাও ছিল দুঃসাধ্য। প্রতি মাসে ওষুধ, থেরাপি ও ফলোআপে খরচ হয় প্রায় ৮-১০ হাজার টাকা। তিনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। গলা থেকে নিচে সম্পূর্ণ অবশ, ফলে তাকে বিশেষ হুইল চেয়ার ও বিছানায় থাকার জন্য প্রয়োজন বিশেষ প্যাডেড বেড ও পরিসেবা। চিকিৎসকদের মতে, তাকে পরবর্তীতে আবারও অস্ত্রোপচার করতে হতে পারে। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে লাগবে দীর্ঘমেয়াদী ফিজিওথেরাপি ও মানসিক সহায়তা।
প্রস্তাবনা
আশরাফুল ইসলাম এখন পঙ্গু। তিনি আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তার জীবন ও পরিবারের জীবন দুই-ই আজ অনিশ্চয়তার মধ্যে। সরকারের উচিত তার চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি করা, মাসিক ভাতা প্রদান করা এবং উন্নত মানের ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা করা। এছাড়া তাকে একটা হুইলচেয়ার, সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সুবিধা, নিয়মিত ওষুধ ও খাবারের জন্য রেশন সুবিধা দেয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদে যদি তার জন্য বাসায় বসে করার মতো কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যায়, যেমন: হোমভিত্তিক অনলাইন কাজ বা ছোট দোকান চালানোর ব্যবস্থা, তাহলে তার বেঁচে থাকা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হবে। কারণ, আশরাফুলের মতো তরুণদের কণ্ঠেই দেশজোড়া অন্যায়ের। বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি নিহিত। তার পাশে দাঁড়ানো মানে হলো এ জাতির বিবেককে বাঁচিয়ে রাখা।
এক নজরে মো: আশরাফুল ইসলাম
নাম: মো: আশরাফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ: ১০-০১-২০০০
জন্মস্থান: কিশোরগঞ্জ
পেশা: শ্রমিক (টাইলস মিস্ত্রী)
নিজ জেলা: কিশোরগঞ্জ
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: হাতিমারা, ইউনিয়ন: নামাপাড়া,
থানা: করিমগঞ্জ,
জেলা: কিশোরগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা: বাড়ি: ১৩/১২১, ৩য় তলা,
এলাকা: কাজলা,
থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: জহিরুল ইসলাম
মায়ের নাম: তাসলিমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স
শ্রমিক, ৫৫
মায়ের নাম ও পেশা: গৃহিণী, ৫০
মাসিক আয়: ১০,০০০
আয়ের উৎস: শ্রম (দিনমজুর)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা:৭ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মারিয়া আক্তার, গৃহিণী, বয়স ২২, সম্পর্ক: বোন
২. সাদিয়া আক্তার, বয়স: ১৫, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: দশম, সম্পর্ক: বোন
৩. তরিকুল ইসলাম, বয়স: ১৩, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ভাই
৪. নুসরাত জাহান, বয়স: ৬, পেশা: ছাত্রী, মারকাজুল নুর মডেল মাদ্রাসা শ্রেণি: প্লে, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান: কাজলা ব্রীজ (স্বপ্ন মার্কেটের কাছে)
আহত হওয়ার সময়: ৫-৮-২০২৪, সকাল ১০:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍