মো: নূরে আলম সালেক
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
রংমিস্ত্রি, গ্রাম: দাইর গাও, অস্থি, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মো. নুরে আলম সালেক জন্ম গ্রহণ করেছেন ০২ জানুয়ারী ১৯৮১ সালে। তিনি ময়মনসিংহের গফরগাঁও এর সন্তান। তাঁর বাবা মো. জালাল উদ্দিন। মা মোছা. শেফালী আক্তার গৃহিণী। তিনি একজন রং মিস্ত্রি।
ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশের ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন জাগরণ, এক গণবিস্ফোরণ। গণতন্ত্রহীনতা, দলীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্র-জনতা রাস্তায় নামে জীবনপণ প্রতিবাদ নিয়ে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম সাহসী মুখ ছিলেন নূরে আলম সালেক। ৫ আগস্ট ২০২৪ দিনটি ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিন। সারাদিনব্যাপী উত্তরা আজমপুরে বিএনএস সেন্টারের পাশে ছাত্র ও সাধারণ জনগণের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল। এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হঠাৎ করেই পুলিশের নির্মম দমননীতির শিকার হয়। অতর্কিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলা চালায়। পরিস্থিতি অচিরেই রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। নূরে আলম সালেক ছিলেন সেদিনের আন্দোলনের সামনের কাতারে। তিনি চিৎকার করে অন্যদের আগলে রাখছিলেন, সাহস জোগাচ্ছিলেন প্রতিবাদীদের। হঠাৎ করেই পুলিশের গুলির শব্দ বাতাস ছেঁড়ে যায়। একটি গুলি সোজা এসে বিদ্ধ হয় সালেকের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, আর সড়ক ভরে যায় রক্তে। তাকে সাথে সাথে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত, রাস্তায় ছিল পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের টহল। তবুও সাহসিকতা ও সহযোদ্ধাদের সহায়তায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো হয়। চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি তাঁর হাতের হাড় ভেঙে দেয় এবং মারাত্মক স্নায়বিক ক্ষতি করে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তাঁর হাত পুরোপুরি অকেজো হয়ে যেতে পারতো। নূরে আলম সালেকের গল্প কেবল একটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি এক তরুণের সাহস, এক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। আজ তিনি শুধু একজন আহত আন্দোলনকারী নন, বরং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর রক্তাক্ত হাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার চাওয়াও কখনো কখনো রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য হয়। নূরে আলম সালেক আজও আছেন যন্ত্রণায়, কিন্তু দৃঢ়তায়। তাঁর গুলির ক্ষত আজও শুকায়নি, ঠিক যেমন শুকায়নি এ দেশের গণতন্ত্রপিপাসু মানুষের বেদনা।
যেভাবে আন্দোলন শুরু
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট যেন এদেশের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর জাগরণের মাস। ঢাকা-চট্টগ্রামের রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অলিগলিও গর্জে উঠেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন দুর্নীতি, একদলীয় দখলদারিত্ব আর নিপীড়নের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় তখনই সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে অসাধারণ। সেই সাধারণের মধ্যেই ছিলেন একজন সংগ্রামী তরুণ, একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন রং মিস্ত্রি মো. নূরে আলম সালেক। দিনভর রঙের তুলি হাতে মানুষের ঘর রাঙিয়ে দেওয়া সালেক সেদিন রঙের বাক্স নামিয়ে তুলে নিয়েছিলেন প্রতিবাদের ব্যানার। কারণ তিনি জানতেন, গৃহস্থের দেয়াল যত সুন্দর হোক না কেন, যদি রাষ্ট্র দুর্নীতির আঁধারে ঢাকা পড়ে যায়, তবে কোনও রঙই দীর্ঘস্থায়ী নয়। ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট, উত্তরা আজমপুরের বিএনএস সেন্টারের পাশে জমায়েত হয়েছিলেন শত শত মানুষ, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সালেকও। বুকে দেশ, হাতে সাহস। বিক্ষোভ চলছিল শান্তিপূর্ণভাবে। হঠাৎ করেই পুলিশ বাহিনী চড়াও হয় আন্দোলনকারীদের ওপর। শুরু হয় লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, গুলি। কেউ দৌড়ায়, কেউ পড়ে যায়, কিন্তু সালেক পিছু হটেননি। তিনি ছিলেন সামনে, নির্ভীক। ঠিক তখনই পুলিশের ছোড়া একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার হাতে। মুহূর্তেই ছিটকে পড়েন তিনি, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সহযোদ্ধারা ছুটে আসেন, তাকে উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি শুধু তাঁর হাত ভেঙে দেয়নি, বরং চিরস্থায়ী শারীরিক কষ্ট রেখে গেছে। একজন রং মিস্ত্রীর কাছে হাত মানে রুটি-রুজির অস্ত্র। সেই হাতেই আজ লেখা আছে এক সাহসী ইতিহাস রাষ্ট্রের গুলির মুখে দাঁড়িয়ে বলা ‘না’, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অক্ষয় প্রতীক। নূরে আলম সালেক আজ কেবল একজন আহত র্রমিস্ত্রী নন। তিনি এই দেশের শ্রমজীবী মানুষের প্রতিবাদী চেহারা, তিনি প্রমাণ দিয়েছেন নির্বাচনী ব্যালটের মালিক কেবল উচ্চশিক্ষিত শহুরে শ্রেণি নয়, বরং রোদে পোড়া, রঙে মাখামাখি, সরল অথচ সাহসী সেই মানুষগুলোও, যারা রুটির জন্য নয়, ন্যায়ের জন্যও জীবন বাজি রাখতে জানে। তার হাতের ক্ষত থেকে ঝরেছে শুধু রক্ত নয়, ঝরেছে প্রতিরোধের রঙ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, এবং একটি সাহসী ভবিষ্যতের রূপরেখা।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর মো. নূরে আলম সালেকের জীবন শুরু করে আরেক যুদ্ধ এইবার হাসপাতালের বিছানায়, অস্ত্রোপচারের ছুরির নিচে, অসহ্য যন্ত্রণার বিরুদ্ধে এক লড়াই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে দ্রুত আশেপাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে, রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রথম হাসপাতালে তাকে ভর্তি না করে ফিরিয়ে দেওয়া হয় যেন একজন আহত নাগরিক নয়, বরং তিনি এক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ান চিকিৎসাব্যবস্থার চোখে। পরবর্তীতে সহযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে ভর্তি করা হয় উত্তরার লেক ভিউ হাসপাতালে। সেখানেই শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। তার শরীরের এক্স-রে করা হয়, যার রিপোর্টে ধরা পড়ে গুলিটি হাড় ভেঙে দিয়েছে এবং আশপাশের টিস্যুগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সালেককে হাসপাতালে ভর্তি রেখে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। অপারেশনের জন্য পরদিন সকাল পাঁচটা থেকেই চিকিৎসক দল প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু হাসপাতালে আহতদের ভিড়, স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অস্বাভাবিক চাপে অপারেশনটি বিলম্বিত হয়। অবশেষে দুপুর ১২টার দিকে তার প্রথম অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। গুলির ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে হাড়ের অবস্থান স্থির করতে হয়। কিন্তু একটি অস্ত্রোপচার যথেষ্ট ছিল না। চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন, আরও একটি জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন রয়েছে। পরবর্তী অপারেশনটি দ্রুতই সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি সেলাই, প্রতিটি ওষুধ ছিল তার জীবনের সঙ্গে জড়িত আরেকটি নতুন যুদ্ধের অংশ। তবে এখানেই শেষ নয়। পরদিন, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সালেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কারণ তার শরীরে গুলির যে অংশটি ছিল রাবার বুলেট, তা বুকে বিদ্ধ হওয়ায় ভেতরে সৃষ্টি হয় মারাত্মক ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা। ফুসফুসের পাশে থাকা সেই জায়গাটি আক্রান্ত হয়ে পড়ে, যার প্রভাব থেকে তিনি এখনো মুক্ত হননি। বর্তমানে, অপারেশনের মাসগুলো পেরিয়ে এলেও সালেক এখনো একজন অসুস্থ মানুষ। তার শরীরে গুলির ক্ষতচিহ্ন যেমন রয়ে গেছে, তেমনি রয়ে গেছে শারীরিক সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে ফুসফুসে মাঝেমধ্যে ব্যথা অনুভব করেন, এ বং দুই কেজির বেশি ওজন তুলতে গেলেই অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগেন। আগে যে হাতে রঙের তুলি ধরতেন, আজ সে হাত ভরে আছে ব্যান্ডেজ, ওষুধ ও সতর্কতার নিদর্শনে। এই পুরো চিকিৎসাজীবন শুধু একটি ব্যক্তির নয় এটি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার নগ্ন মুখোশ উন্মোচনের দলিল। যখন একজন নাগরিক গুলিবিদ্ধ হয়, তার চিকিৎসাও হয় ভয়ের ছায়ায়, রাজনৈতিক প্রতিপত্তির চোখ রাঙানিতে। আর সেই চিকিৎসার প্রতিটি দিন আজ সাক্ষী কীভাবে রাষ্ট্র তার প্রতিবাদী সন্তানদের শরীরে শুধু গুলি নয়, রেখে যায় অপমান, কষ্ট আর অবহেলার দগদগে চিহ্ন। নূরে আলম সালেক বেঁচে আছেন, শ্বাস নিচ্ছেন, কথা বলছেন, হাসছেনও মাঝে মাঝে। কিন্তু তার শরীর জানে, কী বয়ে বেড়াতে হয় একজন প্রতিবাদীর চিহ্ন। সে চিহ্ন আর একা তাঁর নয় তা হয়ে উঠেছে গোটা জাতির যন্ত্রণা ও জেগে ওঠার সাক্ষ্য।
প্রস্তাবনা
১. পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
২. স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা।
৩. ব্যবসার জন্য অনুদান দেয়া।
ব্যক্তিগত বিবরণ পুলিশের গুলিতে হাত গুলিবিদ্ধ
নাম : মো. নূরে আলম সালেক
জন্ম তারিখ : ২-০১-১৯৮১
জন্মস্থান : গফরগাঁও
পেশা : রংমিস্ত্রি
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দাইর গাও, ইউনিয়ন: অস্থি, থানা: গফরগাঁও, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : মো. জালাল উদ্দিন
মায়ের নাম : মোছা. শেফালী আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী ও ৬০
পারিবারিক অবস্থা
মাসিক আয় : ৫,০০০/=
আয়ের উৎস : রংমিস্ত্রি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের তথ্যাদি
১. নিরব আহমেদ, বয়স: ২২, পেশা: শিক্ষার্থী, দক্ষিন কোরিয়ার ভাষা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, সম্পর্ক: ছেলে
২. ফাতেমা আক্তার, বয়স: ৭ বছর, পেশা: ছাত্রী, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. আব্দুল্লাহ, বয়স: ৩, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশের ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন জাগরণ, এক গণবিস্ফোরণ। গণতন্ত্রহীনতা, দলীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্র-জনতা রাস্তায় নামে জীবনপণ প্রতিবাদ নিয়ে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম সাহসী মুখ ছিলেন নূরে আলম সালেক। ৫ আগস্ট ২০২৪ দিনটি ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিন। সারাদিনব্যাপী উত্তরা আজমপুরে বিএনএস সেন্টারের পাশে ছাত্র ও সাধারণ জনগণের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল। এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হঠাৎ করেই পুলিশের নির্মম দমননীতির শিকার হয়। অতর্কিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলা চালায়। পরিস্থিতি অচিরেই রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। নূরে আলম সালেক ছিলেন সেদিনের আন্দোলনের সামনের কাতারে। তিনি চিৎকার করে অন্যদের আগলে রাখছিলেন, সাহস জোগাচ্ছিলেন প্রতিবাদীদের। হঠাৎ করেই পুলিশের গুলির শব্দ বাতাস ছেঁড়ে যায়। একটি গুলি সোজা এসে বিদ্ধ হয় সালেকের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, আর সড়ক ভরে যায় রক্তে। তাকে সাথে সাথে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত, রাস্তায় ছিল পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের টহল। তবুও সাহসিকতা ও সহযোদ্ধাদের সহায়তায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো হয়। চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি তাঁর হাতের হাড় ভেঙে দেয় এবং মারাত্মক স্নায়বিক ক্ষতি করে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তাঁর হাত পুরোপুরি অকেজো হয়ে যেতে পারতো। নূরে আলম সালেকের গল্প কেবল একটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি এক তরুণের সাহস, এক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। আজ তিনি শুধু একজন আহত আন্দোলনকারী নন, বরং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর রক্তাক্ত হাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার চাওয়াও কখনো কখনো রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য হয়। নূরে আলম সালেক আজও আছেন যন্ত্রণায়, কিন্তু দৃঢ়তায়। তাঁর গুলির ক্ষত আজও শুকায়নি, ঠিক যেমন শুকায়নি এ দেশের গণতন্ত্রপিপাসু মানুষের বেদনা।
যেভাবে আন্দোলন শুরু
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট যেন এদেশের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর জাগরণের মাস। ঢাকা-চট্টগ্রামের রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অলিগলিও গর্জে উঠেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন দুর্নীতি, একদলীয় দখলদারিত্ব আর নিপীড়নের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় তখনই সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে অসাধারণ। সেই সাধারণের মধ্যেই ছিলেন একজন সংগ্রামী তরুণ, একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন রং মিস্ত্রি মো. নূরে আলম সালেক। দিনভর রঙের তুলি হাতে মানুষের ঘর রাঙিয়ে দেওয়া সালেক সেদিন রঙের বাক্স নামিয়ে তুলে নিয়েছিলেন প্রতিবাদের ব্যানার। কারণ তিনি জানতেন, গৃহস্থের দেয়াল যত সুন্দর হোক না কেন, যদি রাষ্ট্র দুর্নীতির আঁধারে ঢাকা পড়ে যায়, তবে কোনও রঙই দীর্ঘস্থায়ী নয়। ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট, উত্তরা আজমপুরের বিএনএস সেন্টারের পাশে জমায়েত হয়েছিলেন শত শত মানুষ, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সালেকও। বুকে দেশ, হাতে সাহস। বিক্ষোভ চলছিল শান্তিপূর্ণভাবে। হঠাৎ করেই পুলিশ বাহিনী চড়াও হয় আন্দোলনকারীদের ওপর। শুরু হয় লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, গুলি। কেউ দৌড়ায়, কেউ পড়ে যায়, কিন্তু সালেক পিছু হটেননি। তিনি ছিলেন সামনে, নির্ভীক। ঠিক তখনই পুলিশের ছোড়া একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার হাতে। মুহূর্তেই ছিটকে পড়েন তিনি, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সহযোদ্ধারা ছুটে আসেন, তাকে উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, গুলিটি শুধু তাঁর হাত ভেঙে দেয়নি, বরং চিরস্থায়ী শারীরিক কষ্ট রেখে গেছে। একজন রং মিস্ত্রীর কাছে হাত মানে রুটি-রুজির অস্ত্র। সেই হাতেই আজ লেখা আছে এক সাহসী ইতিহাস রাষ্ট্রের গুলির মুখে দাঁড়িয়ে বলা ‘না’, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অক্ষয় প্রতীক। নূরে আলম সালেক আজ কেবল একজন আহত র্রমিস্ত্রী নন। তিনি এই দেশের শ্রমজীবী মানুষের প্রতিবাদী চেহারা, তিনি প্রমাণ দিয়েছেন নির্বাচনী ব্যালটের মালিক কেবল উচ্চশিক্ষিত শহুরে শ্রেণি নয়, বরং রোদে পোড়া, রঙে মাখামাখি, সরল অথচ সাহসী সেই মানুষগুলোও, যারা রুটির জন্য নয়, ন্যায়ের জন্যও জীবন বাজি রাখতে জানে। তার হাতের ক্ষত থেকে ঝরেছে শুধু রক্ত নয়, ঝরেছে প্রতিরোধের রঙ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, এবং একটি সাহসী ভবিষ্যতের রূপরেখা।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর মো. নূরে আলম সালেকের জীবন শুরু করে আরেক যুদ্ধ এইবার হাসপাতালের বিছানায়, অস্ত্রোপচারের ছুরির নিচে, অসহ্য যন্ত্রণার বিরুদ্ধে এক লড়াই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে দ্রুত আশেপাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে, রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রথম হাসপাতালে তাকে ভর্তি না করে ফিরিয়ে দেওয়া হয় যেন একজন আহত নাগরিক নয়, বরং তিনি এক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ান চিকিৎসাব্যবস্থার চোখে। পরবর্তীতে সহযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে ভর্তি করা হয় উত্তরার লেক ভিউ হাসপাতালে। সেখানেই শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। তার শরীরের এক্স-রে করা হয়, যার রিপোর্টে ধরা পড়ে গুলিটি হাড় ভেঙে দিয়েছে এবং আশপাশের টিস্যুগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সালেককে হাসপাতালে ভর্তি রেখে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। অপারেশনের জন্য পরদিন সকাল পাঁচটা থেকেই চিকিৎসক দল প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু হাসপাতালে আহতদের ভিড়, স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অস্বাভাবিক চাপে অপারেশনটি বিলম্বিত হয়। অবশেষে দুপুর ১২টার দিকে তার প্রথম অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। গুলির ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে হাড়ের অবস্থান স্থির করতে হয়। কিন্তু একটি অস্ত্রোপচার যথেষ্ট ছিল না। চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন, আরও একটি জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন রয়েছে। পরবর্তী অপারেশনটি দ্রুতই সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি সেলাই, প্রতিটি ওষুধ ছিল তার জীবনের সঙ্গে জড়িত আরেকটি নতুন যুদ্ধের অংশ। তবে এখানেই শেষ নয়। পরদিন, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সালেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কারণ তার শরীরে গুলির যে অংশটি ছিল রাবার বুলেট, তা বুকে বিদ্ধ হওয়ায় ভেতরে সৃষ্টি হয় মারাত্মক ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা। ফুসফুসের পাশে থাকা সেই জায়গাটি আক্রান্ত হয়ে পড়ে, যার প্রভাব থেকে তিনি এখনো মুক্ত হননি। বর্তমানে, অপারেশনের মাসগুলো পেরিয়ে এলেও সালেক এখনো একজন অসুস্থ মানুষ। তার শরীরে গুলির ক্ষতচিহ্ন যেমন রয়ে গেছে, তেমনি রয়ে গেছে শারীরিক সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে ফুসফুসে মাঝেমধ্যে ব্যথা অনুভব করেন, এ বং দুই কেজির বেশি ওজন তুলতে গেলেই অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগেন। আগে যে হাতে রঙের তুলি ধরতেন, আজ সে হাত ভরে আছে ব্যান্ডেজ, ওষুধ ও সতর্কতার নিদর্শনে। এই পুরো চিকিৎসাজীবন শুধু একটি ব্যক্তির নয় এটি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার নগ্ন মুখোশ উন্মোচনের দলিল। যখন একজন নাগরিক গুলিবিদ্ধ হয়, তার চিকিৎসাও হয় ভয়ের ছায়ায়, রাজনৈতিক প্রতিপত্তির চোখ রাঙানিতে। আর সেই চিকিৎসার প্রতিটি দিন আজ সাক্ষী কীভাবে রাষ্ট্র তার প্রতিবাদী সন্তানদের শরীরে শুধু গুলি নয়, রেখে যায় অপমান, কষ্ট আর অবহেলার দগদগে চিহ্ন। নূরে আলম সালেক বেঁচে আছেন, শ্বাস নিচ্ছেন, কথা বলছেন, হাসছেনও মাঝে মাঝে। কিন্তু তার শরীর জানে, কী বয়ে বেড়াতে হয় একজন প্রতিবাদীর চিহ্ন। সে চিহ্ন আর একা তাঁর নয় তা হয়ে উঠেছে গোটা জাতির যন্ত্রণা ও জেগে ওঠার সাক্ষ্য।
প্রস্তাবনা
১. পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
২. স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা।
৩. ব্যবসার জন্য অনুদান দেয়া।
ব্যক্তিগত বিবরণ পুলিশের গুলিতে হাত গুলিবিদ্ধ
নাম : মো. নূরে আলম সালেক
জন্ম তারিখ : ২-০১-১৯৮১
জন্মস্থান : গফরগাঁও
পেশা : রংমিস্ত্রি
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দাইর গাও, ইউনিয়ন: অস্থি, থানা: গফরগাঁও, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবারের তথ্য:
পিতার নাম : মো. জালাল উদ্দিন
মায়ের নাম : মোছা. শেফালী আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী ও ৬০
পারিবারিক অবস্থা
মাসিক আয় : ৫,০০০/=
আয়ের উৎস : রংমিস্ত্রি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের তথ্যাদি
১. নিরব আহমেদ, বয়স: ২২, পেশা: শিক্ষার্থী, দক্ষিন কোরিয়ার ভাষা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, সম্পর্ক: ছেলে
২. ফাতেমা আক্তার, বয়স: ৭ বছর, পেশা: ছাত্রী, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. আব্দুল্লাহ, বয়স: ৩, সম্পর্ক: ছেলে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍