হোম / আহতদের তালিকা / মো. রাসেল মিয়া
মো. রাসেল মিয়া

মো. রাসেল মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা (চায়ের দোকান ও আনারস)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামে
গড়া নতুন বাংলাদেশপারিবারিক জীবন
রাসেল মিয়া পরিবারকেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। চার ভাই, তিন বোন। ভাইদের মধ্যে তৃতীয় তিনি এবং তিনি একজন স্নেহময় পিতা। তাঁর একমাত্র পুত্র মো. হোসাইন মিয়া এখনও কোলের শিশু বয়স মাত্র এক বছর। স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে তাঁর সংসার যেন একটি ক্ষুদ্র জগৎ, যেখানে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগ একসূত্রে গাঁথা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া পিতার পাশে ছায়ার মতো আছেন রাসেল; আর মায়ের স্নেহের ঋণ শোধ করছেন নীরব সেবায়। তাঁর পারিবারিক জীবন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংগ্রামী হওয়া মানেই শুধু রাজপথে দাঁড়ানো নয়, প্রিয়জনদের জন্য দায়িত্বশীল থাকা এক ধরনের নীরব বিপ্লব।
কর্মজীবন
চা বিক্রেতা হিসেবে রাসেলের পেশা যতটা সাধারণ, তাঁর আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস ততটাই অসাধারণ। প্রতিদিনের রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা বিক্রি করলেও তাঁর দৃষ্টিতে ছিল দেশ ও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন। শ্রমজীবী এই মানুষটি জানতেন, সম্মানজনক জীবন গড়তে প্রয়োজন হয় সততা, পরিশ্রম এবং মানবিকতা। রাসেলের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়। শ্রমকে লজ্জা নয় বরং গৌরবের সঙ্গে ধারণ করতে জানতে হয়।
সংগ্রামী জীবন ও আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনতার এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। সেই আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন মো. রাসেল মিয়া; একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যিনি তখন পরিণত হয়েছিলেন অসাধারণ এক বীর যোদ্ধায়। ফ্যাসিবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ন্যায্য অধিকারের দাবিতে রাজপথে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল সত্য ও সাহসের এক দুর্লভ উদাহরণ। তিনি শুধু প্রতিবাদ করেননি, বরং নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের আশায়। তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, বিপ্লবীর পোশাকে নয়, মনে থাকে আগুন; যাঁর হৃদয়ে সত্যের দীপ্তি, তিনি যে কোনো সময় হয়ে উঠতে পারেন ইতিহাসের নির্মাতা।
আলোকবর্তিকা হিসেবে তাঁর জীবন
মো. রাসেল মিয়ার জীবন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিপ্লব কোনো উচ্চাসনে বসে নয়; গড়ে ওঠে মাটির মানুষদের বুকের সাহসে, নির্লোভ ত্যাগ, আর সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠায়। ফুটপাতের একজন চা বিক্রেতা হয়েও তিনি হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের এক শ্রেষ্ঠ চরিত্র, যার সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মো. রাসেল মিয়ার জীবন কেবল একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি একটি যুগের প্রতিচ্ছবি, একটি জাতির আত্মদর্শনের আয়না। তাঁর জন্ম, পরিবার, পেশা ও রাজপথের সংগ্রাম একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য চরিত্র—যিনি আমাদের শেখান, সাহসিকতা ও সততা থাকলে সাধারণ জীবনও হয়ে উঠতে পারে মহাকাব্যের মতো। এই জীবনগাথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেবল অনুপ্রাণিতই করবে না বরং একুশ শতকের বাংলাদেশে নাগরিক দায়িত্ব ও বিপ্লবী চেতনার এক অনবদ্য মানদণ্ড হিসেবেও বিবেচিত হবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ


২০২৪ সালের ২০ জুলাই। সকালটা ছিল আশাবাদের, অধিকার আদায়ের স্বপ্নে জাগ্রত এক উজ্জ্বল সূর্যোদয়ের মতো। নরসিংদির রাজপথে শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্র-জনতা জড়ো হয়েছিলেন; গণতন্ত্র, ন্যায্যতা আর নাগরিক অধিকারের দাবিতে। আমি মো. রাসেল মিয়া সেদিন হাজারো সংগ্রামী হৃদয়ের একজন অংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছিলাম শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলনের মিছিলে। কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না, ছিল না সহিংসতা বা উসকানি, কেবল সাহসের সাথে উচ্চারিত অধিকার ও মর্যাদার আর্তনাদ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় কিছু দিন থাকে। যেগুলো রক্তের অক্ষরে লেখা হয়। বিকাল গড়িয়ে যখন সাধারণ মানুষ নিজের জীবনে ফিরছিলেন; দোকানপাট খুলে গিয়েছিল, পথচারীরা চলাফেরা করছিলেন নির্ভয়ে; ঠিক সে সময় আচমকা নেমে আসে এক ভয়ঙ্কর নৃশংসতা। পাঁচটি কালো দানবাকৃতির গাড়ি দ্রুতগতিতে প্রবেশ করে শহরে। গাড়িগুলোর ভেতর ছিল আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী; দেশি-বিদেশি অস্ত্রে সজ্জিত, অন্ধ উন্মাদনার ভরসায় উৎসাহিত।
কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই যেন পূর্ব পরিকল্পিত যুদ্ধ ঘোষণা করে, তারা হঠাৎ করেই পথচারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। রাস্তায় চলা নিরীহ মানুষ, দোকানে বসে থাকা ব্যবসায়ী, এমনকি স্কুল থেকে ফেরা শিশুরাও এই নরপিশাচদের নিশানায় পরিণত হয়। আমি নিজেও সেই মুহূর্তে কোনো শ্লোগান বা প্রতিবাদে ছিলাম না; ছিলাম একটি চায়ের দোকানের পাশে, সহযোদ্ধাদের বিদায় জানিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ আগুনের ঝাঁঝালো শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই আমার শরীরে বিদ্ধ হয় প্রায় ৭০টি রাবার বুলেট। ব্যথা, রক্তপাত ও ঘৃণার বিস্ফোরণে আমি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসে। পাঁজরে, পায়ে, পিঠে, হাতে—একেকটি বুলেট যেন জানান দিচ্ছিল, ফ্যাসিবাদ কতটা হিংস্র ও কাপুরুষ হতে পারে। আমার সহযোদ্ধারা ছুটে আসেন, কাঁধে তুলে নেন আমাকে। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে তাঁরা আমাকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আমার প্রাণ রক্ষা হয়, কিন্তু শরীরে এখনও সেই আঘাতের দাগ বয়ে বেড়াচ্ছি— যা শুধু দেহে নয়, আত্মায়ও ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনাটি শুধু আমার নয়— জুলাই আন্দোলনের অসংখ্য নাম না-জানা মানুষের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এই এক বিকেলের মধ্য দিয়েই পুরো জুলাই মাস রূপ নেয় আওয়ামী ফ্যাসিবাদের রক্তমাখা চিত্রপটে, যেখানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যা, আহত করা, গুম ও নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক এক নিষ্ঠুর খেলা।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অসহ্য ব্যথা আর শ্বাসরুদ্ধকর সেই মুহূর্তে আমি রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়ি। সহযোদ্ধারা দেরি না করে আমাকে দ্রুত নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
কিন্তু সেখানেই শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। চিকিৎসার জন্য যুদ্ধ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা সাফ জানিয়ে দেয়, ‘ভর্তি করা যাবে না’। আহত অবস্থায়, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো সহানুভূতি পেলাম না। এরপর আমার স্বজনরা অনেক কষ্টে ১৬ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রাতেই আমাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। আমরা রাত ৩টার দিকে সেখানে পৌঁছাই। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসা মেলেনি। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, “উপর থেকে নিষেধ আছে” এমন নির্দেশের কারণে আমাকে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। অসহায়ভাবে ফিরে আসতে হয় বাড়িতে-ব্যথা, রক্ত ও অপমান নিয়ে। প্রায় ১০-১২ দিন পর, জীবন-মৃত্যুর টানাপোড়েনে আবার যাই ময়মনসিংহ মেডিকেলে। সেখানে অবশেষে দেড় মাস ভর্তি থেকে কিছু চিকিৎসা নিতে পারি। তবে পুরোপুরি চিকিৎসা হয়নি, কারণ সেখানে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এখনো রাবার বুলেট রয়ে গেছে—বিশেষ করে মেরুদণ্ডে একটি বুলেট এখনও বিদ্ধ অবস্থায় আছে।
এই অবস্থায় প্রতিদিন আমি যে সব সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি
শরীরে গুলির কারণে প্রতিনিয়ত জ্বর ও তীব্র ব্যথা থাকে, বিশেষ করে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। মাথায় ইনফেকশন যা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। মাথার ক্ষতস্থানে এখনো চিকিৎসা প্রয়োজন। আমার শরীরে সবসময় দুর্বলতা আর জ্বর লেগেই থাকে। একটানা দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, কাজ করতে পারি না। অর্থনৈতিকভাবে আমি এতটাই দুর্বল যে, উন্নত চিকিৎসা বা সার্জারির কথা কল্পনাও করতে পারি না।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
চায়ের দোকান ও আনারসের ব্যবসা
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ ব্যবসার ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
জন্ম ও শৈশব
মো. রাসেল মিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামে। প্রকৃতির কোলে গড়া গ্রামীণ পরিবেশে তাঁর শৈশব কেটেছে অভাব, সংগ্রাম আর স্বপ্নের সহাবস্থানে। পিতা মো. আব্দুল গফুর (৭০) ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী কৃষক, যিনি জীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়েছেন মাটি আঁকড়ে রেখে। মা মোছা. জামেনা খাতুন (৬৫) মমতার প্রতিমূর্তি, যিনি সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। মা-বাবার আদর্শ ও জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকেই রাসেলের চরিত্রে গড়ে ওঠে দৃঢ়তা, মানবিকতা এবং সংগ্রামের চেতনা।

ব্যক্তিগত বিবরণ
নাম : মো. রাসেল মিয়া
জন্ম তারিখ : ০২-১০-১৯৯৬
জন্মস্থান : নারায়ণপুর, ময়মনসিংহ
পেশা : ব্যবসা (চায়ের দোকান ও আনারস)
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: নারায়ণপুর, ইউনিয়ন/পৌরসভা: ধীতপুর, থানা: ঈশ্বরগঞ্জ, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো. আব্দুল গফুর
পিতার পেশা ও বয়স : বৃদ্ধ, ৭০
মায়ের নাম : মোছা. জামেনা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৫০০০
আয়ের উৎস : চায়ের দোকান ও আনারস বিক্রি
বাড়ি : টিনের বাড়ি
সম্পদ : ৩ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ঘটনার স্থান : নরসিংদী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই বিকাল ৪.৩০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍