মো. ওয়াজেদ আলি শেখ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : কৃষক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম ও শৈশব
মো. ওয়াজেদ আলী শেখ ১৯৬৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাতলাশি ইউনিয়নের কুরচাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নিলেও তাঁর জীবনাচরণে ছিল দৃঢ়তা, দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতার ছাপ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সচেতন ও প্রতিবাদী মননের অধিকারী। গ্রামীণ জীবনের সীমাবদ্ধতা তাঁর মনোবলকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
জুলাই বিপ্লবের এক প্রবীণ যোদ্ধা
জীবন
ওয়াজেদ আলী শেখের পিতা ছিলেন মৃত মো. আফাজ উদ্দিন শেখ, যিনি পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম, সৎ উপার্জন ও আদর্শের মাধ্যমে তিনি তাঁর পরিবারকে পরিচালনা করতেন। তাঁর মা মৃত মোছা. জোহরা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী, যিনি অসীম ভালোবাসা ও যত্নে সন্তানদের বড় করে তুলেছেন। সংসারের কঠিন বাস্তবতায় গড়া এই পরিবারে মো. ওয়াজেদ আলী শেখ বেড়ে ওঠেন মূল্যবোধ ও সহানুভূতির শিক্ষায়। তিনি নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে একজন সাধারণ কৃষক, কিন্তু মননে ছিলেন একজন দায়িত্ববান সমাজ সচেতন নাগরিক। তিনি বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। তাঁর ছেলে অপূর্ব হিমেল রানা অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত এবং মেয়ে মিম আক্তার ডিগ্রী দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
কর্মজীবন
জীবনের পুরোটা সময় মো. ওয়াজেদ আলী শেখ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কেই গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনযাপন। কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেও তাঁর চিন্তা-ভাবনা ছিল সাহসী চেতনায় উজ্জীবিত। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদল তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তার ক্রমাগত অবস্থান তাঁকে একজন নীরব যোদ্ধায় পরিণত করে।
সংগ্রামী জীবন ও জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে, তখন মো. ওয়াজেদ আলী শেখ আর চুপ থাকতে পারেননি। বিশেষ করে তাঁর সন্তানদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্মম নির্যাতন তাকে আর বসে থাকতে দেয়নি। ছেলের রক্তাক্ত শরীর, মেয়ের আতঙ্কিত চোখ তাঁকে আন্দোলনের মিছিলে ঠেলে দেয়। ৫৮ বছর বয়সে, জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও তিনি হয়ে ওঠেন রাজপথের এক দৃঢ়কণ্ঠ সংগ্রামী। এই প্রবীণ কৃষক আবারও প্রমাণ করেন; বিপ্লবের কোনো নির্দিষ্ট বয়স হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু অন্তরের তাড়না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস। তাঁর সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও প্রতিবাদী মনোভাব আজও তরুণদের অনুপ্রাণিত করে।
মো. ওয়াজেদ আলী শেখের জীবন আমাদের শেখায়, একজন সাধারণ মানুষও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারে অসাধারণ সাহসে। জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্রামের প্রান্তিক পরিবারে, কিন্তু তাঁর আদর্শিক সংগ্রাম তাঁকে করে তুলেছে জাতীয় প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীক। দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতায় গড়া তাঁর জীবন হয়ে উঠতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক আলোকবর্তিকা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
আমি মো. ওয়াজেদ আলী শেখ- এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতার ন্যায্য আন্দোলনে আমি নিজেকে সরাসরি সম্পৃক্ত করেছি, কারণ অন্যায় দেখেও চুপ থাকা আমার কাছে পাপের সমান। আমার ছেলে অপূর্ব হিমেল রানা ও মেয়ে মিম আক্তার- দুজনেই ছাত্র, তারা নিয়মিতভাবে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিল। তাদের ওপর বারবার হামলার খবর শুনে আর বসে থাকতে পারিনি। আমি নিজেও ৫ আগস্ট সকাল থেকে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই। সেদিন বিকাল তিনটার দিকে আমি বাড়িতে ফিরি, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাতলাশি ইউনিয়নের আমাদের ছোট্ট ঘরটিতে। বাড়িতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই-হঠাৎ, কোনো পূর্ববার্তা ছাড়াই-প্রায় ২০০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল আমাদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে। তারা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী- স্থানীয় ছাত্রলীগ- যুবলীগের লোকজন। তারা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল, বুড়া রাজাকার, আন্দোলনের নেতৃত্ব দিস? শেখের বিরুদ্ধে কথা বলিস? তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তাদের হাতে ছিল লাঠি, রড, দেশীয় ধারালো অস্ত্র। প্রথমেই তারা আমার স্ত্রীকে টেনে হিঁচড়ে আঙিনায় ফেলে আঘাত করতে শুরু করে। আমার ছেলেকে ঘরের ভেতর থেকে বের করে এনে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। মেয়েকে চুলের মুঠি ধরে টেনে আনে, গায়ে হাত তোলে, তার কাপড় ছিঁড়ে যায়। আমি নিজে সামনে দাঁড়িয়ে ওদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি। তখনই ওরা আমার ডান হাতে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে। হাত ফেটে যায়, রক্ত গড়িয়ে পড়ে। এরপর পিঠে, পায়ে, বুকের ওপরেও আঘাত করে। আমার বয়সের দিকে তারা একবারও তাকায়নি। যে বয়স হয়েছে সেদিকে তারা ভ্রুক্ষেপ করেনি।
তারা শুধু আমাদের শাস্তি দিতে চায়নি- ওরা চেয়েছিল আমাদের নিঃশেষ করে দিতে। ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে, আমাদের ধানের গোলা তছনছ করে, আলমারি ভেঙে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিস লুটে নেয়। গোটা বাড়ি এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়। আমার স্ত্রীর মাথা ফেটে যায়, ছেলের ডান চোখে লাথি মারে একজন, মেয়ের শরীর রক্তাক্ত হয়। সেই নরপিশাচরা চলে যাওয়ার পরে কেউ এগিয়ে আসেনি। গ্রামের কেউ ভয়েই মুখ খোলেনি। আমরা পরে আহত অবস্থায় স্থানীয়ভাবে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা নিই। হাসপাতালে নেওয়ার সাহস বা সুযোগ তখন আমাদের ছিল না। চারপাশে শুধু ভয় আর আতঙ্ক। আমি কখনো ভাবিনি স্বাধীন দেশের মাটিতে আমার পরিবারকে এভাবে জীবন দিতে হবে শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে। এই ঘটনা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন হয়ে থাকবে। আমার জীবন শেষ প্রান্তে, তবুও আমি বলতে চাই, আমরা চুপ করে থাকবো না। আমার রক্তে, আমার সন্তানের রক্তে নতুন প্রজন্মের সাহস জন্মাবে।
মো. ওয়াজেদ আলী শেখের বয়ানে উঠে এসেছে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের এক নির্মম ও পৈশাচিক চিত্র- যেখানে একজন প্রবীণ কৃষক শুধুমাত্র ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোয় তাঁর পরিবারসহ নির্মম হামলার শিকার হন। এটি শুধু একটি পরিবারে উপর হামলা নয়, বরং এটি ছিল জনগণের প্রতিবাদকে দমন করার হিংস্র প্রচেষ্টা। এই বর্ণনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- স্বৈরতন্ত্র কতটা ভয়ংকর হতে পারে এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি মো. ওয়াজেদ আলী শেখ- জুলাই আন্দোলনের এক প্রবীণ— সৈনিক। ৫ আগস্ট বিকেলে আমার বাড়িতে যেভাবে হামলা চালানো হয়, তা ছিল অকল্পনীয় এক বর্বরতা। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সবাই সেই পাশবিক আক্রমণের শিকার হন। আমি নিজেও রড, লাঠি ও লোহার পাইপের আঘাতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম পাই, বিশেষ করে আমার ডান হাতটি এখনো অবশপ্রায়।
হামলার পরপরই আমার ছোট বোনের জামাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের উদ্ধার করে। রক্তে ভেজা শরীর, ছিন্নভিন্ন কাপড় আর আর্তনাদে ভরা সে মুহূর্তগুলো আজও আমার চোখে ভাসে। তিনি দ্রুত আমাদের একটি পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আমাদের কাউকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কারণ চিকিৎসক ও স্টাফরা আতঙ্কে ছিল, আমরা যেন রাজনৈতিক সমস্যা না হয়ে যাই।
শেষ পর্যন্ত এক সাহসী চিকিৎসক এগিয়ে আসেন। তিনি আমাকে ও আমার ছেলেমেয়েকে ইনজেকশন ও ব্যথানাশক ওষুধ দেন, ক্ষতস্থানে প্রাথমিক সেলাই করেন। কিন্তু সেখানে সকল চিকিৎসা সম্ভব ছিল না— আমার হাতের হাড়ে ফাটল ছিল স্ত্রীর মাথায় সেলাই দরকার ছিল, মেয়ের জখম গুরুতর ছিল। তখন বাধ্য হয়ে আমরা একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হই। চিকিৎসা ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে কঠিন হলেও, পরিবার রক্ষা করতে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। সেখানেই আমাদের দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। ছেলে ও মেয়ে কিছুটা সুস্থ হলেও আমার নিজের শরীর এখনও সম্পূর্ণ সেরে ওঠেনি। বিশেষ করে হাতের ব্যবহার স্বাভাবিক নয়— লিখতে, ধরতে, এমনকি কাজ করতে এখনো কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে রাতে ব্যথায় ঘুমাতে পারি না।
এই শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও বেশি পুড়িয়ে মারে মানসিক ক্ষত- আমি দেখি, আমার পরিবারের সদস্যদের চোখে এখনো আতঙ্ক লুকিয়ে আছে। অথচ আমরা কোনো অন্যায় করিনি- আমরা শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। কতটুকু চিকিৎসা পেয়েছি, তা সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়নি। শরীরের কিছুটা ক্ষত সময় হয়তো সারাবে, কিন্তু আত্মার ওপর যে নির্মম ঘা পড়েছে, তা কোনো হাসপাতাল সারাতে পারবে না। আমি আজও বলি- এই যন্ত্রণা, এই ক্ষত নিয়ে আমি মাথা উঁচু করেই বাঁচতে চাই। কারণ আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম আর সেটাই আমার গর্ব।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখন মোটামুটি সুস্থ কিন্তু নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং দরকার।
পুর্বে কী ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
কৃষক।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, আমাকে বা আমার সন্তানকে চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
নাম : মো. ওয়াজেদ আলী শেখ
জন্ম তারিখ : ১-২-১৯৬৭
জন্মস্থান : পাতলাশি, কুরচাই, ময়মনসিংহ
পেশা : কৃষক
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পাতলাশি, পৌরসভা: কুরচাই, থানা: গফরগাঁও, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মৃত মো. আফাজ উদ্দিন শেখ
মায়ের নাম : মৃত মোছা. জোহরা খাতুন
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০০০০ টাকা
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ি : সেমি পাকা বাড়ি
সম্পদ : ৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ঘটনার স্থান : পাতলাশি, কুরচাই তার নিজ গ্রামের বাড়িতে
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৩.০০টাপারিবারিক
মো. ওয়াজেদ আলী শেখ ১৯৬৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাতলাশি ইউনিয়নের কুরচাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নিলেও তাঁর জীবনাচরণে ছিল দৃঢ়তা, দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতার ছাপ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সচেতন ও প্রতিবাদী মননের অধিকারী। গ্রামীণ জীবনের সীমাবদ্ধতা তাঁর মনোবলকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
জুলাই বিপ্লবের এক প্রবীণ যোদ্ধা
জীবন
ওয়াজেদ আলী শেখের পিতা ছিলেন মৃত মো. আফাজ উদ্দিন শেখ, যিনি পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম, সৎ উপার্জন ও আদর্শের মাধ্যমে তিনি তাঁর পরিবারকে পরিচালনা করতেন। তাঁর মা মৃত মোছা. জোহরা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী, যিনি অসীম ভালোবাসা ও যত্নে সন্তানদের বড় করে তুলেছেন। সংসারের কঠিন বাস্তবতায় গড়া এই পরিবারে মো. ওয়াজেদ আলী শেখ বেড়ে ওঠেন মূল্যবোধ ও সহানুভূতির শিক্ষায়। তিনি নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে একজন সাধারণ কৃষক, কিন্তু মননে ছিলেন একজন দায়িত্ববান সমাজ সচেতন নাগরিক। তিনি বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। তাঁর ছেলে অপূর্ব হিমেল রানা অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত এবং মেয়ে মিম আক্তার ডিগ্রী দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
কর্মজীবন
জীবনের পুরোটা সময় মো. ওয়াজেদ আলী শেখ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কেই গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনযাপন। কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেও তাঁর চিন্তা-ভাবনা ছিল সাহসী চেতনায় উজ্জীবিত। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদল তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তার ক্রমাগত অবস্থান তাঁকে একজন নীরব যোদ্ধায় পরিণত করে।
সংগ্রামী জীবন ও জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে, তখন মো. ওয়াজেদ আলী শেখ আর চুপ থাকতে পারেননি। বিশেষ করে তাঁর সন্তানদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্মম নির্যাতন তাকে আর বসে থাকতে দেয়নি। ছেলের রক্তাক্ত শরীর, মেয়ের আতঙ্কিত চোখ তাঁকে আন্দোলনের মিছিলে ঠেলে দেয়। ৫৮ বছর বয়সে, জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও তিনি হয়ে ওঠেন রাজপথের এক দৃঢ়কণ্ঠ সংগ্রামী। এই প্রবীণ কৃষক আবারও প্রমাণ করেন; বিপ্লবের কোনো নির্দিষ্ট বয়স হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু অন্তরের তাড়না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস। তাঁর সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও প্রতিবাদী মনোভাব আজও তরুণদের অনুপ্রাণিত করে।
মো. ওয়াজেদ আলী শেখের জীবন আমাদের শেখায়, একজন সাধারণ মানুষও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারে অসাধারণ সাহসে। জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্রামের প্রান্তিক পরিবারে, কিন্তু তাঁর আদর্শিক সংগ্রাম তাঁকে করে তুলেছে জাতীয় প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীক। দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতায় গড়া তাঁর জীবন হয়ে উঠতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক আলোকবর্তিকা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
আমি মো. ওয়াজেদ আলী শেখ- এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতার ন্যায্য আন্দোলনে আমি নিজেকে সরাসরি সম্পৃক্ত করেছি, কারণ অন্যায় দেখেও চুপ থাকা আমার কাছে পাপের সমান। আমার ছেলে অপূর্ব হিমেল রানা ও মেয়ে মিম আক্তার- দুজনেই ছাত্র, তারা নিয়মিতভাবে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিল। তাদের ওপর বারবার হামলার খবর শুনে আর বসে থাকতে পারিনি। আমি নিজেও ৫ আগস্ট সকাল থেকে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই। সেদিন বিকাল তিনটার দিকে আমি বাড়িতে ফিরি, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাতলাশি ইউনিয়নের আমাদের ছোট্ট ঘরটিতে। বাড়িতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই-হঠাৎ, কোনো পূর্ববার্তা ছাড়াই-প্রায় ২০০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল আমাদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে। তারা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী- স্থানীয় ছাত্রলীগ- যুবলীগের লোকজন। তারা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল, বুড়া রাজাকার, আন্দোলনের নেতৃত্ব দিস? শেখের বিরুদ্ধে কথা বলিস? তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তাদের হাতে ছিল লাঠি, রড, দেশীয় ধারালো অস্ত্র। প্রথমেই তারা আমার স্ত্রীকে টেনে হিঁচড়ে আঙিনায় ফেলে আঘাত করতে শুরু করে। আমার ছেলেকে ঘরের ভেতর থেকে বের করে এনে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। মেয়েকে চুলের মুঠি ধরে টেনে আনে, গায়ে হাত তোলে, তার কাপড় ছিঁড়ে যায়। আমি নিজে সামনে দাঁড়িয়ে ওদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি। তখনই ওরা আমার ডান হাতে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে। হাত ফেটে যায়, রক্ত গড়িয়ে পড়ে। এরপর পিঠে, পায়ে, বুকের ওপরেও আঘাত করে। আমার বয়সের দিকে তারা একবারও তাকায়নি। যে বয়স হয়েছে সেদিকে তারা ভ্রুক্ষেপ করেনি।
তারা শুধু আমাদের শাস্তি দিতে চায়নি- ওরা চেয়েছিল আমাদের নিঃশেষ করে দিতে। ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে, আমাদের ধানের গোলা তছনছ করে, আলমারি ভেঙে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিস লুটে নেয়। গোটা বাড়ি এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়। আমার স্ত্রীর মাথা ফেটে যায়, ছেলের ডান চোখে লাথি মারে একজন, মেয়ের শরীর রক্তাক্ত হয়। সেই নরপিশাচরা চলে যাওয়ার পরে কেউ এগিয়ে আসেনি। গ্রামের কেউ ভয়েই মুখ খোলেনি। আমরা পরে আহত অবস্থায় স্থানীয়ভাবে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা নিই। হাসপাতালে নেওয়ার সাহস বা সুযোগ তখন আমাদের ছিল না। চারপাশে শুধু ভয় আর আতঙ্ক। আমি কখনো ভাবিনি স্বাধীন দেশের মাটিতে আমার পরিবারকে এভাবে জীবন দিতে হবে শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে। এই ঘটনা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন হয়ে থাকবে। আমার জীবন শেষ প্রান্তে, তবুও আমি বলতে চাই, আমরা চুপ করে থাকবো না। আমার রক্তে, আমার সন্তানের রক্তে নতুন প্রজন্মের সাহস জন্মাবে।
মো. ওয়াজেদ আলী শেখের বয়ানে উঠে এসেছে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের এক নির্মম ও পৈশাচিক চিত্র- যেখানে একজন প্রবীণ কৃষক শুধুমাত্র ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোয় তাঁর পরিবারসহ নির্মম হামলার শিকার হন। এটি শুধু একটি পরিবারে উপর হামলা নয়, বরং এটি ছিল জনগণের প্রতিবাদকে দমন করার হিংস্র প্রচেষ্টা। এই বর্ণনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- স্বৈরতন্ত্র কতটা ভয়ংকর হতে পারে এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি মো. ওয়াজেদ আলী শেখ- জুলাই আন্দোলনের এক প্রবীণ— সৈনিক। ৫ আগস্ট বিকেলে আমার বাড়িতে যেভাবে হামলা চালানো হয়, তা ছিল অকল্পনীয় এক বর্বরতা। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সবাই সেই পাশবিক আক্রমণের শিকার হন। আমি নিজেও রড, লাঠি ও লোহার পাইপের আঘাতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম পাই, বিশেষ করে আমার ডান হাতটি এখনো অবশপ্রায়।
হামলার পরপরই আমার ছোট বোনের জামাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের উদ্ধার করে। রক্তে ভেজা শরীর, ছিন্নভিন্ন কাপড় আর আর্তনাদে ভরা সে মুহূর্তগুলো আজও আমার চোখে ভাসে। তিনি দ্রুত আমাদের একটি পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আমাদের কাউকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কারণ চিকিৎসক ও স্টাফরা আতঙ্কে ছিল, আমরা যেন রাজনৈতিক সমস্যা না হয়ে যাই।
শেষ পর্যন্ত এক সাহসী চিকিৎসক এগিয়ে আসেন। তিনি আমাকে ও আমার ছেলেমেয়েকে ইনজেকশন ও ব্যথানাশক ওষুধ দেন, ক্ষতস্থানে প্রাথমিক সেলাই করেন। কিন্তু সেখানে সকল চিকিৎসা সম্ভব ছিল না— আমার হাতের হাড়ে ফাটল ছিল স্ত্রীর মাথায় সেলাই দরকার ছিল, মেয়ের জখম গুরুতর ছিল। তখন বাধ্য হয়ে আমরা একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হই। চিকিৎসা ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে কঠিন হলেও, পরিবার রক্ষা করতে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। সেখানেই আমাদের দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। ছেলে ও মেয়ে কিছুটা সুস্থ হলেও আমার নিজের শরীর এখনও সম্পূর্ণ সেরে ওঠেনি। বিশেষ করে হাতের ব্যবহার স্বাভাবিক নয়— লিখতে, ধরতে, এমনকি কাজ করতে এখনো কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে রাতে ব্যথায় ঘুমাতে পারি না।
এই শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও বেশি পুড়িয়ে মারে মানসিক ক্ষত- আমি দেখি, আমার পরিবারের সদস্যদের চোখে এখনো আতঙ্ক লুকিয়ে আছে। অথচ আমরা কোনো অন্যায় করিনি- আমরা শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। কতটুকু চিকিৎসা পেয়েছি, তা সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়নি। শরীরের কিছুটা ক্ষত সময় হয়তো সারাবে, কিন্তু আত্মার ওপর যে নির্মম ঘা পড়েছে, তা কোনো হাসপাতাল সারাতে পারবে না। আমি আজও বলি- এই যন্ত্রণা, এই ক্ষত নিয়ে আমি মাথা উঁচু করেই বাঁচতে চাই। কারণ আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম আর সেটাই আমার গর্ব।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখন মোটামুটি সুস্থ কিন্তু নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং দরকার।
পুর্বে কী ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
কৃষক।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, আমাকে বা আমার সন্তানকে চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
নাম : মো. ওয়াজেদ আলী শেখ
জন্ম তারিখ : ১-২-১৯৬৭
জন্মস্থান : পাতলাশি, কুরচাই, ময়মনসিংহ
পেশা : কৃষক
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পাতলাশি, পৌরসভা: কুরচাই, থানা: গফরগাঁও, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মৃত মো. আফাজ উদ্দিন শেখ
মায়ের নাম : মৃত মোছা. জোহরা খাতুন
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০০০০ টাকা
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ি : সেমি পাকা বাড়ি
সম্পদ : ৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ঘটনার স্থান : পাতলাশি, কুরচাই তার নিজ গ্রামের বাড়িতে
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৩.০০টাপারিবারিক
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍