রাশেদুল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শ্রমিক (তবে এখন অসুস্থ)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
ঘটনার বিবরণ
রাশেদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পরিবার চালাতেন। তাঁর মাসিক আয় ছিল প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে তিনি তাঁর সাত সদস্যের পরিবার পরিচালনা করতেন। তাঁর একটি বিবাহিত মেয়ে এবং একটি ১৪ বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। আরো রয়েছে ডিবোর্সি প্রতিবন্ধী বোন যিনি কথা বলতে পারেন না। পরিবারটি তাঁর আয়ের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হন রাশেদুল ইসলাম। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের সহযোগিতায় সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। আক্রমণের সময় তাঁর পা ভেঙে যায়, ফলে তিনি সম্পূর্ণভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন এবং শ্রমিক হিসেবে আর কোনো আয় করতে পারছেন না। বর্তমানে তিনি বেকার শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে রাশেদুল ইসলাম ও তাঁর পরিবার চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারানোয় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঋণ করে চলছে পরিবারটি। ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
রাশেদুল ইসলামের জীবনের এ পরিণতি শুধু একটি ব্যক্তির নয় এটি আমাদের সমাজের অসহায়, দিনমজুর শ্রেণির বাস্তব চিত্র। ন্যায়বিচার ও সহানুভূতির ভিত্তিতে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
১৮ জুলাইয়ের সায়েদাবাদ
রাশেদুল ইসলামের উপর হেলিকপ্টার থেকে পানি নিক্ষেপের পর ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যায়
রাশেদুল ইসলাম একজন সাধারণ দিনমজুর ছিলেন। জীবিকার সন্ধানে তিনি প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে সায়েদাবাদ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৮ জুলাই, টিকাটুলিতে চলমান ছাত্র- জনতার আন্দোলনের সময় তিনি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছান। তখন সেখানে ছাত্র- জনতা সাথে ছাত্রলীগ, যুবলীগের ব্যাপক ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া হয়। ঐ মুহূর্তে তিনি আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কবলে পড়লে তারা তাকে লাঠিপেটা করে। পরে দিনমজুর পরিচয় দিলে ছেড়ে দেয়।
হঠাৎ তিনি দেখতে পান, উপর থেকে সম্ভবত একটি হেলিকপ্টার থেকে জোরালো পানির ধারা ও গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। সে পানির একটি অংশ তাঁর শরীরে আঘাত হানে এবং প্রচণ্ড আঘাতে তিনি অচেতন হয়ে যান। ভারসাম্য হারিয়ে তিনি পাশের ফ্লাইওভার থেকে নিচে রাস্তায় পড়ে যান।
পড়ে যাওয়ার ফলে তার পা ভেঙে যায় এবং কোমরে গুরুতর ব্যথা পান। ছাত্র-জনতা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।
সেখানে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। পরে পঙ্গু হাসপাতালে তার কোমরের দু’টি স্থানে তিনটি অপারেশন করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে সক্ষম নন। চলাচলের জন্য তাকে ফিঙ্গি (ওয়াকার) ব্যবহার করতে হয়। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষ করে কোমর ও পায়ে আরও উন্নততর চিকিৎসা প্রয়োজন। তার একটি পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল, যার জন্যও তিনটি অপারেশন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কর্মহীন ও বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
হাঁটাচলার সমস্যায় ভুগছেন, যার কারণে কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হয়ে বেকার অবস্থায় আছেন। আগে তিনি ঢাকায় বসবাস করতেন, কিন্তু বাসা ভাড়ার বাকি পরিশোধ করতে না পারায় গ্রামে ফিরতে বাধ্য হন। তার স্ত্রী এখনো সেই বাসায় অবস্থান করছেন। তার নিজের কোনো ফসলি জমি বা বাড়িঘর নেই। বর্তমানে তিনি অন্যের জায়গায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
পায়ের বদলে হুইলচেয়ার, রুটির বদলে ঋণ : রাশেদুলের পরিবার ভাঙনের গল্প
রাশেদুল ইসলামের কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তিই ভেঙে পড়েছে। তার বৃদ্ধ বাবা এখন চোখে পানি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। মা দিনের পর দিন ছেলের ওষুধের টাকার চিন্তায় কাটান। ১৪ বছরের ছেলেটা স্কুলে যাওয়ার বদলে বাবার পাশে বসে থাকে, যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
রাশেদুল এখন হুইলচেয়ারে অথচ তার হাতে ছিল বাঁশের মই, মাথায় ছিল সিমেন্টের বস্তা। আজ তাঁর একমাত্র পরিচয় ‘আহত, বেকার, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার’।
এক রাশেদুল নয়, হাজারো রাশেদুল আজ প্রশ্ন করে রাষ্ট্র কার?
এই জীবনী রাশেদুল ইসলামের, কিন্তু গল্পটি একক নয়। হাজারো রাশেদুল ইসলাম আজ এ দেশে বেঁচে আছেন অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে। রাষ্ট্রের নির্যাতন, সরকারের নিপীড়ন, রাজনৈতিক দখলদারিত্ব সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জীবন আজ এক অনিরাপদ অধ্যায়।
কোনো রাজনীতি নয় এটা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। রাশেদুল ইসলামের জন্য বিচার চাই, সহায়তা চাই, সম্মান চাই।
কী করেনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা : গণমানুষের কণ্ঠ রোধে সর্বোচ্চ নিষ্ঠুরতা
একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের চেয়ার রক্ষার্থে জনগণকেই শত্রু মনে করে ফেলেন, তখন রাষ্ট্র রক্তাক্ত হয়। শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা করেছে, তা ইতিহাসে গণবিরোধী রাষ্ট্রচালনার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
রাশেদুল ইসলামের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত নীতির অংশ। সরকার চেয়েছিল ভয় দেখাতে ‘তোমরা আওয়াজ তুললে এই হবে।’ সায়েদাবাদ, গাবতলী, রূপনগর প্রতিটি জায়গাই ছিল রণক্ষেত্র, যেখানে নিরস্ত্র মানুষ, গুলি ও লাঠির শিকার হয়েছে।
গোলামি ফোর্স বনাম জনগণ
জুলাই ১৮, সায়েদাবাদ। রাশেদুল ইসলাম তখন কেবল একজন শ্রমিক, কিন্তু ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তিনি হয়ে ওঠেন এক সাক্ষী। সেদিন শুধু সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ-যুবলীগ নয়, সঙ্গে ছিল পুলিশের সক্রিয় অংশগ্রহণ। চোখ বেঁধে ধরে, লাঠি মেরে, রাস্তায় ফেলে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এক নিরীহ মানুষকে কারণ সে ছিল ‘জনতা’র অংশ।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ২০২৪ সালের বাংলাদেশে ‘ফোর্স’ মানে ছিল না জনগণের বন্ধু বরং তারা ছিল গদি রক্ষাকারী সেনাপতি।
সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে রণনীতি
২০২৪ সালের জুলাই ছিল এক কালো মাস, যখন রাষ্ট্রের সব বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছিল ক্ষমতা রক্ষার জন্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে আধাসামরিক বাহিনী কেউই বাদ যায়নি। অথচ যাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, সেই সাধারণ মানুষকেই প্রতিপক্ষ ভাবা হয়েছিল।
রাশেদুল ইসলাম ছিলেন সেই অসংখ্য বেসামরিক নাগরিকের একজন, যাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করা হয়েছে সরকারি দলের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে, যাদের কর্মকাণ্ডে আজ বহু পরিবার পথে বসেছে।
এক পায়ের মানুষ, লড়াইয়ের প্রতীক
রাশেদুল ইসলাম আজ হাঁটতে পারেন না। তাঁর পা ভেঙেছে, কিন্তু মনোবল ভাঙেনি। তিনিই সেই মানুষ, যাঁকে পিটিয়ে থামাতে চেয়েছিল রাষ্ট্র অথচ তার গল্প এখন দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। রাশেদুল একজন শ্রমিক হলেও আজ তিনি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি যেখানে জনগণ গর্জেছে, আর সরকার দমিয়েছে।
রাস্তায় ছিল যারা, ইতিহাসে থাকবে তারা
জুলাই ২০২৪ এই সময়টা শুধু একটি মাস নয়, একটি যুগান্তকারী চেতনার নাম। চারদিকে ছিল আতঙ্ক, ভয়, দমন-পীড়নের ছায়া। কিন্তু ঠিক এ সময়েই রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষ। ছাত্র, যুবক, গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, এমনকি দিনমজুররাও। এই সংগ্রামে রাশেদুল ইসলাম ছিলেন এক জীবন্ত প্রতীক যিনি অস্ত্রহীন হয়েও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাহস দেখিয়েছেন।
যারা রাস্তায় নামেনি, তারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য গুলি, লাঠি আর সন্ত্রাস ব্যবহার করেছে। কিন্তু ইতিহাস লিখেছে রক্ত দিয়ে কারা নায়ক, কারা খলনায়ক।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. মনিহারী দোকানের ব্যবস্থা করা
৩. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদানজীবনী
রাশেদুল ইসলাম একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যিনি ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা থানার বালিখাঁ পশ্চিম গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ১৯৮০ সালের ২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম তোফাজ্জল হোসেন (বয়স ৭২), যিনি বর্তমানে কর্মহীন। মাতার নাম রোকেয়া বেগম (বয়স ৬৭), তিনি গৃহিণী।
নাম : রাশেদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০২/০৭/১৯৮০
জন্মস্থান : তারাকান্দা
পেশা : শ্রমিক (তবে এখন অসুস্থ)
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বালিখাঁ পশ্চিম, ইউনিয়ন: বালিখাঁ, থানা: তারাকান্দা, জেলা: ময়মনসিংহ
পারিবারিক তথ্যাদি
পিতার নাম : তোফাজ্জল হোসেন
পেশা ও বয়স : বেকার, ৭২
মাতার নাম : রোকেয়া বেগম
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৭
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৫
পারিবারিক অবস্থা : অসচ্ছল
পরিবারের অন্যান্য সদস্য
১. ইয়ালমা আক্তার, বয়স: ২০, সম্পর্ক: মেয়ে-বিবাহিত
২. হাসান রাব্বি, বয়স: ১৪, সম্পর্ক: ছেলে- ছাত্র, নবম শ্রেণি
৩. স্ত্রী (গৃহিণী)
৪. প্রতিবন্ধী বোন (বোবা)
ঘটনার স্থান : সায়েদাবাদ, ঢাকা
আঘাতকারী : পুলিশ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই বিকেল ৪টা দিনমজুর রাশেদুলও স্বৈরাচারী হাসিনার ছোবলের শিকার
রাশেদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পরিবার চালাতেন। তাঁর মাসিক আয় ছিল প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে তিনি তাঁর সাত সদস্যের পরিবার পরিচালনা করতেন। তাঁর একটি বিবাহিত মেয়ে এবং একটি ১৪ বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। আরো রয়েছে ডিবোর্সি প্রতিবন্ধী বোন যিনি কথা বলতে পারেন না। পরিবারটি তাঁর আয়ের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হন রাশেদুল ইসলাম। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের সহযোগিতায় সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। আক্রমণের সময় তাঁর পা ভেঙে যায়, ফলে তিনি সম্পূর্ণভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন এবং শ্রমিক হিসেবে আর কোনো আয় করতে পারছেন না। বর্তমানে তিনি বেকার শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে রাশেদুল ইসলাম ও তাঁর পরিবার চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারানোয় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঋণ করে চলছে পরিবারটি। ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
রাশেদুল ইসলামের জীবনের এ পরিণতি শুধু একটি ব্যক্তির নয় এটি আমাদের সমাজের অসহায়, দিনমজুর শ্রেণির বাস্তব চিত্র। ন্যায়বিচার ও সহানুভূতির ভিত্তিতে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
১৮ জুলাইয়ের সায়েদাবাদ
রাশেদুল ইসলামের উপর হেলিকপ্টার থেকে পানি নিক্ষেপের পর ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যায়
রাশেদুল ইসলাম একজন সাধারণ দিনমজুর ছিলেন। জীবিকার সন্ধানে তিনি প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে সায়েদাবাদ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৮ জুলাই, টিকাটুলিতে চলমান ছাত্র- জনতার আন্দোলনের সময় তিনি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছান। তখন সেখানে ছাত্র- জনতা সাথে ছাত্রলীগ, যুবলীগের ব্যাপক ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া হয়। ঐ মুহূর্তে তিনি আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কবলে পড়লে তারা তাকে লাঠিপেটা করে। পরে দিনমজুর পরিচয় দিলে ছেড়ে দেয়।
হঠাৎ তিনি দেখতে পান, উপর থেকে সম্ভবত একটি হেলিকপ্টার থেকে জোরালো পানির ধারা ও গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। সে পানির একটি অংশ তাঁর শরীরে আঘাত হানে এবং প্রচণ্ড আঘাতে তিনি অচেতন হয়ে যান। ভারসাম্য হারিয়ে তিনি পাশের ফ্লাইওভার থেকে নিচে রাস্তায় পড়ে যান।
পড়ে যাওয়ার ফলে তার পা ভেঙে যায় এবং কোমরে গুরুতর ব্যথা পান। ছাত্র-জনতা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।
সেখানে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। পরে পঙ্গু হাসপাতালে তার কোমরের দু’টি স্থানে তিনটি অপারেশন করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে সক্ষম নন। চলাচলের জন্য তাকে ফিঙ্গি (ওয়াকার) ব্যবহার করতে হয়। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষ করে কোমর ও পায়ে আরও উন্নততর চিকিৎসা প্রয়োজন। তার একটি পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল, যার জন্যও তিনটি অপারেশন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কর্মহীন ও বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
হাঁটাচলার সমস্যায় ভুগছেন, যার কারণে কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হয়ে বেকার অবস্থায় আছেন। আগে তিনি ঢাকায় বসবাস করতেন, কিন্তু বাসা ভাড়ার বাকি পরিশোধ করতে না পারায় গ্রামে ফিরতে বাধ্য হন। তার স্ত্রী এখনো সেই বাসায় অবস্থান করছেন। তার নিজের কোনো ফসলি জমি বা বাড়িঘর নেই। বর্তমানে তিনি অন্যের জায়গায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
পায়ের বদলে হুইলচেয়ার, রুটির বদলে ঋণ : রাশেদুলের পরিবার ভাঙনের গল্প
রাশেদুল ইসলামের কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তিই ভেঙে পড়েছে। তার বৃদ্ধ বাবা এখন চোখে পানি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। মা দিনের পর দিন ছেলের ওষুধের টাকার চিন্তায় কাটান। ১৪ বছরের ছেলেটা স্কুলে যাওয়ার বদলে বাবার পাশে বসে থাকে, যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
রাশেদুল এখন হুইলচেয়ারে অথচ তার হাতে ছিল বাঁশের মই, মাথায় ছিল সিমেন্টের বস্তা। আজ তাঁর একমাত্র পরিচয় ‘আহত, বেকার, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার’।
এক রাশেদুল নয়, হাজারো রাশেদুল আজ প্রশ্ন করে রাষ্ট্র কার?
এই জীবনী রাশেদুল ইসলামের, কিন্তু গল্পটি একক নয়। হাজারো রাশেদুল ইসলাম আজ এ দেশে বেঁচে আছেন অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে। রাষ্ট্রের নির্যাতন, সরকারের নিপীড়ন, রাজনৈতিক দখলদারিত্ব সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জীবন আজ এক অনিরাপদ অধ্যায়।
কোনো রাজনীতি নয় এটা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। রাশেদুল ইসলামের জন্য বিচার চাই, সহায়তা চাই, সম্মান চাই।
কী করেনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা : গণমানুষের কণ্ঠ রোধে সর্বোচ্চ নিষ্ঠুরতা
একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের চেয়ার রক্ষার্থে জনগণকেই শত্রু মনে করে ফেলেন, তখন রাষ্ট্র রক্তাক্ত হয়। শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা করেছে, তা ইতিহাসে গণবিরোধী রাষ্ট্রচালনার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
রাশেদুল ইসলামের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত নীতির অংশ। সরকার চেয়েছিল ভয় দেখাতে ‘তোমরা আওয়াজ তুললে এই হবে।’ সায়েদাবাদ, গাবতলী, রূপনগর প্রতিটি জায়গাই ছিল রণক্ষেত্র, যেখানে নিরস্ত্র মানুষ, গুলি ও লাঠির শিকার হয়েছে।
গোলামি ফোর্স বনাম জনগণ
জুলাই ১৮, সায়েদাবাদ। রাশেদুল ইসলাম তখন কেবল একজন শ্রমিক, কিন্তু ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তিনি হয়ে ওঠেন এক সাক্ষী। সেদিন শুধু সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ-যুবলীগ নয়, সঙ্গে ছিল পুলিশের সক্রিয় অংশগ্রহণ। চোখ বেঁধে ধরে, লাঠি মেরে, রাস্তায় ফেলে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এক নিরীহ মানুষকে কারণ সে ছিল ‘জনতা’র অংশ।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ২০২৪ সালের বাংলাদেশে ‘ফোর্স’ মানে ছিল না জনগণের বন্ধু বরং তারা ছিল গদি রক্ষাকারী সেনাপতি।
সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে রণনীতি
২০২৪ সালের জুলাই ছিল এক কালো মাস, যখন রাষ্ট্রের সব বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছিল ক্ষমতা রক্ষার জন্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে আধাসামরিক বাহিনী কেউই বাদ যায়নি। অথচ যাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, সেই সাধারণ মানুষকেই প্রতিপক্ষ ভাবা হয়েছিল।
রাশেদুল ইসলাম ছিলেন সেই অসংখ্য বেসামরিক নাগরিকের একজন, যাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করা হয়েছে সরকারি দলের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে, যাদের কর্মকাণ্ডে আজ বহু পরিবার পথে বসেছে।
এক পায়ের মানুষ, লড়াইয়ের প্রতীক
রাশেদুল ইসলাম আজ হাঁটতে পারেন না। তাঁর পা ভেঙেছে, কিন্তু মনোবল ভাঙেনি। তিনিই সেই মানুষ, যাঁকে পিটিয়ে থামাতে চেয়েছিল রাষ্ট্র অথচ তার গল্প এখন দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। রাশেদুল একজন শ্রমিক হলেও আজ তিনি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি যেখানে জনগণ গর্জেছে, আর সরকার দমিয়েছে।
রাস্তায় ছিল যারা, ইতিহাসে থাকবে তারা
জুলাই ২০২৪ এই সময়টা শুধু একটি মাস নয়, একটি যুগান্তকারী চেতনার নাম। চারদিকে ছিল আতঙ্ক, ভয়, দমন-পীড়নের ছায়া। কিন্তু ঠিক এ সময়েই রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষ। ছাত্র, যুবক, গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, এমনকি দিনমজুররাও। এই সংগ্রামে রাশেদুল ইসলাম ছিলেন এক জীবন্ত প্রতীক যিনি অস্ত্রহীন হয়েও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাহস দেখিয়েছেন।
যারা রাস্তায় নামেনি, তারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য গুলি, লাঠি আর সন্ত্রাস ব্যবহার করেছে। কিন্তু ইতিহাস লিখেছে রক্ত দিয়ে কারা নায়ক, কারা খলনায়ক।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. মনিহারী দোকানের ব্যবস্থা করা
৩. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদানজীবনী
রাশেদুল ইসলাম একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যিনি ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা থানার বালিখাঁ পশ্চিম গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ১৯৮০ সালের ২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম তোফাজ্জল হোসেন (বয়স ৭২), যিনি বর্তমানে কর্মহীন। মাতার নাম রোকেয়া বেগম (বয়স ৬৭), তিনি গৃহিণী।
নাম : রাশেদুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০২/০৭/১৯৮০
জন্মস্থান : তারাকান্দা
পেশা : শ্রমিক (তবে এখন অসুস্থ)
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বালিখাঁ পশ্চিম, ইউনিয়ন: বালিখাঁ, থানা: তারাকান্দা, জেলা: ময়মনসিংহ
পারিবারিক তথ্যাদি
পিতার নাম : তোফাজ্জল হোসেন
পেশা ও বয়স : বেকার, ৭২
মাতার নাম : রোকেয়া বেগম
পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৭
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৫
পারিবারিক অবস্থা : অসচ্ছল
পরিবারের অন্যান্য সদস্য
১. ইয়ালমা আক্তার, বয়স: ২০, সম্পর্ক: মেয়ে-বিবাহিত
২. হাসান রাব্বি, বয়স: ১৪, সম্পর্ক: ছেলে- ছাত্র, নবম শ্রেণি
৩. স্ত্রী (গৃহিণী)
৪. প্রতিবন্ধী বোন (বোবা)
ঘটনার স্থান : সায়েদাবাদ, ঢাকা
আঘাতকারী : পুলিশ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই বিকেল ৪টা দিনমজুর রাশেদুলও স্বৈরাচারী হাসিনার ছোবলের শিকার
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍