হোম / আহতদের তালিকা / মো: রবিউল করিম
মো: রবিউল করিম

মো: রবিউল করিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মো: রবিউল করিম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের লুদিয়ারা গ্রামে জন্ম নেওয়া এক পরিশ্রমী প্রাইভেটকার চালক, যিনি পরিবার–নির্ভর জীবনে সততা ও দায়িত্বকে নিজের পরিচয় করে তুলেছিলেন। জীবিকার টানে শহরে এলেও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে তিনি ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। রায়েরবাগে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি হারান স্বাভাবিক চলাচলের ক্ষমতা এবং থেমে যায় তার কর্মজীবন। নিজের সংগ্রাম ও দৃঢ়তায় আজও তিনি পরিবারের আশার প্রতীক হয়ে বেঁচে আছেন।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: রবিউল করিম
ক্রমিক: ০১৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০১৮
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মো: রবিউল করিম ১৯৮৭ সালের ২ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার লুদিয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মোঃ ইছহাক মিয়া এবং মাতার নাম মনোয়ারা বেগম। উভয়ের বয়স এখন যথাক্রমে ৮০ ও ৭০ বছর এবং তারা দু'জনেই অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা রবিউল শৈশব থেকেই ছিলেন দায়িত্ববান। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল মধ্যম মানের। তার লেখাপড়া থেমে যায় কৈশোরেই, কারণ তখন পরিবারের প্রয়োজন ছিল একটি আয়ের উৎস। বর্তমানে তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার রশিদবাগ এলাকায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। তার স্ত্রী শিলা আক্তার একজন গৃহিণী। তাদের রয়েছে দুই সন্তান। ১. রেজওয়ানুল করিম রোহান, বয়স ১৪, সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ২. রেহনানুর করিম রোশন, বয়স ৫ ছোট্ট শিশু। অসুস্থ ও বয়স্ক পিতা-মাতার চিকিৎসা ও খরচও রবিউলের আয়ের ওপর নির্ভর করে চলে। এই পরিবারে মোট সদস্য ৬ জন, যার অর্থনৈতিক ভার একাই বহন করতেন রবিউল।
পেশা ও কর্মজীবনের প্রেক্ষাপট
রবিউল করিম একজন পরিশ্রমী মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রাইভেটকার চালকের পেশায় নিযুক্ত। ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি গাড়ি চালিয়ে তার মাসিক আয় ছিল প্রায় ২৩,০০০ টাকা। এই আয় দিয়েই তিনি চালাতেন পরিবার, সন্তানের পড়াশুনা, পিতা-মাতার ওষুধ-পথ্য, বাসা ভাড়া, এবং নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ। কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা ছিল তার বড় গুণ। গাড়ির মালিকের আস্থাভাজন হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। এই কর্মজীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল তার পরিবারকে স্বচ্ছলতা দেওয়া সন্তানদের পড়াশুনা চালিয়ে নেওয়া এবং বৃদ্ধ পিতামাতাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া। কিন্তু ১৯ জুলাই ২০২৪ সালে সে পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, যখন তিনি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হন।
আন্দোলনের সময় আহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশব্যাপী চলছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। চাকরি-বঞ্চিত ছাত্র ও তরুণদের ডাকে লাখো মানুষ। রাজপথে নামে। মো: রবিউল করিম নিজে শিক্ষার্থী না হলেও এই আন্দোলনে নিজের ন্যায্য অধিকারের জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করেন। তিনি আন্দোলনের শুরু থেকেই প্রতিবাদীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত ছিলেন। ১৬ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনের মাঠে সক্রিয়ভাবে ছিলেন। শেষ দিনে, অর্থাৎ ১৯ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে, রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তিনি অবস্থান করছিলেন। সেখানে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অতর্কিতে গুলি চালায়। এই গুলির মধ্যে একটি এসে লাগে রবিউলের বাম পায়ে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের সাধারণ মানুষ তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দ্রুত উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। গুলিটি এমনভাবে লেগেছিল যে, হাড় ভেঙে গিয়ে সংযোগ স্থানে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। এ ঘটনা তাকে শুধু রক্তাক্ত করেনি, বরং তার স্বাধীন চলাফেরার ক্ষমতাও কেড়ে নিয়েছে।
চিকিৎসা প্রক্রিয়া, বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা
রবিউলকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে চারটি অপারেশন করেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পায়ের ভাঙা হাড়ে প্লেট স্থাপন করা হয়। সার্জারির পর তাকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হয়। চিকিৎসা শেষে কিছুটা উন্নতি হলেও বাম পা ১৫ ডিগ্রির বেশি বাঁকা করতে পারেন না। হাঁটা-চলা করতে হয় লাঠির সাহায্যে, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা কাজ করা সম্ভব নয়। ফলে চালকের পেশায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় বললেই চলে। বর্তমানে তিনি কদমতলী ইসলামিয়া হাসপাতালে থেরাপি নিচ্ছেন। নিয়মিতই তাকে ফিজিওথেরাপি নিতে হয়, যার খরচ বহন করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। মানসিকভাবেও তিনি বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছেন। আত্মসম্মানবোধে আঘাত এসেছে। পরিবারের সামনে অক্ষমতা নিয়ে দাঁড়ানো তাকে প্রতিদিন ভেঙে পড়তে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা এখনো চলমান হলেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে অনেক ওষুধ ও থেরাপি বাদ দিতে তিনি বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবারে প্রভাব
আহতের আগে রবিউলের মাসিক আয় ছিল ২৩,০০০ টাকা। সেই টাকাতেই চলছিল পুরো সংসার। এখন সেই আয় একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়ি ভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা সব কিছুতেই তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। মাঝে মাঝে আত্মীয়দের সাহায্য নিতে হচ্ছে, তবে সেটিও নিয়মিত নয়। পিতামাতার ওষুধ কেনা এখন অনেক সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। স্ত্রীর হাতে সামান্য যা থাকে, তা দিয়েই টেনেটুনে চলতে হচ্ছে। রোহান ও রোশনের ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে পড়েছে। বড় ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে, কিন্তু স্কুলে পাঠানো নিয়েই তৈরি হচ্ছে সংকট। ছোট ছেলের পুষ্টিও নিশ্চিত নয়। তিনি নিজেও এখন একজন কর্মক্ষম মানুষ নন। ফলে আত্মত্মবিশ্বাস ও সম্মান দুইই ভেঙে পড়েছে। পরিবার আজও তাকে কেন্দ্র করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে, অথচ বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর।
লেখক কথন
মো: রবিউল করিম একজন শ্রমজীবী মানুষ, যিনি তার ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে আজ পঙ্গু। রাষ্ট্র যদি তার পাশে না দাঁড়ায়, তবে তার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। তার পুনর্বাসন শুধু মানবিক কর্তব্য নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ও।
সহায়তা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তাবনা
১. বর্তমানে মো: রবিউল করিমের পরিবারের জন্য কিছু জরুরি সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তার ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য নিচের পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা প্রয়োজন: এককালীন চিকিৎসা অনুদান: অপারেশনের খরচ, থেরাপি, ওষুধসহ সব কিছু চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা একান্ত জরুরি।
২. সরকারি চাকরি বা আর্থিক সহায়তায় পুনর্বাসন: তার অক্ষমতা বিবেচনায় হালকা কোনো সরকারি কাজ দেয়া যেতে পারে অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রাথমিক পুঁজি প্রদান।
৩. ফিজিওথেরাপির স্থায়ী ব্যবস্থা: কদমতলী ইসলামিয়া হাসপাতালের বাইরে বিশেষায়িত ফিজিও চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে রেফার করতে হবে।
৪. পরিবারের জন্য ভাতা বা খাদ্য সহায়তা: অন্তত ছয় মাসের জন্য পরিবার চালানোর মতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করা দরকার।

এক নজরে রবিউল করিম
নাম: মো: রবিউল করিম
জন্ম তারিখ: ০২-০১-১৯৮৭
জন্মন্মস্থান: কুমিল্লা
পেশা: প্রাইভেটকার চালক (ব্যক্তি মালিকানাধীন)
নিজ জেলা: কুমিল্লা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: লুদিয়ারা, ডাকঘর: পাতড্ডা-৩৫৫০, চৌদ্দগ্রাম, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা: বাসা-মাইনুল ভবন ১৩/৪, এলাকা: রশিদবাগ, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মো: ইছহাক মিয়া, বয়স: ৮০, অসুস্থ
মায়ের নাম: মানোয়ারা বেগম, বয়স: ৭০, অসুস্থ
মাসিক আয়: ২৩,০০০
আয়ের উৎস: মাসিক বেতন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬
স্ত্রী: সুরাইয়া সুলতানা শিলা
সন্তানদের বিবরণ
১. রেজওয়ানুল করিম রোহান, বয়স: ১৪, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৭ম
২. রেহনানুর করিম রোশন, বয়স: ৫
ঘটনার স্থান: রায়েরবাগ বাস স্ট্যান্ড, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময়: ১৯-০৭-২০২৪, বিকাল ৩.০০টা
আক্রমণকারী: পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍