হোম / আহতদের তালিকা / মো. তালহা আহসান ফয়সাল
মো. তালহা আহসান ফয়সাল

মো. তালহা আহসান ফয়সাল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

গ্রাম: ভবানীপুর, ইউনিয়ন: ভবানীপুর: ফুলবাড়িয়া, জেলা: ময়মনসিংহ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলো রূপ নেয় সংঘর্ষে, কারণ তাদের ওপর চালানো হয় রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস, এমনকি প্রাণঘাতী গুলি। বহু তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন; কারও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায় চিরতরে, কেউ চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যান।
মানবিক বিপর্যয় ও জাতিগত সাড়া
এই দমনপীড়ন দেশজুড়ে সৃষ্টি করে এক অভূতপূর্ব আবেগের ঢেউ। হাসপাতালের বারান্দায় রক্তাক্ত যুবকের আর্তনাদ, রাস্তায় পড়ে থাকা ব্যাগ-জুতো, মা-বাবার কান্না সব মিলিয়ে গোটা জাতি যেন থমকে দাঁড়ায়। একদিকে ভয়ে কেউ ঘরে লুকিয়ে পড়ে, অন্যদিকে সাহসী তরুণেরা রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
এই সময় বহু শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #জুলাই আন্দোলন, #গণঅভ্যুত্থান ২০২৪, #শহীদ শিক্ষার্থী, #ঝঃবঢ় ফড়হি ঐধংরহধ ইত্যাদি হ্যাশট্যাগে ভরে যায়।
প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি
সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর হলে আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিন্দা জানায়, এবং কিছু ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি ওঠে। দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই অভ্যুত্থান একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক চেতনা ও প্রতিরোধের স্পৃহা সৃষ্টি করে।
অনেক আন্দোলনকারী নিখোঁজ হয়, কেউ হয় পঙ্গু, আবার কেউ কারাগারে। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা একটি প্রজন্মের চেতনায় স্থায়ী হয়ে যায়।
মোঃ তালহা আহসান ফয়সালের জন্ম ও পরিচয়
জীবন কখনো কখনো এমনভাবে থেমে যায়, যেন সেটি কোনো এক নির্মম নাট্যকারের হাতে লেখা ট্র্যাজেডি। ফয়সালের জীবন তেমনই এক করুণ ও সংগ্রামময় কাহিনী। ফয়সালের বাবা মো. হাসানুর রশিদ মৃত। বাবা নেই তাই আয়ের কোনো উৎস ছিলো না রেখে গেছেন মাত্র অল্প বয়সী এক ছেলে ফয়সালকে। প্রাণপ্রিয় মা মোছা. ফাতেমা খাতুন (৪৩) একজন গৃহিণী, যিনি অসীম মমতা ও নি:স্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের যত্নসহকারে লালন-পালন করেছেন। স্বামী ছাড়া সংসারের হাল ধরে সন্তানদের মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন ফয়সালের মা। অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে ফয়সালকে যার ফলে স্কুলের গন্ডী পেড়নো হয়নি তার। জীবনের তাগিদে ফয়সাল সাভারের একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শ্রমিক হিসেবে চাকরি শুরু করে। ফয়সাল জন্মেছিলেন ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নে, ২০০৬ সালের ৯ আগষ্ট। অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়ে বেড়ে ওঠেন নানা কষ্টে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে ফয়সাল সবার ছোট। বড় বোন রুমা আক্তার (২৪) একজন গৃহিণী এবং বড় ভাই হাসেন আলী (২২) একজন গার্মেন্টস কর্মী।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ


১৪ জুলাই ২০২৩, মোহাম্মদ তালহা আহসান ফয়সাল যখন প্রথমবারের মতো আন্দোলনের মিছিলের ভিড়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তার চোখে ছিল এক অনমনীয় স্বপ্ন একটি ন্যায্য সমাজ, যেখানে ছাত্রের কণ্ঠরোধ হবে না, যেখানে মানুষের অধিকার হবে পবিত্র। সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে তিনি দিন গুনছিলেন পরিবর্তনের। প্রতিটি শ্লোগানে, প্রতিটি ব্যানারে, ফয়সাল খুঁজে ফিরছিলেন স্বাধীনতার নতুন অর্থ।
১৯ জুলাই, এক রক্তঝরা শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষে ফয়সাল সাভারের রাজপথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোদ্ধা ও সাধারণ জনতার সঙ্গে মিশে যান। তাদের কণ্ঠে ছিল মুক্তির ধ্বনি, হাতে ছিল আশা আর অন্তরে ছিল অদম্য সাহস। কিন্তু সেই সন্ধ্যার ছায়া নামতেই, এক নির্মম চিত্র আঁকা হতে শুরু করে ইতিহাসের ক্যানভাসে।
বিকেল গড়াতে না গড়াতেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজপথ। একপাশে ছাত্র-জনতার স্রোত, অন্যপাশে অস্ত্রধারী বাহিনী পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী কর্মীরা। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে, রাত ৮টার দিকে শুরু হয় সম্মিলিত আক্রমণ। আর ঠিক তখনই, একটি গুলি ফয়সালের পা বিদীর্ণ করে দেয়।
মোহাম্মদ তালহা আহসান ফয়সালের বক্তব্য অনুযায়ী, “ওরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আমি চোখে চোখ রেখে দেখেছি সে ব্যক্তি বিজিবির কর্মী, যিনি সোজা তাক করে গুলি ছুড়েছিল।”
গুলি তার পায়ে বিদ্ধ হয়, আর মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চারপাশের চিৎকার, কাঁদতে থাকা বন্ধুরা, রক্তে ভেজা মাটির সঙ্গে একাকার হয়ে যায় তার যন্ত্রণা। প্রতিটি ফোঁটা রক্ত যেন সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছিল একটি স্বপ্নবাজ তরুণের সাহসের, এক আত্মত্যাগী প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। যদিও শারীরিকভাবে তিনি মাটিতে পড়ে যান, তবে তার আত্মা ছিল উঁচুতে। ফয়সালের রক্ত সেই রাজপথে এখনও জমে আছে যেখানে দাঁড়িয়ে হাজারো তরুণ বলেছিল, “আমরা শেষ নই।”
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মো. তালহা আহসান ফয়সাল রাজপথে লুটিয়ে পড়লে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তিনি ভর্তি হন এবং তার চিকিৎসা শুরু হয়। তবে মেডিকেলে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে তার ওপর এবং অন্যান্য আহতদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, হামলাকারীদের নাম মামলায় উল্লেখ না করার জন্য হুমকি দেয়। অনেকের বুকে বন্দুক ধরে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি ২৯ দিন ভর্তি ছিলেন এবং এই সময়ে তার দুইটি অপারেশন করা হয়। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তিনি আরও ১০ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর অবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় তাকে ঢাকা সিএমএইচ (সশস্ত্র বাহিনী হাসপাতালে) স্থানান্তর করা হয়, সেখানে ১টা অপারেশন করা হয়, তারপর পায়ের কোন উন্নতি না হওয়ায় আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য নিটোর পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। ১৩ জুলাই ২০২৫ আরো একটি অপারেশন করা হয়।
বর্তমানে মো. তালহা আহসান ফয়সালের শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। চিকিৎসকদের মতে, তাকে আরও দুই থেকে তিন বছর ক্রাচ বা সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করে চলাফেরা করতে হবে। তার পায়ের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি এবং গুলির স্থানে এখনও ঘা তাজা রয়ে গেছে। পায়ে রিং পরানো আছে।

পারিবারিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা
মো. তালহা আহসান ফয়সালের পরিবার বর্তমানে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তার বাবা জীবিত নেই এবং মা একজন বৃদ্ধা। পরিবারটি একটি জরাজীর্ণ টিনের ভাঙা ঘরে বসবাস করে। তিনি ও তার ভাই ঢাকায় থাকতেন এবং দু’জনেই গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন। তাদের উপার্জনেই পরিবারটির সংসার চলতো।
তবে গত আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. তালহা আহসান ফয়সাল গুরুতর আহত হন এবং এখন বাড়িতে পায়ে রিং লাগানো অবস্থায় রয়েছেন। ফলে তিনি আর কাজ করতে পারছেন না। তার স্ত্রী একজন কওমি মাদ্রাসার ছাত্রী এবং ইতোমধ্যে দাওরায় হাদীস পাস করেছেন।
দুই ভাইয়ের একজন, তালহা আহসান নিজেই, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে রয়েছেন এবং পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। পরিবারের খুব সামান্য ফসলি জমি আছে, যা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তিনি টেক্সটাইলে কাজ করতেন এবং সেখান থেকে ভালো উপার্জন হতো, কিন্তু এখন তিনি সম্পূর্ণভাবে বেকার অবস্থায় আছেন। তিনি একজন হাফেজ।
মো. তালহা আহসান ফয়সালের পরিবার দারিদ্র্য, চিকিৎসা খরচ ও ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চিয়তার মুখোমুখি। মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : পায়ের রিং করানো আছে, উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন । তিন বছর পর পায়ের রিং খুলবে বলে ডাক্তার জানিয়েছেন।
পুর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন : চাকরি, টেক্সটাইল কারখানা
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : একটি মুদি দোকানের ব্যবস্থা করা। পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা


একটি গুলি ফয়সালের
পা বিদীর্ণ করে দেয়জুলাই ২৪ : একটি আত্মত্যাগী প্রজন্মের অভ্যুত্থানের ইতিহাস
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক বাঁক রচনা করে। এই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি হয়ে ওঠে এক আত্মত্যাগী প্রজন্মের গণঅভ্যুত্থান, যা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে এক গর্বিত জাতিগত প্রতিরোধে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো তরুণ-তরুণী যখন বৈষম্য, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করতে শুরু হয় রাষ্ট্রের বর্বর দমন-পীড়ন।

একনজরে মো. তালহা আহসান ফয়সাল
নাম : মো. তালহা আহসান ফয়সাল
জন্ম তারিখ : ০৯-০৮-২০০৩
জন্মস্থান : ভবানীপুরু
নিজ জেলা : ময়মনসিংহ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: ভবানীপুর, ইউনিয়ন: ভবানীপুর: ফুলবাড়িয়া, জেলা: ময়মনসিংহ
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো. হাসানুর রশিদ
মায়ের নাম : মোছা. ফাতেমা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, (৪৩)
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৫,০০০/=
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
আয়ের উৎস : ভাইয়ের আয় (গার্মেন্টস কর্মী)
ভাই-বোনের তথ্য
১. রুমা আক্তার, বয়স: ২৪, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
২. হাসেন আলি, বয়স: ২২, পেশা: গার্মেন্টস কর্মী, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : সাভার, ঢাকা
আক্রমণকারী : আওয়ামী মদদপুষ্ট বি.জি.বি কর্তৃক
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, রাত ৮টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍