হোম / আহতদের তালিকা / জহিরুল ইসলাম খান
জহিরুল ইসলাম খান

জহিরুল ইসলাম খান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা (ঔষধের দোকান)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও পরিচয়
জহিরুল, একজন ফার্মাসিস্ট। তার জন্ম ১৯৭৪ সালের ২ ডিসেম্বর, নেত্রকোনার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে। পিতৃ-মাতৃহীন এই মানুষটি জীবনের কঠিন বাস্তবতায় লড়াই করেই টিকে ছিলেন। ছোট একটি ফার্মেসি ছিল তার। জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে যথেষ্ট না হলেও আত্মসম্মানের সঙ্গে বাঁচার মতো একটি পথ ছিল। তাঁর সংসারে দুই মেয়ে; অথৈ (২০) অনার্সে পড়াশোনা করছে, আর আনিসা (১৪), একজন স্কুল ছাত্রী।
জহিরুলের আয়ের উৎস ছিল সেই ছোট ফার্মেসি, যা থেকে মাসে গড়ে মাত্র ১০ হাজার টাকার মতো আয় হতো।

ঠিক এমন এক সময়ে, নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলা রূপ নেয় প্রতিবাদের এক দুর্বার মোর্চায়। ১৭ জুলাই ২০২৪, যখন দেশের আনাচে কানাচে বিপ্লবের সুর বেজে উঠেছে, তখন সেই ঢেউ এসে পৌঁছায় মদনেও। মুক্তিযুদ্ধ সংসদের নামে আওয়ামী লীগ একটি মাইকিং প্রচার চালায়। উদ্দেশ্য ছিল সহজ: “আমরা মিছিল করবো”, কিন্তু এই ঘোষণার অন্তরালে ছিল হুমকি, ভয়, এবং একরাশ দম্ভ। ছাত্র-জনতাকে জানিয়ে দেওয়া যেন তারা আর রাস্তায় না নামে, না হয় এর ফল হবে ভয়াবহ। কিন্তু ইতিহাস বলেছে, ভয় দেখিয়ে বিপ্লব থামানো যায় না। আর সে ইতিহাস রচনার এক ক্ষুদ্র অংশীদার হয়ে ওঠেন মো. জহিরুল ইসলাম খান।

ছাত্র-জনতার উপর আক্রমণের পরিকল্পনা হয় পূর্বেই
১৮ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২টা। সেদিন মদন উপজেলার জনপথে ছাত্র-জনতা একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করে। তারা পৌরসভার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার বিপরীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন পুলিশ প্রশাসন ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী ইতোমধ্যেই দেশি-বিদেশি অস্ত্রসহ প্রস্তুত ছিল। এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিল আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান ইফতেখারুল ইসলাম। তার নির্দেশে মদনের ওসি, এসিল্যান্ড, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং ছাত্রলীগের গুণ্ডারা একযোগে শিক্ষার্থী ও জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে চড়াও হয়।
ছাত্র-জনতার সাথে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় নির্মম লাঠিপেটা, আক্রমণ, এমনকি গুলিবর্ষণ। রক্তাক্ত হতে থাকে মদনের মাটিও। শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশেই হামলা করা হয় শিক্ষার্থীদের উপর। বিনা উস্কানিতে শিক্ষার্থী ও জনতাকে বেধড়ক লাঠিপেটা, কোপানোর পাশাপাশি গুলি ছুড়ছিল পুলিশ।
আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন জহিরুল ইসলাম খান। তিনি মিছিলে অংশ নেননি। তিনি ছিলেন তার দোকানে, রোগীদের ওষুধ দিচ্ছিলেন, আঘাতপ্রাপ্তদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু তাতেই হয় তার অপরাধ। তার এই মানবিকতা সহ্য হয়নি আওয়ামী ক্যাডারদের। ইফতেখারুল ইসলামের ছাত্রলীগ বাহিনীর ১০-১৫ জন হঠাৎ তার ফার্মেসিতে প্রবেশ করে। না কোনো প্রশ্ন, না কোনো হুঁশিয়ারি; তারা একযোগে হামলে পড়ে জহিরুলের ওপর। তার মাথায় কোপ দেয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে, পিঠে লোহার রড দিয়ে মারে। এতটাই বর্বরভাবে যে, তার শরীর তখন লুন্ঠিত এক প্রতিবাদের ব্যানার হয়ে পড়ে থাকে।
চিকিৎসার সুযোগ হয়নি এলাকায়
নিজে অন্যদের চিকিৎসা দিলেও নিজের চিকিৎসার কোনো সুযোগ ছিল না জহিরুল ইসলামের। স্থানীয়রা তাকে কোনোমতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চলে দীর্ঘ চিকিৎসা। রক্তের দাগ, ব্যথার চিৎকার, অশ্রুর শব্দ, সবকিছু নিয়েই চলে তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আঘাত এতটাই ছিল মারাত্মক যে, তার ডান হাতে তিনটি আঙুল স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে গেছে। এখনো সেই আঙুলগুলো দিয়ে তিনি ওষুধের কৌটা তো দূরের কথা, একটি কলমও ধরতে পারেন না। তাঁর পিঠের আঘাত এখনো মনে করিয়ে দেয় আওয়ামী বর্বরতার গভীরতা।
একটি প্রশ্ন থেকেই যায়; কেন?
জহিরুল ইসলাম কি কেবল এ কারণে আক্রান্ত হলেন যে, তিনি একজন সাধারণ ফার্মাসিস্ট হয়েও আহতদের চিকিৎসা করছিলেন? আওয়ামী লীগের চোখে মানবিকতাও ছিল একটি অপরাধ?
আওয়ামী লীগ তাদের সহযোগী বাহিনী যেন রাষ্ট্রকে এক ভয়াবহ আধিপত্যবাদী লাঠিয়াল কাঠামোতে পরিণত করেছে। যেখানে জনগণ নয়, দলীয় আনুগত্যই মুখ্য। জহিরুলের উপর আঘাত এই ফ্যাসিবাদী কাঠামোর নিষ্ঠুরতার উদাহরণ। জহিরুল মানবিকতা বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ফল তাকে দিতে হয়েছে দেহে রক্ত, চিকিৎসায় অর্থ এবং জীবনভর অপারগতার যন্ত্রণা হিসেবে।
আজ তার দুই মেয়ে শিক্ষাজীবনে লড়াই করছে। অথৈ হয়তো কোনোদিন ভাবেনি তার বাবার স্বপ্ন এভাবে থমকে যাবে। আনিসা হয়তো এখনো জানে না এই রাষ্ট্র একজন সৎ, নিরীহ মানুষকে কীভাবে নিষ্ঠুরতার প্রতীক বানায়। জহিরুলের ফার্মেসি এখন আগের মতো আর নেই। ভাঙা চেয়ার, অচল হাত, মুখে ব্যথার ছাপ সব মিলিয়ে জহিরুল হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য। আওয়ামী লীগ যতই উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট রাষ্ট্রের কথা বলুক না কেন ছাত্র-জনতা জানে এগুলো ছিল ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের একেকটা বুলি মাত্র। যদি এক নিরীহ ও মানবিক মানুষ নিজ দোকানে থেকেও হামলার শিকার হন, তবে সেই উন্নয়ন কেবল বিলবোর্ডে থাকে, বাস্তবতায় নয়।
এই জাতি কি জানবে তার মতো অসংখ্য নীরব শহীদ ও আহতদের গল্প নিয়ে জুলাই এসেছে?
আওয়ামী লীগকে এই নৃশংসতার দায় নিতে হবে। এই আহত দেহের মধ্যেই ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের বীজ লুকিয়ে আছে।
একজন নিরিহ ফার্মাসিস্ট
আওয়ামী বর্বরতার নির্মম সাক্ষী
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাস স্মরণীয় হয়ে থাকবে রক্ত, আগুন আর প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে। ওই সময়, যখন গোটা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের অবসানের জন্য, তখন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলন। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষক, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের উপরও। এ এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যেখানে মানুষের শপথ ছিল জীবন দিয়ে হলেও গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা, ছাত্র হত্যাকারীদের বিচার করা।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. জহিরুল ইসলাম খান
জন্ম তারিখ : ০২/১২/১৯৭৪
জন্মস্থান : জাহাঙ্গীরপুর, মদন, নেত্রকোনা
নিজ জেলা : নেত্রকোনা
পেশা : ব্যবসা (ঔষধের দোকান)
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: জাহাঙ্গীরপুর, ইউনিয়ন: জাহাঙ্গীরপুর, উপজেলা: মদন, জেলা: নেত্রকোণা

পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত হেলেনে ওয়াজ খান
মায়ের নাম : মৃত মাজেদা খানম
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. অথৈই, বয়স: ২০, পেশা: অনাসের্র ছাত্রী, সম্পর্ক: মেয়ে
২. আনিসা, বয়স: ১৪, পেশা: ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী, সম্পক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পূর্ব পাশে
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪; দুপুর: ১২টা
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান ইফতেখারুল ইসলাম ও তার সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী
প্রস্তাবনা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍