হোম / আহতদের তালিকা / মো: দুলাল
মো: দুলাল

মো: দুলাল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ব্যবসা (বেকারিতে তৈরি ফুড ডেলিভারি করেন)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

প্রান্তিক যুবক দুলালের পরিচয়
২০২৪ সালের উত্তাল জুলাই আন্দোলনের ঢেউ যখন সারা দেশের রাজপথে আছড়ে পড়ছিল, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের চৌরাস্তা মোড়ও হয়ে ওঠে প্রতিরোধের এক স্পন্দিত কেন্দ্র। সেই আন্দোলনের সূচনা থেকেই নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ছিলেন এক সংগ্রামী যুবক, যিনি শুধু নিজের অধিকারের জন্য নয়, গোটা জনগণের মুক্তির আশায় বারবার রাজপথে নামেন। মো: দুলাল একজন প্রান্তিক ব্যবসায়ী। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার জামলিপাড়া গ্রামে বসবাস করেন। ১২ অক্টোবর ১৯৮২ সালের জামলিপাড়া গ্রামে তার জন্ম। বর্তমানে তিনি নিজ গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
পেশাগতভাবে তিনি একটি বেকারির মাধ্যমে খাদ্যপণ্য তৈরি ও ডেলিভারির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাসিক আয় মাত্র ৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে তিনি ৯ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ অতি কষ্টে চালিয়ে নেন। তার বাবা মৃত শামসুল হক এবং মা মোছা: সুফিয়া বেগম, একজন গৃহিণী। তার চার সন্তানের মধ্যে রজব আলী (২০) অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় ছেলে শাওন (১৩) হেফজ বিভাগে পড়ছে। তৃতীয় ছেলে সাগর (৫) শিশু শ্রেণিতে এবং সর্বকনিষ্ঠ সন্তান সিয়ামের বয়স মাত্র ১৫ মাস। অত্যন্ত সীমিত আয়ের মধ্যে তিনি সন্তানদের শিক্ষা ও ভরণ পোষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। জুলাই আন্দোলনে ঠাকুরগাঁওয়ে মিছিলে নেমেছিলেন দুলাল। পুলিশের ছেঁাড়া রাবার বুলেট তার শরীর ও মাথায় আঘাত করে। তিনি কেবল একজন পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল পিতাই নন, দেশের মানুষের মুক্তির জন্য তিনি রাজপথেও লড়াই করেছেন। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের বিরুদ্ধে রাজপথে তাঁর মতো সাধারণ মানুষ নেমে এসেছিল বলেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের এই জনপদে সে দিনগুলোতে তার মতো অনেকেই রাস্তায় নেমেছিলেন। দুলালের জীবন কষ্টসাধ্য হলেও আত্মসম্মানবোধে ভরপুর এবং ভবিষ্যতের আশায় তিনি নিরন্তর পরিশ্রম করে চলেছেন।
জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের উপর আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বর্বরতা
২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থান বাংলাদেশে এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন যার সূচনা ঘটে ছাত্র হত্যার মধ্য দিয়ে। যার মূল চেতনায় ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের আত্মপ্রকাশ। এই আন্দোলনে ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, দিনমজুর ও সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই গণআন্দোলনের জবাবে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সম্মিলিত শক্তি যে বর্বরতা চালায়, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা—উপজেলার শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, গাজীপুরসহ অনেক এলাকায় দেখা যায় ভয়াবহ দমন—পীড়নের চিত্র। মিছিলের উপর বিনা উসকানিতে পুলিশ গুলি চালায়, টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের। সর্বত্র আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা পুলিশের সহায়তায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়, বাড়িঘরে ঢুকে ভাংচুর ও মারধর করে।
আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী এমনকি পথচারীরাও এই বর্বরতার শিকার হন। রাবার বুলেট, গুলি ও লাঠিচার্জে বহু মানুষ আহত হন, অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। আহতদের অনেকেই চিকিৎসা নিতে ভয় পান, কারণ হাসপাতালগুলোতেও পুলিশী নজরদারি ও হয়রানি চলতে থাকে। এই দমন—পীড়ন শুধু একটি রাজনৈতিক শক্তির পতন ঠেকানোর প্রয়াস নয়, বরং এটি ছিল জনগণের ন্যায্য অধিকারকে স্তব্ধ করে দেয়ার এক নির্লজ্জ প্রয়াস। তবে ইতিহাস বলে, বর্বরতা দিয়ে কখনোই সত্যকে দমিয়ে রাখা যায় না। এই রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলন, বর্বরতার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে থাকবে।
জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ
৪ আগস্ট সকাল থেকেই তিনি ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তা মোড়ে জমায়েত হওয়া ছাত্র—জনতার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, বুক উঁচিয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন ফ্যাসিবাদের পতন চাই, মানুষের অধিকার চাই। কিন্তু সে দিন ছিল রক্তাক্ত। ছাত্র—জনতার উপর চড়াও হয় পুলিশ ও শাসক দলের সন্ত্রাসীরা। দফায় দফায় সংঘর্ষ বাঁধে, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে কাঁদানে গ্যাস ও ধেঁায়ার গন্ধে। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। পুলিশের রাবার বুলেট ছুঁড়ে মারার সময় তার মাথা ও শরীরে কয়েকটি গুলিবিদ্ধ হয়। তিনি রাস্তায় লুটে পড়ে যান।
তখনই আশপাশের সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চলে আসতে হয় নিরাপত্তার ভয়ে। হাসপাতালগুলোতেও তখন আওয়ামী হায়েনার আক্রমণের ভয়। আহতদের চিকিৎসার অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল ফ্যাসিবাদের উচ্ছিষ্টভোগীরা। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পলায়নের পরবর্তী কয়েকদিন পর অন্য দু’টি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। গুলি বের করতে হয় তার শরীরর ক্ষতস্থান থেকে।
গুরুতর আঘাতে তার শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্তাক্ত প্রতিরোধের চিহ্ন। তবে তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল পরিবারের দুশ্চিন্তা। কারণ, তিনিই পরিবারের একমাত্র ভরসা। তার কাঁধেই বিধবা মা, এক প্রতিবন্ধী বোন ও সন্তানের ব্যয়ভার বহনের দায়। তাদের মুখের আহার, ওষুধ, চলাফেরা সবই নির্ভর করে তার উপার্জনের উপর। তারই একমাত্র সন্তান, যিনি একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়েন, সেও সেদিনের আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আহত হয়। এ যেন এক পরিবারের সম্মিলিত আত্মত্যাগ, যারা জাতির ভবিষ্যতের জন্য আজকের নিরাপত্তা বিসর্জন দেয়। এই ব্যক্তিগত যন্ত্রণাগুলো মিলেমিশে হয়ে ওঠে জাতির সংগ্রামের প্রতীক। হাজারো খেটে খাওয়া মানুষের মতো তিনিও রাজপথে এসেছেন, এসেছেন মুখথুবড়ে পড়া গণতন্ত্রকে আবার দাঁড় করাতে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এ ছিল মানুষের পুঞ্জীভূত বিক্ষোভের বিস্ফোরণ। সেই আন্দোলন শুধু একটি সরকারের বিদায়ের ডাক ছিল না বরং এটি ছিল এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের অবসানের আকুতি।
আজ তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ, তবে তার ভেতরের ক্ষত এখনো জেগে আছে। যে স্বপ্ন ও বিশ্বাস নিয়ে তিনি রক্তাক্ত রাজপথে হেঁটেছেন, তা এখনও তাকে চালিত করে। তার জীবন কাহিনী শুধু একটি ব্যক্তি বা একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি এক সংগ্রামী জাতির কণ্ঠস্বর, যারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে সামনে এগিয়ে চলে। বুকের রক্তে লেখে নতুন ভোরের ইতিহাস।
মো: দুলালের মতো আন্দোলনকারীদের জন্য পুনর্বাসনের মানবিক প্রস্তাবনা
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে মো: দুলালের অংশগ্রহণ ছিল একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ঠাকুরগাঁওয়ের চৌরাস্তা মোড়ে পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হয়েও তিনি পিছপা হননি। তিনি নিজে দিন আনে দিন খায় শ্রেণির একজন, যিনি বেকারির সামান্য ব্যবসা করে পরিবার চালান। এমন একজন মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু কাগজে—কলমে সহানুভূতি নয়, বাস্তবভিত্তিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
তার মতো আহত ও ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের মাসিক পুনর্বাসন ভাতা প্রদান আবশ্যক। স্থানীয় পর্যায়ে তাকে উপযুক্ত ব্যবসা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও প্রয়োজন যাতে তিনি সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। সবশেষে, যেহেতু তিনি নিজ বাড়িতে পরিবারের দায়িত্বে নিয়োজিত, তাই ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা তাকে স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: দুলাল
জন্ম তারিখ : ১২ অক্টোবর ১৯৮২
জন্মস্থান : জামলিপাড়া, সালন্দর, ঠাকুরগাঁও সদর, ঠাকুরগাঁও
পেশা : ব্যবসা (বেকারিতে তৈরি ফুড ডেলিভারি করেন)
প্রতিষ্ঠান : বেকারী
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: জামলিপাড়া, ইউনিয়ন: সালন্দর, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত শামসুল হক
মায়ের নাম : মোছা: সুফিয়া বেগম, বয়স: ৫৫, পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ৫ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৯ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. রজব আলী, বয়স: ২০, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: অনার্স ৩য় বর্ষ, সম্পর্ক: ছেলে
২. শাওন, বয়স: ১৩, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: হেফজ বিভাগ, সম্পর্ক: ছেলে
৩. সাগর, বয়স: ৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: শিশু, সম্পর্ক: ছেলে
৪. সিয়াম, বয়স: ১৫ মাস, শিশু, সম্পক: ছেলে
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; বিকাল ৩.৪৫ মিনিট
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍