হোম / আহতদের তালিকা / মো: হাফিজুর রহমান
🕯️

মো: হাফিজুর রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: ব্যবসা (ফুড ডেলিভারি)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

হাফিজুর রহমান, একটি নাম, এক মুখ, একটি সংগ্রামের গল্প। ১৯৮৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর পশ্চিম গ্রামে তার জন্ম। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার এই নিরীহ গ্রামের সন্তান জীবনের কঠিন বাস্তবতা বুকে ধারণ করে জীবন সংগ্রামে নেমেছেন বহু আগেই। ছোট্ট একটি পরিবার। বয়:বৃদ্ধ বাবা ইউনুস আলী (৬২), মা সাহাদে বেগম (৫২), আর দুই সন্তান রিয়াদ ইসলাম (৯ম শ্রেণির ছাত্র) ও মো. সোয়াদ (১ম শ্রেণির শিক্ষার্থী); এই চারজনকে নিয়েই তার সংসার। পরিবারের ভরণপোষণের পুরো দায়িত্ব একাই নিজের কাঁধে বহন করেন তিনি।
তার আয়ের একমাত্র উৎস হলো স্থানীয় বেকারিতে ফুড ডেলিভারির কাজ। মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা আয় করে তিনি চেষ্টা করেন যেন সন্তানদের লেখাপড়া থেমে না যায়, বৃদ্ধ মা—বাবার ওষুধের অভাব না হয় এবং ঘরে যেন দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা থাকে। এ এক অসম লড়াই। নীরব অথচ মহৎ।
পুলিশের গুলি এসে বিদ্ধ করে চোখ
হাফিজুর রহমান, দুই সন্তানের জনক। এই মানুষটি স্থানীয় বাজারে ছোট পরিসরে বেকারির ফুড ডেলিভারির কাজ করতেন। সংসারের চাহিদা মেটানো, সন্তানদের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা—মায়ের যত্ন সব কিছু মিলিয়ে তার জীবন ছিল ব্যস্ত এবং সংগ্রাম মুখর। তবুও তিনি নিজেকে কেবল পরিবারের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বৈষম্য ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, তখন তিনিও সে ঢেউয়ের অংশ হয়ে উঠেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেন এমন একটি রাষ্ট্রে গড়ে উঠবে, যেখানে মানুষ হবে সমানাধিকারের অধিকারী, যেখানে দুঃখী মানুষের কণ্ঠস্বর দমন করা হবে না।
এই বিশ্বাস থেকেই ৪ আগস্ট দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে তিনি ঠাকুরগাঁও কোর্ট চত্বরে আন্দোলনের প্রথম সারিতে অবস্থান নেন। চিৎকার, শ্লোগান আর মুষ্টিবদ্ধ হাতে যখন মানুষ প্রতিবাদ করছিল, হাফিজুর ছিলেন তখন অন্যতম কণ্ঠ। সেই সকালের সাহসী দৃশ্য হঠাৎই পরিণত হয় এক বিভীষিকায়। বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই নিরীহ মানুষটি ক্ষোভে—দুঃখে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের সাথে স্লোগান ধরেছিলেন। কিন্তু সহ্য হয়নি স্বৈরাচারী বাহিনীর। তার দিকে হঠাৎ করেই ছুটে আসে বর্বরতার হাত। পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ আক্রমণে চোখে গুলিবিদ্ধ হন হাফিজুর। তার শরীরে পড়ে লাঠির আঘাত, গরম নীল রক্ত ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের পথে। পুলিশের ছেঁাড়া রাবার বুলেট চোখে বিদ্ধ হলে রক্তে ভিজে যায় চারপাশ। হাফিজুরের ভাষ্যমতে, তিনটি রাবার বুলেট সরাসরি তার চোখে আঘাত করে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারান।
আতঙ্কিত ছাত্র—জনতা তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার আহত শরীর, রক্তাক্ত চোখ যেন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় দমন—নীতির এক নীরব সাক্ষ্য। হাফিজুর রহমানের গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয় এটি হাজারো সাধারণ মানুষের, যারা স্বপ্ন দেখে একটি সুন্দর রাষ্ট্রের, যারা সাহস করে রাজপথে নামে, এবং যারা বুলেটের মুখেও সত্য উচ্চারণ করতে জানে। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের পথ কখনো সহজ নয়, কিন্তু সাহসীরা সে পথেই হেঁটে ইতিহাস সৃষ্টি করে।
চোখে রয়ে গেছে গুলি, অপারেশন অসম্ভব
চোখে রাবার বুলেট বিদ্ধ হওয়ার পর হাফিজুর রহমান প্রথমে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। তবে সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আক্রমণের আশঙ্কায় সেখানে বেশি সময় ভর্তি থাকা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসার চেয়ে তখন তার নিজের ও সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পান। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীর পথে রওনা দেন চোখের চিকিৎসার জন্য।
তিনি প্রথমে চিকিৎসা নেন ‘দীপ আই কেয়ার ফাউন্ডেশনে’। সেখানে তার চোখের অবস্থা বিশ্লেষণ করে আরও উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেয়া হয়।
এরপর হাফিজুর ভর্তি হন ঢাকার সামরিক হাসপাতাল ঈগঐ—এ। সেখানকার চিকিৎসকেরা তার চোখ পরীক্ষা করে তাকে পাঠান জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। সেখানে বিস্তারিত চেকআপের পর জানানো হয় তার ডান চোখের নিচে একটি রাবার বুলেটের ছররা রয়ে গেছে, যেটি অপসারণ করলে চোখের আরও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। চিকিৎসকের ভাষায়, অস্ত্রোপচার করলে একেবারে দৃষ্টিশক্তি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে তার চোখে মাত্র ৫০ শতাংশ আলো অবশিষ্ট আছে। এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় হাফিজুরের এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। একটি দিনমজুর শ্রেণির মানুষের জন্য এটি শুধু আর্থিক বোঝাই নয়, বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার এক কালো ছায়া। কিন্তু তবুও তিনি বিশ্বাস রাখেন, এই চোখের ক্ষতির চেয়েও বড় হলো ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস। তার প্রতিটি যন্ত্রণাই আজ হয়ে উঠেছে একটি ন্যায্য স্বপ্নের সাক্ষ্য।
আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী দমন নীতি ও জনতার অধিকারের অপহরণ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ দলটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক ফ্যাসিবাদী শক্তিতে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল ভিন্নমত দমন, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল এই দমননীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আত্মপ্রকাশের সর্বশেষ প্রয়াস। হাজারো শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ যখন রাজপথে দাঁড়িয়ে মুক্তির শ্লোগান তোলে, তখন আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন ও সহযোগী সংগঠন এবং পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামে লাঠি, রাবার বুলেট আর টিয়ারগ্যাস নিয়ে। ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত কোথাও রেহাই পায়নি শান্তিপূর্ণ মিছিল। এই হামলাগুলো কেবল শারীরিক আঘাতই নয়, বরং ছিল নাগরিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার সব কিছুকে দমন করে রাখার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারই অংশ ছিল। মানুষের কণ্ঠরোধ করতে গিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখ উপড়ে ফেলেছে, শ্রমিকদের হাড় ভেঙেছে, মা—বোনদের ওপর চালিয়েছে নির্মম নির্যাতন। আওয়ামী লীগের এই ফ্যাসিবাদী কৌশল গোটা জাতিকে ভয় ও আতঙ্কে জর্জরিত করে তুলেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না এটা ইতিহাসই শিক্ষা দেয়। এই প্রজন্ম আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের দমন—পীড়ন মানুষকে আরও সংগঠিত করছে, আরও প্রতিবাদী করে তুলছে। আওয়ামী লীগ যেভাবে জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তার ইতিহাস হাফিজুর রহমানের মতো হাজারো মানুষ।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: হাফিজুর রহমান
জন্ম তারিখ : ৩০/১২/১৯৮৬
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ব্যবসা (ফুড ডেলিভারি)
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সালন্দর পশ্চিম, ইউনিয়ন: সালন্দর, থানা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: ইউনুস আলী
মায়ের নাম : মোছা: সাহাদে বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : বয়স: ৬২ (বয়:বৃদ্ধ)
মায়ের নাম ও পেশা : বয়স: ৫২, পেশা: গৃহিণী (বয়োবৃদ্ধ)
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : তরকারি ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. রিয়াদ ইসলাম, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৯ম, সম্পর্ক: ছেলে
২. মো. সোয়াদ, বয়স: ৬, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : কোর্ট চত্বর, বটগাছের সামনে, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১টা ১৫ মিনিট
আক্রমণকারী : পুলিশ, ছাত্রলীগ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍