জুবায়ের হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
জুবায়ের হোসেন কিশোরগঞ্জের চর নোয়াকান্দি গ্রামের এক শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান, যিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে ঢাকা এসে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯ জুলাই ২০২৪ পুলিশের ছোড়া বুলেটে তিনি গুরুতর আহত হন। যে দুটি বুলেট আজও তার পায়ের ভেতরে রয়ে গেছে। চিকিৎসা, আর্থিক সংকট ও অবহেলার মধ্যেও তিনি টিউশন করে নিজে ও পরিবারকে সামলাচ্ছেন। ন্যায়, সমান অধিকার ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্নে তিনি আজও দৃঢ়। রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পেলেও তিনি ন্যায়, মানবিকতা ও সমঅধিকারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুবায়ের হোসেন
পেশা: ছাত্র
ক্রমিক: ০০২
আইডি: ঢাকা সিটি ০০২
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
জুবায়ের হোসেনের জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন তার পরিবারে একটি নতুন মুখ মানে ছিল একদিকে নতুন আনন্দ অন্যদিকে নতুন এক দুশ্চিন্তা। ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর, কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি থানার চর নোয়াকান্দি গ্রামের একটি ভাঙাচোরা মাটির ঘরে তার জন্ম হয়। চারদিকে ধানের মাঠ, নদীর ধারে কুয়াশা জমা ভোর, কিন্তু ঘরের ভেতরে তখন নিঃস্বতার দীর্ঘশ্বাস। বাবা রতন মিয়া একজন কৃষক। কৃষিকাজ করে জীবিকা আহরণ করেন। একজন কৃষক পিতার ন্যয় ও সততা এই দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আনতে কাজ করেছে। তার সুশিক্ষায় সন্তান জুবায়ের যেন নতুন বাংলাদেশ আনতে নিজের জীবন বাজী ধরেছিলেন। জননী পারভীন শুধু গৃহিনী নয়। তিনি একহাতে পরিবার সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্যদিকে নিজের সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব পালনে যেন অনন্য। জুবায়ের বড় হয়েছিলো এমন এক ঘরে, যেখানে রাত মানে ছিল অনিশ্চয়তা, আর সকাল মানে ছিল বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। কখনো খালি পেটে ঘুমাতে গিয়েছেন, কখনো স্কুলে গেছেন ছেঁড়া ব্যাগে পুরোনো বই নিয়ে। তার পায়ের জুতো ছিল জোড়া লাগানো, জামা ছিল কাউকে দিয়ে যাওয়া পুরোনো পাঞ্জাবি। তবু তার চোখে ছিল স্বপ্নের দীপ্তি, এই দারিদ্র্য তার আত্মাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সে জানত, তার জীবন এমন হতেই পারে, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ সে নিজেই গড়বে।
প্রথম শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রতিদিন খালি পায়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেত সে, গ্রীষ্মের খরতাপ কিংবা শীতের শিশিরভেজা সকাল কোনোটিই তাকে থামাতে পারেনি। খুদে সেই ছাত্রটির মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত নীরব জেদ। স্কুলের বারান্দায় বসে সে শুধু পড়াশোনাই করতো না, তাকিয়ে থাকত আকাশের দিকে। সেখানে সে দেখত মুক্তির রং, দেখত এক অন্য রকম জীবনের ইশারা।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য একসময় পাড়ি জমায় ঢাকা শহরে। রাজধানীর কদমতলী থানার জাপানি বাজার এলাকায় একটি পুরনো মেসে উঠেন, যেখানে ঘরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে বর্ষায়, আর শীতকালে দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে
ঠান্ডা হাওয়া। সেখানে থেকে সে চালাতে থাকে পড়াশোনা আর টিউশনি, কখনো এক বেলা না খেয়ে খরচ বাঁচিয়ে দেয় তার বই কেনার টাকা।
জীবন তার কাছে কখনো দয়ালু ছিল না। বরং প্রতিটি ধাপে ধাপে তার পরীক্ষা নিয়েছে কখনো অভাবে, কখনো অবহেলায়, কখনো অপমানের ঘা দিয়ে। তবু সে হেরে যায়নি। কারণ তার বুকের ভিতর গেঁথে ছিল একটি উপলব্ধি "আমার জীবন কষ্টের হতে পারে, কিন্তু আমি চাই না আমার সন্তানের জীবনেও একই কষ্ট ফিরে আসুক।" এই উপলব্ধিই তাকে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছে, তার অস্তিত্বকে দিয়েছে এক প্রতিবাদী চেতনার রূপ।
তার বেড়ে ওঠা কেবল একজন মানুষ হিসেবে বড় হওয়া নয়, তা ছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক অনমনীয় প্রতিরোধের কাহিনি।
আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাওয়া
জীবনের প্রতিটি ধাপে যে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছিল জুবায়ের, সেই সংগ্রাম তাকে শুধুমাত্র এক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেনি, বরং বাঙালির ইতিহাসের অন্য এক লড়াকু রূপে দাঁড় করিয়েছে। উচ্চশিক্ষার ছাত্র হিসেবে শুধু নিজের জীবন বদলানোর স্বপ্নই নয়, বরং সমাজের বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার পবিত্র দায়িত্বও বুঝতে শুরু করেছিল সে। ঢাকার কদমতলীর ছোট্ট মেস থেকে শুরু করে কলেজের ক্লাসরুম পর্যন্ত, জুবায়ের দেখত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দগদগে এক বেদনা আর অভুক্ত স্বপ্নের ছাপ। চারপাশে প্রচণ্ড বৈষম্য, আর্থিক অন্যায়, শিক্ষা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার সবকিছুতে অসাম্য। এসব দেখে সে একদিন নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো দাঁড়াবে প্রতিবাদের মঞ্চে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন দেশের যুবসমাজ রাস্তায় নেমে আসে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, জুবায়ের সেই তরুণ প্রজন্মের এক মুখ্য সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তার চোখে ঝরে পড়ছিল শুধু ক্রোধ নয়, ছিল এক বিশাল আশা একটা নতুন বাংলাদেশের জন্য যা হবে সকলের সমান অধিকার আর মুক্তির দেশ। পুলিশের হাতে নির্যাতিত হাজারো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, স্বপ্ন দেখাতে ও লড়াই করতে সে নিজেকে নিবেদন করেছিল। জুবায়ের জানত, এই লড়াই শুধু আজকের জন্য নয়, আগামীর জন্যও: নিজের জন্য নয়, দেশের হাজারো স্বপ্নদ্রষ্টার জন্যও। সে নিজের কষ্ট ভুলে যেত মানুষের মুক্তির স্বার্থে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা তার জীবনের এক বিরাট বাঁক ছিল। তার দুর্বল শরীর, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা ভয়ের কোনো অস্ত্র ছিল না তার কাছে, কেবল ছিল এক কঠিন দৃঢ়তা আর স্বপ্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করার অদম্য জেদ। জুবায়ের হোসেনের এই আন্দোলনের পথে পা বাড়ানো ছিল একটি ছোট থেকে শুরু হলেও, তার সাহস ও আত্মত্মত্যাগের বড় গল্প, যা অনুপ্রেরণা দেয় দেশের প্রত্যেক অসহায়, বঞ্চিত তরুণকে। রক্তাক্ত বিকেল (১৯ জুলাই, ২০২৪)
সে ছিল এক অসাধারণ বিকেল, এক ভয়াবহ বিকেল যা জুবায়ের হোসেনের জীবনের ছন্দ একেবারে ভেঙে দেয়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকা শহর ছিল উত্তাল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তাল যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে হাজারো তরুণ স্লোগানে স্লোগানে উচ্চারণ করছিল-"এই বৈষম্য মানি না", "সবার শিক্ষা, সবার সমান অধিকার চাই।" জুবায়ের হোসেন সেই স্রোতের একজন। চোখেমুখে ছিল আগুনের মতো দৃঢ়তা, কণ্ঠে ছিল সত্যের দাবিতে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। মিছিল এগিয়ে যাচ্ছিল যাত্রাবাড়ী থেকে দক্ষিণের দিকে, হঠাৎই পুলিশি বাহিনী ফ্লাইওভারের নিচে ব্যারিকেড তৈরি করে। উত্তেজনা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের উপর শুরু হয় গুলি, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস। চারদিক ছাপিয়ে যায় চিৎকার, ধোঁয়া আর রক্ত। জুবায়ের তখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সে কাউকে ধাক্কায় ফেলে পালায়নি, বরং সহযোদ্ধাদের আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিল বুক চিতিয়ে। সে পুলিশের গাড়িতে সরাসরি আক্রমন করতে যায় ঠিক তখনই তার দিকে সোজা তাক করে রাবার বুলেট ছুড়ে মারে পুলিশ।
দুটি রাবার বুলেট একসঙ্গে এসে আঘাত হানে তার হাঁটুর ওপরে। তীব্র ব্যথায় মাটিতে লুটিয়ে
পড়ে জুবায়ের, আশপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। কিন্তু সে তখনো বুঝে উঠতে পারেনি যে এই বুলেট দু'টি শুধু তার শরীর নয়, তার ভবিষ্যতের ওপরও গভীর ক্ষত তৈরি করে গেছে। তাকে উদ্ধার করে আশ্রয়ে নিয়ে যায়। সেই বিকেল আর জুবায়েরের শরীর যেন দুটোই চিরতরে ভেঙে পড়ে একটি দেশের রাষ্ট্রীয়। বর্বরতার সামনে, আরেকটি তরুণ স্বপ্নবাজ এক মনের শরীরী অস্তিত্বে। তখন হয়তো কেউ জানত না, এই তরুণের পায়ের গভীরে রয়ে যাবে সেই রাবার বুলেট দু'টি যা আজও তার শরীরের ভেতরে চাপা হয়ে আছে, প্রতিটি হাঁটার সাথে দগদগে স্মৃতির মতো ফিরে আসে। ১৯ জুলাই শুধু একটি দিনের নাম নয় তা জুবায়েরের জীবনে এক রক্তাক্ত চিহ্ন, যা সে বয়ে বেড়ায় প্রতিটি মুহূর্তে।
পায়ে গাঁথা বুলেট, জীবনে গাঁথা যন্ত্রণা
যে বিকেলে দুইটি রাবার বুলেট এসে আঘাত হেনেছিল জুবায়ের হোসেনের হাঁটুর ওপর, সে বিকেলটা যেন কেবল তার শরীরেই নয়, তার সারা জীবনের গতিপথে গেঁথে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলেন শরীর থেকে বুলেট বের হয়ে গেছে। সেই ব্যথাকে চেপে ধরে, টিউশনি করে হেঁটে চলেছিলেন দিনের পর - দিন। ভেতরের যন্ত্রণার কথা চাপা দিয়ে ক্লাসে গিয়েছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন, খাবার রান্না করেছেন, মেসে ফিরে আবার ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে গিয়েছেন যেন জীবন একই গতিতে চলবে। কিন্তু না, ব্যথা থামেনি। বরং প্রতিটি হাঁটায়, প্রতিটি ঘুমে, প্রতিটি বসায় সেই ব্যথ্য আরও গভীর হয়েছে। হাঁটার সময় পায়ের ভেতরে চুলকায়, যেন শরীর চিৎকার করে বলছে ভেতরে কিছু আছে, যা এখানে থাকার কথা নয়। অবশেষে যখন এক্স-রে করানোর সুযোগ হলো, তখনই প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয় তার পায়ের ভেতর আজও গেঁথে আছে সেই দুই রাবার বুলেট। চিকিৎসক বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে বলেন, "এই অবস্থায় তুমি এতদিন চলছো কীভাবে?"
অপারেশন ছাড়া এই বুলেট শরীর থেকে বের করা যাবে না। কিন্তু অপারেশনের জন্য প্রয়োজন অর্থ, যা তার কাছে নেই।
এই তরুণ যোদ্ধা যিনি রাষ্ট্রীয় গুলির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরকে ঢাল করেছিলেন, আজ সেই রাষ্ট্রের কাছ থেকেই চিকিৎসা পাওয়ার মতো সামান্য ন্যায্যতাটুকুও পাননি। প্রতিটি সকালে ঘুম ভাঙে যন্ত্রণার সঙ্গে, প্রতিটি রাতে ঘুমাতে যান এক অস্পষ্ট ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নিয়ে। পা ফুলে যায়, ব্যথা তীব্র হয়, ক্লাসে যেতে সমস্যা হয়, মসজিদে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ কেউ জানে না তার প্যান্টের নিচে, হাঁটুর ভেতরে গেঁথে আছে আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত বিকেলের সাক্ষী দুটি বুলেট। তারা আজও রয়ে গেছে, যেন জীবন্ত স্মৃতি হয়ে। এই যন্ত্রণা শুধু শারীরিক নয় এটি মানসিক, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে একজন তরুণের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নীরব শান্তি। জুবায়ের হোসেন এখন শুধু ব্যথা নয়, অপারেশনের ভয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর দায়হীন রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা নিয়ে বেঁচে আছেন। একদিন হাঁটার সময় হঠাৎ থমকে গিয়ে হয়তো তিনি ভাবেন এই পা যদি ঠিক হতো, যদি সেই দিন বিকেলটা অন্যরকম হতো, তাহলে তার জীবনটা কি আজ এইরকম হতো? কিন্তু জুবায়েরের চোখে আজও একটুকরো দৃঢ়তা থাকে, কারণ তিনি জানেন এই যন্ত্রণা যেন বৃথা না যায়।
অবহেলিত জীবন ও রাষ্ট্রের নীরবতা
একজন তরুণ যখন নিজের স্বপ্ন, সাহস আর ভবিষ্যৎকে পায়ে পিষে রেখে রাস্তায় দাঁড়ায় অন্যায়ের প্রতিবাদে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তখন সে কেবল নিজের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য দাঁড়ায়। জুবায়ের হোসেন তেমনই একজন, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রীয় গুলির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু আজ, সেই রাষ্ট্রই তার সবচেয়ে বড় অনুপস্থিত সাথী।
আন্দোলনের সময় তার শরীরে গাঁথা রাবার বুলেট এখনো রয়েছে অস্ত্রোপচার না হওয়া পর্যন্ত। ব্যথা প্রতিদিনের সঙ্গী, অথচ সাহায্যের কেউ নেই। কোনো সরকারি চিকিৎসা নেই, কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, এমনকি একটি ফোন কল পর্যন্ত আসেনি সরকারি দপ্তর বা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে। তার বাবা একজন দিনমজুর, মা গৃহিণী। পরিবার কোনোভাবেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে না। অথচ এই যুবকই শিক্ষিত হওয়ার জন্য নিজের খাবার কমিয়ে, টিউশনি করে খরচ চালায়। রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হবার পরও তাকে নিজের চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে একজন আহত নাগরিক হিসেবে তার কোনো অধিকার যেন নেই। রাষ্ট্র তাকে দেখেছে শুধুমাত্র একটি 'উপদ্রবকারী আন্দোলনকারী' হিসেবে। তার বুলেটবিদ্ধ পা দেখে কেউ বলে না এই পায়ে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রের নৃশংসতা গাঁথা। তার যন্ত্রণা যেন কারও কাছে কোনো দায় সৃষ্টি করে না, বরং তাকে বোবা সহ্য আর নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
যে তরুণের চোখে ছিল নতুন সমাজের স্বপ্ন, আজ তার চোখে ঘুম নেই আছে অনিশ্চয়তা, অবহেলা আর উপেক্ষার জমে থাকা বিষ। রাষ্ট্রের নীরবতা যেন এক ধরনের শান্তি, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় তুমি একা, তুমি অবাঞ্ছিত। জুবায়েরের গল্প আজ দেশের হাজারো আহত তরুণের প্রতিচ্ছবি। যারা মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করেছিল, আজ তারা মাথা নিচু করে ব্যথা লুকিয়ে রাখে, যেন সমাজ আর রাষ্ট্র তাদের ভুলে না যায়। এই নীরবতা কেবল নিষ্ঠুরতা নয় এটা অপরাধ। যারা দেশের জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তাদের পাশে না দাঁড়ানো মানে ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।
টিউশন, মেসজীবন ও ভাঙা শরীরের ভার
রাষ্ট্র যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন জীবন চলে ব্যক্তিগত দায়বোধ আর অসীম সহ্যশক্তির উপর ভর করে। জুবায়ের হোসেনের জীবন যেন তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। রাষ্ট্র দায়িত্ব নেয়নি, হাসপাতাল দিয়েছে কেবল ব্যথানাশক, প্রতিবেশীরা দিয়েছে সান্ত্বনা কিন্তু নিজের জীবন চালাতে তাকে একাই দাঁড়াতে হয়েছে সমস্ত অভাব-অনটনের মুখোমুখি। ঢাকার কদমতলীর একটি ছোট্ট মেসে তিনি থাকেন এখন। ঘরটির দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে, ঘরের এক কোণে একটি চৌকি, এক পাশে বইয়ের স্তূপ। শরীরের ব্যথা সঙ্গী হলেও থেমে যাননি। চলছেন, কারণ থেমে গেলে জীবন থেমে যাবে। প্রতিদিন সকালে ব্যথা নিয়ে উঠে যান টিউশনিতে দু'একটা ছাত্রকে পড়িয়ে যে টুকু আয় হয়, তা দিয়েই চলে নিজের ওষুধ কেনা, খাবার, রুম ভাড়া, আর পড়াশোনার খরচ।
তিনি এখন অনার্সের ৪র্থ বর্ষে পড়ছেন। একসময় যিনি বক্তৃতা দিতেন প্রতিবাদে, মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটতেন গর্ব নিয়ে, আজ তিনি ধীর গতিতে হাঁটেন ভাঙা শরীরটিকে টেনে নিয়ে। তার চলার গতি কম, কিন্তু সাহস আজও অটুট। বন্ধুরা কেউ কেউ চাকরি খুঁজছে, কেউ ইন্টার্নশিপ করছে, কেউ দেশ ছেড়ে বাইরে যাওয়ার চিন্তা করছে। আর জুবায়ের প্রতিদিন ভাবেন এই শরীরটা আর কবে ঠিক হবে কবে অপারেশন হবে? কতদিন এভাবে টিউশনির টাকায় বেঁচে থাকা যাবে? মাঝে মাঝে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেন এই জীবনটা কি আমার প্রাপ্য ছিল? আমি কি ভুল করেছি প্রতিবাদ করে? কিন্তু সে প্রশ্নেই আবার নিজেই উত্তর দেন "না, আমি ঠিকই করেছি। অন্যায় দেখেও চুপ থাকা যদি জীবন হয়, তবে এমন জীবন চাই না।" তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে ব্যথার পাহাড়, সাহসের ভেতর জমে থাকে দুশ্চিন্তার অশ্রু। কিন্তু সে হেরে যায় না। সে যেন হাঁটছে কেবল নিজের জন্য নয়, সকল আহতদের হয়ে, সকল নিপীড়িতদের হয়ে।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও মানবিক ভবিষ্যৎ
জুবায়ের হোসেনের জীবনের এই লড়াই ও যন্ত্রণা শুধু এককের নয়, এটি পুরো সমাজের এক গভীর সংকেত। যখন একজন তরুণ নিজের পায়ে গাঁথা বুলেট নিয়েও স্বপ্ন দেখতে চায়, তখন তার জন্য প্রয়োজন শুধু সাহস নয়, প্রয়োজন একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের সহমর্মিতা ও মানবিকতা। আমাদের প্রত্যাশা হলো এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে আহত নাগরিকরা অবহেলিত থাকবেন না। যেখানে কোনো তরুণ প্রতিবাদের কারণে জীবনের সবুজ বয়সে পঙ্গুত্বের শিকার হবে না, আর তার চিকিৎসার জন্য আর্থিক তহবিলের অভাব হবে না। যেখানে নাগরিকদের প্রতি মানবিক সহানুভূতি ও দ্রুত সহায়তার হাত বাড়ানো হবে। জুবায়েরের মতো অসংখ্য আহত তরুণের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন রাষ্ট্রের উচিত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের ক্ষতিগ্রস্ত শরীর ও মন সুস্থ করা, আর তাদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেওয়া। কারণ দেশের ভবিষ্যত তারাই, যারা প্রতিবাদ করে নিজেদের অধিকার দাবি করে। একটি মানবিক রাষ্ট্র এমন হবে যেখানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর হবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত থাকবে। যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত যুবকের মুখ থেকে হাসি লুকানো থাকবে না, তাদের চোখে নতুন করে জীবনের আশা জ্বলে উঠবে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কী এমন এক ভবিষ্যত গড়ব, যেখানে সবাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাবে, নাকি আমরা নিপীড়িতদের অবহেলা ও উপেক্ষার মহাসাগরে হারিয়ে ফেলব? জুবায়েরের জীবনের গল্প আমাদের জন্য একটি ডাক একটা আহ্বান। তার ব্যথা ও সংগ্রাম যেন বৃথা না যায়। তার জন্য, তার মতো সবার জন্য আমরা চাই সঠিক বিচার, যথাযথ চিকিৎসা, আর এক মানবিক সমাজ। এটাই হবে তার এবং আমাদের দেশের সত্যিকারের বিজয়।
ইতিহাসের বুকে তার কণ্ঠস্বর
ইতিহাস কখনো নিঃসঙ্গ মানুষের কণ্ঠ শুনতে পায় না যতক্ষণ না সেই কণ্ঠ হয়ে ওঠে সময়ের বিবেক। জুবায়ের হোসেনের কন্ঠ ঠিক তেমনই যেটি একদিন নিঃশব্দে গুমরে উঠেছিলো রাবার বুলেটের যন্ত্রণায়, কিন্তু আজ তা হয়ে উঠছে একটি সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী কন্ঠস্বর। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল একটি প্রজন্মের আত্মার চিৎকার। সেই চিৎকারের মধ্যে জুবায়েরের কন্ঠ ছিল কিশোরগঞ্জের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণের নির্ভীক প্রতিবাদ যেখানে ভয় ছিল না, ছিল কেবল প্রশ্ন: "এই দেশটা কি সবার? নাকি কেবল কিছু ক্ষমতাবান মানুষের?"
জুবায়েরের এই প্রশ্ন, তার গুলিবিদ্ধ পা, তার অপারেশনবিহীন শরীর, তার অন্ধকার ঘরে জ্বলতে থাকা আলোর মতো টিউশনির টাকা দিয়ে চলে যাওয়া পড়াশোনা সব মিলিয়ে সে হয়ে উঠেছে ইতিহাসের এক জীবন্তু পৃষ্ঠা। যে রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দেয়নি, ভবিষ্যতের ইতিহাস সে রাষ্ট্রকে জবাব দেবে একটি নাম উচ্চারণ করে। জুবায়ের হোসেন। তার নাম থাকবে সেইসব মানুষের কাতারে, যারা মুখ থামায়নি, যারা গুলি খেয়েও প্রশ্ন করতে ভয় পায়নি, যারা রাষ্ট্রীয় নীরবতার বিরুদ্ধে নিজের জীবনের গল্প দিয়ে কথা বলেছে। জুবায়েরের কন্ঠ আজ একক নয়। এটি হয়ে গেছে গণ-আত্মার প্রতিধ্বনি। তার যন্ত্রণার প্রতিটি শব্দ ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে যে কোনো শাসকের হিসাবের বাইরে, কোনো সরকারি রিপোর্টের নিচে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে,
গণমানুষের চেতনায়। একদিন যখন ভবিষ্যতের প্রজনন্ম এই দেশের ইতিহাস পড়বে তারা জানবে, স্বাধীনতা শুধু কাগজে লেখা ছিল না। তার জন্য রক্ত দিয়েছিল জুবায়েরেরা। পায়ে বুলেট নিয়ে, চোখে আগুন নিয়ে, বুকভরা সাহস নিয়ে তারা বলেছিল: "আমরা ন্যায়ের পক্ষে, মানুষ হবার অধিকারের পক্ষে।"
এই কণ্ঠস্বর কখনো নিঃশেষ হবে না। এটা থাকবে, বেঁচে থাকবে, ধ্বনিত হবে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদে।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. অপারেশনের মাধ্যমে বুলেট বের করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান
৪. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৫. ঘর নির্মাণ বা সংস্কারে সরকারি সহায়তার
এক নজরে জুবায়ের হোসেন
নাম: জুবায়ের হোসেন
জন্ম তারিখ: ২০-১১-২০০১
জন্মস্থান: কিশোরগঞ্জ
নিজ জেলা : কিশোরগঞ্জ
পেশা: ছাত্র
স্থায়ী ঠিকানা
: গ্রাম: চরনোয়াকান্দি, ইউনিয়ন: জালালপুর, থানা: কটিয়াদি, জেলা: কিশোরগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা
: মহল্লা: জাপানি বাজার, শনির আখড়া, থানা: কদমতলি, জেলা: ঢাকা
পিতা রতন মিয়া, পেশা ও বয়স: শ্রমিক, ৫৩
মাতা: পারভীন, গৃহিণী
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : বাবার আয়
বাড়ি
: কাঠ দ্বারা নির্মিত টিনের ঘর
ভাইবোনের পরিচয়
ভাইবোন: ৪ জন
১. মুক্তা আক্তার (গৃহিণী)
২. সুইটি আক্তার (গৃহিণী)
৩. জুবায়ের হোসেন (ছাত্র)
৪. নুসরাত জাহান (ছাত্রী-নবম শ্রেণি)
আক্রমণকারী: পুলিশ
আহত হওয়ার তারিখ: ১৯ জুলাই ২০২৪
পেশা: ছাত্র
ক্রমিক: ০০২
আইডি: ঢাকা সিটি ০০২
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
জুবায়ের হোসেনের জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন তার পরিবারে একটি নতুন মুখ মানে ছিল একদিকে নতুন আনন্দ অন্যদিকে নতুন এক দুশ্চিন্তা। ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর, কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি থানার চর নোয়াকান্দি গ্রামের একটি ভাঙাচোরা মাটির ঘরে তার জন্ম হয়। চারদিকে ধানের মাঠ, নদীর ধারে কুয়াশা জমা ভোর, কিন্তু ঘরের ভেতরে তখন নিঃস্বতার দীর্ঘশ্বাস। বাবা রতন মিয়া একজন কৃষক। কৃষিকাজ করে জীবিকা আহরণ করেন। একজন কৃষক পিতার ন্যয় ও সততা এই দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আনতে কাজ করেছে। তার সুশিক্ষায় সন্তান জুবায়ের যেন নতুন বাংলাদেশ আনতে নিজের জীবন বাজী ধরেছিলেন। জননী পারভীন শুধু গৃহিনী নয়। তিনি একহাতে পরিবার সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্যদিকে নিজের সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব পালনে যেন অনন্য। জুবায়ের বড় হয়েছিলো এমন এক ঘরে, যেখানে রাত মানে ছিল অনিশ্চয়তা, আর সকাল মানে ছিল বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। কখনো খালি পেটে ঘুমাতে গিয়েছেন, কখনো স্কুলে গেছেন ছেঁড়া ব্যাগে পুরোনো বই নিয়ে। তার পায়ের জুতো ছিল জোড়া লাগানো, জামা ছিল কাউকে দিয়ে যাওয়া পুরোনো পাঞ্জাবি। তবু তার চোখে ছিল স্বপ্নের দীপ্তি, এই দারিদ্র্য তার আত্মাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সে জানত, তার জীবন এমন হতেই পারে, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ সে নিজেই গড়বে।
প্রথম শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রতিদিন খালি পায়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেত সে, গ্রীষ্মের খরতাপ কিংবা শীতের শিশিরভেজা সকাল কোনোটিই তাকে থামাতে পারেনি। খুদে সেই ছাত্রটির মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত নীরব জেদ। স্কুলের বারান্দায় বসে সে শুধু পড়াশোনাই করতো না, তাকিয়ে থাকত আকাশের দিকে। সেখানে সে দেখত মুক্তির রং, দেখত এক অন্য রকম জীবনের ইশারা।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য একসময় পাড়ি জমায় ঢাকা শহরে। রাজধানীর কদমতলী থানার জাপানি বাজার এলাকায় একটি পুরনো মেসে উঠেন, যেখানে ঘরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে বর্ষায়, আর শীতকালে দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে
ঠান্ডা হাওয়া। সেখানে থেকে সে চালাতে থাকে পড়াশোনা আর টিউশনি, কখনো এক বেলা না খেয়ে খরচ বাঁচিয়ে দেয় তার বই কেনার টাকা।
জীবন তার কাছে কখনো দয়ালু ছিল না। বরং প্রতিটি ধাপে ধাপে তার পরীক্ষা নিয়েছে কখনো অভাবে, কখনো অবহেলায়, কখনো অপমানের ঘা দিয়ে। তবু সে হেরে যায়নি। কারণ তার বুকের ভিতর গেঁথে ছিল একটি উপলব্ধি "আমার জীবন কষ্টের হতে পারে, কিন্তু আমি চাই না আমার সন্তানের জীবনেও একই কষ্ট ফিরে আসুক।" এই উপলব্ধিই তাকে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছে, তার অস্তিত্বকে দিয়েছে এক প্রতিবাদী চেতনার রূপ।
তার বেড়ে ওঠা কেবল একজন মানুষ হিসেবে বড় হওয়া নয়, তা ছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক অনমনীয় প্রতিরোধের কাহিনি।
আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাওয়া
জীবনের প্রতিটি ধাপে যে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছিল জুবায়ের, সেই সংগ্রাম তাকে শুধুমাত্র এক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেনি, বরং বাঙালির ইতিহাসের অন্য এক লড়াকু রূপে দাঁড় করিয়েছে। উচ্চশিক্ষার ছাত্র হিসেবে শুধু নিজের জীবন বদলানোর স্বপ্নই নয়, বরং সমাজের বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার পবিত্র দায়িত্বও বুঝতে শুরু করেছিল সে। ঢাকার কদমতলীর ছোট্ট মেস থেকে শুরু করে কলেজের ক্লাসরুম পর্যন্ত, জুবায়ের দেখত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দগদগে এক বেদনা আর অভুক্ত স্বপ্নের ছাপ। চারপাশে প্রচণ্ড বৈষম্য, আর্থিক অন্যায়, শিক্ষা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার সবকিছুতে অসাম্য। এসব দেখে সে একদিন নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো দাঁড়াবে প্রতিবাদের মঞ্চে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন দেশের যুবসমাজ রাস্তায় নেমে আসে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, জুবায়ের সেই তরুণ প্রজন্মের এক মুখ্য সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তার চোখে ঝরে পড়ছিল শুধু ক্রোধ নয়, ছিল এক বিশাল আশা একটা নতুন বাংলাদেশের জন্য যা হবে সকলের সমান অধিকার আর মুক্তির দেশ। পুলিশের হাতে নির্যাতিত হাজারো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, স্বপ্ন দেখাতে ও লড়াই করতে সে নিজেকে নিবেদন করেছিল। জুবায়ের জানত, এই লড়াই শুধু আজকের জন্য নয়, আগামীর জন্যও: নিজের জন্য নয়, দেশের হাজারো স্বপ্নদ্রষ্টার জন্যও। সে নিজের কষ্ট ভুলে যেত মানুষের মুক্তির স্বার্থে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা তার জীবনের এক বিরাট বাঁক ছিল। তার দুর্বল শরীর, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা ভয়ের কোনো অস্ত্র ছিল না তার কাছে, কেবল ছিল এক কঠিন দৃঢ়তা আর স্বপ্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করার অদম্য জেদ। জুবায়ের হোসেনের এই আন্দোলনের পথে পা বাড়ানো ছিল একটি ছোট থেকে শুরু হলেও, তার সাহস ও আত্মত্মত্যাগের বড় গল্প, যা অনুপ্রেরণা দেয় দেশের প্রত্যেক অসহায়, বঞ্চিত তরুণকে। রক্তাক্ত বিকেল (১৯ জুলাই, ২০২৪)
সে ছিল এক অসাধারণ বিকেল, এক ভয়াবহ বিকেল যা জুবায়ের হোসেনের জীবনের ছন্দ একেবারে ভেঙে দেয়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকা শহর ছিল উত্তাল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তাল যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে হাজারো তরুণ স্লোগানে স্লোগানে উচ্চারণ করছিল-"এই বৈষম্য মানি না", "সবার শিক্ষা, সবার সমান অধিকার চাই।" জুবায়ের হোসেন সেই স্রোতের একজন। চোখেমুখে ছিল আগুনের মতো দৃঢ়তা, কণ্ঠে ছিল সত্যের দাবিতে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। মিছিল এগিয়ে যাচ্ছিল যাত্রাবাড়ী থেকে দক্ষিণের দিকে, হঠাৎই পুলিশি বাহিনী ফ্লাইওভারের নিচে ব্যারিকেড তৈরি করে। উত্তেজনা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের উপর শুরু হয় গুলি, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস। চারদিক ছাপিয়ে যায় চিৎকার, ধোঁয়া আর রক্ত। জুবায়ের তখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সে কাউকে ধাক্কায় ফেলে পালায়নি, বরং সহযোদ্ধাদের আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিল বুক চিতিয়ে। সে পুলিশের গাড়িতে সরাসরি আক্রমন করতে যায় ঠিক তখনই তার দিকে সোজা তাক করে রাবার বুলেট ছুড়ে মারে পুলিশ।
দুটি রাবার বুলেট একসঙ্গে এসে আঘাত হানে তার হাঁটুর ওপরে। তীব্র ব্যথায় মাটিতে লুটিয়ে
পড়ে জুবায়ের, আশপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। কিন্তু সে তখনো বুঝে উঠতে পারেনি যে এই বুলেট দু'টি শুধু তার শরীর নয়, তার ভবিষ্যতের ওপরও গভীর ক্ষত তৈরি করে গেছে। তাকে উদ্ধার করে আশ্রয়ে নিয়ে যায়। সেই বিকেল আর জুবায়েরের শরীর যেন দুটোই চিরতরে ভেঙে পড়ে একটি দেশের রাষ্ট্রীয়। বর্বরতার সামনে, আরেকটি তরুণ স্বপ্নবাজ এক মনের শরীরী অস্তিত্বে। তখন হয়তো কেউ জানত না, এই তরুণের পায়ের গভীরে রয়ে যাবে সেই রাবার বুলেট দু'টি যা আজও তার শরীরের ভেতরে চাপা হয়ে আছে, প্রতিটি হাঁটার সাথে দগদগে স্মৃতির মতো ফিরে আসে। ১৯ জুলাই শুধু একটি দিনের নাম নয় তা জুবায়েরের জীবনে এক রক্তাক্ত চিহ্ন, যা সে বয়ে বেড়ায় প্রতিটি মুহূর্তে।
পায়ে গাঁথা বুলেট, জীবনে গাঁথা যন্ত্রণা
যে বিকেলে দুইটি রাবার বুলেট এসে আঘাত হেনেছিল জুবায়ের হোসেনের হাঁটুর ওপর, সে বিকেলটা যেন কেবল তার শরীরেই নয়, তার সারা জীবনের গতিপথে গেঁথে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলেন শরীর থেকে বুলেট বের হয়ে গেছে। সেই ব্যথাকে চেপে ধরে, টিউশনি করে হেঁটে চলেছিলেন দিনের পর - দিন। ভেতরের যন্ত্রণার কথা চাপা দিয়ে ক্লাসে গিয়েছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন, খাবার রান্না করেছেন, মেসে ফিরে আবার ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে গিয়েছেন যেন জীবন একই গতিতে চলবে। কিন্তু না, ব্যথা থামেনি। বরং প্রতিটি হাঁটায়, প্রতিটি ঘুমে, প্রতিটি বসায় সেই ব্যথ্য আরও গভীর হয়েছে। হাঁটার সময় পায়ের ভেতরে চুলকায়, যেন শরীর চিৎকার করে বলছে ভেতরে কিছু আছে, যা এখানে থাকার কথা নয়। অবশেষে যখন এক্স-রে করানোর সুযোগ হলো, তখনই প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয় তার পায়ের ভেতর আজও গেঁথে আছে সেই দুই রাবার বুলেট। চিকিৎসক বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে বলেন, "এই অবস্থায় তুমি এতদিন চলছো কীভাবে?"
অপারেশন ছাড়া এই বুলেট শরীর থেকে বের করা যাবে না। কিন্তু অপারেশনের জন্য প্রয়োজন অর্থ, যা তার কাছে নেই।
এই তরুণ যোদ্ধা যিনি রাষ্ট্রীয় গুলির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরকে ঢাল করেছিলেন, আজ সেই রাষ্ট্রের কাছ থেকেই চিকিৎসা পাওয়ার মতো সামান্য ন্যায্যতাটুকুও পাননি। প্রতিটি সকালে ঘুম ভাঙে যন্ত্রণার সঙ্গে, প্রতিটি রাতে ঘুমাতে যান এক অস্পষ্ট ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নিয়ে। পা ফুলে যায়, ব্যথা তীব্র হয়, ক্লাসে যেতে সমস্যা হয়, মসজিদে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ কেউ জানে না তার প্যান্টের নিচে, হাঁটুর ভেতরে গেঁথে আছে আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত বিকেলের সাক্ষী দুটি বুলেট। তারা আজও রয়ে গেছে, যেন জীবন্ত স্মৃতি হয়ে। এই যন্ত্রণা শুধু শারীরিক নয় এটি মানসিক, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে একজন তরুণের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নীরব শান্তি। জুবায়ের হোসেন এখন শুধু ব্যথা নয়, অপারেশনের ভয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর দায়হীন রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা নিয়ে বেঁচে আছেন। একদিন হাঁটার সময় হঠাৎ থমকে গিয়ে হয়তো তিনি ভাবেন এই পা যদি ঠিক হতো, যদি সেই দিন বিকেলটা অন্যরকম হতো, তাহলে তার জীবনটা কি আজ এইরকম হতো? কিন্তু জুবায়েরের চোখে আজও একটুকরো দৃঢ়তা থাকে, কারণ তিনি জানেন এই যন্ত্রণা যেন বৃথা না যায়।
অবহেলিত জীবন ও রাষ্ট্রের নীরবতা
একজন তরুণ যখন নিজের স্বপ্ন, সাহস আর ভবিষ্যৎকে পায়ে পিষে রেখে রাস্তায় দাঁড়ায় অন্যায়ের প্রতিবাদে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তখন সে কেবল নিজের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য দাঁড়ায়। জুবায়ের হোসেন তেমনই একজন, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রীয় গুলির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু আজ, সেই রাষ্ট্রই তার সবচেয়ে বড় অনুপস্থিত সাথী।
আন্দোলনের সময় তার শরীরে গাঁথা রাবার বুলেট এখনো রয়েছে অস্ত্রোপচার না হওয়া পর্যন্ত। ব্যথা প্রতিদিনের সঙ্গী, অথচ সাহায্যের কেউ নেই। কোনো সরকারি চিকিৎসা নেই, কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, এমনকি একটি ফোন কল পর্যন্ত আসেনি সরকারি দপ্তর বা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে। তার বাবা একজন দিনমজুর, মা গৃহিণী। পরিবার কোনোভাবেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে না। অথচ এই যুবকই শিক্ষিত হওয়ার জন্য নিজের খাবার কমিয়ে, টিউশনি করে খরচ চালায়। রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হবার পরও তাকে নিজের চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে একজন আহত নাগরিক হিসেবে তার কোনো অধিকার যেন নেই। রাষ্ট্র তাকে দেখেছে শুধুমাত্র একটি 'উপদ্রবকারী আন্দোলনকারী' হিসেবে। তার বুলেটবিদ্ধ পা দেখে কেউ বলে না এই পায়ে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রের নৃশংসতা গাঁথা। তার যন্ত্রণা যেন কারও কাছে কোনো দায় সৃষ্টি করে না, বরং তাকে বোবা সহ্য আর নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
যে তরুণের চোখে ছিল নতুন সমাজের স্বপ্ন, আজ তার চোখে ঘুম নেই আছে অনিশ্চয়তা, অবহেলা আর উপেক্ষার জমে থাকা বিষ। রাষ্ট্রের নীরবতা যেন এক ধরনের শান্তি, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় তুমি একা, তুমি অবাঞ্ছিত। জুবায়েরের গল্প আজ দেশের হাজারো আহত তরুণের প্রতিচ্ছবি। যারা মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করেছিল, আজ তারা মাথা নিচু করে ব্যথা লুকিয়ে রাখে, যেন সমাজ আর রাষ্ট্র তাদের ভুলে না যায়। এই নীরবতা কেবল নিষ্ঠুরতা নয় এটা অপরাধ। যারা দেশের জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তাদের পাশে না দাঁড়ানো মানে ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।
টিউশন, মেসজীবন ও ভাঙা শরীরের ভার
রাষ্ট্র যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন জীবন চলে ব্যক্তিগত দায়বোধ আর অসীম সহ্যশক্তির উপর ভর করে। জুবায়ের হোসেনের জীবন যেন তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। রাষ্ট্র দায়িত্ব নেয়নি, হাসপাতাল দিয়েছে কেবল ব্যথানাশক, প্রতিবেশীরা দিয়েছে সান্ত্বনা কিন্তু নিজের জীবন চালাতে তাকে একাই দাঁড়াতে হয়েছে সমস্ত অভাব-অনটনের মুখোমুখি। ঢাকার কদমতলীর একটি ছোট্ট মেসে তিনি থাকেন এখন। ঘরটির দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে, ঘরের এক কোণে একটি চৌকি, এক পাশে বইয়ের স্তূপ। শরীরের ব্যথা সঙ্গী হলেও থেমে যাননি। চলছেন, কারণ থেমে গেলে জীবন থেমে যাবে। প্রতিদিন সকালে ব্যথা নিয়ে উঠে যান টিউশনিতে দু'একটা ছাত্রকে পড়িয়ে যে টুকু আয় হয়, তা দিয়েই চলে নিজের ওষুধ কেনা, খাবার, রুম ভাড়া, আর পড়াশোনার খরচ।
তিনি এখন অনার্সের ৪র্থ বর্ষে পড়ছেন। একসময় যিনি বক্তৃতা দিতেন প্রতিবাদে, মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটতেন গর্ব নিয়ে, আজ তিনি ধীর গতিতে হাঁটেন ভাঙা শরীরটিকে টেনে নিয়ে। তার চলার গতি কম, কিন্তু সাহস আজও অটুট। বন্ধুরা কেউ কেউ চাকরি খুঁজছে, কেউ ইন্টার্নশিপ করছে, কেউ দেশ ছেড়ে বাইরে যাওয়ার চিন্তা করছে। আর জুবায়ের প্রতিদিন ভাবেন এই শরীরটা আর কবে ঠিক হবে কবে অপারেশন হবে? কতদিন এভাবে টিউশনির টাকায় বেঁচে থাকা যাবে? মাঝে মাঝে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেন এই জীবনটা কি আমার প্রাপ্য ছিল? আমি কি ভুল করেছি প্রতিবাদ করে? কিন্তু সে প্রশ্নেই আবার নিজেই উত্তর দেন "না, আমি ঠিকই করেছি। অন্যায় দেখেও চুপ থাকা যদি জীবন হয়, তবে এমন জীবন চাই না।" তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে ব্যথার পাহাড়, সাহসের ভেতর জমে থাকে দুশ্চিন্তার অশ্রু। কিন্তু সে হেরে যায় না। সে যেন হাঁটছে কেবল নিজের জন্য নয়, সকল আহতদের হয়ে, সকল নিপীড়িতদের হয়ে।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও মানবিক ভবিষ্যৎ
জুবায়ের হোসেনের জীবনের এই লড়াই ও যন্ত্রণা শুধু এককের নয়, এটি পুরো সমাজের এক গভীর সংকেত। যখন একজন তরুণ নিজের পায়ে গাঁথা বুলেট নিয়েও স্বপ্ন দেখতে চায়, তখন তার জন্য প্রয়োজন শুধু সাহস নয়, প্রয়োজন একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের সহমর্মিতা ও মানবিকতা। আমাদের প্রত্যাশা হলো এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে আহত নাগরিকরা অবহেলিত থাকবেন না। যেখানে কোনো তরুণ প্রতিবাদের কারণে জীবনের সবুজ বয়সে পঙ্গুত্বের শিকার হবে না, আর তার চিকিৎসার জন্য আর্থিক তহবিলের অভাব হবে না। যেখানে নাগরিকদের প্রতি মানবিক সহানুভূতি ও দ্রুত সহায়তার হাত বাড়ানো হবে। জুবায়েরের মতো অসংখ্য আহত তরুণের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন রাষ্ট্রের উচিত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের ক্ষতিগ্রস্ত শরীর ও মন সুস্থ করা, আর তাদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেওয়া। কারণ দেশের ভবিষ্যত তারাই, যারা প্রতিবাদ করে নিজেদের অধিকার দাবি করে। একটি মানবিক রাষ্ট্র এমন হবে যেখানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর হবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত থাকবে। যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত যুবকের মুখ থেকে হাসি লুকানো থাকবে না, তাদের চোখে নতুন করে জীবনের আশা জ্বলে উঠবে। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কী এমন এক ভবিষ্যত গড়ব, যেখানে সবাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাবে, নাকি আমরা নিপীড়িতদের অবহেলা ও উপেক্ষার মহাসাগরে হারিয়ে ফেলব? জুবায়েরের জীবনের গল্প আমাদের জন্য একটি ডাক একটা আহ্বান। তার ব্যথা ও সংগ্রাম যেন বৃথা না যায়। তার জন্য, তার মতো সবার জন্য আমরা চাই সঠিক বিচার, যথাযথ চিকিৎসা, আর এক মানবিক সমাজ। এটাই হবে তার এবং আমাদের দেশের সত্যিকারের বিজয়।
ইতিহাসের বুকে তার কণ্ঠস্বর
ইতিহাস কখনো নিঃসঙ্গ মানুষের কণ্ঠ শুনতে পায় না যতক্ষণ না সেই কণ্ঠ হয়ে ওঠে সময়ের বিবেক। জুবায়ের হোসেনের কন্ঠ ঠিক তেমনই যেটি একদিন নিঃশব্দে গুমরে উঠেছিলো রাবার বুলেটের যন্ত্রণায়, কিন্তু আজ তা হয়ে উঠছে একটি সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী কন্ঠস্বর। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল একটি প্রজন্মের আত্মার চিৎকার। সেই চিৎকারের মধ্যে জুবায়েরের কন্ঠ ছিল কিশোরগঞ্জের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণের নির্ভীক প্রতিবাদ যেখানে ভয় ছিল না, ছিল কেবল প্রশ্ন: "এই দেশটা কি সবার? নাকি কেবল কিছু ক্ষমতাবান মানুষের?"
জুবায়েরের এই প্রশ্ন, তার গুলিবিদ্ধ পা, তার অপারেশনবিহীন শরীর, তার অন্ধকার ঘরে জ্বলতে থাকা আলোর মতো টিউশনির টাকা দিয়ে চলে যাওয়া পড়াশোনা সব মিলিয়ে সে হয়ে উঠেছে ইতিহাসের এক জীবন্তু পৃষ্ঠা। যে রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দেয়নি, ভবিষ্যতের ইতিহাস সে রাষ্ট্রকে জবাব দেবে একটি নাম উচ্চারণ করে। জুবায়ের হোসেন। তার নাম থাকবে সেইসব মানুষের কাতারে, যারা মুখ থামায়নি, যারা গুলি খেয়েও প্রশ্ন করতে ভয় পায়নি, যারা রাষ্ট্রীয় নীরবতার বিরুদ্ধে নিজের জীবনের গল্প দিয়ে কথা বলেছে। জুবায়েরের কন্ঠ আজ একক নয়। এটি হয়ে গেছে গণ-আত্মার প্রতিধ্বনি। তার যন্ত্রণার প্রতিটি শব্দ ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে যে কোনো শাসকের হিসাবের বাইরে, কোনো সরকারি রিপোর্টের নিচে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে,
গণমানুষের চেতনায়। একদিন যখন ভবিষ্যতের প্রজনন্ম এই দেশের ইতিহাস পড়বে তারা জানবে, স্বাধীনতা শুধু কাগজে লেখা ছিল না। তার জন্য রক্ত দিয়েছিল জুবায়েরেরা। পায়ে বুলেট নিয়ে, চোখে আগুন নিয়ে, বুকভরা সাহস নিয়ে তারা বলেছিল: "আমরা ন্যায়ের পক্ষে, মানুষ হবার অধিকারের পক্ষে।"
এই কণ্ঠস্বর কখনো নিঃশেষ হবে না। এটা থাকবে, বেঁচে থাকবে, ধ্বনিত হবে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদে।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. অপারেশনের মাধ্যমে বুলেট বের করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান
৪. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৫. ঘর নির্মাণ বা সংস্কারে সরকারি সহায়তার
এক নজরে জুবায়ের হোসেন
নাম: জুবায়ের হোসেন
জন্ম তারিখ: ২০-১১-২০০১
জন্মস্থান: কিশোরগঞ্জ
নিজ জেলা : কিশোরগঞ্জ
পেশা: ছাত্র
স্থায়ী ঠিকানা
: গ্রাম: চরনোয়াকান্দি, ইউনিয়ন: জালালপুর, থানা: কটিয়াদি, জেলা: কিশোরগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা
: মহল্লা: জাপানি বাজার, শনির আখড়া, থানা: কদমতলি, জেলা: ঢাকা
পিতা রতন মিয়া, পেশা ও বয়স: শ্রমিক, ৫৩
মাতা: পারভীন, গৃহিণী
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : বাবার আয়
বাড়ি
: কাঠ দ্বারা নির্মিত টিনের ঘর
ভাইবোনের পরিচয়
ভাইবোন: ৪ জন
১. মুক্তা আক্তার (গৃহিণী)
২. সুইটি আক্তার (গৃহিণী)
৩. জুবায়ের হোসেন (ছাত্র)
৪. নুসরাত জাহান (ছাত্রী-নবম শ্রেণি)
আক্রমণকারী: পুলিশ
আহত হওয়ার তারিখ: ১৯ জুলাই ২০২৪
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍