আব্দুল সাত্তার
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
১৯৬৮ সালের শুরুর সকালে পিরোজপুরের ইকরীর মাটি ছুঁয়ে পৃথিবীতে আসা আব্দুল সাত্তার বড় হয়েছেন কৃষক পরিবারে পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার আলোতে। জীবিকার পথচলায় ছোট কারখানা থেকে মুদী দোকান সবকিছুই তিনি গড়েছিলেন নিজের হাতে, নিজের ঘামে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর এক জনসমাগমে গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তটি তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয় পায়ে ক্ষত, জীবনে থমকে যাওয়া পথ, আর দায়িত্বের ভার আরও গভীর হয়ে ওঠে। তবু সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর বৃদ্ধ পিতা-মায়ের মুখ মনে রেখে তিনি আজও ধীরে ধীরে হাঁটেন নিজের বিশ্বাসকে বুকে নিয়ে। তার জীবন সাক্ষ্য দেয় একজন সাধারণ মানুষের হৃদয়ও অদম্য শক্তির গল্প লিখে যেতে পারে।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষকেও ভয় পায় খুনী হাসিনা ও তার পোষ্য দলবল
আব্দুল সাত্তার
ক্রমিক: ০২০
আইডি: ঢাকা সিটি ০২০
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
আব্দুল সাত্তার ১৯৬৮ সালের ২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া থানার ইকরী ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। তার পিতা আব্দুল গনি হাওলাদার এখন ৯০ বছরের একজন কর্মহীন বৃদ্ধ, আর মা সুফিয়া বেগমের বয়স ৮০। তারা দু'জনেই এখন পুরোপুরি অসহায় ও অসুস্থ। সাত্তারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছিল সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে, কিন্তু আত্মমর্যাদায় ভরা। জীবনের শুরু থেকেই তিনি সংগ্রামী চরিত্রের। ঢাকায় এসে জীবিকার প্রয়োজনে অনেক কিছু করেছেন, কিন্তু কখনো নিজের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে আপস করেননি।
পেশা ও জীবিকার সংগ্রাম
এক সময় আব্দুল সাত্তারের ছিল নিজস্ব পিতলের কল ও স্যানিটারি সামগ্রীর ছোট কারখানা। সততা ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি ব্যবসাকে ভালো জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীরা একের পর এক চাঁদা দাবি করতে থাকে। একপর্যায়ে নির্যাতন, হুমকি ও ভয়ের কারণে তিনি কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি পশ্চিমপাড়া, ডেমরায় একটি ছোট মুদী দোকান চালিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন। তার চারজনের পরিবারে বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছাড়াও আছেন এক মেয়ে ও এক ছেলে, দু'জনেই শিক্ষার্থী। অল্প আয়ে পরিবারের চাহিদা পুরণ করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
সন্তান ও পরিবারের প্রতি ভালোবাসা
তার মেয়ে উম্মে খাদিজা আক্তার মিতু, বয়স ২৭, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্রী ছিলেন, এখন গৃহিণী। ছেলে সাইফুল ইসলাম শান্ত, ১৯ বছর বয়সী, দনিয়া কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়তে তিনি নিজের প্রতিটি স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তার সন্তানরা একদিন সমাজের জন্য কাজ করবে। তাই তাদের অধিকার রক্ষায় নিজেও ছিলেন আন্দোলনের পক্ষে, ছায়ার মতো পাশে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, দুপুর ১টায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় "আওয়ামী পতনের বিজয় মিছিল"-এ অংশগ্রহণ করেন আব্দুল সাত্তার। মিছিলটি ছিল শান্তিপূর্ণ, জনতার দাবি ছিল স্পষ্ট স্বৈরাচারী দমন-পীড়নের অবসান। কিন্তু হঠাৎ করেই কদমতলী থানার পুলিশ সদস্য রিয়াজ, বাশার, মহাসিন এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা মিলন, আকাশ, বাবলা, সোহাগ ও রনি এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। সাত্তারের পায়ে গুলি লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। জনতা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রথমে চিকিৎসকরা আওয়ামী কর্মীদের ভয়ে চাপে পড়ে তাকে ফেলে রাখে, কিন্তু ছাত্র-জনতার বাধার মুখে পড়ে শেষে চিকিৎসা শুরু হয়। দুই সপ্তাহ পর তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন।
বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই তার হাঁটা-চলা সীমিত হয়ে গেছে। উঁচু-নিচু জায়গায় চলতে কষ্ট হয়। কাজ করতে পারেন না আগের মতো। প্রতিনিয়ত ব্যথা, দুর্বলতা আর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটান। দোকানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ফলে আয় আরও কমে গেছে। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য বা স্বীকৃতি পাননি। এমনকি তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অপরাধও প্রমাণ হয়নি, তবুও তিনি নিপীড়নের শিকার।
অর্থনৈতিক দুর্দশা
ব্যবসা হারানো, চিকিৎসার ব্যয়, আয় কমে যাওয়া সব মিলিয়ে আব্দুল সাত্তারের সংসার এখন টিকে আছে শুধুই মানবিকতা আর প্রতিবেশীদের করুণায়। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া, সন্তানদের পড়াশুনা বজায় রাখা এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ ও খাদ্য যোগাড় করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তার একমাত্র চাওয়া নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং পরিবারকে আরেকবার একটু স্বস্তি দেওয়া।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবহেলা ও চিকিৎসকদের নির্লজ্জ আচরণ
মুগদা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা প্রথমে গুলিবিদ্ধ রোগীকে ফেলে রাখে। ছাত্র-জনতার চাপে পড়ে তারা পরে চিকিৎসা শুরু করে। এ ঘটনায় চিকিৎসা খাতের অমানবিকতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের নগ্ন প্রকাশ ঘটে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির নির্মম উদাহরণ
গুলির ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত পুলিশ ও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তাদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, বরং তারা প্রকাশ্যে ঘোরে। সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতায় মামলা করা হয়নি। এটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
সন্তানরা চোখের সামনে দেখেছে কীভাবে তাদের বাবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে রক্তাক্ত হয়েছেন। এ অভিজ্ঞতা তাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে ভয় ও অনিশ্চয়তায় তারা এক বিষন্ন ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত।
রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চেয়ে ব্যর্থতা ও হতাশা
এখনও পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা মানবাধিকার সংস্থা তার পাশে দাঁড়ায়নি। আবেদন করেও কোনো সহায়তা পাননি। এই অবহেলা তাকে শুধু কষ্ট দিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থারও অবসান ঘটাচ্ছে।
প্রতিবাদী পরিচয়ের কারণে নিঃসঙ্গ ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন
অনেক প্রতিবেশী ভয় পেয়ে দূরে সরে গেছেন। কেউ কেউ বলেন, "রাজনীতি করলে এমন হবেই।" এমন মন্তব্য আরও কষ্ট দেয়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা একজন আহত মানুষকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে দেয়।
আব্দুল সাত্তার একাধারে একজন পিতা, একজন ব্যবসায়ী, একজন প্রতিবাদী নাগরিক। তার জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার করুণ প্রতিফলন। এমন একজন মানুষ আজ বিছানায় পড়ে আছেন ব্যথায়, অভাবে, আর চরম অনিশ্চয়তায়। তাকে সাহায্য করা, তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের সম্মিলিত মানবিক দায়িত্ব। কারণ প্রতিবাদীর কন্ঠকে চুপ করিয়ে দেয়া নয় তাদের সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়াই সভ্যতার পরিচয়।
মানবিক সহায়তার দাবি
একজন গুলিবিদ্ধ নাগরিক হিসেবে তার চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়া তার অধিকার। তিনি চান:
১. পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তা
২. মাসিক ভাতা
৩. সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি
৪. আগের কারখানা পুনরায় চালুর জন্য মূলধন সহায়তা
৫. নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার
এটি শুধু তার একার দাবি নয়, বরং স্বৈরাচার খুনী হাসিনা ও তার পেটোয়াদের প্রতি একটি প্রশ্ন-
বিরোধিতা করলেই কি মানুষকে পঙ্গু করে দিতে হবে?
এক নজরে আব্দুল সাত্তার
নাম: আব্দুল সাত্তার
জন্ম তারিখ: ০২-০১-১৯৬৮
জন্মস্থান: পিরোজপুর
পেশা: ব্যবসা (মুদী দোকান)
নিজ জেলা: পিরোজপুর
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ইকরী, ইউনিয়ন: ইকরী, থানা: ভাণ্ডারিয়া, জেলা: পিরোজপুর
বর্তমান ঠিকানা: ৮৭/৩০, পাইটি, পশ্চিম-পাড়া, ডেমরা, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: আব্দুল গনি হাওলাদার, কর্মহীন বৃদ্ধ, বয়স: ৯০ বছর
মায়ের নাম: সুফিয়া বেগম, কর্মহীন বৃদ্ধা, বয়স: ৮০ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ০৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মেয়ে: উম্মে খাদিজা আক্তার মিতু, বয়স: ২৭, ছাত্রী, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, গৃহিণী
২. ছেলে: সাইফুল ইসলাম শান্ত, বয়স: ১৯, পেশা: ছাত্র, দনিয়া কলেজ, শ্রেণি: দ্বাদশ
ঘটনার স্থান: যাত্রাবাড়ী
আহত হওয়ার সময়: ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১.০০টা
আক্রমণকারী: কদমতলী থানার পুলিশ সদস্য রিয়াজ, বাশার, মহাসিন ও (ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী মিলন, আকাশ, বাবলা, সোহাগ, রনি)
আব্দুল সাত্তার
ক্রমিক: ০২০
আইডি: ঢাকা সিটি ০২০
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
আব্দুল সাত্তার ১৯৬৮ সালের ২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া থানার ইকরী ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। তার পিতা আব্দুল গনি হাওলাদার এখন ৯০ বছরের একজন কর্মহীন বৃদ্ধ, আর মা সুফিয়া বেগমের বয়স ৮০। তারা দু'জনেই এখন পুরোপুরি অসহায় ও অসুস্থ। সাত্তারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছিল সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে, কিন্তু আত্মমর্যাদায় ভরা। জীবনের শুরু থেকেই তিনি সংগ্রামী চরিত্রের। ঢাকায় এসে জীবিকার প্রয়োজনে অনেক কিছু করেছেন, কিন্তু কখনো নিজের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে আপস করেননি।
পেশা ও জীবিকার সংগ্রাম
এক সময় আব্দুল সাত্তারের ছিল নিজস্ব পিতলের কল ও স্যানিটারি সামগ্রীর ছোট কারখানা। সততা ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি ব্যবসাকে ভালো জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীরা একের পর এক চাঁদা দাবি করতে থাকে। একপর্যায়ে নির্যাতন, হুমকি ও ভয়ের কারণে তিনি কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি পশ্চিমপাড়া, ডেমরায় একটি ছোট মুদী দোকান চালিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন। তার চারজনের পরিবারে বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছাড়াও আছেন এক মেয়ে ও এক ছেলে, দু'জনেই শিক্ষার্থী। অল্প আয়ে পরিবারের চাহিদা পুরণ করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
সন্তান ও পরিবারের প্রতি ভালোবাসা
তার মেয়ে উম্মে খাদিজা আক্তার মিতু, বয়স ২৭, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্রী ছিলেন, এখন গৃহিণী। ছেলে সাইফুল ইসলাম শান্ত, ১৯ বছর বয়সী, দনিয়া কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়তে তিনি নিজের প্রতিটি স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তার সন্তানরা একদিন সমাজের জন্য কাজ করবে। তাই তাদের অধিকার রক্ষায় নিজেও ছিলেন আন্দোলনের পক্ষে, ছায়ার মতো পাশে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, দুপুর ১টায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় "আওয়ামী পতনের বিজয় মিছিল"-এ অংশগ্রহণ করেন আব্দুল সাত্তার। মিছিলটি ছিল শান্তিপূর্ণ, জনতার দাবি ছিল স্পষ্ট স্বৈরাচারী দমন-পীড়নের অবসান। কিন্তু হঠাৎ করেই কদমতলী থানার পুলিশ সদস্য রিয়াজ, বাশার, মহাসিন এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা মিলন, আকাশ, বাবলা, সোহাগ ও রনি এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। সাত্তারের পায়ে গুলি লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। জনতা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রথমে চিকিৎসকরা আওয়ামী কর্মীদের ভয়ে চাপে পড়ে তাকে ফেলে রাখে, কিন্তু ছাত্র-জনতার বাধার মুখে পড়ে শেষে চিকিৎসা শুরু হয়। দুই সপ্তাহ পর তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন।
বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই তার হাঁটা-চলা সীমিত হয়ে গেছে। উঁচু-নিচু জায়গায় চলতে কষ্ট হয়। কাজ করতে পারেন না আগের মতো। প্রতিনিয়ত ব্যথা, দুর্বলতা আর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটান। দোকানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ফলে আয় আরও কমে গেছে। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য বা স্বীকৃতি পাননি। এমনকি তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অপরাধও প্রমাণ হয়নি, তবুও তিনি নিপীড়নের শিকার।
অর্থনৈতিক দুর্দশা
ব্যবসা হারানো, চিকিৎসার ব্যয়, আয় কমে যাওয়া সব মিলিয়ে আব্দুল সাত্তারের সংসার এখন টিকে আছে শুধুই মানবিকতা আর প্রতিবেশীদের করুণায়। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া, সন্তানদের পড়াশুনা বজায় রাখা এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ ও খাদ্য যোগাড় করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তার একমাত্র চাওয়া নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং পরিবারকে আরেকবার একটু স্বস্তি দেওয়া।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবহেলা ও চিকিৎসকদের নির্লজ্জ আচরণ
মুগদা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা প্রথমে গুলিবিদ্ধ রোগীকে ফেলে রাখে। ছাত্র-জনতার চাপে পড়ে তারা পরে চিকিৎসা শুরু করে। এ ঘটনায় চিকিৎসা খাতের অমানবিকতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের নগ্ন প্রকাশ ঘটে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির নির্মম উদাহরণ
গুলির ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত পুলিশ ও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তাদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, বরং তারা প্রকাশ্যে ঘোরে। সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতায় মামলা করা হয়নি। এটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
সন্তানরা চোখের সামনে দেখেছে কীভাবে তাদের বাবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে রক্তাক্ত হয়েছেন। এ অভিজ্ঞতা তাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে ভয় ও অনিশ্চয়তায় তারা এক বিষন্ন ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত।
রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চেয়ে ব্যর্থতা ও হতাশা
এখনও পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা মানবাধিকার সংস্থা তার পাশে দাঁড়ায়নি। আবেদন করেও কোনো সহায়তা পাননি। এই অবহেলা তাকে শুধু কষ্ট দিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থারও অবসান ঘটাচ্ছে।
প্রতিবাদী পরিচয়ের কারণে নিঃসঙ্গ ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন
অনেক প্রতিবেশী ভয় পেয়ে দূরে সরে গেছেন। কেউ কেউ বলেন, "রাজনীতি করলে এমন হবেই।" এমন মন্তব্য আরও কষ্ট দেয়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা একজন আহত মানুষকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে দেয়।
আব্দুল সাত্তার একাধারে একজন পিতা, একজন ব্যবসায়ী, একজন প্রতিবাদী নাগরিক। তার জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার করুণ প্রতিফলন। এমন একজন মানুষ আজ বিছানায় পড়ে আছেন ব্যথায়, অভাবে, আর চরম অনিশ্চয়তায়। তাকে সাহায্য করা, তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের সম্মিলিত মানবিক দায়িত্ব। কারণ প্রতিবাদীর কন্ঠকে চুপ করিয়ে দেয়া নয় তাদের সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়াই সভ্যতার পরিচয়।
মানবিক সহায়তার দাবি
একজন গুলিবিদ্ধ নাগরিক হিসেবে তার চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়া তার অধিকার। তিনি চান:
১. পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তা
২. মাসিক ভাতা
৩. সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি
৪. আগের কারখানা পুনরায় চালুর জন্য মূলধন সহায়তা
৫. নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার
এটি শুধু তার একার দাবি নয়, বরং স্বৈরাচার খুনী হাসিনা ও তার পেটোয়াদের প্রতি একটি প্রশ্ন-
বিরোধিতা করলেই কি মানুষকে পঙ্গু করে দিতে হবে?
এক নজরে আব্দুল সাত্তার
নাম: আব্দুল সাত্তার
জন্ম তারিখ: ০২-০১-১৯৬৮
জন্মস্থান: পিরোজপুর
পেশা: ব্যবসা (মুদী দোকান)
নিজ জেলা: পিরোজপুর
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ইকরী, ইউনিয়ন: ইকরী, থানা: ভাণ্ডারিয়া, জেলা: পিরোজপুর
বর্তমান ঠিকানা: ৮৭/৩০, পাইটি, পশ্চিম-পাড়া, ডেমরা, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: আব্দুল গনি হাওলাদার, কর্মহীন বৃদ্ধ, বয়স: ৯০ বছর
মায়ের নাম: সুফিয়া বেগম, কর্মহীন বৃদ্ধা, বয়স: ৮০ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ০৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মেয়ে: উম্মে খাদিজা আক্তার মিতু, বয়স: ২৭, ছাত্রী, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, গৃহিণী
২. ছেলে: সাইফুল ইসলাম শান্ত, বয়স: ১৯, পেশা: ছাত্র, দনিয়া কলেজ, শ্রেণি: দ্বাদশ
ঘটনার স্থান: যাত্রাবাড়ী
আহত হওয়ার সময়: ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১.০০টা
আক্রমণকারী: কদমতলী থানার পুলিশ সদস্য রিয়াজ, বাশার, মহাসিন ও (ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী মিলন, আকাশ, বাবলা, সোহাগ, রনি)
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍