হোম / আহতদের তালিকা / মো: রেজমুল হক
মো: রেজমুল হক

মো: রেজমুল হক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শাসনকালে বাংলাদেশে যে দমন—পীড়ন, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছে; তা গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে চরমভাবে পদদলিত করেছে। নির্বাচনের নামে প্রহসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় নিষেধাজ্ঞা, ভিন্নমত দমন করতে ছাত্রলীগ—যুবলীগের পৃষ্ঠপোষকতায় হামলা ও হত্যাকাণ্ড, বিচার বিভাগের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং আইন—শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়ঙ্কর দমনযন্ত্রে রূপান্তরিত করেছে।
এসবই তাদের স্বৈরশাসনের স্পষ্ট নিদর্শন। মানুষ যখন দেখে, ভোটাধিকার হরণ, চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে দলীয়করণ, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আর সাধারণ নাগরিকের ন্যায্য অধিকারেও পাহারা বসানো হচ্ছে; তখন তারা আর চুপ থাকতে পারে না। আওয়ামী শাসনের এই ভয়াবহতা মানুষকে বাধ্য করেছে রাজপথে নামতে, গণতন্ত্র ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে; এমনকি যদি তার মূল্য হয় গুলি, রক্ত আর জীবন।
রেজমুল হক; জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী নাম
রেজমুল হক, ২০০৩ সালের ১০ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের শান্ত—নিবিড় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের এক নিভৃত পল্লী, সালন্দরপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই প্রকৃতির সংস্পর্শে গড়ে ওঠা এই তরুণের জীবনে মাটি, মানুষ ও সংগ্রামের গভীর প্রভাব পড়ে। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের নির্ভরতা, স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপিত হয় যা পরবর্তীতে তার সাহসী পদক্ষেপগুলোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
পারিবারিক জীবন
রেজমুল হকের পিতা মো: সোলাইমান আলী (৪০) ছিলেন একজন ব্যবসায়ী; নীরব অথচ অনড় এক সংগ্রামী মানুষ। জীবনের প্রতিটি বাঁকে যিনি কুঁচকে যাননি,বরং নিজের শ্রম, সততা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সন্তানদের সামনে এক জীবন্ত আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন। তার মা, মোছা: রোজিনা আক্তার (৩৮), একজন গৃহিণী হলেও ঘরের ভিতরে ছিলেন বাতিঘরের মতো; নিঃস্বার্থ ভালোবাসা,অসীম ধৈর্য আর আদরের স্পর্শে গড়ে তুলেছেন একটি আদর্শ পরিবার। এমন একটি নৈতিক ও মানবিক পরিবেশে বেড়ে উঠেই রেজমুল হকের চরিত্রে জন্ম নেয় আত্মমর্যাদা, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার অদম্য সাহস।
কর্মজীবন
রেজমুল হক একজন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের ছাত্র। তিনি শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থী নন,পারিবারিক দায়িত্ব ও নিজের উন্নয়ন চিন্তা থেকে তিনি একটি পার্টটাইম চাকরিও করতেন। জীবনের বাস্তবতা ও সংগ্রামকে খুব অল্প বয়সেই কাছ থেকে দেখেছেন বলেই তিনি হয়ে উঠেছেন একজন বাস্তববাদী ও কর্মঠ তরুণ। জীবনের প্রতিটি স্তরে তার চলার পথ ছিল পরিশ্রমে ভরা,আর সেই পরিশ্রমই তাকে তৈরি করেছে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবার এক শক্ত মেরুদণ্ডে।
সংগ্রামী জীবন
জুলাই আন্দোলনের সময় যখন গোটা দেশের আকাশ ঘিরে ধরেছিল ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের ঘোর অন্ধকার, তখন হাজারো মানুষের মতো জয়নালও নিজেকে আর গুটিয়ে রাখেননি। তিনি রাস্তায় নেমে আসেন, হাতে তুলে নেন প্রতিবাদের শ্লোগান। রেজমুল হক একটা নির্ভীক সৈনিক,তিনি ছিলেন সেই সাহসী কণ্ঠ, যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। তার চোখে ছিল স্পষ্ট এক বোধ; দেশের স্বাধীনতা মানে কেবল পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানে কথা বলার অধিকার, বিচার চাওয়ার অধিকার, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার। রেজমুল হক সে অধিকার আদায়ের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তার এই জীবনযাত্রা, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ আজকের ও আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখানো এক অনন্ত প্রেরণা। রেজমুল হকের জীবন কেবল একজন ছাত্রের জীবনের গল্প নয়, এটি এক সাহসী চেতনাসম্পন্ন তরুণের আত্মপ্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি প্রমাণ করে গেছেন মানুষ চাইলে নিজেকে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, যদি তার ভিতরে থাকে সততা, সাহস আর ন্যায়ের প্রতি অনমনীয় নিষ্ঠা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন —এক নির্ভীক যোদ্ধার আন্দোলনের স্মৃতি
আমার বয়স মাত্র ২০। আমি একজন ছাত্র; পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও শহরের একটি ফার্মেসিতে পার্টটাইম কাজ করি, পরিবারকে সহায়তা করি। ওষুধ আর অসুখ নিয়ে কাজ করতে করতেই জীবনের আরেক বড় সত্য বুঝেছি; এই রাষ্ট্রও এক অসুস্থ শরীর, যার নিরাময় দরকার। আর সে চিকিৎসার নামই হলো আন্দোলন। ৪ আগস্ট ২০২৪; এই দিনটি আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। ঠাকুরগাঁও শহরের বুকে সেদিন নেমে এসেছিল যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রের বিভীষিকা। একদিকে আমরাও ছিলাম সাধারণ ছাত্র—জনতা, আমাদের হাত ছিল খালি, কিন্তু হৃদয়ে ছিল প্রতিবাদের আগুন। আর অন্যদিকে দাঁড়িয়েছিল রাষ্ট্রের রক্তখেকো রূপ; পুলিশ আর আওয়ামী লীগ নামধারী দুঃশাসনের বাহিনী। ছাত্রদের ওপর ছেঁাড়া হচ্ছিল টিয়ারশেল, রাবার বুলেট আর গুলি। ওই মুহূর্তে আমার নিজের শরীরেও লেগে যায় ছড়রা গুলি। রক্ত ঝরছিল, চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু মনে মনে বলছিলাম, আমি থামব না, আমরা থামব না। আমার মা—বাবা আমাকে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘পরে যা কিছু হোক, এখন নিজের জীবনটা আগে বাঁচাও; কিন্তু আমি কেবল বলেছিলাম, মা, আমি কারও হয়ে নয়, নিজের বিবেকের তাগিদে রাস্তায় যাচ্ছি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই, কোনো রাজনৈতিক স্বার্থও না। আমি চাই একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। আমি চাই, আমাদের মতো সাধারণ ছাত্রদের গুলি না খেতে হোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় না লাগুক। যখন গুলি খেয়ে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম, আমার সহযোদ্ধারা আমাকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। শরীরে এখনো রয়ে গেছে সেই ছররা গুলির চিহ্ন। কিন্তু এই ক্ষত আমার লজ্জা নয়; এটা আমার গর্ব, আমার পরিচয়।”
“আজ যখন মনে হয়, কেউ হয়তো ভাবছে; এতটুকু বয়সে আমি কেন রাজপথে গেলাম? আমি শুধু এটুকু বলি, দেশটা তো আমাদের,তার ভবিষ্যতও আমাদের। যদি আমরা মুখ না খুলি, তাহলে কারা খুলবে?” আমি বিশ্বাস করি; ইতিহাসে আমাদের নাম থাকবে না হয়তো, কিন্তু জনগণের মনে আমরা থাকব। কারণ এই দেশের মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে, আর জানে সে সব মানুষের কদর করতে যারা বুক চিতিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়। রেজমুল হকের এই বয়ান কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়; এটি এক তরুণের সাহসী উচ্চারণ, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক চেতনার ঘোষণা। এ কথা শুধু লিখে রাখার জন্য নয়, স্মরণ করার জন্য, শেখার জন্য, এবং ভবিষ্যতের আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আহত হওয়ার পর আমার সহযোদ্ধারা আমাকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ আমাকে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং জরুরি ভিত্তিতে সার্জারির মাধ্যমে শরীরে বিদ্ধ থাকা বুলেটগুলোর কিছু বের করে ফেলেন। এই শারীরিক আঘাত ও অস্ত্রোপচারের পরও শরীরে রয়ে যায় নানা জটিলতা ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। ফলে পরবর্তীতে আমি স্থানীয় ফার্মেসি থেকেও ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা নেই এবং ধীরে ধীরে সেরে উঠতে থাকি। এখনও পুরোপুরি সুস্থ নই, কিন্তু মনোবল অটুট; কারণ আমি বিশ্বাস করি,এই ব্যথা শুধু আমার একার নয়, এটি পুরো জাতির মুক্তির লড়াইয়ের নিঃশব্দ সাক্ষ্য।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখন মোটামুটি সুস্থ, আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং দরকার।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র ও ফার্মেসিতে পার্ট টাইম চাকরি
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: রেজমুল হক
জন্ম তারিখ : ১০/১২/২০০৩
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ছাত্র, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সালন্দর, পৌরসভা: সালন্দর, থানা: ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: সোলায়মান আলী
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা, ৪০
মায়ের নাম : মোছা: রেজিনা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১২,০০০
আয়ের উৎস : ব্যবসা
সন্তানদের বিবরণ
১. রাব্বি হাসান, বয়স: ১৭, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: একাদশ, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসী
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ২.৩০মিনিট