হোম / আহতদের তালিকা / মো: সেলিম হোসেন মিম
মো: সেলিম হোসেন মিম

মো: সেলিম হোসেন মিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ফ্যাসিস্ট রাক্ষসী হাসিনার শাসন ও জুলাই বিপ্লব
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ শাসন করেছে এক রাজনৈতিক দমন—পীড়নের শাসনের মূল হোতা ছিল শেখের বেটি খুনী হাসিনা; যেখানে ক্ষমতা রক্ষাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাষ্ট্রের একমাত্র উদ্দেশ্য। গণতন্ত্রের মুখোশে লুকিয়ে থাকা এক স্বৈরশাসনের এই চিত্র, যেখানে বিরোধী কণ্ঠকে রক্তে রাঙানো হয়েছে, যুব সমাজের স্বপ্নকে বন্দুকের নলে থামিয়ে দেয়া হয়েছে,আর রাজপথকে রূপান্তরিত করা হয়েছে গুলির আওয়াজ আর নির্যাতনের ভয়ে স্তব্ধ এক জনপদে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের এই স্বৈরতান্ত্রিক দমননীতি চূড়ান্ত সীমা ছাড়িয়ে গেলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাস্তায় নামে দেশের ছাত্র—জনতা। তারা রুখে দাঁড়ায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, বুক পেতে নেয় গুলি, চোখে চোখ রাখে নিপীড়নের,কণ্ঠে ধারণ করে প্রতিরোধের আগুন। এই আন্দোলন ছিল নিপীড়িত জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ; এক সাহসী ঘোষণা যে,জুলুম যতই হোক,অন্যায় কখনো চিরস্থায়ী হয় না।
সেলিম হোসেন মিম : ছাত্র—জনতার বিপ্লবের এক সাহসীর নাম
২০০৩ সালের ১১ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও জেলার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের নিরিবিলি এক প্রান্তে, চেয়ারম্যান পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এক সাহসী প্রজন্মের সন্তান সেলিম হোসেন মিম। এই গ্রামীণ মাটিতে খেলা করে,মাঠ—ঘাটের সেঁাদা গন্ধ মেখে তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে। সহজ—সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই কিশোরের ভেতরেই একদিন জেগে উঠবে এক বিপ্লবী চেতনা, তা হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করেনি।
পারিবারিক জীবন
সেলিমের পারিবারিক জীবন ছিল অনাড়ম্বর কিন্তু গভীর মানবিকতায় পূর্ণ। তাঁর পিতা মো: জয়নাল আবেদীন ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান চাকরিজীবী; যিনি কখনো উচ্চবাচ্য না করেও সন্তানদের সামনে আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন তাঁর শ্রম, সততা ও অবিচল সংগ্রামী মনোভাব দিয়ে। আর তাঁর মা মোছা: সেলিনা আক্তার ছিলেন সংসারের দীপ্ত বাতিঘর; যাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসা,অসীম ধৈর্য আর মমতায় গড়ে ওঠে সেলিমের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মানবিকতা। দুই ভাই—বোনের ছোট সংসারে সেলিমের বড় বোন তাসলিমা আক্তার বিবাহিত ও একজন গৃহিণী। এই পরিবারই ছিল সেলিমের প্রথম পাঠশালা; যেখানে তিনি শিখেছিলেন আত্মমর্যাদা,নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ।
ছাত্রজীবন
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে সেলিম হোসেন মিমের ছাত্রজীবন ছিল নিঃশব্দে আত্মনির্মাণের এক পর্ব। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি দেশ,সমাজ ও রাজনীতির প্রতিও সচেতন ছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা,সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে চিন্তা করা,এসব তাঁর চিন্তার পরিসরে জায়গা করে নেয় অল্প বয়সেই। সমাজে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়াকে তিনি কেবল একটি আদর্শ নয়, দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
সংগ্রামী জীবন
জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোয় যখন রাষ্ট্রীয় দমন— পীড়নের কালো ছায়া গোটা দেশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেলিম হোসেন মিম কণ্ঠে প্রতিবাদের স্লোগান তুলে, বুক চিতিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তাঁর চোখে ছিল দৃপ্ত প্রত্যয়, কণ্ঠে ছিল সাহসের ভাষা, আর হৃদয়ে ছিল দেশের প্রতি অবিচল ভালোবাসা। তিনি বিশ্বাস করতেন; স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই বিবেকবান মানুষের প্রকৃত কর্তব্য। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি জীবন বাজি রেখে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্র—জনতার কাতারে। তাঁর এই সাহসী ভূমিকা আজ আমাদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ; একজন তরুণ কীভাবে সত্য, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে যেতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। এই সংগ্রামী তরুণের জীবন—কথা আজ শুধু কাগজে—কলমে লেখা একটি জীবনী নয়, বরং তা এক প্রেরণার বাতিঘর, যা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে স্বপ্ন, নৈতিকতা ও সাহসের আলোয়।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : ছাত্র—জনতা বিপ্লবের কাহিনী এক বিপ্লবীর জবানিতে
আমি চোখে দেখেছি, গণতন্ত্রকে গুলি করে হত্যা করতে। আমি শরীরে বহন করছি সেই ইতিহাসের ক্ষত।
আমি সেলিম হোসেন মিম, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের এক নগণ্য ছাত্র। কিন্তু সেই জুলাই মাসে, আমি শুধু একজন শিক্ষার্থী ছিলাম না; ছিলাম জনতার কণ্ঠস্বর, অধিকারহীনদের প্রতিবাদ, আর রাষ্ট্রের জুলুমের বিরুদ্ধে তুলেছিলাম সাহসের প্রাচীর। বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই আমি ছাত্র—জনতার কাতারে, মিছিলের প্রথম সারিতে ছিলাম। শ্লেস্নাগানে মুখর রাজপথে যখন আওয়াজ উঠত; “ফ্যাসিবাদের পতন চাই”, তখন আমার কণ্ঠও একসাথে গর্জে উঠত। পুলিশের লাঠি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছি নির্ভয়ে; কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, একদিন ইতিহাস আমাদের এই প্রতিবাদকেই স্মরণ করবে।
আমাদের উপর চলেছে নজিরবিহীন নির্যাতন। ধাওয়া—পাল্টা ধাওয়ার মাঝে আমি নিজ চোখে দেখেছি, কীভাবে আমার সহযোদ্ধারা রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। অনেকেই যখন পালাতে ব্যস্ত, আমি তখন আহত ভাইদের ধরে হাসপাতালের দিকে ছুটেছি। কারো পা ভাঙা, কারো চোখে গুলি; তবুও থেমে থাকিনি। ৫ তারিখের পর থেকে তো আমার জীবনের একমাত্র কাজই ছিল আহতদের পাশে দাঁড়ানো। হুইলচেয়ারে বসা সেই ভাইটির চোখের জল আমার বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল; আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে দেয়নি।
৪ আগস্ট ২০২৪। সেই বিভীষিকাময় বিকাল। ঠাকুরগাঁওয়ের চৌরাস্তা কোর্ট চত্বরে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম শান্তিপূর্ণ অবস্থানে। হঠাৎ পুলিশ বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। গুলির শব্দে আকাশ কেঁপে উঠল। আমি ছুটে গিয়েছিলাম এক আহত ভাইকে টানতে; তখনই কয়েকটি গুলি আমার শরীরে বিদ্ধ হয়। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল গায়ের জামা,কিন্তু আমি চিৎকার করিনি। কারণ জানতাম, ভয়ের চিৎকারে স্বৈরাচার আনন্দ পায়।
আমাকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। শরীরে তখনও গুলির চিহ্ন; ব্যথা ছিল, কিন্তু মনটা ছিল আরও অদম্য। আমি কাউকে বলিনি, আমি কষ্টে আছি। আমি চাইনি, কেউ আমাকে বাড়তি কিছু দিক; আমি চাইনি কোনো সুযোগ—সুবিধা। কারণ আমি বিশ্বাস করি, বিপ্লব মানে ত্যাগ। বিপ্লব মানে নিজের জন্য নয় অন্যদের জন্য বেঁচে থাকা। এই আওয়ামী শাসনব্যবস্থা; আমাদের কণ্ঠরোধ করতে চায়। আমার শরীরে যে বুলেট এখনও রয়ে গেছে, সেটা শুধু একটি ধাতব কণা নয়; এটা একটা ইতিহাসের সাক্ষ্য। আওয়ামী শাসনের বর্বরতা,তাদের পুলিশ বাহিনীর পৈশাচিকতা; সব কিছু আমি নিজ চোখে দেখেছি, নিজের রক্ত দিয়ে লিখেছি।
আজ যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে—“পস্তাচ্ছো?” আমি শুধু বলি,“রক্ত ঝরেছে ঠিকই, কিন্তু মাথা নত হয়নি।” আর তাতেই আমার বিজয়।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আহত হওয়ার পর আমার সহযোদ্ধারা আমাকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তাররা আমার শরীর থেকে গুলি বের করে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। রক্তাক্ত অবস্থায়, তীব্র যন্ত্রণা সত্ত্বেও আমি হুঁশ হারাইনি; কারণ জানতাম, আমার পাশে আছে আমার আন্দোলনরত ভাইয়েরা। চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা হয়।
তবে শরীরের অভ্যন্তরে গুলির আঘাতের পরিণতি থেকে রক্ষা পাইনি পুরোপুরি। কিছুদিন পর বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়—ব্যথা, ফুলে যাওয়া, ঘন ঘন অসুস্থতা। তাই পুনরায় ডাক্তার দেখাই এবং ধারাবাহিকভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাই। এখনো শরীরে সেই ঘটনার ক্ষতচিহ্ন বহন করছি, যা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, এই স্বাধীনতার পথে কতটা মূল্য দিতে হয়েছে আমাদের।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং দরকার।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সেলিম হোসেন মিম
জন্ম তারিখ : ১১/০৩/২০০৩
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চেয়ারম্যানপাড়া, ইউনিয়ন/পৌরসভা: সালন্দর, থানা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: জয়নাল আবেদীন
পিতার পেশা ও বয়স : চাকরী, ৪৫
মায়ের নাম : মোছা: সেলিনা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১৫,০০০/
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ী : সেমি পাকা
সম্পদ : ৬ শতক পরিমাণ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাই: বোনের তথ্যাদি
১. বয়স: তাসলিমা, বয়স: ২৫, বিবাহিত, গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা কোর্টচত্বর, ঠাকুরগাঁও
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; বিকাল ৩.০০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍