মো: সলেমান আলী
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ড্রাইভার
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মো: সোলেমান আলী : জুলাই আন্দোলনের এক প্রবীণ যোদ্ধা
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র—জনতার সাহসী অভ্যুত্থানের এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এই আন্দোলনের সময় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রীয় মদদে নির্বিচারে গুলি চালায় নিরস্ত্র ছাত্র, যুবক ও সাধারণ জনগণের ওপর। স্কুল—কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে দিনমজুর পর্যন্ত কেউই রেহাই পায়নি এই পৈশাচিক হামলা থেকে। রাস্তাঘাট রঞ্জিত হয় তরুণদের রক্তে। অসংখ্য মানুষ গুম, খুন ও আহত হন; হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়ে রক্তাক্ত দেহ। কিন্তু এ নিষ্ঠুরতা জনগণের চেতনাকে দমন করতে পারেনি। বরং পুরো জাতি ফুঁসে ওঠে প্রতিবাদের আগুনে।
ঘরে ঘরে গর্জে ওঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” শ্লোগান। জনরোষ, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মুখে খুনী স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনা অবশেষে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং সেই দুঃশাসনের একটি জঘন্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
জন্ম ও শৈশব
মো: সলেমান আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৬ সালের ৫ জুলাই, ঠাকুরগাঁও জেলার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের সেনপাড়া গ্রামে। মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্কপূর্ণ এক কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। তার পিতা মতিবুর রহমান (৬৮) একজন সাধারণ কৃষক হলেও ছিলেন অনড় ও আত্মমর্যাদাবান এক সংগ্রামী মানুষ। মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে দিন গুজরান করেও তিনি সন্তানদের সামনে সৎ ও পরিশ্রমী জীবনের আদর্শ রেখে গেছেন। তাঁর মা সালমা খাতুন (৬০) একজন গৃহিণী, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা,অসীম ধৈর্য ও মাতৃস্নেহে সন্তানদের লালন—পালন করেছেন। এই নির্লোভ ও নৈতিকতাভিত্তিক পারিবারিক পরিবেশেই গড়ে উঠেছে সোলেমানের আত্মমর্যাদা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ।
পারিবারিক জীবন
বর্তমানে মো: সোলেমান আলী তিন সন্তানের জনক। তাঁর বড় মেয়ে ইসরাত জাহান (১৪) সালন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং দ্বিতীয় মেয়ে নুসরাত জাহান (১২) একই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে তামিম (৫) শিশু শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। মা—বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সোলেমান গড়ে তুলেছেন এক স্নেহ ও বন্ধনে গাঁথা পরিবার, যেখানে শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধের চর্চা প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপ নেয়।
কর্মজীবন
জীবিকা হিসেবে মো: সোলেমান আলী একজন পেশাদার গাড়িচালক। শ্রমজীবী এই মানুষটি প্রতিদিনের ঘাম ও শ্রম দিয়ে নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণ করে গেছেন নীরবে, নিষ্ঠায়। যদিও তিনি রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তবে তাঁর চিন্তা—চেতনায় সবসময়ই বিরাজ করত দেশ, সমাজ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ। তার মতে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় নয়, একজন সচেতন নাগরিকও দেশের দুর্দিনে প্রতিবাদী হতে পারে।
সংগ্রামী জীবন
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়টিতে, যখন ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের কালো ছায়া দেশের প্রতিটি প্রান্তকে গ্রাস করছিল,তখন মো: সোলেমান আলী জীবনকে বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন রক্তাক্ত ময়দানে। তিনি বিশ্বাস করতেন,অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কর্তব্য। গাড়ি চালানোর পেশার মধ্যেও তিনি সময় বের করে ছাত্র—জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই প্রবীণ যোদ্ধার সাহসিকতা,আত্মত্যাগ ও স্পষ্ট বিবেক আজকের ও আগামী প্রজন্মের জন্য হতে পারে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; একটি আলোকবর্তিকার মতো, যা অন্ধকার সময়েও পথ দেখাবে প্রতিবাদের আলো।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন এক বাহাদুরের কাহিনী
আমি মো: সলেমান আলী। পেশায় আমি একজন ড্রাইভার। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটা রাস্তা,অলিগলি আমার চেনা। রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে জীবিকা চলে, কিন্তু দেশের খবর থেকে কখনও দূরে থাকিনি। জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়েও আমি খবর রাখতাম; দেশের ছোট ছোট ভাই—বোনেরা রাজপথে নেমেছে, ন্যায়ের দাবিতে, গুলিতে অনেকেই শহীদ হচ্ছে, কেউ পঙ্গু, কেউ হাসপাতালে কাতর। আমার মনে হতো ওরা আমার আপন ভাই— বোন, আমার সন্তানের মতো।
ডিউটি ছিল, কিন্তু হৃদয় বলছিল; এখন সময় শুধু গাড়ি চালানোর নয়, সময় রাজপথে থাকার। আমি আর বসে থাকতে পারিনি। ঠাকুরগাঁও শহরে আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিলাম। চিৎকার করে বলছিলাম, এ বিচার মানি না,’আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’। হঠাৎ হুলস্থুল পরিস্থিতি; মিছিলের ওপর নেমে আসে পুলিশ ও সরকার দলীয় বাহিনীর ঝাঁপ। শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, গুলি। আমি পালাইনি। দেশপ্রেমে বুক ভরা ছিল। ঠিক তখনই কয়েকটা ছররা গুলি আমার শরীরে এসে লাগে। আমি পড়ে যাই। চারপাশে শুধু ধেঁায়া, আর্তনাদ আর রক্ত। আমি মনে করলাম, এখানেই শেষ। কিন্তু আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন। চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এসেছি বটে, কিন্তু প্রশ্নটা এখনও বুকের মধ্যে জ্বলছে; কেন শুধু আমি? কেন আমরা? শুধু সত্য বলার জন্য, প্রতিবাদ করার জন্যই কি আমাদের গুলি খেতে হবে?
এই যে আওয়ামী লীগের বর্বরোচিত হামলা; এটার কি কোনো জবাবদিহি হবে না? যারা আমার ভাইদের মেরেছে, যারা আমাকে গুলি করেছে; তারা কি কোনোদিন বুঝবে, একটি গুলির ব্যথা শুধু শরীরে নয়, মনে থাকে সারা জীবন। আমি এখনও দেশের খবর রাখি। আমি জানি, আমার মতো হাজারো সোলেমান রাজপথে ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু ওই রক্তাক্ত দিনটা; জুলাইয়ের সেই ভয়ংকর মুহূর্তটা আমি কখনও ভুলতে পারব না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আহত হওয়ার পর আন্দোলনের ভাইয়েরা আমাকে আরেক মুহূর্ত দেরি না করে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমি তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছি, চোখে ঝাপসা, শরীরে অসহনীয় যন্ত্রণা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে ডাক্তাররা আমার শরীর থেকে কয়েকটি রাবার বুলেট অপসারণ করেন। শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত, গুলি শুধু চামড়া ছিঁড়ে ঢোকেনি, বুকের ভেতরেও যেন আগুন ঢেলে দিয়েছিল। ডাক্তাররা বললেন, ‘শরীর থেকে যতটা সম্ভব বুলেট বের করা গেছে, তবে এখনো দু’টি রাবার বুলেট শরীরের ভেতরে রয়ে গেছে। অপারেশন ঝুঁকিপূর্ণ, আর সুযোগ—সুবিধাও নেই।’
আজও আমার শরীরে সেই রাবার বুলেট দু’টি আছে; আমি প্রতিদিন তা টের পাই, যন্ত্রণায় কাতর হই, মনে করি এগুলো শুধু বুলেট নয়, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের জীবন্ত প্রমাণ। তারা শুধু আমার গায়ে গুলি করেনি, বরং পুরো একটা প্রজন্মকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করেছে।
আমি আজও বেঁচে আছি, কিন্তু সেদিনের রক্ত, সেই যন্ত্রণার রাত; আমার কাছে বারবার ফিরে আসে। আমি কখনো ভুলতে পারি না; যে দেশের জন্য ভালোবাসা দেখাতে গিয়েছিলাম, সে দেশের শাসকগোষ্ঠীই আমাকে গুলিবিদ্ধ করল। শুধু আমার কথা না; এ দেশের প্রতিটা তরুণ—তরুণীর হৃদয়ে আজও সেই রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলনের ক্ষত বহন করে চলছে। এই হামলা ছিল আওয়ামী লীগের বর্বরোচিত দমন নীতির নগ্ন উদাহরণ; যেখানে জনগণের কণ্ঠরোধ করতে তারা গুলি, লাঠি আর নির্যাতনকেই অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে; আমরা পিছপা হইনি, হবোও না। শরীরে গুলি থাকলেও বুকটা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
কন্টাক্টে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়িচালক
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সলেমান আলী
জন্ম তারিখ: ০৫/০৭/১৯৮৬
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ড্রাইভার
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সেনপাড়া, ইউনিয়ন: সালন্দর, পৌরসভা: নারগুন, থানা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মতিবুর রহমান
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬৮
মায়ের নাম : সালমা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬০
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
বাড়ী : টিনের বাড়ি
সম্পদ : ৭ শতক পরিমাণ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. ইসরাত জাহান, বয়স: ১৬, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ১০ম, সম্পর্ক: মেয়ে
২. জাহান, বয়স: ১৪, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৬ষ্ঠ, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. তামিম, বয়স: ৪, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: শিশু, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা কোর্ট চত্বর, ঠাকুরগাঁও
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪; বিকাল ৩.০০ মিনিটের দিকে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র—জনতার সাহসী অভ্যুত্থানের এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এই আন্দোলনের সময় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রীয় মদদে নির্বিচারে গুলি চালায় নিরস্ত্র ছাত্র, যুবক ও সাধারণ জনগণের ওপর। স্কুল—কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে দিনমজুর পর্যন্ত কেউই রেহাই পায়নি এই পৈশাচিক হামলা থেকে। রাস্তাঘাট রঞ্জিত হয় তরুণদের রক্তে। অসংখ্য মানুষ গুম, খুন ও আহত হন; হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়ে রক্তাক্ত দেহ। কিন্তু এ নিষ্ঠুরতা জনগণের চেতনাকে দমন করতে পারেনি। বরং পুরো জাতি ফুঁসে ওঠে প্রতিবাদের আগুনে।
ঘরে ঘরে গর্জে ওঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” শ্লোগান। জনরোষ, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মুখে খুনী স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনা অবশেষে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং সেই দুঃশাসনের একটি জঘন্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
জন্ম ও শৈশব
মো: সলেমান আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৬ সালের ৫ জুলাই, ঠাকুরগাঁও জেলার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের সেনপাড়া গ্রামে। মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্কপূর্ণ এক কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। তার পিতা মতিবুর রহমান (৬৮) একজন সাধারণ কৃষক হলেও ছিলেন অনড় ও আত্মমর্যাদাবান এক সংগ্রামী মানুষ। মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে দিন গুজরান করেও তিনি সন্তানদের সামনে সৎ ও পরিশ্রমী জীবনের আদর্শ রেখে গেছেন। তাঁর মা সালমা খাতুন (৬০) একজন গৃহিণী, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা,অসীম ধৈর্য ও মাতৃস্নেহে সন্তানদের লালন—পালন করেছেন। এই নির্লোভ ও নৈতিকতাভিত্তিক পারিবারিক পরিবেশেই গড়ে উঠেছে সোলেমানের আত্মমর্যাদা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ।
পারিবারিক জীবন
বর্তমানে মো: সোলেমান আলী তিন সন্তানের জনক। তাঁর বড় মেয়ে ইসরাত জাহান (১৪) সালন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং দ্বিতীয় মেয়ে নুসরাত জাহান (১২) একই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে তামিম (৫) শিশু শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। মা—বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সোলেমান গড়ে তুলেছেন এক স্নেহ ও বন্ধনে গাঁথা পরিবার, যেখানে শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধের চর্চা প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপ নেয়।
কর্মজীবন
জীবিকা হিসেবে মো: সোলেমান আলী একজন পেশাদার গাড়িচালক। শ্রমজীবী এই মানুষটি প্রতিদিনের ঘাম ও শ্রম দিয়ে নিজের পরিবারের চাহিদা পূরণ করে গেছেন নীরবে, নিষ্ঠায়। যদিও তিনি রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তবে তাঁর চিন্তা—চেতনায় সবসময়ই বিরাজ করত দেশ, সমাজ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ। তার মতে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় নয়, একজন সচেতন নাগরিকও দেশের দুর্দিনে প্রতিবাদী হতে পারে।
সংগ্রামী জীবন
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়টিতে, যখন ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের কালো ছায়া দেশের প্রতিটি প্রান্তকে গ্রাস করছিল,তখন মো: সোলেমান আলী জীবনকে বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন রক্তাক্ত ময়দানে। তিনি বিশ্বাস করতেন,অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কর্তব্য। গাড়ি চালানোর পেশার মধ্যেও তিনি সময় বের করে ছাত্র—জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই প্রবীণ যোদ্ধার সাহসিকতা,আত্মত্যাগ ও স্পষ্ট বিবেক আজকের ও আগামী প্রজন্মের জন্য হতে পারে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; একটি আলোকবর্তিকার মতো, যা অন্ধকার সময়েও পথ দেখাবে প্রতিবাদের আলো।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন এক বাহাদুরের কাহিনী
আমি মো: সলেমান আলী। পেশায় আমি একজন ড্রাইভার। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটা রাস্তা,অলিগলি আমার চেনা। রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে জীবিকা চলে, কিন্তু দেশের খবর থেকে কখনও দূরে থাকিনি। জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়েও আমি খবর রাখতাম; দেশের ছোট ছোট ভাই—বোনেরা রাজপথে নেমেছে, ন্যায়ের দাবিতে, গুলিতে অনেকেই শহীদ হচ্ছে, কেউ পঙ্গু, কেউ হাসপাতালে কাতর। আমার মনে হতো ওরা আমার আপন ভাই— বোন, আমার সন্তানের মতো।
ডিউটি ছিল, কিন্তু হৃদয় বলছিল; এখন সময় শুধু গাড়ি চালানোর নয়, সময় রাজপথে থাকার। আমি আর বসে থাকতে পারিনি। ঠাকুরগাঁও শহরে আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিলাম। চিৎকার করে বলছিলাম, এ বিচার মানি না,’আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’। হঠাৎ হুলস্থুল পরিস্থিতি; মিছিলের ওপর নেমে আসে পুলিশ ও সরকার দলীয় বাহিনীর ঝাঁপ। শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, গুলি। আমি পালাইনি। দেশপ্রেমে বুক ভরা ছিল। ঠিক তখনই কয়েকটা ছররা গুলি আমার শরীরে এসে লাগে। আমি পড়ে যাই। চারপাশে শুধু ধেঁায়া, আর্তনাদ আর রক্ত। আমি মনে করলাম, এখানেই শেষ। কিন্তু আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন। চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এসেছি বটে, কিন্তু প্রশ্নটা এখনও বুকের মধ্যে জ্বলছে; কেন শুধু আমি? কেন আমরা? শুধু সত্য বলার জন্য, প্রতিবাদ করার জন্যই কি আমাদের গুলি খেতে হবে?
এই যে আওয়ামী লীগের বর্বরোচিত হামলা; এটার কি কোনো জবাবদিহি হবে না? যারা আমার ভাইদের মেরেছে, যারা আমাকে গুলি করেছে; তারা কি কোনোদিন বুঝবে, একটি গুলির ব্যথা শুধু শরীরে নয়, মনে থাকে সারা জীবন। আমি এখনও দেশের খবর রাখি। আমি জানি, আমার মতো হাজারো সোলেমান রাজপথে ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু ওই রক্তাক্ত দিনটা; জুলাইয়ের সেই ভয়ংকর মুহূর্তটা আমি কখনও ভুলতে পারব না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আহত হওয়ার পর আন্দোলনের ভাইয়েরা আমাকে আরেক মুহূর্ত দেরি না করে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমি তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছি, চোখে ঝাপসা, শরীরে অসহনীয় যন্ত্রণা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে ডাক্তাররা আমার শরীর থেকে কয়েকটি রাবার বুলেট অপসারণ করেন। শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত, গুলি শুধু চামড়া ছিঁড়ে ঢোকেনি, বুকের ভেতরেও যেন আগুন ঢেলে দিয়েছিল। ডাক্তাররা বললেন, ‘শরীর থেকে যতটা সম্ভব বুলেট বের করা গেছে, তবে এখনো দু’টি রাবার বুলেট শরীরের ভেতরে রয়ে গেছে। অপারেশন ঝুঁকিপূর্ণ, আর সুযোগ—সুবিধাও নেই।’
আজও আমার শরীরে সেই রাবার বুলেট দু’টি আছে; আমি প্রতিদিন তা টের পাই, যন্ত্রণায় কাতর হই, মনে করি এগুলো শুধু বুলেট নয়, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের জীবন্ত প্রমাণ। তারা শুধু আমার গায়ে গুলি করেনি, বরং পুরো একটা প্রজন্মকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করেছে।
আমি আজও বেঁচে আছি, কিন্তু সেদিনের রক্ত, সেই যন্ত্রণার রাত; আমার কাছে বারবার ফিরে আসে। আমি কখনো ভুলতে পারি না; যে দেশের জন্য ভালোবাসা দেখাতে গিয়েছিলাম, সে দেশের শাসকগোষ্ঠীই আমাকে গুলিবিদ্ধ করল। শুধু আমার কথা না; এ দেশের প্রতিটা তরুণ—তরুণীর হৃদয়ে আজও সেই রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলনের ক্ষত বহন করে চলছে। এই হামলা ছিল আওয়ামী লীগের বর্বরোচিত দমন নীতির নগ্ন উদাহরণ; যেখানে জনগণের কণ্ঠরোধ করতে তারা গুলি, লাঠি আর নির্যাতনকেই অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে; আমরা পিছপা হইনি, হবোও না। শরীরে গুলি থাকলেও বুকটা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
কন্টাক্টে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়িচালক
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সলেমান আলী
জন্ম তারিখ: ০৫/০৭/১৯৮৬
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ড্রাইভার
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সেনপাড়া, ইউনিয়ন: সালন্দর, পৌরসভা: নারগুন, থানা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মতিবুর রহমান
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬৮
মায়ের নাম : সালমা খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬০
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
বাড়ী : টিনের বাড়ি
সম্পদ : ৭ শতক পরিমাণ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. ইসরাত জাহান, বয়স: ১৬, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ১০ম, সম্পর্ক: মেয়ে
২. জাহান, বয়স: ১৪, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৬ষ্ঠ, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. তামিম, বয়স: ৪, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: শিশু, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা কোর্ট চত্বর, ঠাকুরগাঁও
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪; বিকাল ৩.০০ মিনিটের দিকে।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍