মো: সোহেল রানা
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
শেখ হাসিনার দুঃশাসনই জুলাই আন্দোলনের মূল ভিত্তি
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল এক গৌরবময় ও গণজাগরণের অধ্যায়, যার মূল প্রেরণা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, নিপীড়ন ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার তার দলীয় কর্মী ও প্রশাসন দিয়ে মানুষের মত প্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার এবং ন্যায্য রাজনৈতিক চর্চাকে ক্রমাগত দমন করেছে। বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মীদের উপর মামলা, গুম, হত্যা এসব ছিল যেন প্রতিদিনের দৃশ্য।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, গণতন্ত্রকে পুরোপুরি প্রহসনে পরিণত করা হয়। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটকে চুরি করে ক্ষমতা ধরে রাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, এবং ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর আচরণ সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এ ক্ষোভই রূপ নেয় আন্দোলনে। শুরুটা হয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে, কিন্তু খুব দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে শ্রমজীবী, পেশাজীবী, দিনমজুর, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে। সবাই বুঝে যায়, শেখ হাসিনার দুঃশাসনের অবসান না হলে কেউ নিরাপদ নয়, দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। জুলাই আন্দোলন তাই কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না এটি ছিল গণমানুষের বিদ্রোহ। স্বাধীনতা ও ইনসাফের আহ্বান। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে ভূমিকা রাখে ঠাকুরগাঁও জেলার কৃতি সন্তান কাভার্ড ভ্যান চালক মো: সোহেল মিয়া।
সোহেল মিয়ার জন্ম ও পরিচয়
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ তরুণ মো: সোহেল রানা, ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের দেওগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। যিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও দুই সন্তানের ভরসা হয়ে বেঁচে আছেন। তার জন্ম ১৯৯৬ সালের ১০ আগস্ট। অল্প বয়সেই বাবা—মাকে হারিয়ে জীবনের ভার নিতে হয়েছে নিজের কাঁধেই। পিতা মৃত মো: আইন উদ্দিন এবং মাতা মৃত মোছা: বেগম দু’জনেরই শূন্যতা আজ তার জীবনের স্থায়ী দুঃখ।
সোহেল রানা পেশায় তিনি একজন কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার। এই পেশার মাধ্যমেই চলে তার ছোট পরিবারের জীবিকা। প্রতি মাসে গড়ে আয় হয় ২০ হাজার টাকা, যা দিয়ে তিন সদস্যের সংসার চালানো তার জন্য এক কঠিন সংগ্রামের নাম। সোহেল রানা শুধু একজন শ্রমজীবী নন, তিনি একজন দায়িত্বশীল পিতা। তার দুই ছেলে ইকবাল, বয়স ৬ বছর এবং মো: ইসরাফিল, বয়স ৩ বছর। এই দুই শিশুর ভবিষ্যতের জন্যই দিন—রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নই তাকে প্রতিদিন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসতে উৎসাহ দেয়। গ্রামীণ তরুণ সোহেল রানার জীবনের অভিজ্ঞতা যেন একটি বৃহত্তর বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি যেখানে বাবা—মা হারানো সন্তান কেবল নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও বাঁচে, স্বপ্ন দেখে এবং সামনে এগিয়ে যেতে চায়। দেশের জন্যে যারা প্রয়োজনে জীবন দিতে সবসময় প্রস্তুত থাকে। মো: সোহেল রানার জীবন কাহিনী যেন হাজারো সাহসী তরুণের গল্প, যারা জুলাই আন্দোলনে জীবন বাজি রেখে লড়াই করে এখন নীরবে—নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন পরিবারকে নিয়ে টিকে থাকার জন্য।
কাভার্ড ভ্যান চালক সোহেলের ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এ মাসে দেশের ছাত্রসমাজ, তরুণ প্রজন্ম, শ্রমজীবী মানুষ সবাই একত্রিত হয়ে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। শুরু টা শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হলেও তা জনতার হৃদয় ছঁুয়ে যায়। কোটাবিরোধী আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি হিসাবে জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিন্তু সরকার সেই ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেয়ার পরিবর্তে বরং লেলিয়ে দেয় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদেরকে যেন তারা ভয়াবহভাবে আন্দোলন দমন করার পথ বেছে নেয়।
শিক্ষার্থীদের উপর আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ যেভাবে আক্রমণ করে, তা সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। ছাত্রাবাসে ঢুকে কুপিয়ে জখম করা, পিটিয়ে মেরে ফেলা, গুলি চালানো, মাঝরাতে গ্রেফতার এসব ছিল নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে জুলাইয়ের মধ্যভাগ থেকে ছাত্রদের উপর যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, তা সাধারণ মানুষকেও তীব্রভাবে আলোড়িত করে। দেশবাসীর চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের লড়াই নয়, এটি গোটা দেশের মুক্তির লড়াই।
এই পরিস্থিতিতে যে সব সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন মো: সোহেল তাদেরই একজন। পেশায় একজন কাভার্ড ভ্যান চালক হলেও তার পরিচয় শুধু একজন শ্রমজীবী নাগরিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার ভিতরে ছিল একজন বিবেকবান মানুষ, এক জনদরদী নাগরিক, যিনি গণতন্ত্র এবং ইনসাফের পক্ষে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন। যা পারেনি এদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা।
দেশকে মুক্ত করার এই উপলব্ধি থেকেই তিনি অংশ নিয়েছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের ছাত্র আন্দোলনে। তার সক্রিয়তা ছিল প্রশংসনীয়। ৪ আগস্ট ২০২৪ ঠাকুরগাঁও কোর্ট চত্বরে ছাত্র ও জনতা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। জজ কোর্ট প্রাঙ্গণের ভিতরেই চলছিল প্রতিবাদ। মো: সোহেল ছিলেন আন্দোলনের মাঝখানে, অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। হঠাৎ করে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ একযোগে আক্রমণ চালায় কোমলমতি শিক্ষার্থী ও জনতার উপর। টিয়ারসেল, রাবার বুলেট, লাঠিচার্জ সবকিছু যেন একসাথে নেমে আসে নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও জনতার উপর। পুলিশ গুলি ছোড়ে সোহেলকে লক্ষ্য করে। এই বর্বর হামলায় সোহেলের শরীরে প্রায় ৩৭টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়। শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। সহযোদ্ধারাই তাকে কোনোমতে উদ্ধার করে কোর্ট এলাকা থেকে সরিয়ে নেন।
আহত হয়েও চিকিৎসার সুযোগ ছিল না
কিন্তু আহত অবস্থায়ও তিনি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেননি। কারণ, তখনও পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা হাসপাতাল চত্বর ঘিরে রেখেছিল। আহতদের খুঁজে খুঁজে ধরার চেষ্টা করছিল। চিকিৎসার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল গ্রেফতার ও নির্যাতনের ভয়। এই কারণে স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে গোপনে চিকিৎসা নেন সোহেল ও তার সাথে অন্যান্য আহতরা। সেখানে কিছু ছররা গুলি অপসারণ করা গেলেও এখনো তার শরীরে ৫ থেকে ৭টি গুলি রয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই গুলিগুলো বের করতে হলে তাকে বড় ধরনের অপারেশন করাতে হবে। কিন্তু একজন দিনমজুরের পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। যার প্রতিদিন কাজ না থাকলে রাতে ঘরে ভাত জোটে না, তার পক্ষে বড় অপারেশন, বিশ্রাম এবং পরবর্তী চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন।
সোহেল ভেঙে পড়েননি। বরং তিনি বলেন, আমি রাজপথে নেমেছিলাম যেন আমার সন্তানরা এক ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশে বড় হতে পারে। আমার রক্ত যদি সেই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়, আমি তাতেই গর্বিত। তার এই কথাগুলো শুধু আবেগ নয়, এটি বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের এক দৃঢ় অঙ্গীকার। দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ যখন রাজপথে দাঁড়ায়, তখন সত্যিই বিজয়ী হয়।
তার এই আত্মত্যাগের কাহিনী আমাদের চোখে পানি আনে, কিন্তু একইসাথে সাহসও জাগায়। এটা কেবল একজন কাভার্ড ভ্যান চালকের গল্প নয়, এটি এক বিবেকবান নাগরিকের জুলাইয়ের দিনগুলোর গল্প, এক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গল্প, ফ্যাসিবাদ থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার গল্প। যে লড়াই করেছে দেশের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য এবং সন্তানের অধিকারের জন্য।
সোহেলের মতো মানুষরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, এই দেশের তরুণদের ভয় দেখিয়ে চুপ করে রাখা যায় না। এই দেশ সেসব মানুষের, যারা নিপীড়নের মুখে প্রতিবাদ করতে জানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে জানে। তাদের রক্তের মূল্যেই এ দেশ ফিরে পেয়েছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা, যার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা হবে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র। তার ত্যাগকে সম্মান জানানো আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদিও তার প্রতি দায়িত্ব ভুলে যায় কিন্তু ইতিহাস তা ভোলে না। ইতিহাস একদিন গর্ব করে বলবে এই দেশ গড়ে উঠেছিল মো: সোহেলদের মতো মানুষদের আত্মত্যাগের ভিত্তিতে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সোহেল রানা
জন্ম তারিখ : ১০/০৮/১৯৯৬
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও সদর, ঠাকুরগাঁও
পেশা : ড্রাইভার
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দেওগাঁও, ইউনিয়ন: সালন্দর, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত মো: আইন উদ্দিন
মায়ের নাম : মৃত মোছা: বেগম
মাসিক আয় : ২০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং থেকে প্রাপ্ত আয়
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মো: ইসরাফিল ইসলাম ইকবাল, বয়স: ৩, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : জজকোর্টের ভিতরে, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট
আক্রমণকারীত : পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল এক গৌরবময় ও গণজাগরণের অধ্যায়, যার মূল প্রেরণা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, নিপীড়ন ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার তার দলীয় কর্মী ও প্রশাসন দিয়ে মানুষের মত প্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার এবং ন্যায্য রাজনৈতিক চর্চাকে ক্রমাগত দমন করেছে। বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মীদের উপর মামলা, গুম, হত্যা এসব ছিল যেন প্রতিদিনের দৃশ্য।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, গণতন্ত্রকে পুরোপুরি প্রহসনে পরিণত করা হয়। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটকে চুরি করে ক্ষমতা ধরে রাখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, এবং ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর আচরণ সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এ ক্ষোভই রূপ নেয় আন্দোলনে। শুরুটা হয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে, কিন্তু খুব দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে শ্রমজীবী, পেশাজীবী, দিনমজুর, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে। সবাই বুঝে যায়, শেখ হাসিনার দুঃশাসনের অবসান না হলে কেউ নিরাপদ নয়, দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। জুলাই আন্দোলন তাই কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না এটি ছিল গণমানুষের বিদ্রোহ। স্বাধীনতা ও ইনসাফের আহ্বান। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে ভূমিকা রাখে ঠাকুরগাঁও জেলার কৃতি সন্তান কাভার্ড ভ্যান চালক মো: সোহেল মিয়া।
সোহেল মিয়ার জন্ম ও পরিচয়
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ তরুণ মো: সোহেল রানা, ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের দেওগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। যিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও দুই সন্তানের ভরসা হয়ে বেঁচে আছেন। তার জন্ম ১৯৯৬ সালের ১০ আগস্ট। অল্প বয়সেই বাবা—মাকে হারিয়ে জীবনের ভার নিতে হয়েছে নিজের কাঁধেই। পিতা মৃত মো: আইন উদ্দিন এবং মাতা মৃত মোছা: বেগম দু’জনেরই শূন্যতা আজ তার জীবনের স্থায়ী দুঃখ।
সোহেল রানা পেশায় তিনি একজন কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার। এই পেশার মাধ্যমেই চলে তার ছোট পরিবারের জীবিকা। প্রতি মাসে গড়ে আয় হয় ২০ হাজার টাকা, যা দিয়ে তিন সদস্যের সংসার চালানো তার জন্য এক কঠিন সংগ্রামের নাম। সোহেল রানা শুধু একজন শ্রমজীবী নন, তিনি একজন দায়িত্বশীল পিতা। তার দুই ছেলে ইকবাল, বয়স ৬ বছর এবং মো: ইসরাফিল, বয়স ৩ বছর। এই দুই শিশুর ভবিষ্যতের জন্যই দিন—রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নই তাকে প্রতিদিন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসতে উৎসাহ দেয়। গ্রামীণ তরুণ সোহেল রানার জীবনের অভিজ্ঞতা যেন একটি বৃহত্তর বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি যেখানে বাবা—মা হারানো সন্তান কেবল নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও বাঁচে, স্বপ্ন দেখে এবং সামনে এগিয়ে যেতে চায়। দেশের জন্যে যারা প্রয়োজনে জীবন দিতে সবসময় প্রস্তুত থাকে। মো: সোহেল রানার জীবন কাহিনী যেন হাজারো সাহসী তরুণের গল্প, যারা জুলাই আন্দোলনে জীবন বাজি রেখে লড়াই করে এখন নীরবে—নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন পরিবারকে নিয়ে টিকে থাকার জন্য।
কাভার্ড ভ্যান চালক সোহেলের ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এ মাসে দেশের ছাত্রসমাজ, তরুণ প্রজন্ম, শ্রমজীবী মানুষ সবাই একত্রিত হয়ে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। শুরু টা শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হলেও তা জনতার হৃদয় ছঁুয়ে যায়। কোটাবিরোধী আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি হিসাবে জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিন্তু সরকার সেই ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেয়ার পরিবর্তে বরং লেলিয়ে দেয় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদেরকে যেন তারা ভয়াবহভাবে আন্দোলন দমন করার পথ বেছে নেয়।
শিক্ষার্থীদের উপর আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ যেভাবে আক্রমণ করে, তা সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। ছাত্রাবাসে ঢুকে কুপিয়ে জখম করা, পিটিয়ে মেরে ফেলা, গুলি চালানো, মাঝরাতে গ্রেফতার এসব ছিল নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে জুলাইয়ের মধ্যভাগ থেকে ছাত্রদের উপর যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, তা সাধারণ মানুষকেও তীব্রভাবে আলোড়িত করে। দেশবাসীর চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের লড়াই নয়, এটি গোটা দেশের মুক্তির লড়াই।
এই পরিস্থিতিতে যে সব সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন মো: সোহেল তাদেরই একজন। পেশায় একজন কাভার্ড ভ্যান চালক হলেও তার পরিচয় শুধু একজন শ্রমজীবী নাগরিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার ভিতরে ছিল একজন বিবেকবান মানুষ, এক জনদরদী নাগরিক, যিনি গণতন্ত্র এবং ইনসাফের পক্ষে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন। যা পারেনি এদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা।
দেশকে মুক্ত করার এই উপলব্ধি থেকেই তিনি অংশ নিয়েছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের ছাত্র আন্দোলনে। তার সক্রিয়তা ছিল প্রশংসনীয়। ৪ আগস্ট ২০২৪ ঠাকুরগাঁও কোর্ট চত্বরে ছাত্র ও জনতা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। জজ কোর্ট প্রাঙ্গণের ভিতরেই চলছিল প্রতিবাদ। মো: সোহেল ছিলেন আন্দোলনের মাঝখানে, অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। হঠাৎ করে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ একযোগে আক্রমণ চালায় কোমলমতি শিক্ষার্থী ও জনতার উপর। টিয়ারসেল, রাবার বুলেট, লাঠিচার্জ সবকিছু যেন একসাথে নেমে আসে নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও জনতার উপর। পুলিশ গুলি ছোড়ে সোহেলকে লক্ষ্য করে। এই বর্বর হামলায় সোহেলের শরীরে প্রায় ৩৭টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়। শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। সহযোদ্ধারাই তাকে কোনোমতে উদ্ধার করে কোর্ট এলাকা থেকে সরিয়ে নেন।
আহত হয়েও চিকিৎসার সুযোগ ছিল না
কিন্তু আহত অবস্থায়ও তিনি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেননি। কারণ, তখনও পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা হাসপাতাল চত্বর ঘিরে রেখেছিল। আহতদের খুঁজে খুঁজে ধরার চেষ্টা করছিল। চিকিৎসার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল গ্রেফতার ও নির্যাতনের ভয়। এই কারণে স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে গোপনে চিকিৎসা নেন সোহেল ও তার সাথে অন্যান্য আহতরা। সেখানে কিছু ছররা গুলি অপসারণ করা গেলেও এখনো তার শরীরে ৫ থেকে ৭টি গুলি রয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই গুলিগুলো বের করতে হলে তাকে বড় ধরনের অপারেশন করাতে হবে। কিন্তু একজন দিনমজুরের পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। যার প্রতিদিন কাজ না থাকলে রাতে ঘরে ভাত জোটে না, তার পক্ষে বড় অপারেশন, বিশ্রাম এবং পরবর্তী চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন।
সোহেল ভেঙে পড়েননি। বরং তিনি বলেন, আমি রাজপথে নেমেছিলাম যেন আমার সন্তানরা এক ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশে বড় হতে পারে। আমার রক্ত যদি সেই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়, আমি তাতেই গর্বিত। তার এই কথাগুলো শুধু আবেগ নয়, এটি বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের এক দৃঢ় অঙ্গীকার। দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ যখন রাজপথে দাঁড়ায়, তখন সত্যিই বিজয়ী হয়।
তার এই আত্মত্যাগের কাহিনী আমাদের চোখে পানি আনে, কিন্তু একইসাথে সাহসও জাগায়। এটা কেবল একজন কাভার্ড ভ্যান চালকের গল্প নয়, এটি এক বিবেকবান নাগরিকের জুলাইয়ের দিনগুলোর গল্প, এক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গল্প, ফ্যাসিবাদ থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার গল্প। যে লড়াই করেছে দেশের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য এবং সন্তানের অধিকারের জন্য।
সোহেলের মতো মানুষরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, এই দেশের তরুণদের ভয় দেখিয়ে চুপ করে রাখা যায় না। এই দেশ সেসব মানুষের, যারা নিপীড়নের মুখে প্রতিবাদ করতে জানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে জানে। তাদের রক্তের মূল্যেই এ দেশ ফিরে পেয়েছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা, যার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা হবে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র। তার ত্যাগকে সম্মান জানানো আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদিও তার প্রতি দায়িত্ব ভুলে যায় কিন্তু ইতিহাস তা ভোলে না। ইতিহাস একদিন গর্ব করে বলবে এই দেশ গড়ে উঠেছিল মো: সোহেলদের মতো মানুষদের আত্মত্যাগের ভিত্তিতে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সোহেল রানা
জন্ম তারিখ : ১০/০৮/১৯৯৬
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও সদর, ঠাকুরগাঁও
পেশা : ড্রাইভার
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: দেওগাঁও, ইউনিয়ন: সালন্দর, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত মো: আইন উদ্দিন
মায়ের নাম : মৃত মোছা: বেগম
মাসিক আয় : ২০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং থেকে প্রাপ্ত আয়
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মো: ইসরাফিল ইসলাম ইকবাল, বয়স: ৩, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : জজকোর্টের ভিতরে, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট
আক্রমণকারীত : পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍