হোম / আহতদের তালিকা / মো: আলমগীর কবীর
মো: আলমগীর কবীর

মো: আলমগীর কবীর

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ইলেক্ট্রিশিয়ান

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: আলমগীর কবির ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের কহরপাড়া গ্রামের একজন পরিশ্রমী মানুষ। ১৯৮৮ সালের ১৬ জুলাই জন্ম নেয়া আলমগীর জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রামের পথে হাঁটছেন। তিনি পেশায় একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান হলেও জীবিকার প্রয়োজনে অটোরিকশা চালিয়েও পরিবারের জন্য আয় করেন। তার মাসিক গড় আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা, যা দিয়েই তিনি চার সদস্যের পরিবারে সকলের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
আলমগীরের পিতা খয়রুল ইসলাম, বয়স ৫৫, একজন কৃষক হিসেবে এখনও মাঠে—ময়দানে কাজ করেন। মা পারুল বেগম এখন আর জীবিত নেই। আলমগীরের শৈশব ও যৌবনের বড় একটি অংশ কেটেছে মায়ের স্নেহ ছাড়াই। সেই শূন্যতা তাকে আরও দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভর করে তোলে। নিজের পরিবারে আলমগীরের স্ত্রী এবং দুই সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে আলপনা রোজা, বয়স ৮, বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট ছেলে মো: আদিল রহমান আয়াত বয়স মাত্র ২ বছর। তাদের ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্নে আলমগীর প্রতিদিন কাজ করছেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। কখনও বিদ্যুৎ লাইন মেরামত, কখনও রাস্তায় অটোরিকশা চালিয়ে সব কাজই করছেন সৎভাবে। আলমগীর কবির কেবল একজন ইলেক্ট্রিশিয়ানই নন, তিনি একজন জুলাই যোদ্ধাও। তিনি আওয়ামী লীগের লাগাতার দুঃশাসনের প্রতিবাদে ও ফ্যাসিবাদের পতনে রাজপথে নেমেছিলেন।
আলমগীর কবীর : একটি সাহসী প্রতিরোধের গল্প
আন্দোলনের দিনগুলোতে শহরজুড়ে যখন ভয়ের ছায়া, দমন—পীড়নের নিষ্ঠুর থাবা আর গুলির শব্দে আকাশ ভারী হয়ে উঠছিল, তখন কিছু সাধারণ মানুষই হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ প্রতিরোধের প্রতীক। এমনই একজন নাম মো: আলমগীর কবীর। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার কহরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় একজন অটো—রিকশা চালক এবং চুক্তিভিত্তিক ইলেক্ট্রিশিয়ান হলেও, তার হৃদয়ে জ্বলছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন।
আলমগীর পেশাগত জীবনে একজন দক্ষ ইলেক্ট্রিশিয়ান। ইতোমধ্যে তিনি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিসে মাস্টার রোলে বৈদ্যুতিক কাজ করে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই—আগস্টে যখন সারা দেশে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র—জনতার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি নিজেকে আর কেবল একজন শ্রমিক মনে করেননি। বরং এই অন্যায়—অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাহসী সৈনিক হয়ে ওঠেন।
আন্দোলনের সময় শহরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে সরকারের নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখেন আলমগীর। শহরের কেন্দ্রস্থলে, প্রশাসনিক ভবনের আশেপাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত সিসি ক্যামেরাগুলো বন্ধ করে দিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন যাতে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করে পরবর্তী দমন—পীড়ন চালানো না যায়। এ কাজটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি সরাসরি প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলী পদক্ষেপ। এই কারণে তাকে থাকতে হতো আত্মগোপনে।
চিকিৎসার সুযোগ ছিল না
তবে আত্মগোপনে থেকেও আলমগীরের মন আন্দোলন থেকে সরে যায়নি। ৪ আগস্ট ২০২৪, ঠাকুরগাঁও কোর্ট চত্বরে ছাত্র—জনতার সমাবেশে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে পুলিশ ছাত্র—জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। আক্রমণ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে অনেকেই দিগি্বদিক ছুটতে বাধ্য হয়। সেই আন্দোলনে ছিলেন আলমগীর কবীরও। তার শরীরে বিদ্ধ হয় পুলিশের ছোড়া প্রায় ১২টি ছররা গুলি।
আঘাত পাওয়া মাত্রই সহযোদ্ধারা তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে স্থানীয় বাজারের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যান। হাসপাতালে যাওয়ার উপায় ছিল না, কারণ সে সময় হাসপাতালে অবস্থান করছিল ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা, যারা আহত আন্দোলনকারীদের খুঁজে বের করে মারধর ও গ্রেফতার করছিল। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, আলমগীর বাধ্য হন গোপনে চিকিৎসা নিতে। ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণবিহীন চিকিৎসকের সহায়তায় তার শরীর থেকে ছররা গুলিগুলো বের করা হয়। যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন, কারণ জানতেন এই যন্ত্রণা শুধু তার নয়, বরং হাজারো নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর।
আলমগীরের এই আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা নিছক ব্যক্তিগত কোনো রোমাঞ্চ নয়। এটি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক অসাধারণ প্রতিবাদের চিহ্ন। তিনি নিজে একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা। পিতা খয়রুল ইসলাম একজন কৃষক, মা পারুল বেগম আগে থেকেই প্রয়াত। স্ত্রী ও দু’টি সন্তান নিয়েই তার পরিবার।
এই সীমিত আয়ের মধ্যেই তিনি সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আন্দোলনের গুলিতে আহত হওয়ার পর তার জীবনে নেমে এসেছিল এক দুঃসহ বাস্তবতা। পায়ের ক্ষত, শরীরজুড়ে ব্যথা, চিকিৎসার অভাব, আর নিরাপত্তাহীনতা সব মিলিয়ে তিনি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ত্যাগ, এই রক্তপাত, এই যন্ত্রণা সার্থক হয়েছে। তিনি চান এ দেশ ইনসাফ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক, যেখানে আর ভোটের জন্য লড়াই করতে বাধ্য না হয়। আলমগীর কবীরের জীবনকথা যেন বর্তমান বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। তিনি আমাদের শেখান, একজন অটোরিকশা চালক কিংবা ইলেক্ট্রিশিয়ানও হয়ে উঠতে পারে স্বাধীনতা ও ইনসাফের এক আগুনমুখো কণ্ঠস্বর। হয়তো ইতিহাস তার নাম মনে রাখবে না, কিন্তু আলমগীরের রক্তে ভেজা পথই আগামী দিনের সূর্যোদয়ের পটভূমি হয়ে থাকবে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আলমগীর কবীর
জন্ম তারিখ : ১৬/০৭/১৯৮৮
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ইলেক্ট্রিশিয়ান
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কহরপাড়া, ইউনিয়ন: নারগুন, থানা: সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : খয়রুল ইসলাম, বয়স: ৫৫, পেশা: কৃষক
মায়ের নাম : মরহুমা পারুল বেগম
মাসিক আয় : ৩০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : ইলেক্ট্রিশিয়ান ও অটো রিকশাচালক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. আলপনা রোজা, বয়স: ৮, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৪র্থ, সম্পর্ক: মেয়ে
২. মো: আদিল রহমান আয়াত, বয়স: ২, সম্পর্ক: ছেলে

ঘটনার স্থান : ডিসি অফিসের সামনে, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ২টা ৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : পুলিশ

পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশনকার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍