মো: রহমত উল্লাহ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : অটো রিকশা চালক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাই আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের বর্বরতা : এক নির্মম বাস্তবতা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন গণজাগরণের সূচনা ঘটে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের চলমান ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি, গুম—খুন ও ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নামে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। যা এক অনন্য সংহতির নিদর্শন হয়ে ওঠে। কিন্তু এই গণআন্দোলনের জবাবে সরকার এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এক বর্বর দমননীতির আশ্রয় নেয়।
আওয়ামী লীগ, তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো মিলে এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর চালায় নজিরবিহীন হামলা। দেশের বিভিন্ন শহরে মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। শুধু লাঠিচার্জ বা কাঁদানে গ্যাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই দমন। ছোড়া হয় গুলি, ছররা গুলি, টিয়ারশেল যার ফলে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান, গুরুতর আহত হন হাজার হাজার।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে হাসপাতালগুলোতে। আহত আন্দোলনকারীরা যখন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আশ্রয় নেন, তখনও সেখানেও হামলা চালানো হয়। ছাত্রলীগের ক্যাডাররা চিকিৎসাধীন রোগিদের ওপর হামলা চালায়, হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। চিকিৎসক ও নার্সদের হুমকি দেওয়া হয়, রোগিদের সেবা প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়। এমন বর্বরতা যে শুধু মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, তা আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা ও শালীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই হামলা প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগ সরকার কোনো ভিন্নমত সহ্য করতে রাজি নয়। তারা গণআন্দোলনকে দমন করছে রাষ্ট্রীয় শক্তি ও দলীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে। কিন্তু এই দমননীতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং জনগণের মাঝে ক্ষোভ আরও প্রবলভাবে বেড়ে যায়। মানুষ আরও বেশি সচেতন, সংগঠিত ও প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। জুলাই আন্দোলন আমাদের সামনে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রীয় দমন—পীড়নের নগ্ন রূপ উন্মোচন করেছে। এটি কেবল একটি আন্দোলন ছিল না, ছিল এক সংগ্রাম; ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য। সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল অটোচালক রহমতউল্লাহ। নিচে তার গল্পটিই তুলে ধরা হয়েছে।
জন্ম ও পরিচয়
জুলাই আন্দোলনে আহত মো: রহমত উল্লাহ একজন অটোরিকশা চালক। তিনি ৭ অক্টোবর ১৯৮৯ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার বান্দিগড় সরকারপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। রহমত উল্লাহর পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। তার বাবা মৃত আলীম উদ্দিন এবং মা মৃত আমেনা বেগম। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী তিনি নিজেই। মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা, যা তিনি অটোরিকশা চালিয়ে অর্জন করেন। পরিবারে তার দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে রুবিনা খাতুন, বয়স ১০ বছর, বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। ছোট মেয়ে মেরিনা খাতুন, বয়স ৮ বছর, তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই কন্যা শিক্ষার্থী যাদের ভবিষ্যত ও লেখাপড়ার জন্য সকল রকম চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। রহমত উল্লাহ তার ছোট্ট পরিবার নিয়ে বান্দিগড় সরকারপাড়ায় বসবাস করেন। তিনি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অটোরিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ চালান। যদিও জীবনের দুঃখ—কষ্ট ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে সংকল্পবদ্ধ।
রহমত উল্লাহ : একজন অটোরিকশা চালকের আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকা
রহমত উল্লাহ পেশাগতভাবে একজন অটোরিকশা চালক হলেও, জুলাইয়ের আন্দোলনে তিনি শুধু নিজ জীবিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি একজন সচেতন নাগরিক, যিনি নিজের পেশার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতেন। দেশের জন্য, ছাত্রদের জন্য কিছু করতে চাইতেন। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের কারণে দেশের রাজনৈতিক সংকটজনক পরিস্থিতি, গণতন্ত্রহীনতা ও মানুষের অধিকার হরণের বিষয়গুলো তার মনকে নাড়া দেয়। তার একটাই স্বপ্ন, একটি ন্যায্য, মানবিক এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে যে গণআন্দোলন শুরু হয়, তাতে রহমত উল্লাহ সরাসরি যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, গুম—খুন, ভোট ডাকাতি, বিচারহীনতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে সারা দেশের মানুষ পথে নামে। ঠাকুরগাঁও জেলার আন্দোলনে রহমত উল্লাহ প্রথম দিক থেকেই সক্রিয় ছিলেন। তিনি শুধু একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেই নয়, একজন অটো—ড্রাইভার হিসাবে আন্দোলনের সংগঠক, কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের পরিবহনের দায়িত্ব নিয়ে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৪ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওইদিন দেশজুড়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে জনতা জড়ো হয় শহরের বিভিন্ন স্থানে। রহমত উল্লাহ তার নিজস্ব অটোরিকশাটি ব্যবহার করে গ্রামের মানুষদের শহরের আন্দোলনে বিনা ভাড়ায় নিয়ে আসেন। অনেক সময় তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শুধু আন্দোলনকারীদের আনা—নেয়ার কাজ করতেন। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে তিনি নিজের অটোটি অরক্ষিত অবস্থায় রেখেই নিজেও মিছিলে যোগ দেন।
৪ আগস্টের শিক্ষার্থী ও জনতা মিলে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয়। দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে হঠাৎই পুলিশ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা মিছিলে হামলা চালায়। প্রথমে তারা টিয়ার শেল ছোড়ে। এই শেলের আঘাতে রহমত উল্লাহ প্রথমে আহত হন। এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ ছররা গুলি চালাতে শুরু করে। ছাত্রলীগ রামদা, হকিস্টিক, লাঠি, চাপাতি নিয়ে হামলা করে। রহমত উল্লাহর শরীরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়। এমনকি কিছু গুলি তার মাথাতেও লাগে।
চিকিৎসা
আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তার প্রাথমিক চিকিৎসা হয় এবং কিছু ছররা গুলি অপসারণ করা হয়। কিন্তু যেগুলো গভীরে প্রবেশ করেছে ও মাথার ভেতরে আটকে গেছে, সেগুলো এখনও রয়ে গেছে। মাথার গুলিগুলোর কিছু এখনও তার শরীরে রয়ে গেছে, যেগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, এগুলো অপসারণ করতে উন্নত চিকিৎসা ও বিশেষায়িত সার্জারি প্রয়োজন। প্রতিনিয়ত তিনি ব্যথা ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজ, এমনকি অটোরিকশা চালানোও এখন তার পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: রহমত উল্লাহ
জন্ম তারিখ : ০৭/১০/১৯৮৯
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : অটো রিকশা চালক
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বান্দিগড় সরকারপাড়া, উপজেলা: সদর উপজেলা, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আলীম উদ্দিন
মায়ের নাম : মৃত আমেনা বেগম
মাসিক আয় : ২০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : অটো রিকশা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. রুবিনা খাতুন, বয়স: ১০, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৪র্থ, সম্পর্ক: মেয়ে
২. মেরিনা খাতুন, বয়স: ৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণী: ২য়, সম্পর্ক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : জজকোর্ট প্রাঙ্গণ, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. একটা অটো রিকশার ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশনকার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন গণজাগরণের সূচনা ঘটে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের চলমান ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি, গুম—খুন ও ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নামে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। যা এক অনন্য সংহতির নিদর্শন হয়ে ওঠে। কিন্তু এই গণআন্দোলনের জবাবে সরকার এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এক বর্বর দমননীতির আশ্রয় নেয়।
আওয়ামী লীগ, তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো মিলে এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর চালায় নজিরবিহীন হামলা। দেশের বিভিন্ন শহরে মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। শুধু লাঠিচার্জ বা কাঁদানে গ্যাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই দমন। ছোড়া হয় গুলি, ছররা গুলি, টিয়ারশেল যার ফলে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান, গুরুতর আহত হন হাজার হাজার।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে হাসপাতালগুলোতে। আহত আন্দোলনকারীরা যখন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আশ্রয় নেন, তখনও সেখানেও হামলা চালানো হয়। ছাত্রলীগের ক্যাডাররা চিকিৎসাধীন রোগিদের ওপর হামলা চালায়, হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। চিকিৎসক ও নার্সদের হুমকি দেওয়া হয়, রোগিদের সেবা প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়। এমন বর্বরতা যে শুধু মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, তা আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা ও শালীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই হামলা প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগ সরকার কোনো ভিন্নমত সহ্য করতে রাজি নয়। তারা গণআন্দোলনকে দমন করছে রাষ্ট্রীয় শক্তি ও দলীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে। কিন্তু এই দমননীতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং জনগণের মাঝে ক্ষোভ আরও প্রবলভাবে বেড়ে যায়। মানুষ আরও বেশি সচেতন, সংগঠিত ও প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। জুলাই আন্দোলন আমাদের সামনে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রীয় দমন—পীড়নের নগ্ন রূপ উন্মোচন করেছে। এটি কেবল একটি আন্দোলন ছিল না, ছিল এক সংগ্রাম; ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য। সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল অটোচালক রহমতউল্লাহ। নিচে তার গল্পটিই তুলে ধরা হয়েছে।
জন্ম ও পরিচয়
জুলাই আন্দোলনে আহত মো: রহমত উল্লাহ একজন অটোরিকশা চালক। তিনি ৭ অক্টোবর ১৯৮৯ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার বান্দিগড় সরকারপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। রহমত উল্লাহর পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। তার বাবা মৃত আলীম উদ্দিন এবং মা মৃত আমেনা বেগম। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী তিনি নিজেই। মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা, যা তিনি অটোরিকশা চালিয়ে অর্জন করেন। পরিবারে তার দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে রুবিনা খাতুন, বয়স ১০ বছর, বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। ছোট মেয়ে মেরিনা খাতুন, বয়স ৮ বছর, তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই কন্যা শিক্ষার্থী যাদের ভবিষ্যত ও লেখাপড়ার জন্য সকল রকম চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। রহমত উল্লাহ তার ছোট্ট পরিবার নিয়ে বান্দিগড় সরকারপাড়ায় বসবাস করেন। তিনি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অটোরিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ চালান। যদিও জীবনের দুঃখ—কষ্ট ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে সংকল্পবদ্ধ।
রহমত উল্লাহ : একজন অটোরিকশা চালকের আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকা
রহমত উল্লাহ পেশাগতভাবে একজন অটোরিকশা চালক হলেও, জুলাইয়ের আন্দোলনে তিনি শুধু নিজ জীবিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি একজন সচেতন নাগরিক, যিনি নিজের পেশার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতেন। দেশের জন্য, ছাত্রদের জন্য কিছু করতে চাইতেন। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের কারণে দেশের রাজনৈতিক সংকটজনক পরিস্থিতি, গণতন্ত্রহীনতা ও মানুষের অধিকার হরণের বিষয়গুলো তার মনকে নাড়া দেয়। তার একটাই স্বপ্ন, একটি ন্যায্য, মানবিক এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে যে গণআন্দোলন শুরু হয়, তাতে রহমত উল্লাহ সরাসরি যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, গুম—খুন, ভোট ডাকাতি, বিচারহীনতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে সারা দেশের মানুষ পথে নামে। ঠাকুরগাঁও জেলার আন্দোলনে রহমত উল্লাহ প্রথম দিক থেকেই সক্রিয় ছিলেন। তিনি শুধু একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেই নয়, একজন অটো—ড্রাইভার হিসাবে আন্দোলনের সংগঠক, কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের পরিবহনের দায়িত্ব নিয়ে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৪ আগস্ট ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওইদিন দেশজুড়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে জনতা জড়ো হয় শহরের বিভিন্ন স্থানে। রহমত উল্লাহ তার নিজস্ব অটোরিকশাটি ব্যবহার করে গ্রামের মানুষদের শহরের আন্দোলনে বিনা ভাড়ায় নিয়ে আসেন। অনেক সময় তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শুধু আন্দোলনকারীদের আনা—নেয়ার কাজ করতেন। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে তিনি নিজের অটোটি অরক্ষিত অবস্থায় রেখেই নিজেও মিছিলে যোগ দেন।
৪ আগস্টের শিক্ষার্থী ও জনতা মিলে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয়। দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে হঠাৎই পুলিশ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা মিছিলে হামলা চালায়। প্রথমে তারা টিয়ার শেল ছোড়ে। এই শেলের আঘাতে রহমত উল্লাহ প্রথমে আহত হন। এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ ছররা গুলি চালাতে শুরু করে। ছাত্রলীগ রামদা, হকিস্টিক, লাঠি, চাপাতি নিয়ে হামলা করে। রহমত উল্লাহর শরীরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়। এমনকি কিছু গুলি তার মাথাতেও লাগে।
চিকিৎসা
আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তার প্রাথমিক চিকিৎসা হয় এবং কিছু ছররা গুলি অপসারণ করা হয়। কিন্তু যেগুলো গভীরে প্রবেশ করেছে ও মাথার ভেতরে আটকে গেছে, সেগুলো এখনও রয়ে গেছে। মাথার গুলিগুলোর কিছু এখনও তার শরীরে রয়ে গেছে, যেগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, এগুলো অপসারণ করতে উন্নত চিকিৎসা ও বিশেষায়িত সার্জারি প্রয়োজন। প্রতিনিয়ত তিনি ব্যথা ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজ, এমনকি অটোরিকশা চালানোও এখন তার পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: রহমত উল্লাহ
জন্ম তারিখ : ০৭/১০/১৯৮৯
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : অটো রিকশা চালক
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বান্দিগড় সরকারপাড়া, উপজেলা: সদর উপজেলা, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত আলীম উদ্দিন
মায়ের নাম : মৃত আমেনা বেগম
মাসিক আয় : ২০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : অটো রিকশা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. রুবিনা খাতুন, বয়স: ১০, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৪র্থ, সম্পর্ক: মেয়ে
২. মেরিনা খাতুন, বয়স: ৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণী: ২য়, সম্পর্ক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : জজকোর্ট প্রাঙ্গণ, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. একটা অটো রিকশার ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশনকার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍