মো: লামিম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ছাত্র, ৭ম শ্রেণি, টেকনিকেল স্কুল এন্ড কলেজ
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
ঠাকুরগাঁও জেলার এক শান্ত নির্জন গ্রাম কহরপাড়ায় ২০১২ সালের ২ সেপ্টেম্বর এক শিশুর জন্ম, যার নাম মো: লামিম। তাঁর জন্ম হয়েছিল এক সংগ্রামী সময়ের প্রান্তে, কিন্তু হৃদয়ের নির্মলতায় ছিল ভবিষ্যতের ঝড় তোলার ইঙ্গিত। ছোট্ট লামিম ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে গ্রামের ধূলিমাখা মাঠ, সবুজ ধানের গন্ধ, আর নির্মল বাতাসে। যেন প্রকৃতি নিজেই তাঁকে প্রস্তুত করছিল এক অনিবার্য যুদ্ধের জন্য।
পারিবারিক জীবন
মো: লামীমের পরিবার ছিল সাহস ও স্নেহের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাঁর বাবা মমিনুল ইসলাম(৩৯) একজন রাজমিস্ত্রী; ঘামে ভেজা হাতে গড়ে তুলেছেন ভবন, আর হৃদয়ের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন সন্তানের ভবিষ্যত। মা সাবিনা ইয়াসমিন(৩৫) ছিলেন ঘরের নির্মল আলো, যিনি অফুরন্ত ভালোবাসা আর মাতৃত্বের মমতায় সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছেন। বড় ভাই শামীম ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা, আর ছোট বোন সাদিয়া ছিল তাঁর খেলার সাথী ও মমতার প্রতিচ্ছবি। এই পরিবারের মাটিতেই রোপিত হয়েছিল লামীমের সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বীজ।
ছাত্র জীবন ও চরিত্র
মো: লামিম টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৭ম শ্রেণির একজন ছাত্র। তিনি একজন একাধারে মেধাবী ও মননশীল। বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের সীমা ছাড়িয়ে তাঁর কিশোর হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল সময়ের বাস্তবতা। চোখে ছিল স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল দেশপ্রেম। তাঁর চরিত্রে ফুটে উঠেছিল কর্তব্যবোধ, আত্মসম্মান ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনন্য সাহস। সহপাঠীরা তাঁকে জানত বিনয়ী ছাত্র হিসেবে, অথচ ভেতরে লুকানো ছিল এক দুর্বার যোদ্ধার আত্মা।
সংগ্রামী জীবন ও বীরত্ব
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোয় যখন গোটা দেশের আকাশ ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের ঘন অন্ধকারে ঢাকা পড়েছিল, তখন এই ছোট্ট কিশোর বুক ভরা সাহস নিয়ে নেমে পড়েছিল রাস্তায়। সে জানত, নিরব থাকা মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা। সে জানত, প্রতিবাদ করা মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। তবু, সে থামেনি। নিজের জীবনকে বাজি রেখে, স্বাধীনতার স্বপ্নকে বুকের মাঝে ধারণ করে লামিম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বন্দুকের সামনে, সন্ত্রাসের সামনে। গুলিবিদ্ধ হয়েও তাঁর চেতনাকে দমন করা যায়নি। আজ সেই ছোট্ট লামীমের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বীরত্ব আমাদের জন্য হয়ে উঠেছে এক অনন্ত প্রেরণা, একটি দীপ্তিমান ইতিহাস, যা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে অন্ধকারের মধ্যেও আলোর খেঁাজে।
ছোট্ট লামিম নামের এই কিশোর শুধু এক পরিবারের নয়, হয়ে উঠেছে গোটা জাতির অহংকার। তাঁর জীবন যেন আমাদের সকলের চেতনার প্রদীপ, যার আলো নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের পথ আলোকিত করবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : এক ছোট্ট বাহাদুরের বীরত্বের কাহিনী
লামিম মাত্র ১২ বছরের এক কিশোর। শহরতলীর ছোট্ট এক ঘরে যার শৈশব ছিল বই—খেলা আর স্বপ্নের গল্পে ভরা। কিন্তু দেশজুড়ে যখন প্রতিবাদের দাবানল জ্বলে ওঠে,সেই আগুন এসে লাগে তার হৃদয়ের কোণে। আন্দোলনের গভীর তাৎপর্য না বুঝলেও, সে বুঝে নিয়েছিল অন্যায় মানে অন্ধকার; আর এই অন্ধকার ভেদ করেই আলো আসবে। তাই লামিমও নেমে পড়ে রাজপথে; সাহস আর স্বপ্ন নিয়ে, হাতে ধরা ছিল একটি পতাকা আর চোখে ছিল এক নিষ্পাপ বিশ্বাস।
চৌরাস্তার মোড়ে পেঁৗছতেই ঘটে বিভীষিকাময় সেই ঘটনা। রাষ্ট্রের লাঠিয়াল বাহিনী, পুলিশ—আওয়ামী স্বৈরাচারের অন্ধ দাসেরা— একদল ছাত্র, শিশু আর নিরস্ত্র জনতার উপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে। গর্জে ওঠে অস্ত্র, আর এক মুহূর্তেই ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় বাতাস। লামীমের একটি চোখ ভেদ করে বিদ্ধ হয় পুলিশের গুলি। রক্তে ভেসে যায় ছোট্ট সেই মুখ, যার বয়স এখনো কৈশোর ছুঁয়েও দেখেনি। ছাত্র—জনতা আর কিছু তরুণ যোদ্ধা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে নেন। প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে, তারপর ঢাকা পিজি হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেন তার চোখ রক্ষা করতে। অপারেশন হয়, শরীর থেকে গুলি বের হয়, কিন্তু ফিরে আসে না সেই চোখ।
একটি শিশুর চোখ কেড়ে নেয়ার অপরাধ যে কেবল চোখ হারানোর নয়, তা ছিল একটি স্বপ্ন হত্যা, একটি নিষ্পাপ প্রজন্মের উপর বর্বর আঘাত। আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের পাশবিকতা এতটাই সীমাহীন হয়েছিল যে, তারা একটুখানি প্রতিবাদের স্বরও সহ্য করতে পারেনি; এমনকি একটি শিশুর কাছ থেকেও লামীমের চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, সেখানে ছররা গুলি চালিয়ে তারা প্রমাণ করেছিল; এই শাসকগোষ্ঠী কেবল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই বাঁচে, তারা শিশুদেরও ভয় পায়।
এটাই ছিল ২০২৪ সালের জুলাই; যেখানে শিশুর কান্না ছিল প্রতিবাদের সুর। এটাই ছিল লামিমÑ একটি চোখ হারিয়ে যে জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে, সাহস কখনো বয়স দেখে না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসীর গুলিতে হারানো তার চোখ যেন খুনি হাসিনার পাশবিকতা ও নির্মমতার সাক্ষ্য ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর ছররা গুলিতে তামিমের একটি চোখ হারানো শুধু একটি শারীরিক ক্ষত নয়; এ যেন খুনি হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের জীবন্ত দগদগে সাক্ষ্য। সেই চোখটি ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার জানালা যা আজ আর নেই। আঘাত পাওয়ার পর রক্তাক্ত লামিমকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়—যেন একটি অমূল্য জীবন ও চোখের ক্ষতি কেবল রুটিন ইনজুরির মতো! কিন্তু ব্যথা থেমে থাকেনি। চোখের ভিতর গুলি ছিল; একটি বিস্ফোরিত যন্ত্রণার বিস্মরণহীন অস্তিত্ব।
পরদিন নিয়ে যাওয়া হয় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা চোখে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; তারা পারেন না কিছু করতে। এরপর আশার একটি নাম হয়ে আসে দিনাজপুর গাউছুল আজম হাসপাতাল। কিন্তু সেখানেও অপারেশন করেও গুলিটি বের করতে ব্যর্থ হন ডাক্তাররা। সময় যেন তামিমের চোখে অন্ধকার ঢেলে দিতে প্রস্তুত হচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। অবশেষে একদিন পর তাকে ঢাকা পিজি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে শুরু হয় দীর্ঘ দুঃসহ এক যুদ্ধ। মোট ১৮ দিন সেখানে ছিল লামিম। একবার, দু’বার—দু’টি অপারেশন করা হয়। কিন্তু গুলি যেন তামিমের চোখে নয়, পুরো জাতির বিবেকে গেঁথে ছিল। প্রথম দু’টি চেষ্টায় তা বের করা যায়নি।
এক সপ্তাহ পর হয় তৃতীয় অপারেশন। চোখে যন্ত্রপাতির ছায়া, শরীরে ব্যথার পাহাড়, আর মনে নিঃসীম এক শূন্যতা। অবশেষে বের করা হয় সেই অমানবিক গুলি। কিন্তু গুলি বের হলেও তামিমের বাম চোখ আর কখনও আলো দেখবে না; চিরদিনের জন্য অন্ধকারে তলিয়ে যায় তার সেই চোখ। তবে তামিমের যন্ত্রণা শুধু তার ব্যক্তিগত নয়, এটা পুরো জাতির দগদগে ক্ষত, একটা ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় দানবীয়তার দলিল। একটি শিশুর চোখে গুলি করে যে শাসক টিকে থাকতে চায়, সে শাসক আসলে নিজের পতনের কবরই খুঁড়ে দেয়।
লামিম চোখ হারিয়েছে, কিন্তু সে ভয় হারায়নি। সে এখন এক চোখে দেখতে পায় গোটা দেশের চোখে জমে থাকা প্রতিরোধের অশ্রম্ন আর সে অশ্রম্নই যা পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো কেউ জন্ম নিলে সেই ফ্যাসিস্টদেরকে দূরীভূত করতে— একদিন রূপ নেবে অগ্নিস্রোতে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
চিকিৎসা চলমান রাখতে হবে, যাতে অন্য চোখটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিক্যাল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র ৭ম শ্রেণি, টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তার পরিবারের কাউকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা,চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ,পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: লামিম
জন্ম তারিখ : ০২—০৯—২০১২
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ছাত্র
প্রতিষ্ঠান : ৭ম শ্রেণি, টেকনিকেল স্কুল এন্ড কলেজ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কহরপাড়া, ইউনিয়ন: নারগুন, থানা: সদর , জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মমিনুল ইসলাম
পিতার পেশা ও বয়স : রাজমিস্ত্রী, ৩৯
মায়ের নাম : মোছা: সাবিনা ইয়াসমিন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
মাসিক আয় : ১৫,০০০
আয়ের উৎস : রাজমিস্ত্রী
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. শামীম হোসাইন, বয়স: ১৮, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: ভাই
২. সাদিয়া, বয়স: ৩, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তা, আমতলী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পুলিশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিটের দিকে
পারিবারিক জীবন
মো: লামীমের পরিবার ছিল সাহস ও স্নেহের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাঁর বাবা মমিনুল ইসলাম(৩৯) একজন রাজমিস্ত্রী; ঘামে ভেজা হাতে গড়ে তুলেছেন ভবন, আর হৃদয়ের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন সন্তানের ভবিষ্যত। মা সাবিনা ইয়াসমিন(৩৫) ছিলেন ঘরের নির্মল আলো, যিনি অফুরন্ত ভালোবাসা আর মাতৃত্বের মমতায় সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছেন। বড় ভাই শামীম ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা, আর ছোট বোন সাদিয়া ছিল তাঁর খেলার সাথী ও মমতার প্রতিচ্ছবি। এই পরিবারের মাটিতেই রোপিত হয়েছিল লামীমের সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বীজ।
ছাত্র জীবন ও চরিত্র
মো: লামিম টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৭ম শ্রেণির একজন ছাত্র। তিনি একজন একাধারে মেধাবী ও মননশীল। বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের সীমা ছাড়িয়ে তাঁর কিশোর হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল সময়ের বাস্তবতা। চোখে ছিল স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল দেশপ্রেম। তাঁর চরিত্রে ফুটে উঠেছিল কর্তব্যবোধ, আত্মসম্মান ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনন্য সাহস। সহপাঠীরা তাঁকে জানত বিনয়ী ছাত্র হিসেবে, অথচ ভেতরে লুকানো ছিল এক দুর্বার যোদ্ধার আত্মা।
সংগ্রামী জীবন ও বীরত্ব
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোয় যখন গোটা দেশের আকাশ ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের ঘন অন্ধকারে ঢাকা পড়েছিল, তখন এই ছোট্ট কিশোর বুক ভরা সাহস নিয়ে নেমে পড়েছিল রাস্তায়। সে জানত, নিরব থাকা মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা। সে জানত, প্রতিবাদ করা মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। তবু, সে থামেনি। নিজের জীবনকে বাজি রেখে, স্বাধীনতার স্বপ্নকে বুকের মাঝে ধারণ করে লামিম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বন্দুকের সামনে, সন্ত্রাসের সামনে। গুলিবিদ্ধ হয়েও তাঁর চেতনাকে দমন করা যায়নি। আজ সেই ছোট্ট লামীমের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বীরত্ব আমাদের জন্য হয়ে উঠেছে এক অনন্ত প্রেরণা, একটি দীপ্তিমান ইতিহাস, যা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে অন্ধকারের মধ্যেও আলোর খেঁাজে।
ছোট্ট লামিম নামের এই কিশোর শুধু এক পরিবারের নয়, হয়ে উঠেছে গোটা জাতির অহংকার। তাঁর জীবন যেন আমাদের সকলের চেতনার প্রদীপ, যার আলো নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের পথ আলোকিত করবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : এক ছোট্ট বাহাদুরের বীরত্বের কাহিনী
লামিম মাত্র ১২ বছরের এক কিশোর। শহরতলীর ছোট্ট এক ঘরে যার শৈশব ছিল বই—খেলা আর স্বপ্নের গল্পে ভরা। কিন্তু দেশজুড়ে যখন প্রতিবাদের দাবানল জ্বলে ওঠে,সেই আগুন এসে লাগে তার হৃদয়ের কোণে। আন্দোলনের গভীর তাৎপর্য না বুঝলেও, সে বুঝে নিয়েছিল অন্যায় মানে অন্ধকার; আর এই অন্ধকার ভেদ করেই আলো আসবে। তাই লামিমও নেমে পড়ে রাজপথে; সাহস আর স্বপ্ন নিয়ে, হাতে ধরা ছিল একটি পতাকা আর চোখে ছিল এক নিষ্পাপ বিশ্বাস।
চৌরাস্তার মোড়ে পেঁৗছতেই ঘটে বিভীষিকাময় সেই ঘটনা। রাষ্ট্রের লাঠিয়াল বাহিনী, পুলিশ—আওয়ামী স্বৈরাচারের অন্ধ দাসেরা— একদল ছাত্র, শিশু আর নিরস্ত্র জনতার উপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে। গর্জে ওঠে অস্ত্র, আর এক মুহূর্তেই ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় বাতাস। লামীমের একটি চোখ ভেদ করে বিদ্ধ হয় পুলিশের গুলি। রক্তে ভেসে যায় ছোট্ট সেই মুখ, যার বয়স এখনো কৈশোর ছুঁয়েও দেখেনি। ছাত্র—জনতা আর কিছু তরুণ যোদ্ধা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে নেন। প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে, তারপর ঢাকা পিজি হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেন তার চোখ রক্ষা করতে। অপারেশন হয়, শরীর থেকে গুলি বের হয়, কিন্তু ফিরে আসে না সেই চোখ।
একটি শিশুর চোখ কেড়ে নেয়ার অপরাধ যে কেবল চোখ হারানোর নয়, তা ছিল একটি স্বপ্ন হত্যা, একটি নিষ্পাপ প্রজন্মের উপর বর্বর আঘাত। আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের পাশবিকতা এতটাই সীমাহীন হয়েছিল যে, তারা একটুখানি প্রতিবাদের স্বরও সহ্য করতে পারেনি; এমনকি একটি শিশুর কাছ থেকেও লামীমের চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, সেখানে ছররা গুলি চালিয়ে তারা প্রমাণ করেছিল; এই শাসকগোষ্ঠী কেবল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই বাঁচে, তারা শিশুদেরও ভয় পায়।
এটাই ছিল ২০২৪ সালের জুলাই; যেখানে শিশুর কান্না ছিল প্রতিবাদের সুর। এটাই ছিল লামিমÑ একটি চোখ হারিয়ে যে জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে, সাহস কখনো বয়স দেখে না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসীর গুলিতে হারানো তার চোখ যেন খুনি হাসিনার পাশবিকতা ও নির্মমতার সাক্ষ্য ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর ছররা গুলিতে তামিমের একটি চোখ হারানো শুধু একটি শারীরিক ক্ষত নয়; এ যেন খুনি হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের জীবন্ত দগদগে সাক্ষ্য। সেই চোখটি ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার জানালা যা আজ আর নেই। আঘাত পাওয়ার পর রক্তাক্ত লামিমকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়—যেন একটি অমূল্য জীবন ও চোখের ক্ষতি কেবল রুটিন ইনজুরির মতো! কিন্তু ব্যথা থেমে থাকেনি। চোখের ভিতর গুলি ছিল; একটি বিস্ফোরিত যন্ত্রণার বিস্মরণহীন অস্তিত্ব।
পরদিন নিয়ে যাওয়া হয় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা চোখে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; তারা পারেন না কিছু করতে। এরপর আশার একটি নাম হয়ে আসে দিনাজপুর গাউছুল আজম হাসপাতাল। কিন্তু সেখানেও অপারেশন করেও গুলিটি বের করতে ব্যর্থ হন ডাক্তাররা। সময় যেন তামিমের চোখে অন্ধকার ঢেলে দিতে প্রস্তুত হচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। অবশেষে একদিন পর তাকে ঢাকা পিজি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে শুরু হয় দীর্ঘ দুঃসহ এক যুদ্ধ। মোট ১৮ দিন সেখানে ছিল লামিম। একবার, দু’বার—দু’টি অপারেশন করা হয়। কিন্তু গুলি যেন তামিমের চোখে নয়, পুরো জাতির বিবেকে গেঁথে ছিল। প্রথম দু’টি চেষ্টায় তা বের করা যায়নি।
এক সপ্তাহ পর হয় তৃতীয় অপারেশন। চোখে যন্ত্রপাতির ছায়া, শরীরে ব্যথার পাহাড়, আর মনে নিঃসীম এক শূন্যতা। অবশেষে বের করা হয় সেই অমানবিক গুলি। কিন্তু গুলি বের হলেও তামিমের বাম চোখ আর কখনও আলো দেখবে না; চিরদিনের জন্য অন্ধকারে তলিয়ে যায় তার সেই চোখ। তবে তামিমের যন্ত্রণা শুধু তার ব্যক্তিগত নয়, এটা পুরো জাতির দগদগে ক্ষত, একটা ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় দানবীয়তার দলিল। একটি শিশুর চোখে গুলি করে যে শাসক টিকে থাকতে চায়, সে শাসক আসলে নিজের পতনের কবরই খুঁড়ে দেয়।
লামিম চোখ হারিয়েছে, কিন্তু সে ভয় হারায়নি। সে এখন এক চোখে দেখতে পায় গোটা দেশের চোখে জমে থাকা প্রতিরোধের অশ্রম্ন আর সে অশ্রম্নই যা পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো কেউ জন্ম নিলে সেই ফ্যাসিস্টদেরকে দূরীভূত করতে— একদিন রূপ নেবে অগ্নিস্রোতে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
চিকিৎসা চলমান রাখতে হবে, যাতে অন্য চোখটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিক্যাল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র ৭ম শ্রেণি, টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তার পরিবারের কাউকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা,চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ,পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: লামিম
জন্ম তারিখ : ০২—০৯—২০১২
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ছাত্র
প্রতিষ্ঠান : ৭ম শ্রেণি, টেকনিকেল স্কুল এন্ড কলেজ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কহরপাড়া, ইউনিয়ন: নারগুন, থানা: সদর , জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মমিনুল ইসলাম
পিতার পেশা ও বয়স : রাজমিস্ত্রী, ৩৯
মায়ের নাম : মোছা: সাবিনা ইয়াসমিন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
মাসিক আয় : ১৫,০০০
আয়ের উৎস : রাজমিস্ত্রী
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. শামীম হোসাইন, বয়স: ১৮, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: ভাই
২. সাদিয়া, বয়স: ৩, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তা, আমতলী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পুলিশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিটের দিকে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍