হোম / আহতদের তালিকা / আব্দুল্লাহ বিন নোমান
আব্দুল্লাহ বিন নোমান

আব্দুল্লাহ বিন নোমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, টিটিসি ভোকেশনাল

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আওয়ামী স্বৈরশাসন ও জনতার বিস্ফোরণ
দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, দলীয়করণ, দুর্নীতি, বিচারহীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার গলা টিপে ধরার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ একটি নিপীড়নমূলক স্বৈরশাসনের রূপ নেয়। ভোটহীন নির্বাচন, প্রশাসনের দলীয় ব্যবহার, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের গুম—খুন ও হাজারো নিরীহ নাগরিকের উপর দমন—পীড়ন; সব মিলিয়ে গোটা দেশ যেন পরিণত হয় এক বন্দীশালায়। মানুষের কণ্ঠরোধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে অস্ত্র বানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয় দলীয় সন্ত্রাসের দুর্গে।

এই দীর্ঘস্থায়ী অন্যায় আর অবিচারের পাহাড় চাপা দেয়া জনগণ যখন আর সহ্য করতে পারছিল না, তখনই ফুঁসে ওঠে সারা দেশ। শিশু—কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ; সবাই এক কণ্ঠে রাস্তায় নামে একটাই শ্লেস্নাগান নিয়ে: ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার নিপাত যাক—গণতন্ত্র মুক্তি পাক, এক দুই তিন চার, স্বৈরাচার বাংলা ছাড়! এই আন্দোলন ছিল শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়—এটি ছিল মানুষের সম্মান, স্বাধীনতা আর অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক জাগরণ।
আব্দুল্লাহ বিন নোমান : জুলাই আন্দোলনের এক কিশোর বিপ্লবী
জন্ম
আব্দুল্লাহ বিন নোমান ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ ঠাকুরগাঁও জেলার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের মাদ্রাসা পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শান্তিপূর্ণ এক গ্রামীণ পরিবেশে তাঁর শৈশব কাটে। এই অঞ্চলের সরল—সহজ জীবনধারা ও চারপাশের মানুষের সংগ্রামী মনোভাবই তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পারিবারিক জীবন
নোমানের পিতা ফয়সাল আহমেদ (৪০) একজন ব্যবসায়ী, যিনি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সৎ ও পরিশ্রমী থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিরবে, দৃঢ় মনোবলে তিনি সংসারের হাল ধরেছেন। মা বিলকিস বানু (৩০) একজন গৃহিণী, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে সন্তানদের লালন—পালন করেছেন। এই স্নেহময় ও নৈতিক মূল্যবোধে গড়ে ওঠা পরিবারে আব্দুল্লাহ বিন নোমানের মাঝে আত্মমর্যাদা, দায়িত্ববোধ ও আদর্শের বীজ রোপিত হয়।
কর্মজীবন
আব্দুল্লাহ বিন নোমান একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বয়সের কাঁচা ধাপেও তাঁর চিন্তা ও বোধ ছিল পরিণত। শিক্ষার পাশাপাশি তিনি পারিপার্শ্বিক রাজনীতি ও সমাজের অবিচারের প্রতি ছিলেন সজাগ। শিক্ষা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তাঁর মননে গড়ে ওঠে যা পরবর্তীতে তাঁকে আন্দোলনের সাহসী পথে নিয়ে আসে।
সংগ্রামী জীবন
জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে, যখন ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের কালো ছায়া দেশের আকাশ ঢেকে ফেলেছিল, তখন কিশোর আব্দুল্লাহ বিন নোমান জীবনবাজি রেখে রাজপথে নেমে পড়েন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন; স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি বিবেকবান মানুষের নৈতিক কর্তব্য। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন আগামী প্রজন্মের জন্য অনন্ত প্রেরণা হয়ে থাকবে। এই কিশোর বিপ্লবীর সংগ্রামী জীবন বাংলাদেশের আন্দোলন—ইতিহাসে এক দীপ্তিময় নাম হয়ে জ্বলজ্বল করবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন এক ছোট্ট কিশোরের কথন
আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। দেশের চারদিকে ফ্যাসিবাদ ও বৈষম্যের আগুন জ্বলছে। শহরের রাস্তায় হাজারো মানুষ নেমেছে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। আমি কীভাবে ঘরে বসে থাকি? আমিও নেমে পড়ি রাজপথে, ঠাকুরগাঁও শহরের চৌরাস্তা মোড়ে আমরা অবস্থান নেই। তখন মনে হচ্ছিল এই শহরটা যেন আমাদের হাতে, আমাদের স্বপ্নে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই অবস্থানকে ভেঙে দিতে পুলিশ হঠাৎ টিয়ারগ্যাস ছঁুড়ে দেয়। অনেকেই তখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, চোখ জ্বলতে থাকে, নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তবুও আমরা পিছিয়ে যাইনি, শ্লেস্নাগানে উত্তাল রাখি রাজপথ।
এরপর আসে ভয়াবহ মুহূর্ত। পুলিশ গুলি চালায়। চারপাশে চিৎকার, কান্না, রক্ত। আমি বুঝতে পারি, আমার শরীরেও গুলি লেগেছে কয়েক জায়গায়। হঠাৎ সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়, আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমার সংগ্রামী ভাইয়েরা আমাকে তুলে নিয়ে যায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে। সেখানেই আমি ধীরে ধীরে চোখ খুলে বুঝি; এই জীবনটা এখন শুধুই আমার না, এটা আন্দোলনের, এটা মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য উৎসর্গিত।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের গুলি বয়ে বেড়াচ্ছি। সেদিন রাজপথে নেমেছিলাম অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা আর ন্যায়ের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তার মূল্য যে এতো ভয়াবহ হবে,তখন ভাবিনি। পুলিশের গুলিতে যখন আমার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়,তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি; শুধু তীব্র যন্ত্রণা ও রক্তে ভেজা মাটির গন্ধ।

আন্দোলনের ভাইয়েরা আমাকে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়,তারপর আমার শরীর থেকে কিছু বুলেট অপসারণ করা হয়। কিন্তু এখনও ছোট ছোট গুলির টুকরো শরীরে রয়ে গেছে—ফ্যাসিবাদের নৃশংসতার চিহ্ন হয়ে, যা প্রতিদিন আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি কী হারিয়েছি, আর কী পেয়েছি।
টিয়ার গ্যাসের যন্ত্রণাও থেমে থাকেনি। গ্যাসের সেই ঝাঁঝালো গন্ধ, চোখের জ্বালা আর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মুহূর্তগুলো এখনও মনে পড়ে। তখন থেকেই আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে তা দীর্ঘমেয়াদী রোগ; টিবিতে রূপ নেয়। এ মুহূর্তে আমি ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দিন চলে যায় ইনজেকশন, ওষুধ আর ডাক্তারের পরামর্শে। কিন্তু আমি জানি, আমার লড়াই শুধু শারীরিক ক্ষতের নয়; এটা একটা স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। আমি আজও বেঁচে আছি সে স্বপ্নের আগুন বুকের ভেতর নিয়ে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
ছাত্র
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তার পরিবারের কাউকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আব্দুল্লাহ বিন নোমান
জন্ম তারিখ : ১৭—০৩—২০০৭
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : ছাত্র, টিটিসি ভোকেশনাল
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মাদ্রাসাপাড়া, ইউনিয়ন: সালন্দর, থানা: সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও

পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : ফয়সাল আহমেদ
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা (মুদী), ৪০
মায়ের নাম : বিলকিস বানু
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩০
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : দোকান
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই—বোনদের বিবরণ
১.আহিয়ান, বয়স: ৭, পেশা: ছাত্র, নূরানী কিন্ডারগার্টেন, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা, ঠাকুরগাঁও
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিটের দিকে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍