হোম / আহতদের তালিকা / মো: সাইদুর রহমান
মো: সাইদুর রহমান

মো: সাইদুর রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : দিনমজুর (পুরানো মালামাল ক্রয় বিক্রয়ের দোকান)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সাইদুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি, ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের মনি বিষ্ণুপুর গ্রামে। ছোট্ট একটি গ্রামে জন্ম হলেও তাঁর জীবনগাথা ছড়িয়ে আছে বিস্তৃত সংগ্রামের চিত্রপটে। পিতা মো: আব্দুল মালেক একজন মানসিক প্রতিবন্ধী, যিনি জীবনের ভার বহন করতে না পারলেও মা মোছা: পেয়ারা বেগম সে শূন্যতা পূরণ করেছেন অফুরান ভালোবাসা, নিরলস শ্রম, আর অদম্য মমতার আলো দিয়ে। এই নিরীহ গৃহিণী শুধু একটি পরিবারের নয়, ছিলেন এক নৈতিক বিদ্যালয়; যেখান থেকে সাইদুর শিখেছেন আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা ও মানবিক দায়িত্ববোধ।
পারিবারিক জীবন
দাম্পত্য জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের জনক। বড় ছেলে মোয়াজ; মাত্র ছয় বছরের শিশু, স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে আয়ান এখনো কোলের শিশু,বয়স মাত্র এক বছর। এই ছোট্ট সংসারটিই ছিল তাঁর হৃদয়ের কেন্দ্র, জীবনের মানে। দিনমজুরির পথে ঘাম ঝরিয়ে চলা সাইদুর কাজ করতেন পুরাতন মালামাল ক্রয়—বিক্রয়ের একটি দোকানে। অল্প আয়ের জীবন, কিন্তু সততার আলোয় দীপ্ত। ঠিক এমনই এক মানুষ, যিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজের।
কর্ম জীবন
২০২৪ সালের উত্তাল জুলাইয়ে, যখন স্বৈরাচারী দমন—পীড়নের ঘনঘটা নেমে আসে বাংলাদেশের আকাশজুড়ে, তখন সাইদুর রহমান দাঁড়িয়ে যান জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে। তাঁর শ্রমজীবী পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদম্য যোদ্ধা বেরিয়ে আসে। তিনি বুঝেছিলেন; স্বাধীনতার আসল মানে কেবল ভোট নয়, কেবল শ্লোগান নয়; মানুষের সম্মান, জীবনের নিরাপত্তা ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা। তাই তিনি পিছু হটেননি, জীবনকে বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।
সংগ্রামী জীবন
সাইদুর রহমানের জীবন শুধু একটি নামের গল্প নয়, এটি এক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী জীবনের প্রতিচ্ছবি—যে শ্রেণি রোজ রোজ রক্ত—ঘামে দেশকে বাঁচিয়ে রাখে,আবার প্রয়োজন হলে সেই ঘামকে রক্তে রূপান্তরিত করে সংগ্রামের দীপ্ত মশাল জ্বালায়। তাঁর শ্রমজীবন,পরিবারপ্রেম এবং আন্দোলনের সাহসিকতা আগামী প্রজন্মের জন্য প্রজ¦লিত অনুপ্রেরণা-যেখানে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ আর আত্মত্যাগ একই রেখায় মিলিত হয়ে তৈরি করে এক আলোকবর্তিকা, যার আলো সমাজকে পথ দেখায় অন্ধকার সময়েও।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন—এক দিনমজুর যোদ্ধার লোমহর্ষক ঘটনা
আমি সাইদুর রহমান; একজন ভাঙারী দোকানের কর্মচারি। সারা জীবন শুধু হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেই সংসার চালিয়েছি। রাজনীতি আমার ছিল না, কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনার স্বৈরাচার, জুলুম আর দমন—পীড়ন এমনভাবে চারপাশ ঘিরে ফেলেছিল যে, নিরব থাকা আর সম্ভব হয়নি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হলো, তা যেন আমার নিজের জীবনের কথাই বলে। সেই দিনটা ছিল ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের উত্তপ্ত এক বিকেল। আমার কর্মস্থল রুহিয়া বাজারে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ জড়ো হতে থাকে ক্ষোভের আগুন তখন আকাশে বাতাসে। চোখের সামনে দেখি আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন জ্বলছে; আর ওই আগুন যেন প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা রাগ, ক্ষোভ আর প্রতিরোধের। কিন্তু আমার দোকান ছিল সে অফিসের পাশেই। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আমার দোকানেও। আগুনে পেট্রোল ছিল, যা মুহূর্তেই বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি আগুন আমার শরীরেও ধরে গেছে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে আমার শরীর। বাঁচার জন্য আমি চিৎকার করি, দৌড়াতে থাকি। কেউ এগিয়ে আসে, কেউ সরে যায়। শরীরের প্রায় ৫০ ভাগ পুড়ে যায় তখনই। যন্ত্রণা এমন ছিল, মনে হচ্ছিল আমি আর বেঁচে নেই; শুধু একটা জ্বলন্ত যন্ত্রণার নাম হয়ে গেছি। এই যে আমার দেহের পুড়ে যাওয়া প্রতিটি টুকরো, তা হয়ে থাকবে আওয়ামী সন্ত্রাসের, ফ্যাসিস্ট শাসনের এক জীবন্ত দলিল।
আজ আমি বেঁচে আছি,কিন্তু সেই আগুনের দাগ এখনও আমার গায়ে। রাতের নিস্তব্ধতায় ঘুম ভেঙে দেখি দগ্ধ শরীর জ্বলে ওঠে, আর ভেতরের ক্ষতগুলো চিৎকার করে বলে—এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই থেমে গেলে, আমার এই পুড়ে যাওয়া শরীরের রক্ত মিথ্যা হয়ে যাবে। তাই আমি বলবো, আমি একজন দিনমজুর, কিন্তু আজ আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী; আওয়ামী সন্ত্রাসের নির্মমতার, ফ্যাসিবাদের লেলিহান আগুনের।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিবাদের পোড়া ছাপ নিয়ে বেঁচে আছি; জীবন্ত এক সাক্ষী হয়ে। যে আগুন আমার শরীর গিলে নিয়েছিল, সে আগুনের জ্বলন আজও আমার রক্তে, হাড়ে, শিরায় শিরায় জ্বলে। সেদিন যখন আগুনে জড়িয়ে পড়ে আমার দেহ, স্থানীয় হাসপাতালে আমাকে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসা ছিল সীমিত, যেন আমার পোড়া গায়ের চেয়ে সিস্টেমটাই আরও বেশি পঁচে গেছে। ওরা শুধু শয্যা দিল, কিন্তু ব্যথার জন্য একটা দায়বদ্ধ চিকিৎসা দিল না। পরে সহযোদ্ধারা আমাকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট, পিজিতে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে চিকিৎসা। দিন, সপ্তাহ, মাস কেটে গেছে কিন্তু আমি যেন থেমে আছি এক যন্ত্রণার মধ্যে। ঘুম আসে না, চোখ বন্ধ করলেই আগুন দেখি,আমার গায়ের মাংস গলে পড়তে দেখি। ব্যান্ডেজ খুললেই পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যেন সারা শরীরে মৃত্যু বাসা বেঁধেছে। এখনো চিকিৎসা চলছে। শরীরের যেসব অংশ পুড়ে গেছে; তা এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। ব্যথা এখনও নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাজে।
আমার শরীরের প্রতিটি পোড়া ক্ষত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের নিষ্ঠুরতার নিরব ভাষ্য। যন্ত্রণা শুধু শরীরে না, মনের ভেতরেও এক আগুন জ্বলছে—যা নিভছে না কোনো মলমে, কোনো ওষুধে। চিকিৎসকেরা বলে, পুরোপুরি সেরে উঠতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু আমি জানি, যে আগুন আমার গায়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে এক স্বৈরাচারী সরকার, তার দহন এত সহজে নিভবে না। আমার দগ্ধ শরীর এখন প্রতিরোধের এক ব্যানার—যেখানে লেখা আছে, ‘এই আগুন যেন ভুলে না যায় কেউ।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: কৃষক
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সাইদুর রহমান
জন্ম তারিখ : ১৫—০১—১৯৯৪
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : দিনমজুর (পুরানো মালামাল ক্রয়—বিক্রয়ের দোকান)
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মনি বিষ্ণুপুর, ইউনিয়ন: রুহিয়া, থানা: রুহিয়া, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আব্দুল মালেক
পিতার পেশা ও বয়স : মানসিক প্রতিবন্ধী, বয়স: ৫০
মায়ের নাম : মোছা: পেয়ারা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : দিনমজুর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মোয়াজ, বয়স: ৬ পেশা: শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান: সর: প্রাথ: বিদ্যা: শ্রেণি: ১ম সম্পর্ক: ছেলে
২. আয়ান, বয়স: ১ বছর, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : রামনাথ বাজার
আক্রমণকারী : পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট, ২০২৪, সকাল ১১.৩০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍