হোম / আহতদের তালিকা / মো: তোফাজুল ইসলাম
মো: তোফাজুল ইসলাম

মো: তোফাজুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: কাঠমিস্ত্রী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জুলাই অভ্যুত্থানে আহত মো: তোফাজুল ইসলাম একজন পেশাদার কাঠমিস্ত্রী। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার ৭ নং চিলারং ইউনিয়নের চিলারং গ্রামে ১৯৭৯ সালের ৫ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন কর্মঠ ও পরিশ্রমী ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে কাঠমিস্ত্রীর কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তার মাসিক আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা, যার মূল উৎস হলো কাঠের দোকান। তোফাজুল ইসলামের পরিবারের মোট সদস্য পাঁচ জন। তার পিতা সামস উদ্দিন ইতোমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন এবং মা রহিমা বেগম এখনও জীবিত।
পরিবারে তিন সন্তানের মধ্যে সকলের বড় তুলি জাহান (১৯), তারপর সাদিয়া (১৭) এবং আব্দুল্লাহ কাউসার মাহিন (১৩)। তিনজনেই বর্তমানে শিক্ষার্থী। তুলি দ্বাদশ শ্রেণি, সাদিয়া দশম শ্রেণি এবং মাহিন নবম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছে। তোফাজুল ইসলাম একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ হলেও তার জীবনে শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা লক্ষণীয়। সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে সর্বাধিক সচেষ্ট। তার জীবনধারা গ্রামীণ হলেও দায়িত্বশীল পিতার ভূমিকায় তিনি নিজেকে সবসময় নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত রেখেছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের একজন প্রান্তিক নাগরিক হিসেবে তার জীবনসংগ্রাম বাংলাদেশের লাখো পরিশ্রমী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা আমাদের হৃদয়কে ব্যথিত করে।
ঘটনা
তোফাজুল ইসলাম পেশায় একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রী হলেও দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সারা দেশে নতুন গতি পেয়েছিল, তখন তিনি সাহসের সঙ্গে রাজপথে নেমে আসেন। দেশের নানা প্রান্তে ছাত্র, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, কৃষকসহ সর্বস্তরের জনগণ যখন এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছিল তখন ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তায় ৪ আগস্ট হাজার হাজার মানুষের মিছিলে সামান্য একজন কাঠমিস্ত্রী হয়ে তোফাজ্জল ইসলামও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আন্দোলন দমাতে আওয়ামী লীগ সরকার বরাবরের মতো কঠোর অবস্থান নেয়। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র আর আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশের সহযোগিতায় তারা মিছিলে আক্রমণ চালায়। সেদিন চৌরাস্তায় বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়েছিল পুলিশ। ছররা গুলি আর রাবার বুলেটে অনেকেই আহত হন। তোফাজুল ইসলামও সেখানে পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে জখম হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।
যখন চারপাশে ধেঁায়া আর আতঙ্ক, তখনও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেননি। তারা তোফাজ্জল ইসলামকে ধরাধরি করে দ্রুত ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত অবস্থায় তার সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। চোখে—মুখে কষ্ট আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, তবুও তার মনোবল ভেঙে যায়নি। হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরে ছররা গুলির গভীর ক্ষত এবং রাবার বুলেটের আঘাতের কারণে ভেতরের টিস্যু ছিঁড়ে গেছে।
চিকিৎসা
চৌরাস্তায় আন্দোলনের দিন পুলিশের ছররা গুলি ও রাবার বুলেটে আহত কাঠমিস্ত্রী মো: তোফাজ্জল ইসলামকে সহযোদ্ধারা ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হলেও নিরাপত্তার শঙ্কায় তাকে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করতে হয়। কারণ পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নজরে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তোফাজুল ইসলাম মনে করেন, তখন হাসপাতালেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। আহতদের উপরও চলে দমনমূলক তৎপরতা। ৫ আগস্টের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পলায়ন করলে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে তোফাজুল ভর্তি হন। সেখানেই তার শরীর থেকে গুলিগুলো অপসারণ করা হয়।
তোফাজ্জলের ডান কাঁধে রাবার বুলেটের আঘাত এখনও সেরে ওঠেনি। প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে তাকে প্রতিদিনের জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কাঠের কাজ, যা তার প্রধান পেশা, এখন সে কাজ করতেও শারীরিক অসুবিধা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। বিশেষ করে কাঁধের ব্যথা ও পেশির ক্ষয়জনিত সমস্যার কারণে। কিন্তু অর্থাভাবে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। তোফাজ্জলের এই পরিস্থিতি আরও একবার দেখিয়ে দেয়, এই আন্দোলনে অংশ নেয়ার খেসারত কতটা কঠিন হতে পারতো। একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ শুধু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর অপরাধে আজ জীবন ও জীবিকার সংকটে। তার প্রতি সহানুভূতি ও সহায়তা এখন সময়ের দাবি। তোফাজুল ইসলামের সাহসিকতা প্রমাণ করে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কোনো একক দলের নয়, এটি সাধারণ মানুষের আওয়ামী লীগের লাগাতার দুঃশাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। একজন কাঠমিস্ত্রীও এ লড়াইয়ে জীবনবাজি রাখতে পিছপা হননি। তার ত্যাগ আন্দোলনকে বেগবান করেছে এবং মানুষের মধ্যে অন্যায়—অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্পৃহা আরও উজ্জীবিত করেছে।
আওয়ামী লীগ শাসনে মানবাধিকার হরণের চিত্র
আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিনই বেড়ে চলছিল। বিশেষত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা হরণ একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছিল। বিরোধী মত দমন, রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগিং, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, মিথ্যা মামলা, এবং পুলিশি হয়রানি এসব যেন একটি সংগঠিত ও কাঠামোগত দমন নীতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
বিশেষত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই দমন নীতির বহিঃপ্রকাশ আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিরোধী দল ও সাধারণ আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ ও দলীয় বাহিনী দিয়ে হামলা, গুলি ও গ্রেফতার চালানো হয়। শুধু সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, এমনকি শ্রমজীবী মানুষও অকথ্য নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্নমত দমনে, যার ফলে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চরম সংকটের মধ্যে আবর্তিত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকার তা বরাবরের মতো অস্বীকার করেছে। বরং সরকারি বাহিনী র‌্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআই, ডিবি ও দলীয় সংগঠনগুলো ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ বিচারবহির্ভূতভাবে সাধারণ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। এতে করে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আওয়ামী লীগের অধীনে বাংলাদেশে একটি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, যেখানে ভিন্নমতের কোনো জায়গা নেই। মানবাধিকার রক্ষার বদলে সেগুলোর দমনই যেন রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে উঠে। এই পরিস্থিতি শুধু দেশের ভেতরে নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। আজ প্রয়োজন একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে জনগণের অধিকারই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: তোফাজুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০৫/০৬/১৯৭৯
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : কাঠমিস্ত্রী
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চিলারং, ইউনিয়ন: ৭ নং চিলারং, থানা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত সামস উদ্দিন
মায়ের নাম : রহিমা বেগম
মাসিক আয় : ৩০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : দোকান
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. তুলি জাহান, বয়স: ১৯, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: মেয়ে
২. সাদিয়া, বয়স: ১৭, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: দশম, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. আব্দুল্লাহ কাউসার মাহিন, বয়স: ১৩, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৯ম, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশনকার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍