হোম / আহতদের তালিকা / হোসাইন ফরহাদ কমল
হোসাইন ফরহাদ কমল

হোসাইন ফরহাদ কমল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

১৯৮৫ সালের ৫ ডিসেম্বর চাঁদপুরের মতলবের শান্ত গ্রামীণ আকাশের নিচে জন্ম নেওয়া হোসাইন ফরহাদ কমল বড় হয়েছেন এক ধর্মভীরু পরিবারের স্নেহে ও অনুশাসনের আলোয়। গ্রামের মাটি, মক্তবের পাঠ, মসজিদে নামাজ এসবেই তার ভেতরে গড়ে ওঠে ন্যায়পরায়ণ ও সংবেদনশীল এক মন। বড় হয়ে তিনি ঢাকায় আখের আড়ত গড়ে তোলেন, যেখানে পরিশ্রম, সততা আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই ছিল তাঁর ব্যবসার মূল শক্তি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক জনসমাগমে ছররা গুলিতে আহত হওয়ার অভিজ্ঞতা তার জীবনকে থামিয়ে দিলেও মনকে থামাতে পারেনি ব্যথার মধ্যেও তিনি পরিবারের হাত ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান আবার। আজ তাঁর জীবন এক নীরব বার্তা আহতরা হারায় না, বরং মানবিকতার ইতিহাসকে নতুন পথ দেখায়।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আহতরা হারায় না, বরং ইতিহাসকে নতুন পথ দেখায়
হোসাইন ফরহাদ কমল
ক্রমিক: ০২২
আইডি: ঢাকা সিটি ০২২
জন্ম
হোসাইন ফরহাদ কমলের জন্ম ১৯৮৫ সালের ৫ ডিসেম্বর, চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায়। তাঁর পরিবারটি ছিল ঐতিহ্যবাহী ও ধর্মভীরু। তাঁর বাবা আমিন মোল্লা ছিলেন একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা। বিআরডিবির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। পিতার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই ফরহাদ অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়েছেন। মা ছালেহা বেগম ছিলেন গৃহিণী, যিনি পরিবারকে ভালোবাসা ও শাসনের ভারসাম্যে পরিচালনা করতেন। হোসাইন ফরহাদ কৈশোর থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসার প্রতি আকৃষ্ট হন। চাঁদপুরের গ্রামীণ পরিবেশ ও সামাজিক রীতিনীতি তাঁর চারিত্রিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। শৈশবের বন্ধুত্ব, মাঠে খেলা, মক্তবের পাঠ এবং নিয়মিত মসজিদে নামাজ। এসব মিলেই তাঁর ভেতরে এক সংবেদনশীল, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মভীরু মন গড়ে ওঠে। বড় হয়ে তিনি শহরমুখী হলেও হৃদয়ের একাংশ পড়ে থাকে গ্রামের সেই মাটি আর মানুষের কাছে।
কর্ম
বর্তমানে হোসাইন ফরহাদ একজন আখের আড়তদার হিসেবে পরিচিত। যাত্রাবাড়ী কাজলা ব্রিজ-সংলগ্ন এলাকায় তাঁর নিজস্ব আখের আড়ত রয়েছে, যা থেকে দৈনিক প্রচুর পরিমাণে আখ সরবরাহ হয় ঢাকার বিভিন্ন দোকান ও জুস কারখানায়। তাঁর মাসিক আয় প্রায় এক লক্ষ টাকা, যা দিয়ে তিনি পরিবারের খরচ, ব্যবসায়িক ব্যয় ও সামাজিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করে থাকেন। শ্রম, সততা ও ব্যবসায়িক বিচক্ষণতার সম্মিলনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। তাঁর কর্মজীবনে সততা, কর্মনিষ্ঠা ও জনসেবার চেতনা বরাবরই দৃশ্যমান। ব্যবসার পাশাপাশি সমাজের সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সচেতন থেকেছেন। একাধারে তিনি ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং গণআন্দোলনের একজন নির্ভীক সৈনিক।
পারিবারিক বর্ণনা
ফরহাদের পরিবারটি একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত আয়ের রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার। ছয় সদস্যের পরিবারে রয়েছেন তাঁর বাবা-মা, স্ত্রী ও দু'টি কন্যাসন্তান। স্ত্রী একজন ধর্মপ্রাণ গৃহিণী, যিনি সংসার সামলে রেখেছেন অকুন্ঠ ভালোবাসা ও ধৈর্যের সঙ্গে। বড় মেয়ে ফাহমিদা মাহরিন এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। সে মেধাবী, হাসিখুশি আর সংগ্রামী বাবার পথ অনুসরণ করছে। ছোট মেয়ে মাহবুবা ফাতিন এখনো দুধের শিশু। মাত্র ১৩ মাস বয়স তার। পরিবারটি সম্মানিত ও অভিজাত ধারার, যেখান থেকে সর্বদা মানবতা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধের চেতনা প্রকাশ পায়। তাঁর মা ছালেহা বেগমের বয়স এখন ৬০ বছর। তিনি নিজ হাতে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে সুশিক্ষায় ও রুচিশীলতায় গড়ে তুলেছেন।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে শুরু হয় একটি যুগান্তকারী বৈষম্য বিরোধী গণ আন্দোলন। ছাত্রদের ন্যায্য দাবিকে ঘিরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। প্রথমে শিক্ষা ও চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা সরকারবিরোধী গণবিপ্লবে রূপ নেয়। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের ডাক পড়ে। প্রতিদিনই ছাত্র-ছাত্রী, যুবক, চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। আওয়ামী বর্বরতা, পুলিশের গুলি, টিয়ার-গ্যাস টএবং গ্রেপ্তারের হুমকি সত্ত্বেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বরং আওয়ামী দমননীতি দেখে সাধারণ মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। রংপুরে ছাত্র আবু সাঈদের নির্মম হত্যাকাণ্ড যেন সারা জাতির চেতনাকে আলোড়িত করে তোলে। এর ফলেই আন্দোলনের গতি হয় আরও প্রবল, এবং এতে দেশের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। হোসাইন ফরহাদ তখন ব্যবসার পাশাপাশি এই আন্দোলনের নৈতিক সমর্থন থেকে সরাসরি মাঠে নামেন।
যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ
আন্দোলনে যোগদান
হোসাইন ফরহাদ শুধু একজন দর্শক নন, তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৬ ও ১৭ জুলাই তিনি যাত্রাবাড়ীতে যুবকদের নিয়ে মিছিল করেছেন। পুলিশের নির্যাতন, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রোষানলের মধ্যেও তিনি পিছপা হননি। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় একটি স্থানীয় প্রতিবাদী দল যা প্রতিদিনই যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায় মিছিল করত। ১৮ জুলাই সকালেও তিনি মিছিলে অংশ নেন। আন্দোলন তখন যৌক্তিক দাবিতে উত্তাল। হোসাইন ফরহাদ জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সেদিন মনে মনে ভেবেছিলেন-'নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।' কিন্তু পুলিশ সেদিন ইতিহাসের ভয়ঙ্কর অধ্যায় রচনা করে। হঠাৎই টিয়ার-গ্যাস, ছররা গুলি ছুঁড়ে মিছিলে হামলা করে। সেখানেই ছররা গুলিতে ফরহাদ আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় সঙ্গীরা তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। তবু তাঁর মন আন্দোলনের মধ্যেই থেকে যায়।
আহত পরবর্তী জীবন
আহত হওয়ার পর হোসাইন ফরহাদ কয়েকদিন ঘরে শুয়ে থাকলেও তাঁর মন পড়ে থাকত রাজপথে। চোখে ছিল প্রতিবাদীদের মুখ, কানে ছিল মিছিলে উচ্চারিত স্লোগান। বাড়ির পরিবেশ, স্ত্রীর সেবা, মেয়েদের মুখ সব তাঁকে বাঁধতে পারেনি। যেন তাঁর শরীর নয়, মন ছুটে বেড়াচ্ছে রাজপথে। পাড়ার ছেলেরা, প্রতিবেশীরা প্রতিদিন খোঁজ নিতে আসত। বীরের মতো তাকিয়ে থাকতেন তিনি। তখন চারদিকে পুলিশি ধরপাকড় চলছিল, সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গেলেই হয়রানির শিকার হতো। তাই ফরহাদ পাশের ফার্মেসি থেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন, পরে ধীরে ধীরে কিছুটা সুস্থ হন। এত কষ্টের মাঝেও একদিন যখন শুনলেন। খুনী হাসিনা আবারও ছাত্রদেরকে নিয়ে উপহাস করে। আন্দোলন দমাতে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ফরহাদ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। আবারও শামিল হন রাজপথে। তাঁর এই অবিচলতা যেন এক নীরব অভ্যুত্থানের প্রতিচ্ছবি।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
হোসাইন ফরহাদ যখন ছররা গুলিতে আহত হন, তখন পরিবেশ এতটা বিপজ্জনক ছিল যে, হাসপাতালে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। পুলিশ ও সরকারি বাহিনী হাসপাতালগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করছিল। তাই তিনি একপ্রকার গৃহবন্দী অবস্থায় কাছাকাছি ফার্মেসি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। ব্যথা, জ্বর, রক্তপাত সবকিছুর মধ্যেও তিনি ধৈর্য হারাননি। স্থানীয় এক পরিচিত ফার্মাসিস্ট তাঁকে ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও ত্বক ফোঁড়ানোর ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান। স্ত্রীর যত্ন ও আত্মবিশ্বাসই ছিল তাঁর প্রধান শক্তি। কোনো রকমে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। পরিবার তাঁর চিকিৎসার খরচ নির্বাহ করে নিরবভাবে। যদিও আর্থিক সমস্যা ছিল না, তবুও সে সময়কার ভীতিকর পরিস্থিতির জন্য পূর্ণ চিকিৎসা তিনি নিতে পারেননি। এভাবেই এক যোদ্ধা ফের প্রস্তুত হন আবার লড়াইয়ে ফেরার জন্য।
প্রস্তাবনা
দেশমাতৃকার দুঃসাহসী এই সৈনিকের মতো সাহসী মানুষদের গল্প যেন নতুন প্রজন্ম জেনে এবং হদয়ঙ্গম করতে অনুপ্রাণিত হয়।
এটাই হবে সত্যিকারের বাংলাদেশ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।

এক নজরে হোসাইন ফরহাদ কমল
নাম: হোসাইন ফরহাদ কমল
জন্ম তারিখ: ৫-১২-১৯৮৫
জন্মস্থান: চাঁদপুর
পেশা: ব্যবসা (আখের আড়তদার)
স্থায়ী ঠিকানা: মতলব, চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: ৬০৩/৬০৪ কাজলা ব্রীজ-সংলগ্ন, মহল্লা: দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, থানা: যাত্রাবাড়ী, জেলা: ঢাকা
পিতার নাম: আমির মোল্লা, অবসরপ্রাপ্ত বিআরডিবি কর্মকর্তা, বয়স: ৭৫ বছর
মায়ের নাম: ছালেহা বেগম, বয়স: ৬০ বছর, গৃহিণী
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬ জন
স্ত্রী: গৃহিণী
সন্তানদের বিবরণ
মেয়ে ১: ফাহমিদা মাহরিন, বয়স: ১১ বছর, ছাত্রী, ৫ম শ্রেণি
মেয়ে ২: মাহবুবা ফাতিন, বয়স: ১৩ মাস
মাসিক আয়: এক লক্ষ টাকা
আয়ের উৎস: আখের আড়তদার ব্যবসা
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী থানা সংলগ্ন, ঢাকা
আক্রমণকারী : যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বাহিনী
আক্রমণের ধরণ : ছররা গুলি, টিয়ার গ্যাস
আহত হওয়ার তারিখ: ১৮ জুলাই ২০২৪

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍