হোম / আহতদের তালিকা / মো: ফরহাদ ইসলাম
 মো: ফরহাদ ইসলাম

মো: ফরহাদ ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী, জালালাইন জামাত শেষ, জামিয়া দারুল উলুম নুরিয়া মাদ্রাসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল এক বিপ্লবী জাগরণ, যেখানে দেশের হাজারো ছাত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই ন্যায্য আন্দোলনের জবাবে সরকার চালায় বর্বরতম দমন—পীড়ন। আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর নামিয়ে আনা হয় পুলিশের বুলেট, রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস আর লাঠিচার্জের ভয়াল থাবা। রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায় অনেককে, অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। কারও শরীরে গুলি, কারও চোখ উপড়ে নেয়া হয়, আবার কাউকে রাতের অন্ধকারে গুম করে ফেলা হয়।
সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী গুণ্ডারা একত্র হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র নেতাদের টার্গেট করে চরম নৃশংসতা চালায়। এই নির্যাতন শুধু শারীরিক ছিল না মানসিক, সামাজিক, এমনকি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসও ছিল তা। কিন্তু তবুও ছাত্ররা দমে যায়নি। তাদের রক্ত, যন্ত্রণা ও আত্মত্যাগই আজকের স্বাধীনতার স্বপ্নের ভিত্তি।
মো: ফরহাদুল ইসলাম : জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী বীর
মো: ফরহাদুল ইসলাম ২০০৬ সালের ১ জুন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মারেরবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নদী—খাল—ফসলি জমিতে ঘেরা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক সাদামাটা পরিবেশেই শুরু হয় তার জীবনের পথচলা।
পারিবারিক জীবন
ফরহাদের পিতা আলী হোসেন (৪৫) একজন সাধারণ কৃষক। তিনি নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে সারা জীবন মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছেন, সন্তানদের সামনে সততা ও পরিশ্রমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফরহাদের মা ফরিদা বেগম (৩৯) একজন গৃহিণী, যিনি ছিলেন সন্তানদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর। তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অসীম ধৈর্য ও মাতৃস্নেহে গড়ে উঠেছে ফরহাদের আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ।
কর্মজীবন
ব্যক্তিগত জীবনে মো: ফরহাদুল ইসলাম একজন শিক্ষার্থী। তিনি ঢাকার মধ্য বাড্ডার জামিয়া দারুল উলুম নুরিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছিলেন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতেন, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার মতো প্রজ্ঞা তার ভিতরে গড়ে উঠেছিল ছোটবেলা থেকেই।
সংগ্রামী জীবন
যখন দেশে ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের অন্ধকার নেমে এসেছিল, তখন মো: ফরহাদুল ইসলাম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামেন। দেশের গুমোট বাতাসে যখন ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তিনি বুঝেছিলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দেশের প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন ফরহাদ। তার সংগ্রামী জীবনযাত্রা আগামী প্রজন্মের জন্য হতে পারে আলোকবর্তিকার মতো এক অনন্ত অনুপ্রেরণা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ


আমি তখন ঢাকার বাড্ডা এলাকার এক মাদ্রাসায় পড়াশুনা করি। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ, চারপাশে শুধু আতঙ্ক আর দমন— পীড়নের ছায়া। কিন্তু আমি চুপ থাকতে পারিনি। প্রতিদিন মাদ্রাসা থেকে আন্দোলনের ময়দানে ছুটে যেতাম। জানতাম, কেউ কেউ ফিরছে না ঠিকমতো, কেউ আহত, কেউ বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। তবু থামিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই হচ্ছে প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।
১৯ জুলাই, বাড্ডার লিংক রোড এলাকায় আমরা প্রতিবাদে নেমেছিলাম। চারদিকে শ্লোগান ও উত্তাল জনতার ঢল। আমি তখন গোদারাঘাটের কাছে পেঁৗছাই। ঠিক তখনই হঠাৎ বুকের ডান পাশের একটু ওপর দিয়ে একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় আমার শরীরে। গুলিটি বুক চিরে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। পা পিছলে আমি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে যায়। কানে ভেসে আসে শ্লোগান, মানুষের চিৎকার, অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ। আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শরীর নিথর, কিন্তু মন তখনো লড়ছে। আমি জানি, এটা কোনো দুর্ঘটনা নয় এ এক ভয়াবহ স্বৈরাচারী সরকারের পরিকল্পিত বর্বরতা। আওয়ামী সরকারের নির্দেশে নিরীহ মানুষদের যেভাবে গুলি করে, সেটাই আমি নিজের রক্ত দিয়ে বুঝে গেছি।
আজও বুকের সেই ক্ষত বয়ে বেড়াই, কিন্তু লজ্জা নয়—এটা আমার গর্ব। এই ক্ষতের প্রতিটি ব্যথা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি মাথা নত করিনি, আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার এই রক্ত, আমার এই বুলেটবিদ্ধ দেহ, ইনশাআল্লাহ একদিন এই দেশের স্বাধীনতার স্বাক্ষর হয়ে থাকবে।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। গুলিটা যখন বুক চিরে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেল, তখন মনে হচ্ছিল—এই বুঝি সব শেষ। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল শরীর, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, চোখের সামনে সব অন্ধকার। আমাকে দ্রুত বাড্ডার এ জেড এম হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু ওখানে বেশিদিন থাকা গেল না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, চারপাশে শুধু পুলিশ, গোয়েন্দা, আর আওয়ামী গুণ্ডাদের ভয়। তাদের চোখে আমি ছিলাম ‘অপরাধী’, কারণ আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম! তারপর আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেখানেও নিরাপদ ছিলাম না। প্রতিটি পা চালানোর শব্দে মনে হতো, কেউ আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। পুলিশের চোখ এড়িয়ে, নিজের জীবন বাঁচাতে সেখান থেকে একরকম পালিয়ে আসতে হয়।
অবশেষে ফিরে যাই নিজের জেলা কুড়িগ্রামে। সেখানকার সদর হাসপাতালে ভর্তি হই। এখানেই আমার গুলিবিদ্ধ শরীরে কিছুটা চিকিৎসা সম্ভব হয়। কিন্তু এখনো আমার শরীরে সেই ভয়াল নির্যাতনের চিহ্ন রয়ে গেছে। এখনো বুকে ব্যথা, রাতে ঘুম ভেঙে যায় গুলির দুাস্বপ্নে। এই ক্ষত শুধু মাংসের নয়, আত্মায়ও লেগে গেছে।
আমি জানি, এই যন্ত্রণা আমৃত্যু থাকবে। কিন্তু এটাও জানি এ ব্যথা আমার অহঙ্কার, কারণ আমি অন্যায়ের সামনে মাথানত করিনি। আমি গুলি খেয়েছি সত্যের পক্ষে, মানুষের অধিকারের পক্ষে। আর সে জন্যই এ ক্ষত আমার শরীরে নয়, ইতিহাসের বুকে লেখা থাকবে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
তার বাবাকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা এবং তার পড়াশোনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: ফরহাদ ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০১—০৬—২০০৬
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী, জালালাইন জামাত শেষ, জামিয়া দারুল উলুম নুরিয়া মাদ্রাসা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মারের বাড়ি, ইউনিয়ন: ছিনাই, থানা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : বাড্ডা, গুলশান, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আলী হোসেন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৪৫
মায়ের নাম : মোছা: ফরিদা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৯
মাসিক আয় : ১৫০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. অঁাখি আক্তার, বয়স: ১৬, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার বাড্ডা লিংকরোড, গুদারাঘাট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪, দুপুর ৩.০০ মিনিটের দিকে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍