মো: কাজল সরকার
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের উপর আওয়ামী লীগের পৈশাচিক নির্যাতন
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের উপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের যে বর্বর নির্যাতন নেমে এসেছিল, তা ইতিহাসের এক ঘৃণ্যতম অধ্যায় হয়ে থাকবে। শান্তিপূর্ণভাবে ন্যায়ের দাবি জানানো ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রক্তপিপাসু পুলিশ বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীরা। মিছিলের মাঝখানে নির্বিচারে গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ সবই ছিল পরিকল্পিত দমননীতির অংশ। বহু ছাত্র আহত হয়, কেউ হারায় চোখ, কেউ পঙ্গু হয় আজীবনের জন্য।
রাস্তাঘাটে শুধু কান্না, রক্ত আর চিৎকারের দৃশ্য—যেন যুদ্ধক্ষেত্র। গ্রেফতারের পর কারাগারেও চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন; শরীর ভাঙার পাশাপাশি মনকেও ধ্বংস করার পৈশাচিক প্রচেষ্টা। আওয়ামী সরকারের এই দমন—পীড়ন প্রমাণ করে, তারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, তারা তরুণদের প্রতিবাদকেই সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবে। কিন্তু সেই রক্তঝরা প্রতিবাদ আজও জীবন্ত, সেই রক্তের প্রত্যেক ফেঁাটা হয়ে উঠবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের বিরুদ্ধে জোরালো সাক্ষী।
মো: কাজল সরকার : জুলাই আন্দোলনের এক অকেুতোভয় সৈনিক
মো: কাজল সরকার ২০০২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালভাঙ্গা ইউনিয়নের জমিদার পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিভৃত এক গ্রামীণ জনপদের এই ভূমিপুত্রের জন্ম ছিল এক প্রতীক্ষিত সূর্যোদয়ের মতো, যিনি বড় হয়ে উঠবেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে। জন্মের মাটিতেই তার মনন গঠিত হয়েছিল পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও সততার আলোকে।
পারিবারিক জীবন
কাজলের পিতা মো: জাহিদুল ইসলাম একজন কৃষক ছিলেন; মাটির সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়া এক শ্রমিক আত্মা। চাষের কর্ষণ আর জীবনের সংগ্রামকে পাশাপাশি চালিয়ে তিনি সন্তানদের সামনে স্থাপন করেছিলেন সততার অদ্বিতীয় নজির, কিন্তু বর্তমানে এক্সিডেন্টে পায়ে আঘাত পাওয়ার কারণে অবসর আছেন। মা মোছা: কুলসুম বেগম এক নিঃস্বার্থ গৃহিণী, যার নিঃশব্দ ত্যাগ, মাতৃস্নেহ ও অনুপ্রেরণাময় উপস্থিতি কাজলের নৈতিকতা ও আদর্শের ভিত্তি গড়ে দেয়। তিন ভাই—বোনের মধ্যে কাজল ছিলেন সবার বড়। ছোট ভাই শরিফুল ইসলাম একজন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর ছোট বোন জান্নাতি খাতুন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। এই ছোট সংসারে ভালোবাসা, সংগ্রাম আর মর্যাদার এক সুশৃঙ্খল ভারসাম্য বিরাজ করত, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কাজল।
কর্মজীবন
মো: কাজল সরকার একজন শিক্ষার্থী হয়েও কর্মজীবনে ছিলেন সক্রিয় ও সচেতন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকাকালেই তিনি সমাজ বাস্তবতা, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক জটিলতার গভীরে প্রবেশ করেন। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল তার মূল ব্রত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার প্রকৃত মূল্য দাঁড়ায় তখনই, যখন তা সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। সে বিশ্বাস থেকেই তিনি একাধারে আন্দোলনের কর্মী, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন। কর্মজীবনে তার ভূমিকা ছিল নেতৃত্বমূলক, প্রতিবাদী এবং জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এক সত্যনিষ্ঠ সংগ্রামী সৈনিক হিসেবে।
সংগ্রামী জীবন
ছোটবেলা থেকেই কাজল সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতেন। তার মধ্যে অন্যায়—ন্যায়ের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্র যখন দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের অন্ধকার নেমে আসতে দেখে, তখন আর নিরব থাকতে পারেননি। ভয় আর আতঙ্কের ঘনঘোর রাতেও তিনি এগিয়ে এসেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। রাজপথে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন; স্বৈরাচারকে আর প্রশ্রয় নয়। তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সুর। সাহস, আত্মত্যাগ ও অটল বিশ্বাসের এক অপরাজেয় প্রতীক হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জুলাই আন্দোলনের এক অকুতোভয় সৈনিক। আগামী প্রজন্ম তার জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে, যেখানে আছে দৃঢ়তা, আদর্শ ও সংগ্রামের দীপ্ত অঙ্গীকার।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : জুলাই যোদ্ধার জবানীতে শুনুন
জুলাই আন্দোলনের সে দিনগুলো ছিল ইতিহাসের রক্তাক্ত এক অধ্যায়,আর আমি ছিলাম সেই অধ্যায়ের এক জীবন্ত সাক্ষী। আমি তখন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করি। দেশের চারদিকে নেমে এসেছিল ভয়ের অন্ধকার—ফ্যাসিবাদী শাসনের করালগ্রাসে গোটা জাতি ছিল স্তব্ধ, নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ ছিল না। আতঙ্ক, নিপীড়ন আর গুম—খুন ছিল নিত্যদিনের সংবাদ। কিন্তু আমি চুপ থাকতে পারিনি। প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট পেরিয়ে নামতাম রাজপথে, যেখানে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধে মুখর ছিল জনতার ঢল।
আমরা শ্লোগানে শ্লোগানে উচ্চারণ করছিলাম সত্য, স্বাধীনতা আর ন্যায়ের পক্ষে। আমার পাশে ছিলেন আবু সাঈদ, যিনি শহীদ হয়েছিলেন আন্দোলনের এক নিষ্ঠুর মুহূর্তে। ঠিক সেদিন—১৬ জুলাই, স্বৈরাচারী সরকারের দমনযন্ত্র দানবের মতো আছড়ে পড়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে। হঠাৎ গর্জে ওঠে পুলিশের বন্দুক। ঝাঁঝরা হয়ে যায় শরীর, রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। আমার বুকেও বিদ্ধ হয় ফ্যাসিস্ট সরকারের ছোড়া গুলি। অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। সহযোদ্ধারা আমাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যায়, পরে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছি চিকিৎসার জন্য।
আমি জানি, এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এ এক পরিকল্পিত, বর্বর ও রক্তপিপাসু সরকারের নগ্ন উন্মাদনা। আওয়ামী সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে যেভাবে শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালানো হয়েছে, তা হিটলারের গ্যাস চেম্বারকেও হার মানায়। আমি নিজ শরীরের রক্ত দিয়ে বুঝে গেছি, এ সরকার মানুষের রক্তের উপর টিকে থাকতে চায়।
আজও সেই ক্ষত আমি বয়ে বেড়াই। বুকের গভীরে লুকানো নয়, গর্বের সাথে ধারণ করি। এই ক্ষত আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, আমি মাথা নত করিনি, আমি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। ইনশাআল্লাহ, আমার এই রক্ত, আমার এই বুলেটবিদ্ধ শরীর একদিন ইতিহাসে স্বাধীনতার সাক্ষর হয়ে থাকবে, হয়ে থাকবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনতার দ্রোহের পবিত্র প্রমাণ।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সন্ত্রাসীদের দেয়া ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। সেই ভয়াল ১৬ জুলাইয়ের গুলিবর্ষণের পর যখন আমার শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, তখন সহযোদ্ধারাই আমাকে দ্রুত স্থানীয় এক ক্লিনিকে নিয়ে যায়। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আমি কোনো বড় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পারিনি। চারপাশে ছিল পুলিশি তল্লাশি, গ্রেফতারের ভয় এবং হাসপাতাল চত্বরে সরকারের দালালচক্রের ছায়া। কোথাও আশ্রয় ছিল না শান্তির, ছিল শুধু আতঙ্ক আর গোপন পলায়ন। তাই বাধ্য হয়ে আমি গোপনে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নেই। কখনো কোনো পরিচিত ব্যক্তির সহায়তায় ছোট ক্লিনিকে, কখনো কোনো নামহীন চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ব্যথা ছিল অসহনীয়, শরীরে গুলির ক্ষত গভীর,কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর ছিল রাষ্ট্রের সেই নির্মম দৃষ্টি—যেখানে আহতকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যেখানে হাসপাতালও নিরাপদ নয় এক প্রতিবাদীর জন্য।
আজও সেই বুলেটের যন্ত্রণা শরীরে রয়ে গেছে,কিছু ক্ষত শুকিয়েছে, কিছু থেকে গেছে স্থায়ী চিহ্ন হয়ে। কিন্তু আমি লজ্জিত নই, বরং গর্বিত— কারণ এই ক্ষত, এই যন্ত্রণাই প্রমাণ করে আমি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি ছিলাম এক সৈনিক, যে নিজের রক্তে অঁাকতে চেয়েছিল মুক্তির মানচিত্র।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
শিক্ষার্থী
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা এবং তার পড়াশুনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: কাজল সরকার
জন্ম তারিখ : ১১-০২-২০০২
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : কুড়িগ্রাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: জমিদারপাড়া, ইউনিয়ন: ঘাড়িয়াল ভাঙ্গা, থানা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: জাহিদুল ইসলাম
পিতার পেশা ও বয়স : এক্সিডেন্ট করে বর্তমানে অবসর, ৫৫
মায়ের নাম : মোছা: কুলসুম বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : কোচিংয়ে ক্লাস নেন এবং টিউটর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. শরিফুল ইসলাম, বয়স: ১৮ পেশা: দ্বাদশ, সম্পর্ক: ভাই
২. জান্নাতি খাতুন, বয়স: ১৬ পেশা: ১০ম, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর এর ১নং গেইট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই, ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিটের দিকে
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের উপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের যে বর্বর নির্যাতন নেমে এসেছিল, তা ইতিহাসের এক ঘৃণ্যতম অধ্যায় হয়ে থাকবে। শান্তিপূর্ণভাবে ন্যায়ের দাবি জানানো ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রক্তপিপাসু পুলিশ বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীরা। মিছিলের মাঝখানে নির্বিচারে গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ সবই ছিল পরিকল্পিত দমননীতির অংশ। বহু ছাত্র আহত হয়, কেউ হারায় চোখ, কেউ পঙ্গু হয় আজীবনের জন্য।
রাস্তাঘাটে শুধু কান্না, রক্ত আর চিৎকারের দৃশ্য—যেন যুদ্ধক্ষেত্র। গ্রেফতারের পর কারাগারেও চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন; শরীর ভাঙার পাশাপাশি মনকেও ধ্বংস করার পৈশাচিক প্রচেষ্টা। আওয়ামী সরকারের এই দমন—পীড়ন প্রমাণ করে, তারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, তারা তরুণদের প্রতিবাদকেই সবচেয়ে বড় শত্রু ভাবে। কিন্তু সেই রক্তঝরা প্রতিবাদ আজও জীবন্ত, সেই রক্তের প্রত্যেক ফেঁাটা হয়ে উঠবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের বিরুদ্ধে জোরালো সাক্ষী।
মো: কাজল সরকার : জুলাই আন্দোলনের এক অকেুতোভয় সৈনিক
মো: কাজল সরকার ২০০২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালভাঙ্গা ইউনিয়নের জমিদার পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিভৃত এক গ্রামীণ জনপদের এই ভূমিপুত্রের জন্ম ছিল এক প্রতীক্ষিত সূর্যোদয়ের মতো, যিনি বড় হয়ে উঠবেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে। জন্মের মাটিতেই তার মনন গঠিত হয়েছিল পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও সততার আলোকে।
পারিবারিক জীবন
কাজলের পিতা মো: জাহিদুল ইসলাম একজন কৃষক ছিলেন; মাটির সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়া এক শ্রমিক আত্মা। চাষের কর্ষণ আর জীবনের সংগ্রামকে পাশাপাশি চালিয়ে তিনি সন্তানদের সামনে স্থাপন করেছিলেন সততার অদ্বিতীয় নজির, কিন্তু বর্তমানে এক্সিডেন্টে পায়ে আঘাত পাওয়ার কারণে অবসর আছেন। মা মোছা: কুলসুম বেগম এক নিঃস্বার্থ গৃহিণী, যার নিঃশব্দ ত্যাগ, মাতৃস্নেহ ও অনুপ্রেরণাময় উপস্থিতি কাজলের নৈতিকতা ও আদর্শের ভিত্তি গড়ে দেয়। তিন ভাই—বোনের মধ্যে কাজল ছিলেন সবার বড়। ছোট ভাই শরিফুল ইসলাম একজন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর ছোট বোন জান্নাতি খাতুন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। এই ছোট সংসারে ভালোবাসা, সংগ্রাম আর মর্যাদার এক সুশৃঙ্খল ভারসাম্য বিরাজ করত, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কাজল।
কর্মজীবন
মো: কাজল সরকার একজন শিক্ষার্থী হয়েও কর্মজীবনে ছিলেন সক্রিয় ও সচেতন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকাকালেই তিনি সমাজ বাস্তবতা, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক জটিলতার গভীরে প্রবেশ করেন। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল তার মূল ব্রত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার প্রকৃত মূল্য দাঁড়ায় তখনই, যখন তা সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। সে বিশ্বাস থেকেই তিনি একাধারে আন্দোলনের কর্মী, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন। কর্মজীবনে তার ভূমিকা ছিল নেতৃত্বমূলক, প্রতিবাদী এবং জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এক সত্যনিষ্ঠ সংগ্রামী সৈনিক হিসেবে।
সংগ্রামী জীবন
ছোটবেলা থেকেই কাজল সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতেন। তার মধ্যে অন্যায়—ন্যায়ের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্র যখন দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের অন্ধকার নেমে আসতে দেখে, তখন আর নিরব থাকতে পারেননি। ভয় আর আতঙ্কের ঘনঘোর রাতেও তিনি এগিয়ে এসেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। রাজপথে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন; স্বৈরাচারকে আর প্রশ্রয় নয়। তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সুর। সাহস, আত্মত্যাগ ও অটল বিশ্বাসের এক অপরাজেয় প্রতীক হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জুলাই আন্দোলনের এক অকুতোভয় সৈনিক। আগামী প্রজন্ম তার জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে, যেখানে আছে দৃঢ়তা, আদর্শ ও সংগ্রামের দীপ্ত অঙ্গীকার।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : জুলাই যোদ্ধার জবানীতে শুনুন
জুলাই আন্দোলনের সে দিনগুলো ছিল ইতিহাসের রক্তাক্ত এক অধ্যায়,আর আমি ছিলাম সেই অধ্যায়ের এক জীবন্ত সাক্ষী। আমি তখন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করি। দেশের চারদিকে নেমে এসেছিল ভয়ের অন্ধকার—ফ্যাসিবাদী শাসনের করালগ্রাসে গোটা জাতি ছিল স্তব্ধ, নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ ছিল না। আতঙ্ক, নিপীড়ন আর গুম—খুন ছিল নিত্যদিনের সংবাদ। কিন্তু আমি চুপ থাকতে পারিনি। প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট পেরিয়ে নামতাম রাজপথে, যেখানে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধে মুখর ছিল জনতার ঢল।
আমরা শ্লোগানে শ্লোগানে উচ্চারণ করছিলাম সত্য, স্বাধীনতা আর ন্যায়ের পক্ষে। আমার পাশে ছিলেন আবু সাঈদ, যিনি শহীদ হয়েছিলেন আন্দোলনের এক নিষ্ঠুর মুহূর্তে। ঠিক সেদিন—১৬ জুলাই, স্বৈরাচারী সরকারের দমনযন্ত্র দানবের মতো আছড়ে পড়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে। হঠাৎ গর্জে ওঠে পুলিশের বন্দুক। ঝাঁঝরা হয়ে যায় শরীর, রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। আমার বুকেও বিদ্ধ হয় ফ্যাসিস্ট সরকারের ছোড়া গুলি। অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। সহযোদ্ধারা আমাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যায়, পরে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছি চিকিৎসার জন্য।
আমি জানি, এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এ এক পরিকল্পিত, বর্বর ও রক্তপিপাসু সরকারের নগ্ন উন্মাদনা। আওয়ামী সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে যেভাবে শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালানো হয়েছে, তা হিটলারের গ্যাস চেম্বারকেও হার মানায়। আমি নিজ শরীরের রক্ত দিয়ে বুঝে গেছি, এ সরকার মানুষের রক্তের উপর টিকে থাকতে চায়।
আজও সেই ক্ষত আমি বয়ে বেড়াই। বুকের গভীরে লুকানো নয়, গর্বের সাথে ধারণ করি। এই ক্ষত আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, আমি মাথা নত করিনি, আমি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। ইনশাআল্লাহ, আমার এই রক্ত, আমার এই বুলেটবিদ্ধ শরীর একদিন ইতিহাসে স্বাধীনতার সাক্ষর হয়ে থাকবে, হয়ে থাকবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনতার দ্রোহের পবিত্র প্রমাণ।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনো শরীরে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সন্ত্রাসীদের দেয়া ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। সেই ভয়াল ১৬ জুলাইয়ের গুলিবর্ষণের পর যখন আমার শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, তখন সহযোদ্ধারাই আমাকে দ্রুত স্থানীয় এক ক্লিনিকে নিয়ে যায়। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, আমি কোনো বড় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে পারিনি। চারপাশে ছিল পুলিশি তল্লাশি, গ্রেফতারের ভয় এবং হাসপাতাল চত্বরে সরকারের দালালচক্রের ছায়া। কোথাও আশ্রয় ছিল না শান্তির, ছিল শুধু আতঙ্ক আর গোপন পলায়ন। তাই বাধ্য হয়ে আমি গোপনে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নেই। কখনো কোনো পরিচিত ব্যক্তির সহায়তায় ছোট ক্লিনিকে, কখনো কোনো নামহীন চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ব্যথা ছিল অসহনীয়, শরীরে গুলির ক্ষত গভীর,কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর ছিল রাষ্ট্রের সেই নির্মম দৃষ্টি—যেখানে আহতকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যেখানে হাসপাতালও নিরাপদ নয় এক প্রতিবাদীর জন্য।
আজও সেই বুলেটের যন্ত্রণা শরীরে রয়ে গেছে,কিছু ক্ষত শুকিয়েছে, কিছু থেকে গেছে স্থায়ী চিহ্ন হয়ে। কিন্তু আমি লজ্জিত নই, বরং গর্বিত— কারণ এই ক্ষত, এই যন্ত্রণাই প্রমাণ করে আমি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি ছিলাম এক সৈনিক, যে নিজের রক্তে অঁাকতে চেয়েছিল মুক্তির মানচিত্র।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
শিক্ষার্থী
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা এবং তার পড়াশুনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: কাজল সরকার
জন্ম তারিখ : ১১-০২-২০০২
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : কুড়িগ্রাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: জমিদারপাড়া, ইউনিয়ন: ঘাড়িয়াল ভাঙ্গা, থানা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: জাহিদুল ইসলাম
পিতার পেশা ও বয়স : এক্সিডেন্ট করে বর্তমানে অবসর, ৫৫
মায়ের নাম : মোছা: কুলসুম বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : কোচিংয়ে ক্লাস নেন এবং টিউটর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. শরিফুল ইসলাম, বয়স: ১৮ পেশা: দ্বাদশ, সম্পর্ক: ভাই
২. জান্নাতি খাতুন, বয়স: ১৬ পেশা: ১০ম, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর এর ১নং গেইট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই, ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিটের দিকে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍