মো: ওবাদুল হক
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : সিএনজি চালক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাই আন্দোলনে সাধারণ জনতার উপর পাশবিক নির্যাতনের চিত্র
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল একদিকে স্বৈরাচার বিরোধী জনতার গর্জন, অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতম দমন—পীড়নের রক্তাক্ত অধ্যায়। সে সময় আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী যেন জনতার মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল লাঠি, বুলেট আর টিয়ারশেলের মাধ্যমে। শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলোতে পুলিশি হামলা ছিল রুটিন ওয়ার্ক, আর সাধারণ মানুষ—নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি। ছাত্র—জনতা, দিনমজুর, রিকশাচালক, দোকানদার; যারা শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল, তাদের উপর নেমে আসে পাশবিক অত্যাচার।
প্রকাশ্য রাজপথে গুলি, অন্ধকার গলিতে ধরে নিয়ে পেটানো, রাতের অঁাধারে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে তুলে নিয়ে যাওয়া— এসব ছিল সে সময়ের নিত্যদিনের ভয়াল বাস্তবতা। বহু মানুষ গুম হয়, অনেকে পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্র নিজেই যেন এক ভয়ংকর দানবে পরিণত হয়েছিল, যে নিজের সন্তানদের রক্ত চুষে খাচ্ছিল। এই দমনপীড়নের রক্তাক্ত চিত্র আজও জনমনে শিহরণ জাগায়, আর প্রমাণ করে ফ্যাসিবাদ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না; জনতার ঐক্যই শেষ সত্য।
জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী বীর
জন্ম
মো: ওবাদুল হক ১৯৮৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের মিয়াটারী গ্রামে। নদী—খাল—বিল ও ফসলি জমিতে ঘেরা এই গ্রামটি ছিল তার শৈশবের খেলাঘর। আর প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই জীবনই তার চরিত্রে গেঁথে দেয় এক অনমনীয়তা ও মাটির ঘ্রাণ। প্রত্যন্ত এই জনপদের নীরবতাই যেন গড়ে তোলে এক সংগ্রামী চেতনার বীজ, যার পরিণত রূপ আমরা দেখতে পাই তার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে।
পারিবারিক জীবন
ওবাদুল হকের পিতা ছিলেন মৃত আছান আলী, একজন সৎ, নির্লোভ কৃষক। যিনি নিজের পরিশ্রম ও মাটির প্রতি ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি হাল ছাড়েননি, রেখে গেছেন সততার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তার মা, সুপিয়া বেগম (৬০), একজন আদর্শ গৃহিণী— যিনি সন্তানদের জন্য ছিলেন ভালোবাসার আশ্রয়, সাহসের উৎস ও নৈতিকতার বাতিঘর। মায়ের আদর্শ ও স্নেহে গড়ে উঠেছে ওবাদুল হকের আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্ববোধ।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল পিতা। তার দুই সন্তান—বড় ছেলে মেহেদী হাসান (৯), যিনি বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং ছোট ছেলে মিরাজ হোসেন (৭), প্রথম শ্রেণির ছাত্র—এই দুই সন্তানই তার জীবনের আলোকস্তম্ভ।
কর্মজীবন
দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রামে মো: ওবাদুল হক একজন সিএনজি চালক হিসেবে কাজ করে আসছেন। শহরের কোলাহল আর গ্রাম্য হাহাকারের মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের প্রতিটি দিন হাল ধরে রেখেছেন সততার। তার পেশা কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি তার আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি। সমাজের চোখে এক ‘সাধারণ চালক’, কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক পথযাত্রী— যিনি নিজের শ্রম দিয়ে পরিবারকে আগলে রেখেছেন, তেমনি দেশের সংকটকালে বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন।
সংগ্রামী জীবন
ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের এক অন্ধকার সময় যখন দেশের বাতাসে ভয়ের বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন হাজারো মানুষের মতো নয় বরং হাজারো মানুষকে পথ দেখিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন মো: ওবাদুল হক। জীবনের ঝুঁকি নিতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি; স্বৈরাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বুক চিতিয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন, এদেশ শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং এটা ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের স্থান। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মানসিকতা— আজকে এবং আগামী দিনের প্রজন্মের জন্য অনন্ত প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
মো: ওবাদুল হক শুধু একজন সিএনজি চালক নন; তিনি একজন সময়ের নায়ক, একজন নির্ভীক সৈনিক, যিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সংগ্রাম করে গেছেন, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এবং দেশের স্বাধীনতার পক্ষে। তার জীবনকাহিনী প্রমাণ করে, বীরত্ব কোনো পরিচয়ে জন্মায় না, জন্মায় মননে, বিশ্বাসে, আর সংকটে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার জবানীতে শুনুন
আমি মো: ওবাদুল হক। একজন সিএনজি ড্রাইভার। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমি শুধু একজন চালক ছিলাম না; ছিলাম এই জাতির লাঞ্ছিত মানুষের কণ্ঠ, ছিলাম রাজপথে দাঁড়ানো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী। পরপর চার দিন আমি আন্দোলনে শরিক হই। দেশের জন্য, মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য নিজের পরিবার, জীবিকা সব কিছু পিছনে ফেলে রাস্তায় দাঁড়াই। ঘটনাটি ৫ আগস্টের আগের দিন ৪ আগস্ট দিনে। আমরা বনশ্রী এলাকায় অবস্থান করছিলাম। বিকেলবেলা হঠাৎ করেই পুলিশ অতর্কিতে আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা চালায়। কোনো ঘোষণা ছিল না, কোনো সতর্কবার্তা ছিল না; ছিল শুধু গুলির বিকট শব্দ আর মানুষের আর্তনাদ।
একটি গুলি আমার ডান হাতে, কাঁধ বরাবর এসে বিদ্ধ হয়। আমি তখন তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও যেন আরেক যুদ্ধ অপেক্ষা করছিল আমার জন্য।
ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হলেও চিকিৎসা শুধু নামমাত্রই হয়েছে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসা কর্মীরা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। তারা যেন আমাদের শত্রু মনে করত। আহত একজন নাগরিক হিসেবে নয়, তারা আমাকে দেখেছে যেন আমি অপরাধী! এই নির্মমতা, এই অবহেলা—সবই ছিল আওয়ামী শাসনের সেই হিংস্র রূপ, যা আন্দোলনকারীদের শুধু রাজপথে নয়, হাসপাতালের বেডেও নিস্তার দেয়নি। আমার জীবন, আমার শরীর আজও সেই দাগ বহন করছে। গুলির চিহ্ন শুধু একটি ক্ষত নয়, তা আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের এক রক্তাক্ত দলিল। আমি লড়েছি, আজও লড়ছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে, অন্যায় আর জুলুমের দিন শেষ হবেই।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। এই ক্ষত শুধু রক্ত—মাংসের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দমন—পীড়নের জীবন্ত দলিল—যা আমার শরীরে গেঁথে আছে। যেদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে আমি আহত হই, সেদিন থেকে আমার জীবনের ধারা পাল্টে যায়। গুলিটি আমার ডান কাঁধে বিদ্ধ হয়। সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তড়িঘড়ি করে আমাকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে নেয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে আমার শরীরে দু’টি অপারেশন করা হয়। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল যন্ত্রণায় ভরা, প্রতিটি নিঃশ্বাস ছিল অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। অপারেশনের পর দীর্ঘ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে আমাকে সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল)—এ স্থানান্তর করা হয়, যেখানে আমি প্রায় এক মাস ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করি। ওই সময় চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াইও চালিয়ে গেছি। কেবল শরীর নয়, আমার মনও ছিল আঘাতপ্রাপ্ত—একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিককে লক্ষ্য করে গুলি চালায়,তখন সেই ক্ষত শুধু শারীরিক হয় না, আত্মাকেও বিদ্ধ করে।
আজও আমি সেই ফ্যাসিবাদী আক্রমণের যন্ত্রণা অনুভব করি। আমার চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা এসেছে, ডান হাতে শক্তি আগের মতো নেই। কিন্তু সে ব্যথাও আমাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং এ ক্ষত আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—আমি একটি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলেছিলাম ‘না’।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: সিএনজি চালক
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: ওবাদুল হক
জন্ম তারিখ : ০৩-০২-১৯৮৫
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : সিএনজি চালক
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মিয়াটারী, ইউনিয়ন: কাশিপুর, থানা: ফুলবাড়ি, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মরহুম মো: আছান আলী
মায়ের নাম : মোছা: সুপিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬০
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মেহেদী হাসান, বয়স: ৯, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ছেলে
১. মিরাজ হাসান, বয়স: ৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার, রামপুরা, বনশ্রী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪, বিকাল চারটা
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল একদিকে স্বৈরাচার বিরোধী জনতার গর্জন, অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতম দমন—পীড়নের রক্তাক্ত অধ্যায়। সে সময় আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী যেন জনতার মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল লাঠি, বুলেট আর টিয়ারশেলের মাধ্যমে। শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলোতে পুলিশি হামলা ছিল রুটিন ওয়ার্ক, আর সাধারণ মানুষ—নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি। ছাত্র—জনতা, দিনমজুর, রিকশাচালক, দোকানদার; যারা শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল, তাদের উপর নেমে আসে পাশবিক অত্যাচার।
প্রকাশ্য রাজপথে গুলি, অন্ধকার গলিতে ধরে নিয়ে পেটানো, রাতের অঁাধারে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে তুলে নিয়ে যাওয়া— এসব ছিল সে সময়ের নিত্যদিনের ভয়াল বাস্তবতা। বহু মানুষ গুম হয়, অনেকে পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্র নিজেই যেন এক ভয়ংকর দানবে পরিণত হয়েছিল, যে নিজের সন্তানদের রক্ত চুষে খাচ্ছিল। এই দমনপীড়নের রক্তাক্ত চিত্র আজও জনমনে শিহরণ জাগায়, আর প্রমাণ করে ফ্যাসিবাদ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না; জনতার ঐক্যই শেষ সত্য।
জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী বীর
জন্ম
মো: ওবাদুল হক ১৯৮৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের মিয়াটারী গ্রামে। নদী—খাল—বিল ও ফসলি জমিতে ঘেরা এই গ্রামটি ছিল তার শৈশবের খেলাঘর। আর প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই জীবনই তার চরিত্রে গেঁথে দেয় এক অনমনীয়তা ও মাটির ঘ্রাণ। প্রত্যন্ত এই জনপদের নীরবতাই যেন গড়ে তোলে এক সংগ্রামী চেতনার বীজ, যার পরিণত রূপ আমরা দেখতে পাই তার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে।
পারিবারিক জীবন
ওবাদুল হকের পিতা ছিলেন মৃত আছান আলী, একজন সৎ, নির্লোভ কৃষক। যিনি নিজের পরিশ্রম ও মাটির প্রতি ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি হাল ছাড়েননি, রেখে গেছেন সততার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তার মা, সুপিয়া বেগম (৬০), একজন আদর্শ গৃহিণী— যিনি সন্তানদের জন্য ছিলেন ভালোবাসার আশ্রয়, সাহসের উৎস ও নৈতিকতার বাতিঘর। মায়ের আদর্শ ও স্নেহে গড়ে উঠেছে ওবাদুল হকের আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্ববোধ।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল পিতা। তার দুই সন্তান—বড় ছেলে মেহেদী হাসান (৯), যিনি বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং ছোট ছেলে মিরাজ হোসেন (৭), প্রথম শ্রেণির ছাত্র—এই দুই সন্তানই তার জীবনের আলোকস্তম্ভ।
কর্মজীবন
দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রামে মো: ওবাদুল হক একজন সিএনজি চালক হিসেবে কাজ করে আসছেন। শহরের কোলাহল আর গ্রাম্য হাহাকারের মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের প্রতিটি দিন হাল ধরে রেখেছেন সততার। তার পেশা কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি তার আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি। সমাজের চোখে এক ‘সাধারণ চালক’, কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক পথযাত্রী— যিনি নিজের শ্রম দিয়ে পরিবারকে আগলে রেখেছেন, তেমনি দেশের সংকটকালে বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন।
সংগ্রামী জীবন
ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়নের এক অন্ধকার সময় যখন দেশের বাতাসে ভয়ের বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন হাজারো মানুষের মতো নয় বরং হাজারো মানুষকে পথ দেখিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন মো: ওবাদুল হক। জীবনের ঝুঁকি নিতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি; স্বৈরাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বুক চিতিয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন, এদেশ শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং এটা ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের স্থান। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মানসিকতা— আজকে এবং আগামী দিনের প্রজন্মের জন্য অনন্ত প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
মো: ওবাদুল হক শুধু একজন সিএনজি চালক নন; তিনি একজন সময়ের নায়ক, একজন নির্ভীক সৈনিক, যিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সংগ্রাম করে গেছেন, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এবং দেশের স্বাধীনতার পক্ষে। তার জীবনকাহিনী প্রমাণ করে, বীরত্ব কোনো পরিচয়ে জন্মায় না, জন্মায় মননে, বিশ্বাসে, আর সংকটে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
জুলাই যোদ্ধার জবানীতে শুনুন
আমি মো: ওবাদুল হক। একজন সিএনজি ড্রাইভার। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমি শুধু একজন চালক ছিলাম না; ছিলাম এই জাতির লাঞ্ছিত মানুষের কণ্ঠ, ছিলাম রাজপথে দাঁড়ানো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী। পরপর চার দিন আমি আন্দোলনে শরিক হই। দেশের জন্য, মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য নিজের পরিবার, জীবিকা সব কিছু পিছনে ফেলে রাস্তায় দাঁড়াই। ঘটনাটি ৫ আগস্টের আগের দিন ৪ আগস্ট দিনে। আমরা বনশ্রী এলাকায় অবস্থান করছিলাম। বিকেলবেলা হঠাৎ করেই পুলিশ অতর্কিতে আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা চালায়। কোনো ঘোষণা ছিল না, কোনো সতর্কবার্তা ছিল না; ছিল শুধু গুলির বিকট শব্দ আর মানুষের আর্তনাদ।
একটি গুলি আমার ডান হাতে, কাঁধ বরাবর এসে বিদ্ধ হয়। আমি তখন তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও যেন আরেক যুদ্ধ অপেক্ষা করছিল আমার জন্য।
ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হলেও চিকিৎসা শুধু নামমাত্রই হয়েছে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসা কর্মীরা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। তারা যেন আমাদের শত্রু মনে করত। আহত একজন নাগরিক হিসেবে নয়, তারা আমাকে দেখেছে যেন আমি অপরাধী! এই নির্মমতা, এই অবহেলা—সবই ছিল আওয়ামী শাসনের সেই হিংস্র রূপ, যা আন্দোলনকারীদের শুধু রাজপথে নয়, হাসপাতালের বেডেও নিস্তার দেয়নি। আমার জীবন, আমার শরীর আজও সেই দাগ বহন করছে। গুলির চিহ্ন শুধু একটি ক্ষত নয়, তা আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের এক রক্তাক্ত দলিল। আমি লড়েছি, আজও লড়ছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে, অন্যায় আর জুলুমের দিন শেষ হবেই।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। এই ক্ষত শুধু রক্ত—মাংসের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দমন—পীড়নের জীবন্ত দলিল—যা আমার শরীরে গেঁথে আছে। যেদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে আমি আহত হই, সেদিন থেকে আমার জীবনের ধারা পাল্টে যায়। গুলিটি আমার ডান কাঁধে বিদ্ধ হয়। সহযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তড়িঘড়ি করে আমাকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে নেয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে আমার শরীরে দু’টি অপারেশন করা হয়। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল যন্ত্রণায় ভরা, প্রতিটি নিঃশ্বাস ছিল অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। অপারেশনের পর দীর্ঘ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে আমাকে সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল)—এ স্থানান্তর করা হয়, যেখানে আমি প্রায় এক মাস ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করি। ওই সময় চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াইও চালিয়ে গেছি। কেবল শরীর নয়, আমার মনও ছিল আঘাতপ্রাপ্ত—একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিককে লক্ষ্য করে গুলি চালায়,তখন সেই ক্ষত শুধু শারীরিক হয় না, আত্মাকেও বিদ্ধ করে।
আজও আমি সেই ফ্যাসিবাদী আক্রমণের যন্ত্রণা অনুভব করি। আমার চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা এসেছে, ডান হাতে শক্তি আগের মতো নেই। কিন্তু সে ব্যথাও আমাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং এ ক্ষত আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—আমি একটি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলেছিলাম ‘না’।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: সিএনজি চালক
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: ওবাদুল হক
জন্ম তারিখ : ০৩-০২-১৯৮৫
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : সিএনজি চালক
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মিয়াটারী, ইউনিয়ন: কাশিপুর, থানা: ফুলবাড়ি, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মরহুম মো: আছান আলী
মায়ের নাম : মোছা: সুপিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬০
মাসিক আয় : ২০,০০০
আয়ের উৎস : ড্রাইভিং
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মেহেদী হাসান, বয়স: ৯, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ছেলে
১. মিরাজ হাসান, বয়স: ৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার, রামপুরা, বনশ্রী
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪, বিকাল চারটা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍