মোছা: স্বপ্না আক্তার
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রীদের প্রতি ছাত্রলীগের পাশবিক ও বর্বর নির্যাতন
জুলাই ২০২৪—এর আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না, ছিল মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার এক সংগ্রাম। কিন্তু এই ন্যায্য আন্দোলনের সময় নারীদের উপর যা ঘটেছে,তা সভ্যতা ও মানবতাকে লজ্জায় ডুবিয়েছে। ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা যেভাবে ছাত্রীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, রাস্তায় ফেলে উপর্যুপরি আঘাত করে, চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে তাদের শরীর ও মানসিকতায় যে পৈশাচিকতা চালায় তা এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে থাকবে ইতিহাসে। কোনো নারীকে মানুষ হিসেবে নয় যেন শত্রুর বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কাপুরুষের মতো দল বেঁধে হামলা চালিয়ে নারীদের কান্না, রক্ত আর আর্তনাদকে তারা গর্ব ভেবে উদযাপন করে। এই পাশবিকতা কেবল রাজনৈতিক দমন নয়, এটি নারীর অস্তিত্বের উপর এক ঘৃণ্য আঘাত—যার জবাব ইতিহাস একদিন নির্মমভাবেই দেবে।
জুলাই আন্দোলনের এক মহীয়সী বীরাঙ্গনা
জন্ম
মোছা: স্বপ্না আক্তার ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝার ইউনিয়নের খামার আন্ধারীঝার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এক নদীঘেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই জনপদে জন্ম নেয়া স্বপ্নার শৈশব কেটেছে প্রকৃতির কোলে, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও এক দৃঢ়চিত্ত মানস গড়ে ওঠে তাঁর মধ্যে।
পারিবারিক জীবন
স্বপ্নার পিতা ছলিম উদ্দীন একজন সাধারণ কৃষক, যিনি সারা জীবন মাটির সঙ্গে লড়াই করে পরিবার চালিয়েছেন এবং সন্তানদের জন্য সততা ও কঠোর পরিশ্রমের একটি শক্ত ভিত্ তৈরি করে গেছেন। তাঁর মা হাজেরা বেগম একজন পরিশ্রমী ও মমতাময়ী গৃহিণী, যিনি সন্তানদের নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের বীজ বপন করেছেন। তারা ২ ভাই ২ বোন, বড় বোন শিরিনা বেগম (৩৩) তিনি একজন গৃহিণী, বড় ভাই মো: হাফিজুর রহমান (২৯) তিনি একজন চাকরিজীবী এবং তৃতীয় ভাই হারুন অর রশিদ (২৭) তিনিও একজন চাকরিজীবী। এই পরিবারিক পরিমণ্ডলে স্বপ্নার চারিত্রিক গুণাবলি গড়ে ওঠে, যা তাঁকে পরিণত করে একজন প্রতিবাদী নারীতে।
কর্মজীবন
শিক্ষা জীবনে মোছা: স্বপ্না আক্তার মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী ছিলেন। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবতেন এবং ছোটবেলা থেকেই ন্যায়ের প্রতি তাঁর এক অটুট অবস্থান তৈরি হয়। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই নয়, বরং সমাজের অসঙ্গতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেই তিনি ছাত্রজীবন কাটিয়েছেন।
সংগ্রামী জীবন
স্বপ্না আক্তারের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন দেশের রাজপথে নামে ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়ন। এই ভয় ও নির্যাতনের সময়েও তিনি মুখ ফিরিয়ে নেননি; বরং বুক চিতিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের কর্তব্য হিসেবে দেখেছেন। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মনোভাব তাঁকে পরিণত করে এক মহীয়সী বীরাঙ্গনায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, নারীরা শুধু ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা দেশ ও সমাজের জন্যও লড়তে জানে। তাঁর সংগ্রামী পথচলা আগামী প্রজন্মের কাছে একটি আলোকবর্তিকার মতোই প্রেরণাদায়ী হয়ে থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : জুলাই আন্দোলনের এক মহীয়সী বীরাঙ্গনার জবানীতে শুনুন; আমার দগদগে স্মৃতি
আমি, স্বপ্না আক্তার, দেশের স্বার্থে, মানুষের অধিকারের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজপথে নেমেছিলাম। আগস্টের ৪ তারিখ, আমরা কয়েকজন সহযোদ্ধা মিলে কুড়িগ্রামের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিই। ভেবেছিলাম, রাষ্ট্র হয়তো আমাদের কণ্ঠ শুনবে—আমাদের প্রতিবাদ বুঝবে। কিন্তু হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগের লাঠিয়াল বাহিনী।
আমি একজন নারী, অথচ কোনো মানবিকতা তাদের স্পর্শ করেনি। পশুরাও যেমন ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে শিকারকে, তেমনিভাবে আমাকে রাস্তায় ফেলে উপর্যুপরি লাথি, ঘুষি আর লাঠির আঘাতে মেরে চলে ওরা। আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল কেউ কেউ। আমি ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম, চোখে অন্ধকার নেমে এসেছিল; তবু ভেতরের আগুন নিভে যায়নি। আমার সহযোদ্ধারা দৌড়ে এসে আমাকে উদ্ধার করে। আমি তখনো বুঝতে পারছিলাম, এটি শুধু আমার ওপর হামলা নয়; বিবেক ও মানবতার উপর নির্মম আঘাত। ছাত্রলীগের সেই পৈশাচিক নির্যাতনের দগদগে ক্ষত আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। আমার শরীরের প্রতিটি যন্ত্রণা, প্রতিটি দাগ আজও চিৎকার করে বলে—স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে মাথা নত করিনি, করবও না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। ০৪ আগস্ট ২০২৪ ছাত্রলীগের সেই পৈশাচিক হামলার পর আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর জখম হয়, আমাকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়,ক্ষতস্থানে সেলাই করা হয়, ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সাময়িকভাবে ব্যথা কমানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বর ও দুর্বলতা দেখা দিলে, ১০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সে সময়ে টানা সাত দিন হাসপাতালে থাকা হয়, ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে থাকি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও চিকিৎসা শেষ হয়নি। প্রায় দুই মাস ধরে নিয়মিত ঔষধ সেবন করেছি। কিন্তু সে নির্যাতনের ক্ষত শুধু শরীরেই নয়, মানসিকভাবেও গভীর দাগ কেটে গেছে। এখনো মাঝে মাঝে শরীর অসার হয়ে আসে,ব্যথা চেপে ধরে হাড়—মাংসে। ঘুম ভেঙে যায় আতঙ্কে, মনে হয় ছাত্রলীগের সেই নরপিশাচেরা আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই শরীর যেন ফ্যাসিবাদের এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে— যার প্রতিটি যন্ত্রণা বলে দেয়, কীভাবে একটি স্বৈরশাসক তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নারীদেরকেও নির্মমভাবে আঘাত করতে দ্বিধা করে না। আমি আজও লড়ছি—শুধু রাজপথে নয়, নিজের শরীর ও মনে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
শিক্ষার্থী
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
ফ্যামিলির ভাইদেরকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা এবং তার পড়াশুনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা, যাতে তার স্বপ্ন অনুসারে পড়াশুনা করে ভালো ক্যারিয়ার অর্জন করতে পারে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোছা: স্বপ্না আক্তার
জন্ম তারিখ : ০৮—১০—২০০৪
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ
নিজ জেলা : কুড়িগ্রাম
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: খামার আন্ধারীঝার, ইউনিয়ন: আন্ধারীঝার, থানা: ভূরুঙ্গামারী, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: ছলিম ঊদ্দীন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৬২
মায়ের নাম : মোছা: হাজেরা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫২
মাসিক আয় : ৫,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ির বিবরণ : টিনের ঘর
সম্পদের পরিমাণ : ৩০ শতক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. মোছা: শিরিনা বেগম, বয়স: ৩৩, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
২. মো: হাফিজুর রহমান, বয়স: ২৯ পেশা: চালক, সম্পর্ক: ভাই
৩. হারুন অর রশিদ, বয়স: ২৭, পেশা: চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : শাপলা চত্বর, কুড়িগ্রাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১.৩৫ মিনিট
জুলাই ২০২৪—এর আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না, ছিল মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার এক সংগ্রাম। কিন্তু এই ন্যায্য আন্দোলনের সময় নারীদের উপর যা ঘটেছে,তা সভ্যতা ও মানবতাকে লজ্জায় ডুবিয়েছে। ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা যেভাবে ছাত্রীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, রাস্তায় ফেলে উপর্যুপরি আঘাত করে, চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে তাদের শরীর ও মানসিকতায় যে পৈশাচিকতা চালায় তা এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে থাকবে ইতিহাসে। কোনো নারীকে মানুষ হিসেবে নয় যেন শত্রুর বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কাপুরুষের মতো দল বেঁধে হামলা চালিয়ে নারীদের কান্না, রক্ত আর আর্তনাদকে তারা গর্ব ভেবে উদযাপন করে। এই পাশবিকতা কেবল রাজনৈতিক দমন নয়, এটি নারীর অস্তিত্বের উপর এক ঘৃণ্য আঘাত—যার জবাব ইতিহাস একদিন নির্মমভাবেই দেবে।
জুলাই আন্দোলনের এক মহীয়সী বীরাঙ্গনা
জন্ম
মোছা: স্বপ্না আক্তার ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝার ইউনিয়নের খামার আন্ধারীঝার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এক নদীঘেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই জনপদে জন্ম নেয়া স্বপ্নার শৈশব কেটেছে প্রকৃতির কোলে, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও এক দৃঢ়চিত্ত মানস গড়ে ওঠে তাঁর মধ্যে।
পারিবারিক জীবন
স্বপ্নার পিতা ছলিম উদ্দীন একজন সাধারণ কৃষক, যিনি সারা জীবন মাটির সঙ্গে লড়াই করে পরিবার চালিয়েছেন এবং সন্তানদের জন্য সততা ও কঠোর পরিশ্রমের একটি শক্ত ভিত্ তৈরি করে গেছেন। তাঁর মা হাজেরা বেগম একজন পরিশ্রমী ও মমতাময়ী গৃহিণী, যিনি সন্তানদের নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের বীজ বপন করেছেন। তারা ২ ভাই ২ বোন, বড় বোন শিরিনা বেগম (৩৩) তিনি একজন গৃহিণী, বড় ভাই মো: হাফিজুর রহমান (২৯) তিনি একজন চাকরিজীবী এবং তৃতীয় ভাই হারুন অর রশিদ (২৭) তিনিও একজন চাকরিজীবী। এই পরিবারিক পরিমণ্ডলে স্বপ্নার চারিত্রিক গুণাবলি গড়ে ওঠে, যা তাঁকে পরিণত করে একজন প্রতিবাদী নারীতে।
কর্মজীবন
শিক্ষা জীবনে মোছা: স্বপ্না আক্তার মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী ছিলেন। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবতেন এবং ছোটবেলা থেকেই ন্যায়ের প্রতি তাঁর এক অটুট অবস্থান তৈরি হয়। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই নয়, বরং সমাজের অসঙ্গতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেই তিনি ছাত্রজীবন কাটিয়েছেন।
সংগ্রামী জীবন
স্বপ্না আক্তারের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন দেশের রাজপথে নামে ফ্যাসিবাদী দমন—পীড়ন। এই ভয় ও নির্যাতনের সময়েও তিনি মুখ ফিরিয়ে নেননি; বরং বুক চিতিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের কর্তব্য হিসেবে দেখেছেন। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মনোভাব তাঁকে পরিণত করে এক মহীয়সী বীরাঙ্গনায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, নারীরা শুধু ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা দেশ ও সমাজের জন্যও লড়তে জানে। তাঁর সংগ্রামী পথচলা আগামী প্রজন্মের কাছে একটি আলোকবর্তিকার মতোই প্রেরণাদায়ী হয়ে থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ : জুলাই আন্দোলনের এক মহীয়সী বীরাঙ্গনার জবানীতে শুনুন; আমার দগদগে স্মৃতি
আমি, স্বপ্না আক্তার, দেশের স্বার্থে, মানুষের অধিকারের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজপথে নেমেছিলাম। আগস্টের ৪ তারিখ, আমরা কয়েকজন সহযোদ্ধা মিলে কুড়িগ্রামের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিই। ভেবেছিলাম, রাষ্ট্র হয়তো আমাদের কণ্ঠ শুনবে—আমাদের প্রতিবাদ বুঝবে। কিন্তু হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগের লাঠিয়াল বাহিনী।
আমি একজন নারী, অথচ কোনো মানবিকতা তাদের স্পর্শ করেনি। পশুরাও যেমন ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে শিকারকে, তেমনিভাবে আমাকে রাস্তায় ফেলে উপর্যুপরি লাথি, ঘুষি আর লাঠির আঘাতে মেরে চলে ওরা। আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল কেউ কেউ। আমি ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম, চোখে অন্ধকার নেমে এসেছিল; তবু ভেতরের আগুন নিভে যায়নি। আমার সহযোদ্ধারা দৌড়ে এসে আমাকে উদ্ধার করে। আমি তখনো বুঝতে পারছিলাম, এটি শুধু আমার ওপর হামলা নয়; বিবেক ও মানবতার উপর নির্মম আঘাত। ছাত্রলীগের সেই পৈশাচিক নির্যাতনের দগদগে ক্ষত আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। আমার শরীরের প্রতিটি যন্ত্রণা, প্রতিটি দাগ আজও চিৎকার করে বলে—স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে মাথা নত করিনি, করবও না।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
আমি এখনও শরীরে ফ্যাসিবাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। ০৪ আগস্ট ২০২৪ ছাত্রলীগের সেই পৈশাচিক হামলার পর আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর জখম হয়, আমাকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়,ক্ষতস্থানে সেলাই করা হয়, ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সাময়িকভাবে ব্যথা কমানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বর ও দুর্বলতা দেখা দিলে, ১০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সে সময়ে টানা সাত দিন হাসপাতালে থাকা হয়, ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে থাকি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও চিকিৎসা শেষ হয়নি। প্রায় দুই মাস ধরে নিয়মিত ঔষধ সেবন করেছি। কিন্তু সে নির্যাতনের ক্ষত শুধু শরীরেই নয়, মানসিকভাবেও গভীর দাগ কেটে গেছে। এখনো মাঝে মাঝে শরীর অসার হয়ে আসে,ব্যথা চেপে ধরে হাড়—মাংসে। ঘুম ভেঙে যায় আতঙ্কে, মনে হয় ছাত্রলীগের সেই নরপিশাচেরা আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই শরীর যেন ফ্যাসিবাদের এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে— যার প্রতিটি যন্ত্রণা বলে দেয়, কীভাবে একটি স্বৈরশাসক তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নারীদেরকেও নির্মমভাবে আঘাত করতে দ্বিধা করে না। আমি আজও লড়ছি—শুধু রাজপথে নয়, নিজের শরীর ও মনে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন
শিক্ষার্থী
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
ফ্যামিলির ভাইদেরকে স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা এবং তার পড়াশুনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা, যাতে তার স্বপ্ন অনুসারে পড়াশুনা করে ভালো ক্যারিয়ার অর্জন করতে পারে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোছা: স্বপ্না আক্তার
জন্ম তারিখ : ০৮—১০—২০০৪
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ
নিজ জেলা : কুড়িগ্রাম
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: খামার আন্ধারীঝার, ইউনিয়ন: আন্ধারীঝার, থানা: ভূরুঙ্গামারী, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: ছলিম ঊদ্দীন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৬২
মায়ের নাম : মোছা: হাজেরা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫২
মাসিক আয় : ৫,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ির বিবরণ : টিনের ঘর
সম্পদের পরিমাণ : ৩০ শতক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. মোছা: শিরিনা বেগম, বয়স: ৩৩, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: বোন
২. মো: হাফিজুর রহমান, বয়স: ২৯ পেশা: চালক, সম্পর্ক: ভাই
৩. হারুন অর রশিদ, বয়স: ২৭, পেশা: চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : শাপলা চত্বর, কুড়িগ্রাম
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১.৩৫ মিনিট
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍