হোম / আহতদের তালিকা / ইউছুপ আলী
ইউছুপ আলী

ইউছুপ আলী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

১৯৮৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুরের রুদ্ররামপুরের জন্ম নেওয়া ইউছুপ আলী বড় হয়েছেন দরিদ্রতার মাঝেও মূল্যবোধে গড়া এক সাদামাটা পরিবারে। অল্প বয়সে জীবিকার টানে শহরে এসে গার্মেন্টস দোকানের শ্রমজীবী মানুষের জীবনেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের সম্মান, দায়িত্ব ও পরিবারের জন্য বাঁচার অর্থ। ২০২৪ সালের আগস্টে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার কর্মব্যস্ত জীবন থেমে গেলেও থামেনি তার পরিবারকে আঁকড়ে ধরার দৃঢ়তা। দীর্ঘ চিকিৎসা-যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা আর অভাবের মধ্যেও তিনি আজও দাঁড়িয়ে আছেন অটল হয়ে। যিনি বিশ্বাস করেন আঘাতে মানুষ ভেঙে যায় না, বরং বাঁচতেস শিখায় নতুন করে।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মুগদা মেডিকেল কলেজের অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের ডা. এ বি এম জাকির উদ্দিন তাঁকে চিকিৎসা না দিয়ে হুমকি দেয়- এখান থেকে বেরিয়ে যাও!
ইউছুপ আলী
ক্রমিক: ০২৩
আইডি: ঢাকা সিটি ০২৩
জন্ম
ইউছুপ আলী ১৯৮৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার রুদ্ররামপুর ইউনিয়নের মধ্য বাদুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মৃত খোরশেদ, যিনি জীবদ্দশায় কৃষিকাজ করতেন। মা আফিয়া বেগম, বয়স ৬৫, একজন গৃহিণী। ছোটবেলা কেটেছে মাটির ঘরে, কষ্টে গড়া সংসারে। শিক্ষা জীবন বেশিদূর এগোয়নি, কারণ দরিদ্র পরিবারে জীবিকার তাগিদে তাঁকে অল্প বয়সেই কাজের সন্ধানে শহরমুখী হতে হয়। তবে জীবনের প্রতিটি বাঁকে সংগ্রামই ছিল তাঁর একমাত্র সঙ্গী। গ্রাম্য পরিবেশের সৌজন্য, সরলতা আর নৈতিকতা ইউসুফকে গড়ে তোলে দায়িত্ববান মাটির মানুষ হিসেবে। বয়স বাড়লেও তিনি কখনো আত্মমর্যাদা হারাননি। বরং দারিদ্র্যকে জয় করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।
কর্ম
ইউসুপ ঢাকায় এসে এক গার্মেন্টস দোকানে চাকরি নেন। বেতন কম হলেও সংসার চালাতে যথেষ্ট ছিল। মাসে ১৫,০০০ টাকা আয় করে তিনি পরিবারের পাঁচ সদস্যকে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখতেন। তাঁর স্ত্রী, ছোট দুই সন্তান এবং বৃদ্ধা মা। এই মানুষগুলোর মুখে হাসি রাখতে তিনিই ছিলেন একমাত্র ভরসা। পোশাক দোকানে কাজ করলেও তিনি কখনো শ্রমিক পরিচয়ে লজ্জা পাননি। বরং শ্রমিক জীবনের গৌরব ও সম্মান তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন। দোকানের কাজ, মাল উত্তোলন, বিক্রি সবই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন। ক্রেতাদের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলা, সময়মতো দোকান খোলা ও বন্ধ করা এই একঘেঁয়েমি জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক নির্লোভ যোদ্ধার গল্প। কিন্তু ৫ আগস্টের সে গুলির পর সেই জীবন আজ আর নেই।
পারিবারিক বর্ণনা
ইউছুপের পরিবার বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর স্ত্রী একজন নিরহংকারী গৃহিণী, যিনি দু'টি সন্তানকে লালন পালনের পাশাপাশি মায়ের সেবাতেও সময় দেন। বড় মেয়ে ইশরাত জাহান এখন রামগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণির ছাত্রী, বয়স ৯ বছর। সে একজন মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের শিশু। ছোট ছেলে ফাহিমের বয়স মাত্র ৫ বছর। সে এখনও পুরোপুরি কথা বলা শেখেনি। পরিবারের বাড়িটি পাকা হলেও আর্থিক নিরাপত্তা নেই। বাবার মৃত্যুর পর মাও বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন, তিনিও এখন কারো ওপর নির্ভরশীল। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ইউছুপ এখন গুলিবিদ্ধ ও কর্মহীন। এমন অবস্থায় পরিবারের প্রতিটি দিন যেন এক দুর্বিষহ যুদ্ধ। চিকিৎসা খরচ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা সবকিছুই থমকে গেছে অভাব আর বেদনার ধাক্কায়।
২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। দেশের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী,
শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে বৈষম্য দূরীকরণ ও
গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের
স্বৈরাচারী আচরণ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও প্রশাসনিক বৈষম্যের
বিরুদ্ধে জনমনে সঞ্চিত ক্ষোভ রূপ নেয় এক আন্দোলনের ঝড়ে।
ইউসুপ, একজন শ্রমিক হয়েও বুঝতে পেরেছিলেন এই আন্দোলন
তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার আন্দোলন। তাই চাকরির ফাঁকে
বন্ধুবান্ধব নিয়ে তিনি মিছিলে অংশ নিতে থাকেন। দমন-পীড়নের
ভেতরেও দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শুরু করে রাজধানীর
অলিগলিতে প্রতিদিনের মিছিল, প্রতিবাদ চালিয়ে যান সাধারণ
মানুষ। অবশেষে ৫ আগস্ট সরকারের পতনের খবরে সমগ্র দেশ
জেগে ওঠে বিজয়ের আনন্দে।
আন্দোলনে যোগদান
৫ আগস্ট ২০২৪। একটি ঐতিহাসিক দিন। এ দিনে সরকার পতনের ঘোষণা আসে। সারা দেশে বিজয়ের আনন্দে মিছিল শুরু হয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ী অঞ্চলেও সাধারণ জনগণ বিজয়ের আনন্দে অংশ নেয়। ইউসুফ, সেই আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র সৈনিক, বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে বিজয় মিছিলে যোগ দেন বিবির বাগিচা ১ নম্বর গেট এলাকায়। হঠাৎ যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশবাহিনী বিজয় মিছিল লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। ইউসুফের পায়ে ছোড়া গুলি লাগে। ব্যথায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। সে মুহূর্তেই সঙ্গী প্রতিবাদীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু এরপর যা ঘটে তা স্বাধীন দেশেও কল্পনাতীত।
আহত পরবর্তী জীবন
মুগদা হাসপাতালে ভর্তি হলেও ইউসুফের প্রতি মানবিক আচরণ তো দূরের কথা, চিকিৎসাও পাননি। রক্তাক্ত অবস্থায় ২১ দিন শুয়ে ছিলেন বিনা চিকিৎসায়। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন। ডাক্তার জাকির নামে এক চিকিৎসক তাঁকে চিকিৎসা না করে ভয় দেখান। তিনি বলেন, "এখান থেকে বেরিয়ে যাও। চিকিৎসা দেয়া হবে না।" অবশেষে তাঁকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসা শুরু হলেও পরে আবার তাকে ছাড়িয়ে দেয়া হয়। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি এক পর্যায়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। চিকিৎসকদের কাছে বারবার বললেও কেউ মনোযোগ দেয়নি। বরং এক পর্যায়ে বলা হয় চিকিৎসা পেতে হলে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। একজন দরিদ্র শ্রমিকের পক্ষে এই অর্থ যোগাড় করা অসম্ভব। বারবার উপেক্ষিত হয়ে অবহেলিত হয়ে আজ তিনি শুধু আহতই নন, কর্মহীনও।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
ইউসুফের চিকিৎসা যেন এক দুঃস্বপ্ন। প্রথমে মুগদা মেডিকেলে গিয়েও চিকিৎসা না পেয়ে অপমানিত হন। পরে পঙ্গু হাসপাতালে কিছু চিকিৎসা শুরু হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। একজন সাধারণ মানুষের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা চিকিৎসাব্যবস্থার চরম অবক্ষয়ের পরিচায়ক। তাঁর পায়ের ভেতর এখনও ব্যথা, মাঝে মাঝে রক্ত পড়ে। ব্যথা কমাতে তিনি আজও ঔষধের ওপর নির্ভরশীল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪-৫ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে। নিজের অর্থ তো নয়, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার, এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ, আত্মীয়দের সহযোগিতায় চলছে চিকিৎসা। এমন এক যোদ্ধা, যিনি বিজয়ের মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন, তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের এ অবহেলা প্রশ্ন তোলে। এই দেশ কি সত্যিই সবার?
প্রস্তাবনা
১. সম্পূর্ণ চিকিৎসা খরচ সরকারি ভাবে বহন।
২. চাকরির সুযোগ বা মাসিক ভাতা প্রদান।
৩. সন্তানদের জন্য শিক্ষা সহায়তা ও বৃত্তি।
৪. রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় একটি বাসস্থান প্রদান করা হোক।
৫. মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. জাকির এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হোক।

এক নজরে ইউছুপ আলী
নাম: ইউছুপ আলী
জন্য তারিখ: ০২-০৯-১৯৮৮
জন্মস্থান: লক্ষ্মীপুর
পেশা: চাকরি (গার্মেন্টসের দোকানে), বর্তমানে চাকরিচ্যুত
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: মধ্য বাদুর, ইউনিয়ন: ৩ নং রুদ্ররামপুর, থানা: রামগঞ্জ, জেলা: লক্ষীপুর
বর্তমান ঠিকানা: বাসা: ২/২, কাজলা ব্রীজ, বালি মসজিদ সংলগ্ন, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
পিতার নাম: মৃত খোরশেদ আলম
মায়ের নাম: আফিয়া খাতুন
মাতার পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৬৫
পরিবারের সদস্য: ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
মেয়ে: ইশরাত জাহান, বয়স: ৯ বছর, ছাত্রী, ৩য় শ্রেণি, রামগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
ছেলে: মোঃ ফাহিম, বয়স: ৫ বছর
মাসিক আয়: ১৫,০০০
আয়ের উৎস: চাকরি
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল, ৪.৩০ মিনিট
আহত হওয়ার স্থান ও সময়: বিবির বাগিচা, ১ নং গেট সংলগ্ন, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ
আক্রমণের ধরণ : পায়ে গুলি

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍