মো: ফাহিম মিয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ছাত্র
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মোঃ ফাহিম মিয়া জন্মগ্রহণ করেছেন ০৮ সেপ্টেম্বর ২০০৫ সালে। তিনি রংপুরের লালমনিরহাটের সন্তান। তার বাবা এরশাদুল হক। মাতা ফাতেমা বেগম। তিনি লালমনিরহাট নেছারীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল ১ম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী।
ঘটনার বিবরণ
যখনই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে, তখনই তারা একদলীয় শাসনের ছক অঁাকে এবং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিণত করে একটি দমনযন্ত্রে যেখানে প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে আইন—শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, সাংবাদিকতা সবই হয়ে পড়ে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। এই নিপীড়নমূলক বাস্তবতার নির্মম শিকার হন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। তাদেরই একজন হলেন ফাহিম মিয়া, যিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলার নেছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। ফাহিম মিয়া ছিলেন একজন শান্তিপূর্ণ, কিন্তু দৃঢ়চেতা আন্দোলনকারী। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি নিয়মিতভাবে রাজপথে অংশগ্রহণ করতেন। ১৮ জুলাই, লালমনিরহাটের কালেক্টরেট চত্বরের সামনে ছাত্রদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছিল, যার অন্যতম সংগঠক ছিলেন ফাহিম। মিছিলটি মিশন মোড়ের দিকে এগিয়ে গেলে হঠাৎ করে পুলিশ অতর্কিতে আক্রমণ করে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। বৃষ্টির মতো নেমে আসা সেই গুলির একটিই এসে বিঁধে তার চোখে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু তার অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু ফাহিমের পরিবার ছিল চরম আর্থিক সঙ্কটে। দূরবর্তী রংপুরে নেয়ার মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে তারা স্থানীয় একটি হাসপাতালে সীমিত চিকিৎসা নেন। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে চোখের ক্ষতি রয়ে যায় স্থায়ীভাবে। এই চোখ হারানো শুধু তার দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনের বড় বাধা। চোখের সমস্যার কারণে বিভিন্ন চাকরির শারীরিক পরীক্ষায় বিশেষ করে ডিফেন্স, নিরাপত্তা বা সরকারি চাকরিতে তাকে “অযোগ্য” ঘোষণা করা হয়। একজন মেধাবী, প্রতিশ্রম্নতিশীল ছাত্র কেবল একটি গুলির আঘাতে রাষ্ট্রীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ফাহিম মিয়া এখন কেবল একজন আহত ছাত্র নয় তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর এক চোখের ক্ষত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এ দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলার, প্রতিবাদ জানানো ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কোনো নিরাপদ পরিসর আর অবশিষ্ট নেই। তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক, যাকে গুলি করে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল এক দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু তার গল্প থেমে যায়নি। সে এখন ইতিহাসের গায়ে লেখা একটি লাল দাগ, যা একদিন ন্যায়বিচারের সূচনা করবে।
যেভাবে আন্দোলন শুরু
যে আগুন এতদিন ছাইচাপা ছিল, তা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দাবানল হয়ে জ্বলে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয় আরেকটি গৌরবময়, রক্তাক্ত এবং আন্দোলনমুখর অধ্যায়। একপাক্ষিক নিয়োগ ব্যবস্থা, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, ক্ষমতার দম্ভ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়াবহ অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জেগে ওঠে ছাত্রসমাজ। তারা প্রশ্ন তোলে, মেধার কণ্ঠরোধ কেন? রাষ্ট্র কি শুধুই একটি দলের সম্পত্তি? জুলাইয়ের শুরুতেই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশের প্রতিটি কোণে। কোটাব্যবস্থার সংস্কার এবং মেধার মূল্যায়নের দাবিতে রাজপথে নামে দেশের সচেতন ছাত্রছাত্রী। ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের মধ্যেই ঢাকার রাজপথ, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। ঠিক সে সময় লালমনিরহাট সদর উপজেলার মিশন মোড়ে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলেন একজন তরুণ, সাহসী মাদ্রাসা ছাত্র ফাহিম মিয়া। তিনি নেছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। নির্ভীক, দায়িত্ববান এবং ন্যায়ের পক্ষে অটল এই তরুণ সে দিন কালেক্টরেট চত্বর থেকে মিছিল শুরু করে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জনতার কণ্ঠে। কিন্তু রাষ্ট্র তখনও পুরনো অভ্যাসে। প্রতিবাদের ভাষা বোঝার বদলে, প্রতিবাদীদের চুপ করাতে চায় গুলি দিয়ে। মিশন মোড়ে মিছিল পেঁৗছাতেই পুলিশ অতর্কিতে হামলা চালায়। শুরু হয় এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ। সে গুলির একটিই ছুটে এসে বিঁধে ফাহিম মিয়ার চোখে। মুহূর্তেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে তখন শুধু দৌড়ঝাঁপ, কান্না আর আতঙ্ক। সহযোদ্ধারা কোনোরকমে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন।
অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে রংপুর মেডিকেলে পাঠানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তার পরিবার তাকে রংপুরে নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে স্থানীয় হাসপাতালেই সীমিত চিকিৎসা চলতে থাকে। সে চিকিৎসায় প্রাণ রক্ষা হলেও চোখটি আর ফিরে পাননি তিনি। চোখ হারানোর যন্ত্রণা শুধু শারীরিক ক্ষত নয় এটি হয়ে ওঠে তার ভবিষ্যৎ ধ্বংসের এক স্থায়ী চিহ্ন। পরবর্তীতে যখন সরকারি বা ডিফেন্স সংশ্লিষ্ট চাকরির জন্য ফাহিম আবেদন করেন, চোখের অক্ষমতার কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। যে ছেলেটি একদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে দেশের পক্ষে কথা বলেছিল, তাকে আজ একটি চোখ হারিয়ে সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফাহিম মিয়া এখন কেবল আঘাতপ্রাপ্ত একজন শিক্ষার্থী নন, তিনি ২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের আরেকটি জীবন্ত দলিল। তার এক চোখের বিনিময়ে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার তরুণদের সম্ভাবনা থামিয়ে দেয়, প্রতিবাদ স্তব্ধ করে দেয় জীবনের সবচেয়ে তীব্র কষ্ট দিয়ে। কিন্তু তবুও ফাহিম মিয়ার দৃষ্টিহীনতা আমাদের নতুনভাবে পথ দেখায় সত্যকে দেখার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা:
২০২৪ সালের জুলাইয়ের উত্তাল আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন লালমনিরহাট সদর উপজেলার নেছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম মিয়া। তার ডান চোখে গুলি লাগে, যা সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মাটিতে লুটিয়ে ফেলে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় এবং অবস্থা বুঝে তাকে উন্নত চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর তিনি চিকিৎসার জন্য জউজঝ চক্ষু হাসপাতালে যান, যেখানে চোখের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু চক্ষুগোলকে গুলির অবস্থান জটিল হওয়ায় সেখানে অপারেশন সম্ভব হয়নি। ফলে শেষমেশ তাকে অর্কিট চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার চোখে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতরে আটকে থাকা গুলি অপসারণ করা হয়। যদিও অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবু গুলির আঘাতজনিত কারণে তার দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপারেশন পরবর্তী পর্যায়ে তার চোখে ঝাপসা দেখার সমস্যা ও মানসিক উদ্বেগ দেখা দেয়, যা এখনও চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং পুনর্বাসন ছাড়া চোখের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। এই চিকিৎসা জীবনের প্রতিটি ধাপেই ফাহিম মিয়া যেমন শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তেমনি আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অন্ধকার ভবিষ্যত অন্ধকারতাও তাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করেছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
ফাহিম মিয়া ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পুলিশের গুলিতে চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরবর্তীতে অর্কিট চক্ষু হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতর থেকে গুলি অপসারণ করা হয়। অপারেশনশেষে প্রাথমিকভাবে কিছুটা উন্নতি হলেও বর্তমানে তার চোখে নিয়মিত ব্যথা অনুভূত হচ্ছে যা দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলছে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, তার অব্যাহত ব্যথা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা অবহেলা করলে ভবিষ্যতে চোখের স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উন্নতমানের চক্ষু বিশেষজ্ঞ দ্বারা তার পূর্ণাঙ্গ চেকআপ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা—নিরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি মানসিক চাপ ও চোখের যন্ত্রণাজনিত উদ্বেগও বিবেচনায় রেখে পুনর্বাসনমূলক সেবার প্রয়োজন রয়েছে। একজন তরুণ শিক্ষার্থীর সুস্থ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে অক্ষণ্ণ রাখতে অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ ফাহিম মিয়া
জন্ম তারিখ : ০৮—০৯—২০০৫
জন্মস্থান : লালমনিরহাট
পেশা : ছাত্র
নিজ জেলা : লালমনিরহাট
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: সারপুকুর, ইউনিয়ন: সারপুকুর, থানা: আদিতমারী, জেলা: লালমনিরহাট
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: এরশাদুল হক
মায়ের নাম : ফাতেমা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী ও ৩৮
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
বোন: লামিয়া আক্তার সিমা, বয়স: ১৫ বছর, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৭ম
প্রতিষ্ঠান: সাপটিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়
ঘটনার বিবরণ
যখনই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে, তখনই তারা একদলীয় শাসনের ছক অঁাকে এবং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিণত করে একটি দমনযন্ত্রে যেখানে প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে আইন—শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, সাংবাদিকতা সবই হয়ে পড়ে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। এই নিপীড়নমূলক বাস্তবতার নির্মম শিকার হন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। তাদেরই একজন হলেন ফাহিম মিয়া, যিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলার নেছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। ফাহিম মিয়া ছিলেন একজন শান্তিপূর্ণ, কিন্তু দৃঢ়চেতা আন্দোলনকারী। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি নিয়মিতভাবে রাজপথে অংশগ্রহণ করতেন। ১৮ জুলাই, লালমনিরহাটের কালেক্টরেট চত্বরের সামনে ছাত্রদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছিল, যার অন্যতম সংগঠক ছিলেন ফাহিম। মিছিলটি মিশন মোড়ের দিকে এগিয়ে গেলে হঠাৎ করে পুলিশ অতর্কিতে আক্রমণ করে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। বৃষ্টির মতো নেমে আসা সেই গুলির একটিই এসে বিঁধে তার চোখে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু তার অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু ফাহিমের পরিবার ছিল চরম আর্থিক সঙ্কটে। দূরবর্তী রংপুরে নেয়ার মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে তারা স্থানীয় একটি হাসপাতালে সীমিত চিকিৎসা নেন। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে চোখের ক্ষতি রয়ে যায় স্থায়ীভাবে। এই চোখ হারানো শুধু তার দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনের বড় বাধা। চোখের সমস্যার কারণে বিভিন্ন চাকরির শারীরিক পরীক্ষায় বিশেষ করে ডিফেন্স, নিরাপত্তা বা সরকারি চাকরিতে তাকে “অযোগ্য” ঘোষণা করা হয়। একজন মেধাবী, প্রতিশ্রম্নতিশীল ছাত্র কেবল একটি গুলির আঘাতে রাষ্ট্রীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ফাহিম মিয়া এখন কেবল একজন আহত ছাত্র নয় তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর এক চোখের ক্ষত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এ দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলার, প্রতিবাদ জানানো ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কোনো নিরাপদ পরিসর আর অবশিষ্ট নেই। তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক, যাকে গুলি করে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল এক দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু তার গল্প থেমে যায়নি। সে এখন ইতিহাসের গায়ে লেখা একটি লাল দাগ, যা একদিন ন্যায়বিচারের সূচনা করবে।
যেভাবে আন্দোলন শুরু
যে আগুন এতদিন ছাইচাপা ছিল, তা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দাবানল হয়ে জ্বলে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয় আরেকটি গৌরবময়, রক্তাক্ত এবং আন্দোলনমুখর অধ্যায়। একপাক্ষিক নিয়োগ ব্যবস্থা, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, ক্ষমতার দম্ভ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়াবহ অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জেগে ওঠে ছাত্রসমাজ। তারা প্রশ্ন তোলে, মেধার কণ্ঠরোধ কেন? রাষ্ট্র কি শুধুই একটি দলের সম্পত্তি? জুলাইয়ের শুরুতেই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশের প্রতিটি কোণে। কোটাব্যবস্থার সংস্কার এবং মেধার মূল্যায়নের দাবিতে রাজপথে নামে দেশের সচেতন ছাত্রছাত্রী। ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের মধ্যেই ঢাকার রাজপথ, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। ঠিক সে সময় লালমনিরহাট সদর উপজেলার মিশন মোড়ে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলেন একজন তরুণ, সাহসী মাদ্রাসা ছাত্র ফাহিম মিয়া। তিনি নেছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। নির্ভীক, দায়িত্ববান এবং ন্যায়ের পক্ষে অটল এই তরুণ সে দিন কালেক্টরেট চত্বর থেকে মিছিল শুরু করে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জনতার কণ্ঠে। কিন্তু রাষ্ট্র তখনও পুরনো অভ্যাসে। প্রতিবাদের ভাষা বোঝার বদলে, প্রতিবাদীদের চুপ করাতে চায় গুলি দিয়ে। মিশন মোড়ে মিছিল পেঁৗছাতেই পুলিশ অতর্কিতে হামলা চালায়। শুরু হয় এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ। সে গুলির একটিই ছুটে এসে বিঁধে ফাহিম মিয়ার চোখে। মুহূর্তেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে তখন শুধু দৌড়ঝাঁপ, কান্না আর আতঙ্ক। সহযোদ্ধারা কোনোরকমে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন।
অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে রংপুর মেডিকেলে পাঠানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তার পরিবার তাকে রংপুরে নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে স্থানীয় হাসপাতালেই সীমিত চিকিৎসা চলতে থাকে। সে চিকিৎসায় প্রাণ রক্ষা হলেও চোখটি আর ফিরে পাননি তিনি। চোখ হারানোর যন্ত্রণা শুধু শারীরিক ক্ষত নয় এটি হয়ে ওঠে তার ভবিষ্যৎ ধ্বংসের এক স্থায়ী চিহ্ন। পরবর্তীতে যখন সরকারি বা ডিফেন্স সংশ্লিষ্ট চাকরির জন্য ফাহিম আবেদন করেন, চোখের অক্ষমতার কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। যে ছেলেটি একদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে দেশের পক্ষে কথা বলেছিল, তাকে আজ একটি চোখ হারিয়ে সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফাহিম মিয়া এখন কেবল আঘাতপ্রাপ্ত একজন শিক্ষার্থী নন, তিনি ২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের আরেকটি জীবন্ত দলিল। তার এক চোখের বিনিময়ে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার তরুণদের সম্ভাবনা থামিয়ে দেয়, প্রতিবাদ স্তব্ধ করে দেয় জীবনের সবচেয়ে তীব্র কষ্ট দিয়ে। কিন্তু তবুও ফাহিম মিয়ার দৃষ্টিহীনতা আমাদের নতুনভাবে পথ দেখায় সত্যকে দেখার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা:
২০২৪ সালের জুলাইয়ের উত্তাল আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন লালমনিরহাট সদর উপজেলার নেছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম মিয়া। তার ডান চোখে গুলি লাগে, যা সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মাটিতে লুটিয়ে ফেলে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় এবং অবস্থা বুঝে তাকে উন্নত চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর তিনি চিকিৎসার জন্য জউজঝ চক্ষু হাসপাতালে যান, যেখানে চোখের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু চক্ষুগোলকে গুলির অবস্থান জটিল হওয়ায় সেখানে অপারেশন সম্ভব হয়নি। ফলে শেষমেশ তাকে অর্কিট চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার চোখে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতরে আটকে থাকা গুলি অপসারণ করা হয়। যদিও অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবু গুলির আঘাতজনিত কারণে তার দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপারেশন পরবর্তী পর্যায়ে তার চোখে ঝাপসা দেখার সমস্যা ও মানসিক উদ্বেগ দেখা দেয়, যা এখনও চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং পুনর্বাসন ছাড়া চোখের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। এই চিকিৎসা জীবনের প্রতিটি ধাপেই ফাহিম মিয়া যেমন শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তেমনি আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অন্ধকার ভবিষ্যত অন্ধকারতাও তাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করেছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
ফাহিম মিয়া ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পুলিশের গুলিতে চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরবর্তীতে অর্কিট চক্ষু হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতর থেকে গুলি অপসারণ করা হয়। অপারেশনশেষে প্রাথমিকভাবে কিছুটা উন্নতি হলেও বর্তমানে তার চোখে নিয়মিত ব্যথা অনুভূত হচ্ছে যা দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলছে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, তার অব্যাহত ব্যথা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা অবহেলা করলে ভবিষ্যতে চোখের স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উন্নতমানের চক্ষু বিশেষজ্ঞ দ্বারা তার পূর্ণাঙ্গ চেকআপ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা—নিরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি মানসিক চাপ ও চোখের যন্ত্রণাজনিত উদ্বেগও বিবেচনায় রেখে পুনর্বাসনমূলক সেবার প্রয়োজন রয়েছে। একজন তরুণ শিক্ষার্থীর সুস্থ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে অক্ষণ্ণ রাখতে অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ ফাহিম মিয়া
জন্ম তারিখ : ০৮—০৯—২০০৫
জন্মস্থান : লালমনিরহাট
পেশা : ছাত্র
নিজ জেলা : লালমনিরহাট
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: সারপুকুর, ইউনিয়ন: সারপুকুর, থানা: আদিতমারী, জেলা: লালমনিরহাট
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মো: এরশাদুল হক
মায়ের নাম : ফাতেমা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী ও ৩৮
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
বোন: লামিয়া আক্তার সিমা, বয়স: ১৫ বছর, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৭ম
প্রতিষ্ঠান: সাপটিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍