মো: আল রাব্বি সোহান
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
লালমনিরহাট
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
তার মাতা রাজিয়া সুলতানা একজন গৃহিণী, বয়স ৩২ বছর। পরিবারে সদস্য সংখ্যা তিনজন পিতা, মাতা ও একমাত্র সন্তান সোহান। অর্থনৈতিকভাবে সীমিত হলেও সোহান পড়াশোনায় মনোযোগী এবং দায়িত্বশীল। তিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি পরিবারের জন্যও স্বপ্ন দেখে। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সোহান কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। তার জীবনধারা, পারিবারিক অবস্থা এবং অধ্যয়ন—নির্ভর মনোভাব একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর প্রতিচ্ছবি। সমাজ ও রাষ্ট্রের সহায়তা পেলে সোহানের মতো শিক্ষার্থীরা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একমাত্র সন্তানের পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন, যা কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম—গঞ্জেও। এই আন্দোলন ছিল বৈষম্য, দমন—পীড়ন, এবং আওয়ামী লীগ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, কৃষক সবাই একত্রিত হয়েছিল একটি ইনসাফভিত্তিক সাম্য, ন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এই আন্দোলনের ঢেউ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম শহরেও পেঁৗছায়, যেখানে সাধারণ ছাত্র—জনতা রাজপথে নেমে আসে। সেই ছাত্র—জনতার মধ্যেই ছিলেন একজন কিশোর, বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান আল রাব্বি সোহান।
সোহানের পরিচয় খুব সাধারণ, কিন্তু তার গল্প অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। সোহান যখন দেখলেন দেশজুড়ে অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে ছাত্র—জনতা রাস্তায় নামছে, তখন তিনি নিজেও পিছিয়ে থাকেননি। বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান হয়েও তিনি সাহসিকতার সাথে আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি বুঝেছিলেন, এই লড়াই শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতের জন্যও। তাই ৪ আগস্ট ২০২৪ সালে সোহান পাটগ্রাম শহরের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা, তার চাহনিতে ছিল সাহস আর আশার আলো। তার স্লোগান ছিল, “দিয়েছি তো রক্ত আরও দিব রক্তে” “রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”, “আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দিব না” প্রভৃতি। এই কারণে তার প্রতি মারমুখী হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ। দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সাথে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। আওয়ামী লীগ তখন দেশীয় অস্ত্র—শস্ত্রসহ শিক্ষার্থীদের ও জনগণকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। জনতা বিজয়ী হয়।
আগুনে ঝলসে যাওয়া বিকেল
কিন্তু বিজয়ের পরও সোহানের জীবন পুরোপুরি পাল্টে যায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আগের দিন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিয়ে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সোহান। পরদিন বিকেলে আবারও আন্দোলন শেষে বাসায় ফেরার পথে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ফেরার পথে হঠাৎই একটি পেট্রোল ও ডিজেল ভর্তি ড্রামে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে চারপাশ কেঁপে ওঠে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে থাকা মানুষদের দিকেও। সোহান পালাতে পারেননি। আগুনে তার একটি পা মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিশোধের স্পৃহায় আন্দোলনকারীদের গুপ্তহত্যা ও টার্গেটেড কিলিংয়ের রাস্তা বেছে নেয়। দেশব্যাপী নানান দুর্ঘটনা ও অস্থিরতা তৈরি করে দেশে অচলাবস্থা তৈরির সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়। আন্দোলনকারীদের উপর নানা প্রক্রিয়ায় হুমকি ধামকি ও নিপীড়নের ছক কষতে থাকে।
এই মুহূর্তটি ছিল সোহান ও তার পরিবারের জন্য একটি দুঃস্বপ্নের শুরু। জনতা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। সেখানে তার ক্ষতস্থানে চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পুড়ে যাওয়া স্থান পরিষ্কার করে অ্যান্টিসেপ্টিক মলম লাগানো হয়, ব্যান্ডেজ করে যন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এত বড় আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষত শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সারানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন ছিল উন্নত চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, এবং মানসিকভাবে সোহানকে শক্ত রাখার জন্য একটি সহানুভূতিশীল রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার। যা সোহান এখনও পায়নি।
রাষ্ট্র যখন পাশে থাকেনা
সোহানের পরিবার এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। বাবার একার আয়ে চলে না সংসার, আর সোহান নিজেও বিভিন্ন সময়ে টিউশনি করে বা কৃষিকাজে সাহায্য করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু পা ঝলসে যাওয়ার পর তিনি এখন হাটতেই পারেন না স্বাভাবিকভাবে। দীর্ঘদিন বিছানায় থাকতে হয়েছে তাকে। এখনো পূর্ণ সুস্থ হননি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উপর নেমে আসে দ্বিগুণ চাপ। ছেলের চিকিৎসা ও ভরণপোষণ দুটোই চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে তার পরিবারের পক্ষে। সরকারি বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য, পুনর্বাসন ভাতা বা উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সোহান এখনো পাননি। বরং, আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে স্থানীয়ভাবে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয় তার পরিবারকে। অথচ তার অপরাধ একটাই সে দেশের জন্য, সমাজের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
একটি সাহসী চেতনার প্রতীক
আল রাব্বি সোহান শুধু একজন ছাত্র নয়, তিনি এই সময়ের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহস বয়স দেখে আসে না। যে কিশোর তার বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান হয়েও দেশের পক্ষে দাঁড়াতে পারে, তাকে কোনো শক্তি দমিয়ে রাখতে পারে না। পা ঝলসে যাওয়া, শারীরিক যন্ত্রণা, জীবনের হঠাৎ পরিবর্তন এসব কিছুর পরেও তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন, কথা বলেন অধিকারের পক্ষে। এই সোহান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন শুধু নেতারা, বড় মানুষরাই নয়; দেশের জন্য জীবন বাজি রাখে সাধারণ ঘরের ছেলেরা, কৃষকের সন্তানরা, গ্রাম থেকে উঠে আসা কিশোররা। সোহানের মতো আহত ও প্রতিবাদী তরুণদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। আল রাব্বি সোহানের পুড়ে যাওয়া পা কেবল এক ব্যক্তির দুঃখগাঁথা নয়; তা একটি রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীর নির্মম চেহারা উন্মোচন করে। একজন ছাত্র, একজন সন্তান, একজন স্বপ্নবাজ তরুণ যে কেবল একটি ন্যায্য সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল, তাকে আগুনে পোড়ানো হয় শুধু তার সাহসিকতার কারণে।
সোহানদের ইতিহাস আমরা যত ভুলে যেতে চাই, ততই তা ফিরে ফিরে আসে। কারণ তারা এই দেশের বিবেক। আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, যাতে আগামী প্রজন্ম দেখে সত্য বললে পুড়ে যেতে হয় না, বরং মাথা উঁচু করে বাঁচা যায়। আল রাব্বি সোহান বেঁচে থাকুক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে, একটি নতুন সমাজের সূর্যসন্তান হয়ে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আল রাব্বি সোহান
জন্ম তারিখ : ৩১/১২/২০০৭
জন্মস্থান : লালমনিরহাট
পেশা : শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি
প্রতিষ্ঠান : পাটগ্রাম আদর্শ কলেজ
নিজ জেলা : লালমনিরহাট
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম, সোহাগপুর, থানা, পাটগ্রাম, জেলা, লালমনিরহাট
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : এ কে এম আনিসুজ্জামান খান, বয়স—৪৫, পেশা—কৃষক
মায়ের নাম : মোছা: রাজিয়া সুলতানা, বয়স—৩২, পেশা—গৃহিণী
মাসিক আয় : ৫ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ঘটনার স্থান : ভূমি অফিসের পাশে, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ১২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : আন্দোলনে আক্রমণকারী ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা।
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহয়তা কার্ড চালু।
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভূক্তকরণ।
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা।
একমাত্র সন্তানের পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন, যা কেবল শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম—গঞ্জেও। এই আন্দোলন ছিল বৈষম্য, দমন—পীড়ন, এবং আওয়ামী লীগ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, কৃষক সবাই একত্রিত হয়েছিল একটি ইনসাফভিত্তিক সাম্য, ন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এই আন্দোলনের ঢেউ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম শহরেও পেঁৗছায়, যেখানে সাধারণ ছাত্র—জনতা রাজপথে নেমে আসে। সেই ছাত্র—জনতার মধ্যেই ছিলেন একজন কিশোর, বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান আল রাব্বি সোহান।
সোহানের পরিচয় খুব সাধারণ, কিন্তু তার গল্প অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। সোহান যখন দেখলেন দেশজুড়ে অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে ছাত্র—জনতা রাস্তায় নামছে, তখন তিনি নিজেও পিছিয়ে থাকেননি। বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান হয়েও তিনি সাহসিকতার সাথে আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি বুঝেছিলেন, এই লড়াই শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতের জন্যও। তাই ৪ আগস্ট ২০২৪ সালে সোহান পাটগ্রাম শহরের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা, তার চাহনিতে ছিল সাহস আর আশার আলো। তার স্লোগান ছিল, “দিয়েছি তো রক্ত আরও দিব রক্তে” “রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”, “আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দিব না” প্রভৃতি। এই কারণে তার প্রতি মারমুখী হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ। দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সাথে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। আওয়ামী লীগ তখন দেশীয় অস্ত্র—শস্ত্রসহ শিক্ষার্থীদের ও জনগণকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। জনতা বিজয়ী হয়।
আগুনে ঝলসে যাওয়া বিকেল
কিন্তু বিজয়ের পরও সোহানের জীবন পুরোপুরি পাল্টে যায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আগের দিন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিয়ে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সোহান। পরদিন বিকেলে আবারও আন্দোলন শেষে বাসায় ফেরার পথে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ফেরার পথে হঠাৎই একটি পেট্রোল ও ডিজেল ভর্তি ড্রামে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে চারপাশ কেঁপে ওঠে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে থাকা মানুষদের দিকেও। সোহান পালাতে পারেননি। আগুনে তার একটি পা মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিশোধের স্পৃহায় আন্দোলনকারীদের গুপ্তহত্যা ও টার্গেটেড কিলিংয়ের রাস্তা বেছে নেয়। দেশব্যাপী নানান দুর্ঘটনা ও অস্থিরতা তৈরি করে দেশে অচলাবস্থা তৈরির সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়। আন্দোলনকারীদের উপর নানা প্রক্রিয়ায় হুমকি ধামকি ও নিপীড়নের ছক কষতে থাকে।
এই মুহূর্তটি ছিল সোহান ও তার পরিবারের জন্য একটি দুঃস্বপ্নের শুরু। জনতা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। সেখানে তার ক্ষতস্থানে চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পুড়ে যাওয়া স্থান পরিষ্কার করে অ্যান্টিসেপ্টিক মলম লাগানো হয়, ব্যান্ডেজ করে যন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এত বড় আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষত শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সারানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন ছিল উন্নত চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, এবং মানসিকভাবে সোহানকে শক্ত রাখার জন্য একটি সহানুভূতিশীল রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার। যা সোহান এখনও পায়নি।
রাষ্ট্র যখন পাশে থাকেনা
সোহানের পরিবার এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। বাবার একার আয়ে চলে না সংসার, আর সোহান নিজেও বিভিন্ন সময়ে টিউশনি করে বা কৃষিকাজে সাহায্য করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু পা ঝলসে যাওয়ার পর তিনি এখন হাটতেই পারেন না স্বাভাবিকভাবে। দীর্ঘদিন বিছানায় থাকতে হয়েছে তাকে। এখনো পূর্ণ সুস্থ হননি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উপর নেমে আসে দ্বিগুণ চাপ। ছেলের চিকিৎসা ও ভরণপোষণ দুটোই চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে তার পরিবারের পক্ষে। সরকারি বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য, পুনর্বাসন ভাতা বা উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সোহান এখনো পাননি। বরং, আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে স্থানীয়ভাবে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয় তার পরিবারকে। অথচ তার অপরাধ একটাই সে দেশের জন্য, সমাজের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
একটি সাহসী চেতনার প্রতীক
আল রাব্বি সোহান শুধু একজন ছাত্র নয়, তিনি এই সময়ের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহস বয়স দেখে আসে না। যে কিশোর তার বাবা—মায়ের একমাত্র সন্তান হয়েও দেশের পক্ষে দাঁড়াতে পারে, তাকে কোনো শক্তি দমিয়ে রাখতে পারে না। পা ঝলসে যাওয়া, শারীরিক যন্ত্রণা, জীবনের হঠাৎ পরিবর্তন এসব কিছুর পরেও তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন, কথা বলেন অধিকারের পক্ষে। এই সোহান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন শুধু নেতারা, বড় মানুষরাই নয়; দেশের জন্য জীবন বাজি রাখে সাধারণ ঘরের ছেলেরা, কৃষকের সন্তানরা, গ্রাম থেকে উঠে আসা কিশোররা। সোহানের মতো আহত ও প্রতিবাদী তরুণদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। আল রাব্বি সোহানের পুড়ে যাওয়া পা কেবল এক ব্যক্তির দুঃখগাঁথা নয়; তা একটি রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীর নির্মম চেহারা উন্মোচন করে। একজন ছাত্র, একজন সন্তান, একজন স্বপ্নবাজ তরুণ যে কেবল একটি ন্যায্য সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল, তাকে আগুনে পোড়ানো হয় শুধু তার সাহসিকতার কারণে।
সোহানদের ইতিহাস আমরা যত ভুলে যেতে চাই, ততই তা ফিরে ফিরে আসে। কারণ তারা এই দেশের বিবেক। আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, যাতে আগামী প্রজন্ম দেখে সত্য বললে পুড়ে যেতে হয় না, বরং মাথা উঁচু করে বাঁচা যায়। আল রাব্বি সোহান বেঁচে থাকুক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে, একটি নতুন সমাজের সূর্যসন্তান হয়ে।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আল রাব্বি সোহান
জন্ম তারিখ : ৩১/১২/২০০৭
জন্মস্থান : লালমনিরহাট
পেশা : শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি
প্রতিষ্ঠান : পাটগ্রাম আদর্শ কলেজ
নিজ জেলা : লালমনিরহাট
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম, সোহাগপুর, থানা, পাটগ্রাম, জেলা, লালমনিরহাট
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : এ কে এম আনিসুজ্জামান খান, বয়স—৪৫, পেশা—কৃষক
মায়ের নাম : মোছা: রাজিয়া সুলতানা, বয়স—৩২, পেশা—গৃহিণী
মাসিক আয় : ৫ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ঘটনার স্থান : ভূমি অফিসের পাশে, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪; দুপুর ১২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : আন্দোলনে আক্রমণকারী ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা।
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহয়তা কার্ড চালু।
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভূক্তকরণ।
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍