হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ সাজ্জাদ হোসেন
মোঃ সাজ্জাদ হোসেন

মোঃ সাজ্জাদ হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

রক্তে লেখা ইতিহাস
আওয়ামী লীগ সরকার তার শাসন টিকিয়ে রাখতে শুরু থেকেই বেছে নিয়েছে দমন—পীড়নের পথ। ২০১৩—১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে গুলি চালায় নিরপরাধ মানুষের বুকে, মঞ্চস্থ করে একপাক্ষিক নির্বাচন নামের প্রহসন।
দিনের পর দিন চলতে থাকে গুম, খুন, বিচারহীনতা, ছাত্রলীগ—যুবলীগের সন্ত্রাস এবং মত প্রকাশের ওপর নিষ্ঠুর দমন। গোটা দেশ যেন পরিণত হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর রাষ্ট্রে, যেখানে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, প্রতিবাদ করতে প্রাণ হারায়।
এই ভয়াবহতা ব্যতিক্রম ছিল না ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও। বহুদিন চুপ থাকলেও সেই মাসে দেশের ছাত্র—তরুণ সমাজ যেন জেগে উঠেছিল ঘুম ভেঙে। শিক্ষাগত বৈষম্য, বেকারত্ব, পুলিশের বর্বরতা এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা তাদের রাস্তায় নামিয়ে আনে। ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথে ধ্বনিত হয় প্রতিবাদের স্লোগান —“স্বৈরাচারের পতন চাই!”
নিরস্ত্র, সাহসী ছাত্ররা হাতে প্ল্যাকার্ড আর চোখে আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সত্যের পক্ষে। কিন্তু সরকার তাদের জবাব দেয় আগুন দিয়ে। গুলি চালানো হয় পাখির মতো। বেধড়ক লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান সব একত্র হয়ে গড়ে তোলে এক বিভীষিকাময় রাষ্ট্রীয় সহিংসতা।
রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা মিলে যেন ঘোষণা দেয়, “প্রতিবাদ করলেই মৃত্যু”। শত শত তরুণ আহত হয়, কেউ কেউ চিরতরে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তাজা রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। কেউ হারায় শক্তি, কেউ হারায় শরীরের অঙ্গ। সূচনা হয় ইতিহাসের নির্মম এক কালো অধ্যায়ের।
পরিচিতি
মাত্র ১৭ বছরের এক তরুণ, নাম মো: সাজ্জাদ হোসেন। জন্মেছেন ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৬, লালমনিরহাটের এক ছোট্ট গ্রাম ঝালাঙ্গী ইসলামপুরে। সেই শৈশব থেকেই বড় হয়েছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে, কৃষক বাবার কষ্টে আর মায়ের মমতায়। পড়াশুনার হাতেখড়ি হয়েছে গ্রামের মাদ্রাসায়, বর্তমানে তিনি এপি সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা, পাটগ্রামের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
তার চোখে ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, ছিল মায়ের মুখে হাসি ফুটানোর আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সময় লিখে দেয় ভিন্ন এক কাহিনী, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চলমান ছাত্র—জনতার আন্দোলন সেই কিশোরকে টেনে নেয় রাজপথে, যেখানে সত্যের জন্য দাঁড়ানোর মূল্য দিতে হয় রক্তে, যন্ত্রণায়।
সাজ্জাদ শুধু চেয়েছিল ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে। চেয়েছিল, এই দেশটা হোক সকলের জন্য নিরাপদ, শিক্ষার্থীদের জন্য হোক বৈষম্যহীন। তাই ছাত্রদের কণ্ঠে যখন স্লোগান ওঠে, “আমরা অধিকার চাই, আমরা ভাই হত্যার বিচার চাই” সাজ্জাদও তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলায়।
তার পরিবারের সদস্য ৫ জন। বাবা পরিশ্রমী কৃষক সংসার আলী, মায়া মাখা গৃহিণী মা মোছা: শাহনাজ পারভীন, আর দু’টি ছোট ভাই—বোন। ভাই সাদিকুল ইসলাম, মাত্র ৫ বছরের শিশু। আর বোন মরিয়ম আক্তার, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। তাদের জন্যই সাজ্জাদের স্বপ্ন ছিল শিক্ষিত হয়ে একদিন কিছু করে দেখানোর।
কিন্তু ২৪ এর আগস্ট সে স্বপ্নকে থামিয়ে দেয় গুলির শব্দ, কাঁদানে গ্যাস আর লাঠি আঘাতে। চব্বিশ এর বিপ্লবে সাজ্জাদের ত্যাগের গল্প ইতিহাসের পাতায় থাকবে লাল কালিতে লেখা থাকবে।
রাজপথের রক্তাক্ত সকাল
০৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১:৩০। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম বাইপাস মোড় তখন উত্তাল। ছাত্র—তরুণেরা জড়ো হয়েছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্লোগানে। সকলের মুখে স্লোগান, কার কারো হাতে প্ল্যাকার্ড। এসবের মাঝে দাঁড়িয়েছিলেন সাজ্জাদ হোসেনও। মাত্র ১৭ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, যিনি সেদিন উপস্থিত হয়েছিলেন ইতিহাসে নাম লেখাতে।
কিন্তু আন্দোলনের স্রোত ভাঙে হঠাৎ এক হিংসাত্নক আক্রমণে। ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকায় যখন ছাত্ররা সমবেত, তখনই দুই দিক থেকে ছুটে আসে পুলিশ আর ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ—আওয়ামী লীগ কর্মীরা। শুরু হয় ধাওয়া, লাঠিপেটা। সাজ্জাদসহ সবাই হঠাৎ এ আক্রমণে হতভম্ব হয়ে যায়। সবার মতো তিনিও নিষ্ঠুর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে চেষ্টা করেন, কিন্তু পেছন থেকে লাঠির নির্মম আঘাত এসে লাগে তার শরীরে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাজ্জাদ। আরও অনেকেই মারাত্নক আহত হয়।
সাজ্জাদ উঠে দাঁড়াতে চাইলে আরও একটি লাঠি সজোরে পড়ে মাথার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত ঝরতে থাকে। চারপাশের মানুষ চিৎকার করছে, ছুটে যাচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। কিন্তু রক্তাক্ত সাজ্জাদ পড়ে আছেন মাটিতে। তখন কিছু সাহসী তরুণ এগিয়ে এসে, তাঁকে টেনে তোলেন মৃত্যুর মুখ থেকে, নিয়ে যান নিরাপদ আশ্রয়ে।
অ—নিরাপদ হাসপাতাল
আহত অবস্থায় পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় সাজ্জাদকে। মাথায় ৪টি গভীর সেলাই পড়ে, প্রচণ্ড রক্তপাতের কারণে তার অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক।
তবে সেখানেও তাকে শান্তিতে রাখা যায়নি। পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব এতটাই ছিল যে, হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ও নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতে হয় সাজ্জাদকে। বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন তাকে দ্রুত অন্যত্র স্থানান্তর করে।
প্রস্তাবনা
পড়ালেখা ঠিকমতো চালিয়ে যেতে তার জন্য মাসিক শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম: মো: সাজ্জাদ হোসেন
জন্ম তারিখ : ১৬-০২-২০০৬
জন্মস্থান: লালমনিরহাট
পেশা/পদবি : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা: লালমনিরহাট
স্থায়ী ঠিকানা- গ্রাম: ঝালাঙ্গী ইসলামপুর,
ইউনিয়ন: শ্রীরামপুর, থানা: পাটগ্রাম,
জেলা: লালমনিরহাট
বর্তমান ঠিকানা গ্রাম: ঝালাঙ্গী ইসলামপুর,
ইউনিয়ন: শ্রীরামপুর, থানা: পাটগ্রাম, জেলা: লালমনিরহাট
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : সংসার আলী
পিতার পেশা ও বয়স: কৃষক, ৪৭

মায়ের নাম : শাহনাজ পারভীন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
পারিবারিক অবস্থা : মাসিক আয় ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : বাবার কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোন/সন্তানদের বিবরণ
১. সাদিকুল ইসলাম, বয়স: ০৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: শিশু, সম্পর্ক: ভাই
২. মরিয়ম আক্তার, বয়স: ১৩, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৬ষ্ঠ, প্রতিষ্ঠান: আউলিয়ারহাট দাখিল মাদ্রাসা, সম্পর্ক: বোন ঘটনার স্থান: ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন, পাটগ্রাম বাইপাস, লালমনিরহাট।
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, পুলিশ
আহত হওয়ার সময়: ০৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১.৩০টা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍