হোম / আহতদের তালিকা / জরিফুল ইসলাম
জরিফুল ইসলাম

জরিফুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সময়টা ছিল জুলাই ২০২৪। বাংলাদেশের রাজপথ যেন ফুটে উঠেছিল গর্জে ওঠা তারুণ্যের এক মহাসমাবেশে। বুকভরা স্বপ্ন, চোখভরা ক্ষোভ আর কণ্ঠভরা প্রশ্ন নিয়ে শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ— সবাই একত্র হয়েছিল একটি স্বপ্নের পেছনে। চাই একটি সমতার বাংলাদেশ, যেখানে কেউ বঞ্চিত হবে না। কিন্তু রাষ্ট্র তখন ভিন্ন পথে হাঁটছিল। যেখানে গণতন্ত্র ছিল মুখোশ, আর সহিংসতা ছিল শাসনের বাস্তব রূপ। যেখানে প্রতিবাদ মানেই শত্রু হওয়া, আর সত্য উচ্চারণের মানে লাঠি, গুলি আর নিখেঁাজের ভয়।
জুলাইয়ের শুরুতে গড়ে ওঠেছিল আন্দোলন। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর ক্ষোভ আর কান্না জমে এক সময় হয়ে উঠল বিস্ফোরণ। বাংলাদেশ যেন এক বিশাল মিছিলের মানচিত্র হয়ে উঠেছিল। তারপর শুরু হয় গণহত্যা। একটি একটি করে দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। ৩১ জুলাই পার হয়, কিন্তু জনতার প্রতিরোধ থামে না। তখনই জন্ম নেয় একটি প্রতীকী দিন “৩৬ জুলাই”। এমনই একটি দিন, যা গণজাগরণের দিনপঞ্জিকায় গেঁথে গেছে অক্ষয় হয়ে।
এই দিনপঞ্জির পাতা উল্টাতে গেলে আমরা দেখতে পাই মোঃ মাসুম হোসেনের মতো হাজারো তরুণের রক্তাক্ত মুখ। ৩৬শে জুলাই” তাদেরই দিন, যারা তাজা প্রাণ দিয়ে লিখেছে ন্যায়বিচারের গান; যাদের লাশ রক্তাক্ত রাজপথে পড়ে থেকেছে নিঃশব্দ প্রতিরোধ হয়ে; যাদের স্বপ্ন আজও তাড়া করে একটি দেশকে: কবে আসবে সত্য ও সমতার সেই সকাল?
পরিচিতি
অত্যন্ত সাধারণ এক জীবন ছিল জরিফুল ইসলামের। জন্ম লালমনিরহাট জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম পূর্ব সারডুবিতে। জন্ম তারিখ ১৫ জুলাই, ১৯৯০। জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছেন ধুলো—মাটি ঘেরা মফস্বলের রাস্তায়, আর জীবনের সংগ্রাম শুরু করেছেন অনেক আগে থেকেই। পিতা আব্দুস ছাত্তার একজন প্রবীণ মানুষ, বয়স ৬০, এখনও সক্রিয় জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। মা জরিনা বেগম অনেক আগেই পরপারে পাড়ি দিয়েছেন।
জরিফুল ইসলাম পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মুরগির খামার পরিচালনার মাধ্যমে পরিবার চালাতেন। ৫ জন সদস্যের একটি ছোট সংসার, কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল বিশাল। স্ত্রী, কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌস (১৩) ও পুত্র রেজবিল করিম (৮) কে নিয়ে যেন শান্তির সংসার গড়বেন, এই ছিল তাঁর দিন—রাতের প্রেরণা। জান্নাতুল ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে আবু হোসেন আহমেদ সিনিয়র মাদ্রাসায়, আর ছোট ছেলে রেজবিল ১ম শ্রেণিতে। রিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার সংগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে তিনি চলে যান রাজধানীর আশপাশে, থিতু হন সাভারে। সেখানে পুরাতন ওভারব্রিজ এলাকার একটি গলিতে তিনি একটি ব্রয়লার মুরগির দোকান চালান।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, এই সরল জীবনের গতিপথ বদলে যায় চিরতরে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আগুন যখন গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে, জরিফুল ইসলামও নীরব থাকতে পারেননি। দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনিও রাস্তায় নামেন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে। যে জীবন এতদিন মুরগির খামার আর সংসারের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা হঠাৎই বাস্তবতা আর বিপ্লবের কঠিন সংঘাতে জড়িয়ে যায়। একজন সাধারণ মানুষ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের সময়ের এক নীরব বীর— আহত, ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু অনড়। তাঁর জীবনকাহিনি যেন ২০২৪ সালের আন্দোলনের এক জীবন্ত দলিল।
ঢাকার সাভারে আন্দোলনের উত্তাপ
সারাদেশ তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। শিক্ষাগত বৈষম্য, দমন—পীড়ন ও গুম—খুনের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ছাত্র—জনতা রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানী, জেলা শহর পেরিয়ে আন্দোলনের অঁাচ লাগে সাভারেও। জরিফুল প্রথমে এই আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেননি। কিন্তু ১৯ জুলাই বিকাল ৩:৩০ টা, সেই দিনটি পাল্টে দেয় সবকিছু। হঠাৎ করেই পুলিশ ও সরকারি দলের দোসররা প্রবেশ করে সাভার বাজারের ভিতর। অকারণে তারা টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে গলিতে। ধেঁায়ায় দম বন্ধ হয়ে আসে, দোকানের সব মুরগি মারা যায়। আশেপাশের অনেকেই গ্যাসে আহত হয়। সেই মুহূর্তেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ব্যবসা ধ্বংস, জীবন বিপন্ন। জরিফুল ইসলাম তখন আর নিজেকে থামিয়ে রাখতে পারেননি। মুরগির মৃতদেহের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি হঠাৎ একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবাদকারীদের দলে যোগ দেন। কিন্তু সরকার প্রতিবাদের জবাব দেয় গুলি দিয়ে।
একটি গুলিবিদ্ধ পা
ছাত্র—জনতাকে লক্ষ করে পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে। গুলিরে আঘাতে অনেকেই আহত হয়। হঠাৎ একটি গুলি সরাসরি লাগে জরিফুলের বাম পায়ে। মুহূর্তেই তিনি লুটিয়ে পড়েন রক্তাক্ত অবস্থায়।
গ্রেফতার আতঙ্ক
আহতের পর তাকে আশেপাশের লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সাভার বা আশেপাশের কোনো হাসপাতাল তাঁকে ভর্তি নেয়নি। পুলিশের ভয়ে, গ্রেফতার আতঙ্কে হাসপাতালগুলো পিছু হটে। তিনিও ভয়ে কোনো সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হননি।
পরবর্তী চিকিৎসা
প্রথমে কমলাপুরের একটি ছোট ক্লিনিকে লুকিয়ে ভর্তি হন। অপারেশনের মাধ্যমে গুলি বের করা হয়। আত্মীয়ের বাসায় উঠে যান গোপনে। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে, কিন্তু সেখানেও পুরোপুরি চিকিৎসা মেলেনি।
অবশেষে পিজি হাসপাতালে পেঁৗছান জরিফুল। সেখানে প্লাস্টার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল হসপিটালে (উঈগঐ) চিকিৎসা শুরু হয়। এখন হাড় বেড়ে গিয়ে এমনভাবে বিকৃত হয়েছে, চিকিৎসকরা জানান বেড়ে যাওয়া হাড় কেটে ফেলতে হবে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : জরিফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১৫—০৭—১৯৯০
জন্মস্থান : লালমনিরহাট
পেশা : ব্যবসা
নিজ জেলা : লালমনিরহাট
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পূর্ব সারডুবি, ইউনিয়ন: পূর্ব সারডুবি মিলন বাজার, থানা: হাতিবান্ধা, জেলা: লালমনিরহাট
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : আঃ ছাত্তার
পিতার বয়স : ৬০
মায়ের নাম : জরিনা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : মৃত
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. নাম: জান্নাতুল ফেরদৌস, বয়স: ১৩, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৬ষ্ঠ, প্রতিষ্ঠান: আবু হোসেন আহমেদ সিনিয়র মাদ্রাসা, সম্পর্ক: মেয়ে
২. নাম: রেজবিল করেম, বয়স: ৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ১ম, প্রতিষ্ঠান: আবু হোসেন আহমেদ সিনিয়র মাদ্রাসা, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : সাভার পুরাতন ওভারব্রিজের নিচে
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৩.৩০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
আঘাতের ধরণ : পায়ে টাখনুতে গুলি লাগে
চিকিৎসা : অপারেশন
বর্তমান অবস্থা : আবারও অপারেশন প্রয়োজন
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : বর্তমানে তার অপারেশন এবং উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : তিনি তার চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা ঋণ করেছেন। চিকৎসা বাবদ তার প্রায় ৪ লক্ষ টাকা
খরচ হয়েছে। তার ব্যবসা পুনরায় সচল করার জন্য উপযুক্ত সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍