হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ হাবিবুল্লাহ
মোঃ হাবিবুল্লাহ

মোঃ হাবিবুল্লাহ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ইলেক্টিক প্রিপেইড মিটারের মাষ্টার রুলে কাজ করেন

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মোঃ হাবিবুল্লাহ ৩ জুন ১৯৯৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন নীলফামারী জেলায়। তার গ্রামের নাম বড়ভাঙা বিশমুড়ি। সদর থানার রামনগর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এই গ্রামেরই ছেলে মোঃ হাবিবুল্লাহ। পিতার নাম সিদ্দিকুর রহমান, মাতা মরিয়ম বেগম। ইমামতি তার পিতার পেশা, মাতা গৃহিণী। এক ভাই নুরুল্লাহ মাদ্রাসায় আলীম ক্লাসের ছাত্র, অপর ভাই ওয়ালীউল্লাহ এস এস সি পরীক্ষার্থী। বোন সুলতানা আক্তার প্রতিবন্ধী, ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী।
পেশা
মোঃ হাবিবুল্লাহ এইস এস সি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। বাবা ইমাম, ¯^ল্প আয়ে তার বাবার সংসার চালানো কষ্টকর হয়। পরিবারের হাল ধরতে বিদ্যুৎ অফিসে প্রিপেইড মিটার সেকশনে মাস্টার রোলে কাজ করেন। তার আরও দুই ভাই, এক বোন অধ্যয়নরত। তিনি ভাই বোনদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার মানসে নিজের লেখাপড়া বন্ধ রাখেন। জুলাই আন্দোলনে আহত হয়ে বেকার জীবন যাপন করছেন।
ঘটনার দিন
জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পদত্যাগ ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে তিনি প্রতিদিনই আন্দোলনে অংশ নিতেন। ১৮ জুলাই-২৪ সকালবেলা ছাত্রদের সাথে মিলিত হন। চৌরঙ্গী মোড় থেকে তারা ডিসি মোড়ের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে আগে থেকেই পুলিশ, আওয়ামী লীগ সশস্ত্র অবস্থান করছিল। ডিসি মোড়ে ছাত্র-জনতা পৌঁছলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। মুখোমুখি অবস্থায় পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌছে। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ছাত্র-জনতার উপর হামলা করে। পুলিশ মিছিলে নির্বিচারে গুলি করতে থাকে। গুলিতে বহু লোক আহত হয়। হাবিবুল্লাহ পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। আঘাত নিয়েই তিনি নিয়মিত আন্দোলনে অংশ নিতে থাকেন। তার অদম্য সাহস আর বৈপ্লবিক মনোভাবের কারণে তিনি এলাকায় চিহ্নিত হয়ে যান। ২২ জুলাই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে একা পেয়ে আক্রমণ করে। ডান হাতের কব্জিতে কোপ পড়ায় কব্জি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক হয়ে পড়ে, তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হন।
সাহসী হাবিবুল্লাহ
মো: হাবিবুল্লাহ ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছেন। বুক ভরা ¯^প্ন পাশ করে ভর্তি হবেন ভার্সিটিতে। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ, জাতি, সমাজের খেদমত করবেন। উজ্জ্বল করবেন বাবা-মায়ের মুখ। কিন্তু দারিদ্র্য তার পড়ালেখার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে কাজ খোঁজেন। বিদ্যুৎ অফিসে কাজ করেন মাস্টার রোলে।
যে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সেই ভার্সিটির ছাত্র ভাইয়েরা আন্দোলনে নেমেছে রাজপথে। আজকাল যেকোনো খবর অতি দ্রুত পৌঁছে যায় শহর-গ্রাম ছাড়িয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এখন যুগটাই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। বিশ্ব হাতের মুঠোয়। এক মুহূর্ত দেরি করতে হয় না। খবর জানাজানি হয়ে যায়। ছাত্রদের আন্দোলনের সংবাদ দেশবাসী জেনে গেছে। ছাত্ররা চাকরিতে কোটার বিরোধিতা করে মেধার মূল্যায়নের দাবী জানিয়েছিল।
সরকার ছাত্রদের রাজাকার বলে দমিয়ে দিতে চায়
সরকার টানা পনেরো বছর ক্ষমতায়। এ সময়ে ফ্যাসিস্ট কায়দায় সকল বিরোধী মতকে দমন করেছে অস্ত্রের ভাষায়। বিরোধী যেকোনো মতকেই সরকার মিথ্যা মামলা, হামলা, জোর-জবরদস্তি করে দমন করেছে। কাউকে রাজপথে দাঁড়াতে দেয়নি। জেল, জুলুমের ভয়ে অনেকেই কথা বলেনি। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দিয়ে জেলখানা ভরে রেখেছে।
পনেরো বছরে সরকার সর্বকালের শীর্ষ সৈরাচারে পরিণত হয়েছে। ভোটের রাজনীতি ধ্বংস করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে। ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে দলীয় গুণ্ডা বাহিনী মাঠে নামিয়েছে। সরকারের চিরাচরিত নিয়ম হলো বিপক্ষে গেলেই জঙ্গী, রাজাকার তকমা দিয়ে ধূম্রজাল তৈরি করা।
ছাত্র আন্দোলনকেও এসব ধূম্রজালে আচ্ছন্ন করতে ব্যর্থ হয়
আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সরকার এই আন্দোলন দমন করতে, ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করতে সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ আক্রমণে রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরতে থাকে।
শত শত লাশ পড়ে জুলাইয়ে
আন্দোলন শুরু হয় জুলাইয়ের প্রথম দিকে। মধ্য জুলাইয়ে সরকার ছাত্রদের রাজাকারের বাচ্চা বলে সংবাদ সম্মেলনে তিরস্কার করে। ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা ভার্সিটিতে অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। ছাত্ররা হল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে দলে দলে। ছাত্রদের সাথে যোগ দেয় ছাত্রীরাও। ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে রাজপথে নেমে আসে।
রাজপথ উত্তপ্ত হয় শ্লোগানে শ্লোগানে
ফ্যাসিস্ট হাসিনা বাহিনী ছাত্র-ছাত্রীদের উপর চড়াও হয়। ১৪ জুলাই থেকে সারা দেশের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির ছাত্ররা একযোগে রাজপথে নামে। তাদের দমন করতে পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ মিছিলে হামলা করে। সরাসরি গুলি করে হত্যা করতে থাকে আন্দোলনরতদের। সরকারের বর্বরতায় বিবেকবান কেউ বসে থাকতে পারে না। অভিভাবক, ছাত্র, শিক্ষক, সকল পেশাজীবী সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মোঃ হাবিবুল্লাহ বা তার মতো লক্ষ লক্ষ হাবিবুল্লাহরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে আন্দোলনে যোগ দেয়।
পনেরো বছর দেশের মানুষ একজন ফ্যাসিস্ট, ¯ৈ^রাচারের কবলে বন্দি ছিল। এই বন্দিদশা থেকে দেশ মুক্ত করতে হবে, দেশের মানুষকে মুক্ত করতে হবে, এই প্রত্যাশা মুক্তিকামী জনতার। দেশের এই বন্দিদশা থেকে মুক্তির মিছিলে ইতোমধ্যে ঝরে গেছে বহু প্রাণ। হাজার হাজার লোক আহত, প্রায় দুই হাজারের অধিক লোক শহীদ হয়েছেন।
হাবিবুল্লাহ নিজের এলাকা নীলফামারীতে প্রতিদিনই আন্দোলনে অংশ নেন। পুলিশের গুলি, টিয়ারশেল, আওয়ামী যুব লীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের গুণ্ডাদের আক্রমণ উপেক্ষা করেই আন্দোলন চালিয়ে যান।
হুমকি, ভয়কে উপেক্ষা করেই
আন্দোলনে অংশ নেন। ভয় কাজ করে বাসায় আওয়ামী লীগের হামলার। এমন ঘটনা তখন অহরহ ঘটতো। প্রতিদিনের মতো ১৮ জুলাই তিনি ছাত্রদের সাথে মিলিত হয়ে চৌরঙ্গী মোড় থেকে ডিসি মোড়ের দিকে অগ্রসর হন।
১৮ জুলাই ডিসি মোড়ে পূর্ব থেকে সশস্ত্র অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের লোকবল। পুলিশও অবস্থান করে। মিছিল ডিসি মোড়ে পৌছতেই তাদের ঘিরে ফেলা হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত
তার আগে সারা দেশে আওয়ামী লীগ প্রায় জায়গাতেই সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালিয়ে যায়। কোথাও কোথাও মরণ কামড়ের প্রস্তুতি নেয়। নীলফামারী আওয়ামী লীগ এই মনোভাবেই মাঠে নামে।
মূলত ১৮ জুলাই দেশ আন্দোলনকারীদের দখলে
ছাত্র-জনতা সামনে অগ্রসর হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেই অতর্কিতে পুলিশ মুহুর্মুহু গুলি ছুঁড়তে থাকে। তিনি ছিল মিছিলের অগ্রভাগে। হঠাৎ পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে আহত হন অনেকে। সারা শরীরে অসংখ্য গুলি লেগে মাঠ মরণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় তিনি রক্তাক্ত আহত হন। পায়ের টাখনু ফেটে যায়। তারপর চিকিৎসা করে বাসায় যান। পরদিন যথারীতি আন্দোলনে অংশ নেন।
হাবিবুল্লার অদম্য সাহসিকতার কথা জেনে যায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তিনি আন্দোলনকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। ২২ জুলাই তাকে একা পেয়ে ধারালো অস্ত্রে মারাত্মক আহত করে ছাত্রলীগ। টানা তিন মাস হাসপাতালে থাকতে হয় তাকে।
চিকিৎসা তথ্য
১৮ জুলাই ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ায় তিনি পায়ের টাকনুতে ব্যথা পান। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন। ক্ষতস্থানে সেলাই করে অন্যান্য আঘাতেও চিকিৎসা করান। তারপর নিয়মিত আন্দোলনে অংশ নেন।
কিন্তু ২২ জুলাই লীগ সন্ত্রাসী কর্তৃক আহতের মাত্রা ভয়াবহ রকম। তাকে একা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করে। ডান হাতের কব্জি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে পঙ্গু হাসপাতাল ঢাকায় ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় ৩ মাস চিকিৎসার পর সুস্থ হন। কিন্ত তার হাতে সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তার ডান হাতের আঙুল অকেজো। তিনি চিকিৎসকে পরামর্শক্রমে এখনো ঔষধপত্র খেয়ে যাচ্ছেন।
আক্রমণকারী ও সময়
১৮-০৭-২৪ পুলিশ ১১.৩০ পুলিশের হামলার সময় ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ায় আহত হন। ২২-০৭-২৪, ৯.৩০ ছাত্রলীগ ধারালো অস্ত্রে হামলা করে। ডান হাতের কব্জি আলাদা প্রায়।
স্থান: চৌরঙ্গী মোড় থেকে ডিসি মোড়ে পৌছলে আক্রান্ত হন।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ হাবিবুল্লাহ
জন্ম তারিখ : ০৩-০৬-১৯৯৮
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : ইলেক্টিক প্রিপেইড মিটারের মাষ্টার রুলে কাজ করেন। নীলফামারী।
নিজ জেলা : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বড় ভাঙা বিশমুড়ি, ইউনিয়ন: রামনগর, থানা: সদর, জেলা: নীলফামারী
পিতার নাম : সিদ্দিকুর রহমান
পিতার পেশা : ইমামতি
মায়ের নাম : মরিয়ম বেগম
মায়ের পেশা : গৃহিণী
পারিবারিক অবস্থা
আয়ের পরিমাণ : ৫০০০ টাকা
আয়ের উৎস : পিতার ইমামতি
ভাই ও বোন : ৩ জন
১. নুরুল্লাহ, এইসএসসি
২. ওয়ালীউল্লাহ, এসএসসি
৩. সুলতানা আক্তার (প্রতিবন্ধী) ৮ম শ্রেণি

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍