হোম / আহতদের তালিকা / মোয়াজ্জেম শাহ রিয়াদ
মোয়াজ্জেম শাহ রিয়াদ

মোয়াজ্জেম শাহ রিয়াদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

রক্তাক্ত জামায় লেখা প্রতিবাদ
মোয়াজ্জেম শাহ রিয়াদ
ক্রমিক: ২৪৯
আইডি: রংপুর বিভাগ ০৫৫
গ্রামীণ বিকেল আর শালিকের ডাক
নীলফামারীর এক প্রান্তে, টুপামারী ইউনিয়নের শাহপাড়া গ্রাম। এখানেই জন্ম নেয় মোয়াজ্জেম শাহ রিয়াদ ২০০৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রিয়াদ বেড়ে উঠেছে খোলা প্রান্তর আর কাঁচা রাস্তায় দৌড়াতে দৌড়াতে। বাবা মো: নূর আলম শাহ মানিক একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বয়স ৫২। মা মোছা: শাহিনা আক্তার রুপালী, বয়স ৪০, সংসারের নীরব রথচালক। রিয়াদের ছোট ভাই রাইয়ান মাত্র ৮ বছরের শিশু, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, চতুর্থ শ্রেণিতে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। আয়ের উৎস বাবার ছোট্ট ব্যবসা, মাসে মাত্র ২০ হাজার টাকা। এই টাকায় চলতো ছয়জনের খরচ, পড়াশোনা, ওষুধ, ঈদের নতুন জামা আর ভাইয়ের স্কুল ফি। কিন্তু অভাবের ভেতরেও ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না। গ্রামে বিকেল মানে মাঠে ক্রিকেট আর সন্ধ্যায় মসজিদে নামাজ পড়া। আবার কখনও বাবার ব্যবসার সাহায্য করতো যেন বাবার কষ্ট কম হয়। টেকনিক্যাল স্কুলে পড়লেও রিয়াদের চোখে ছিল বড় কিছু করার স্বপ্ন নিজের জীবন বদলানো নয়, সমাজটাকে বদলানোর সাহস।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আসলে প্রতিবাদের চিৎকার
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন সবসময়ই ছিল সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল যৌক্তিক সংস্কার যাতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই স্বৈরাচারী সরকার ছাত্রদের কণ্ঠ রোধ করতে চেয়েছিল। টিয়ারশেল, রাবার বুলেট আর লাঠিচার্জের মাঝেও ছাত্ররা মাথা নোয়ায়নি। চাপে পড়ে সরকার কোটা সংস্কার ব্যবস্থা বাতিল করে, কিন্তু সেটাও ছিল অস্থায়ী ও অসম্পূর্ণ। কোনো স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। এই ফাঁকফোকর থেকেই ২০২৪ সালে আবার মাথাচাড়া দেয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। আর তখন দেশের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী একসাথে বলে ওঠে -এই বৈষম্যের শেষ চাই।
রিয়াদ তখন নীলফামারী গভ. টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বয়স মাত্র ১৭, কিন্তু চোখে অদ্ভুত সাহস। সে নিয়মিত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেসবুক পোস্ট ফলো করতো, পোস্টার টানাতো, বন্ধুদের সচেতন করতো। জুলাই মাসে যখন ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের প্রথম লাঠিচার্জ হয়, তখন রিয়াদ জানে, এটা সহজ লড়াই নয়। ১৯ জুলাই নীলফামারীর ডিসি অফিসের সামনে আন্দোলন করার কারণে তাকে প্রশাসন লক্ষ করে। অত:পর তার বাড়িতে যেয়ে হুমকি দিয়ে আসে। তবু সে মাথা নোয়ায় নি বরং নিয়মিত আন্দোলন করত।
৪ আগস্টের রক্তাক্ত সকাল
সকালের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা। জায়গা ডিসি মোড়, নীলফামারী। সেখানে এক দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যে অবস্থান নেয় শতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের দাবিগুলো ছিল পরিষ্কার, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের শুরুতে নয় দফা দাবি আদায়ের জন্য মাঠে নামে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল কোটার যৌক্তিক সংস্কার।কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার তাদের দাবি না মেনে বরং তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। শিক্ষার্থীদেরকে প্রকাশ্যে পুলিশ গুলি করে হত্যা করলে আন্দোলন শহরের বাইরে জেলা এবং উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ই জুলাই ২০২৪ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করলে আন্দোলন দানা বেধে উঠে।
ধীরে ধীরে নয় দফা থেকে চলে আসে এক দফার আন্দোলন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন। আন্দোলনের একসপ্তাহ ছিল ছাত্র-জনতা অন্যদিকে ছিল স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ এবং আওয়ামী দোসররা। শান্তিপূর্ণভাবেই ছাত্র-জনতা আন্দোলন করছিল কিন্তু হঠাৎ করেই সরকারপ্রধানের নির্দেশে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পুলিশবাহিনী ও আওয়ামী যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী মিলে নির্মমভাবে আক্রমণ চালায়। তারা ছুরি, চাপাতি, রড, হকিস্টিক দিয়ে মারতে থাকে নিরস্ত্র ছাত্রদের। চারদিক শুধু কান্না আর চিৎকারে ভরে ওঠে। রিয়াদ ছত্রভঙ্গ হয়ে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে পড়ে যায়। তখন কয়েকটি ছোররাগুলি এসে তার শরীরে বিঁধে যায়। পিঠে, হাতে, কোমরে রক্তের ধারা নেমে আসে। তার জামা রক্তে ভিজে যায়।
রক্ত, হাসপাতাল আর সাহসের নতুন গল্প
সহপাঠীরা আর স্থানীয় মানুষজন রিয়াদকে তুলে নেয়। শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, তবুও তার চোখে ভয় নেই শুধু ব্যথা আর অনিশ্চয়তা। প্রথমে তাকে নেয়া হয় পাশের একটি ফার্মেসিতে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সদর হাসপাতালে। দ্রুত অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১০টি ছোররা গুলি অপারেশন করে বের করা হয়, কিন্তু ৪টি ছোররা গুলি এখনো শরীরের ভেতরে। এই চারটি গুলি থাকার কারণে মাঝেমধ্যে ব্যথা করে, কখনো ঘুম ভেঙে যায় রাতে।
চিকিৎসা শেষে সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়। তবে শরীরে ক্ষত বয়ে বেড়ায় এখনো। যেমন বয়ে বেড়ায় মনভাঙা দেশের অবিচারের ক্ষত।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোয়াজ্জেম শাহ রিয়াদ
জন্ম তারিখ : ২ ফেব্রয়ারি ২০০৭
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : নীলফামারী গভ. টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ
নিজ জেল : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: টুপামারী শাহপাড়া, ইউনিয়ন: টুপামারী, থানা: সদর, জেলা: নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: নূর আলম শাহ মানিক
মায়ের নাম : মোছা: শাহিনা আক্তার রুপালী
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা, ৫২ বছর
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০ বছর
আর্থিক ও পারিবারিক তথ্য
মাসিক আয় : ২০,০০০/- টাকা
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. রাইয়ান শাহ, বয়স: ৮ বছর, পেশা: শিক্ষার্থী (সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়), শ্রেণি: ৪র্থ, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : ডিসি মোড়, নীলফামারী
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍