হোম / আহতদের তালিকা / মো: কালা মিয়া মুন্না
মো:  কালা মিয়া মুন্না

মো: কালা মিয়া মুন্না

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

হোটেল শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


বানিয়াপাড়ার মাটিতে জন্ম, শ্রমজীবী জীবনের সূচনা
১৯৯৯ সালের ৪ মে, নীলফামারী সদর উপজেলার চড়াই খোলা ইউনিয়নের ছোট্ট এক গ্রামে বানিয়াপাড়ায় জন্ম নেয় এক শিশু, নাম রাখা হয় কালা মিয়া মুন্না। পরিবারের সবাই তাকে ডাকত শুধু “মুন্না” নামে। জন্ম থেকেই দারিদ্র্য ছিল তার ছায়াসঙ্গী। বাবা মো: খাদের উদ্দিন একজন ভ্যানচালক, মা মোছা: অলেদা বেগম এখন আর বেঁচে নেই। শিক্ষার আলো তার দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি কখনো। অক্ষরজ্ঞানহীন মুন্না ছোটবেলা থেকেই বুঝে গিয়েছিল, কাঁধে বই না, ভারই বইতে হবে তাকে। বড় ভাই আলমগীর ভ্যান চালাতেন, আরেক ভাই শরিফুল কাজ নেন জুট মিলে। মুন্না নিজে শুরু করে হোটেলে কাজ। শেফাউল হোটেল, নীলফামারী সদরে। সকালে দোকান খুলে, দুপুরে থালা ধুয়ে, রাতে বাসন মাজতে মাজতেই তার শৈশব-কৈশোর পার হয়ে যায়। বাড়ির পাশে এক সময় কিছু জমি ছিল না, তাই পরিবার বাস করত অন্যের জায়গায়। স্থানীয় এক ব্যক্তি দয়া করে একটু জায়গা দেন, যেখানে তারা একটি ছোট টিনের ঘর তুলে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেয়।
আন্দোলনের আগুন ও চেতনার জাগরণ
কালা মিয়া মুন্না রাজনীতি বোঝে না, বড় বড় কথা শোনার সময় তার ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ সবই তার হোটেলের চায়ের কাপে ভেসে আসত। রংপুরে কাজ করতে গিয়ে সে দেখেছিল আবু সাঈদ নামের এক ছাত্রের শহীদ হওয়ার খবর। এরপর একে একে আরও অনেকের রক্তাক্ত ছবি, মাথা ফাটা, চোখ হারানোর গল্প সবই পৌঁছায় মুন্নার কাছে। তার ভেতরে একটা কিছু নড়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, তার মতো গরিব ছেলেরা যদি কখনো সরকারি চাকরি পেত, তাহলে জীবনটা হয়তো একটু বদলাত। কিন্তু আজও সেই স্বপ্ন বৈষম্যের দেয়ালে আটকে আছে।
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত। এছাড়া রাষ্ট্রের সকল জায়গায় দুর্নীতি, চোরাকারবারি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস, মানুষের কথা বলার অধিকার হরণ ইত্যাদি বিষয়গুলা তার ভিতর নাড়া দেয়। এই বিশ্বাস থেকে মুন্না যোগ দেয় শহরের বিজয় মিছিলে। ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেলে থানার সামনে যে মিছিল হয়, তাতে সে ছিল সামনে সারিতে।

ছররা গুলি আর রক্তাক্ত বিকেল
৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টা। নীলফামারী থানার সামনে তখন উত্তাল জনতা। দীর্ঘ দুই মাস আন্দোলনের পর ছাত্র-জনতা, অভিভাবক, শ্রমজীবী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ যখন রাস্তায় নামে তখন স্বৈরাচারী সরকারের পালানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কারণ সকলের মুখে একটিই দাবি ছিল স্বৈরাচারী সরকার শেখ হাসিনার পতনের দাবি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার তার সকল বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, মানুষ হত্যা করে হলেও সে ক্ষমতায় থাকতে চায়। কিন্তু দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী তা হতে দেননি। সেনাবাহিনী প্রধান তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা কোন উপায় না পেয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। বিকাল তিনটা সারা দেশের মানুষ তখন বিজয় উল্লাসে মেতে উঠে। ছাত্র জনতা এবং সকল শ্রেণীর মানুষ বিজয় উল্লাসে রাস্তায় নেমে পড়ে। তখনোও অনেক থানার পুলিশ বাহিনী তাদের সর্বশক্তি দিয়ে গুলি করে মানুষ হত্যা করে। কালা মিয়া মুন্না সেইদিন নীলফামারী সদরে বিজয় মিছিলে বের হয়। মিছিল যখন একটু সামনে এগোয়, হঠাৎ করেই পুলিশ লাঠিচার্জ আর ছররা গুলির বর্ষণ শুরু করে। দিকবিদিক ছুটতে থাকে সবাই। মুন্না তখন পালাতে পারেনি। একেবারে সামনে পড়ে যায়। সোজা তার মুখের দিকে ছুটে আসে ছররার গুলি। মুখে, গলায়, পিঠে, হাতে একটার পর একটা গুলি বিদ্ধ হয়। মাটিতে পড়ে যায় মুন্না। চোখ-মুখ ঢেকে রক্তে ভেসে যায় রাস্তা।
তাকে দ্রুত সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।
চিকিৎসা, ব্যথা, আর বাঁচার নতুন লড়াই
নীলফামারী সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় মুন্নাকে। চিকিৎসকরা প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি ছররা গুলি বের করেন তার মুখ, কাঁধ, ও গলা আর মাথা থেকে। মুখের ভেতরে রক্ত জমে গিয়েছিল। কয়েকদিন ধরে খাবার তো দূরের কথা, কথা বলাও অসম্ভব হয়ে পড়ে তার পক্ষে।
এরপর তাকে রংপুর সিএমএইচ-এ স্থানান্তর করা হয়। কিছু চিকিৎসা সম্পন্ন হলেও শরীরে এখনো রয়ে গেছে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ছররা গুলি। কিছু গুলি মাথার কাছাকাছি থাকায় সেগুলো অপারেশন করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিকিৎসকেরা জানান। চেহারায় এখনো সেই বিকেলের দাগ বহন করে বেড়ায় সে। আজ সে আর আগের মতো হোটেলে কাজ করতে পারে না। শরীর সহ্য করে না, মাথাব্যথা তীব্র হয় মাঝেমধ্যে। বেঁচে থাকলেও জীবন থমকে গেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ভালো চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে মুন্নাকে আবার ¯^াভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু অভাবী পরিবারে সেই খরচ বহনের সাধ্য কোথায়? স্থানীয়রা কেউ কেউ বলেছে, মুন্নাকে একটি প্রতিষ্ঠানে দারোয়ান বা পিয়নের চাকরি দিলে সে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
প্রতিষ্ঠানের পিয়ন পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: কালা মিয়া মুন্না
জন্ম তারিখ : ৪ মে ১৯৯৯
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : হোটেল শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : শেফাউল হোটেল, নীলফামারী সদর
নিজ জেলা : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বানিয়া পাড়া, ইউনিয়ন: চড়াই খোলা, থানা: নীলফামারী সদর, জেলা: নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: খাতের উদ্দিন
মায়ের নাম : মৃত মোছা: অলেদা
পিতার পেশা ও বয়স : ভ্যানচালক, ৫১
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : দিনমজুর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. আলমগীর, বয়স: ২৭, পেশা: ভ্যানচালক, সম্পর্ক: ভাই
২. শরিফুল, বয়স: ১৮, পেশা: জুট মিল শ্রমিক, সম্পর্ক: ভাই
৩. সাদেকুল, বয়স: ৫, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: প্রি ১, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : থানার সামনে, নীলফামারী
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍