হোম / আহতদের তালিকা / মো: আতিকুজ্জামান
মো: আতিকুজ্জামান

মো: আতিকুজ্জামান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

রক্তে ভেজা বিশ্ববিদ্যালয়
ভর্তিচ্ছু ছাত্রের গল্প

নীলফামারী সদর উপজেলার ছোট্ট এক গ্রাম তালুক মানুষমারা। এই গ্রামেই ২০০৬ সালের ১৯ অক্টোবর জন্ম নেয় মো: আতিকুজ্জামান। ছয় সদস্যের পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ছেলেটি ছিলো ছোটদের মধ্যে তৃতীয়। বাবা শামসুল হক, পেশায় কৃষক, যিনি জীবনের পুরোটা কাটিয়েছেন জমিতে হালচাষ আর ফসল ফলিয়ে। মা আয়শা খাতুন ছিলেন গৃহিণী, তবে তাঁর মমতা আর ত্যাগ ছিলো আতিকের জীবনের চালিকাশক্তি। সংসারে মোটামুটি সচ্ছলতা বলতে ছিলো বাবা-মায়ের অল্প¯^ল্প আয় আর দুই ভাইয়ের পরিশ্রম। মাসে দশ হাজার টাকা আয়েই চলতো পুরো পরিবারের খরচ বোনদের বিয়ে দেওয়া, ছোট বোন আসমার পড়ালেখা, আর আতিকের নিজের স্বপ্নপূরণের প্রস্তুতি।
আতিকের ছোটবেলা কেটেছে ধানের ক্ষেতে, কাঁচা রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে আর নদীর ধারে খেলাধুলা করে। ছোটবেলায় সে স্কুলে ছিলো খুবই মনোযোগী। পড়াশোনায় ভালো ছিল। পরিবারে বড় ভাই আসাদুজ্জামান একটি মুদি দোকান চালাতো, সেই আয়েই সংসার টিকিয়ে রাখা যেত। বড় বোন শামীমা ও সালমার বিয়ে হয়ে গেলেও তাদের ভালোবাসা ও সহানুভ‚তি আজও আতিককে আগলে রেখেছে। এইচএসসি পাসের পর থেকেই আতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু প্রতিদিন বাড়ির পাশে বসে কৃষক বাবার খাটুনি আর মায়ের অব্যক্ত দুশ্চিন্তা দেখে তার মনে হতো, এই জীবনে তাকে বড় কিছু হতেই হবে, কেবল নিজের জন্য নয়, বরং গোটা পরিবার ও সমাজের জন্য।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিবাদ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। সারাদেশজুড়ে ছাত্রজনতা তখন উত্তাল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নতুন ঢেউ ঢাকা থেকে শুরু করে, নীলফামারী, রাজশাহী, খুলনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু আতিক সেই সময় একসাথে কয়েকটি ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আতিক বুঝেছিল এই আন্দোলন শুধু কোটা নয়, এটা তার মতো সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা হাজার হাজার শি¶ার্থীর ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কৃষকের সন্তান হয়ে, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে পড়ালেখা করে যে স্বপ্ন আঁকা হয়, সেই স্বপ্ন যদি রাজনীতির ছোবলে ভেঙে যায়, তাহলে সে প্রতিবাদ না করে থাকতে পারবে না। ৪ আগস্ট, সে অন্য শি¶ার্থীদের সাথে আন্দোলনে অংশ নিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। তার চোখে তখন আগুনের ঝিলিক, বুক ভরা স্বপ্ন, আর কণ্ঠে প্রতিবাদের জোর। সহপাঠীদের সাথে নিয়ে সে চৌরঙ্গী মোড় থেকে ভিসি মোড়ের দিকে এগিয়ে যায়। আশেপাশের ইউনিয়ন থেকেও ছুটে আসে হাজারো মানুষ। একটা সতঃস্ফূর্ত ঢেউ তৈরি হয়, পুলিশের উপস্থিতি শুরু থেকেই ছিল উত্তপ্ত,সাথে ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীরা। কিন্তু ছাত্রদের জেদ আরও প্রবল। তারা ছিলো নিরস্ত্র। ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা। নীলফামারীর ডিসি মোড়ে তখন আন্দোলন তুঙ্গে। আতিক ছিলো মিছিলের একেবারে সামনের দিকে। হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পুলিশ চরম বেগতিক অবস্থা অনুভব করে ছত্রভঙ্গ করার জন্য ছররা গুলি চালায় এবং টিয়ার গ্যাস নি¶েপ করে। ছাত্র জনতার দিক বিদিক ছুটতে থাকে। অনেকের শরীরেই ছররা গুলির আঘাতে রক্তাক্ত হয়। হঠাৎ তীব্র ব্যথা অনুভব করে আতিক। অনুভব করে তার শরীরে কেমন যেন আগুন ধরে গেছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে সে দেখে আরও কয়েকজন আহত হয়ে পড়ে যাচ্ছে। চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, কান পটপট করে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরীরের নানা অংশে ছররা গুলি ঢুকে পড়ে। পিঠে, পায়ে, মাথার পাশে প্রায় ৫০টির মতো ছররা গুলি আঘাত হানে। ছররা গুলিতে তার শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। রক্তে জামা ভিজে লাল হয়ে যায়। ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হতে শুরু করে। তার পাশে থাকা সহপাঠীরা তাকে ধরে নিয়ে নিকটস্থ সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু ভিড় ও বিশৃঙ্খলায় সেখানে দীর্ঘসময় অবস্থান করা সম্ভব হয় না। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারীর গ্রীন সাইন ক্লিনিকে। সেখানে এক্স-রে করে দেখা যায় গুলিগুলো শরীরের গভীরে ঢুকে গেছে।

ব্যথার দিনগুলো ও চিকিৎসার যুদ্ধ
চিকিৎসার যুদ্ধ শুরু হয় গ্রীন সাইন ক্লিনিক থেকেই। প্রথমে কয়েকটি ছররা গুলি বের করা হয়। কিন্তু শরীরে তখনও ৭/৮টি গুলি রয়ে যায়। পরে তাকে ভর্তি করা হয় নীলফামারী সদর হাসপাতালে। ১০ দিন ধরে চলে চিকিৎসা, আর পরিবার প্রতিদিন ছুটে চলে হাসপাতাল থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে ক্লিনিক। ঢাকা মেডিকেল, ঢাকার সিএমএইচ এবং রংপুর সিএমএইচ এই তিন জায়গায় তাকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়মিত যাতায়াত করা, চিকিৎসা নেওয়া, ঔষধ ক্রয় করা ছিলো ব্যয়বহুল। কৃষক বাবার প¶ে এত খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়, যা তারা ধার করে জোগাড় করে। মাথা ও শরীরে রয়ে যাওয়া ছররা গুলির জন্য আতিক এখনো ভোগে ব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও অসুস্থতায়। ডাক্তাররা বলেন, যদি উন্নত পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার করানো যায়, তাহলে পুরাপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ এখনো তাদের নাগালের বাইরে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
যেহেতু সে এখনো শিক্ষার্থী সুতরাং শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া যেতে পারে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আতিকুজ্জামান
জন্ম তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০০৬
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু
নিজ জেলা : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: তালুক মানুষমারা, ইউনিয়ন: মেলাকচুকাটা, থানা: নীলফামারী সদর, জেলা: নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : শামসুল হক
মায়ের নাম : আয়শা খাতুন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. শামীমা আক্তার, বয়স: ২৬, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. আসাদুজ্জামান, বয়স: ২৩, পেশা: মুদি দোকান, সম্পর্ক: ভাই
৩. সালমা আক্তার, বয়স: ২০, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
৪. আসমা আক্তার, বয়স: ১৩, পেশা: শিক্ষার্থী , শ্রেণি: ৭ম, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : ডিসি মোড়, নীলফামারী
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍